FASHON
  • কভারস্টোরি I আপনজনে ফেরা

    মনে যখন বাজে ‘অ্যাওয়ে ফ্রম হোম’ তখন উৎসব তাগাদা দেয় আপন মানুষের কাছে ফেরার জন্য। ভিড়, আসনসঙ্কট, দুর্ঘটনার শঙ্কা- সবই তুচ্ছ হয়ে যায়। প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে হবে যে! লিখেছেন সাগুফতা শারমীন তানিয়া

    উৎসব মানে স্বজনের বুকে ফেরা কিংবা আপনজনের বুকে ফিরে আসার মানেই উৎসব। উৎসবের আনন্দ-অনুভূতির পেছনে এই সম্মিলনের ভূমিকা এত বড় যে, স্বজনদের কাছে ফিরতে না পারলে পরবাসীর উৎসব আর উৎসব থাকে না। মনে আছে আপনাদের, মানুষের কাছে মানুষ ফিরবার জাদুকরি একটি বিজ্ঞাপন দেখাতো বিটিভি, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিজ্ঞাপন, ইয়ানি ‘ল্যাকমে’ অপেরার ‘ফ্লাওয়ার ডুয়েট’-এর মিউজিক ভেঙে এই বিজ্ঞাপনের আবহসংগীত করেছিলেন, ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল এই বিজ্ঞাপনের সুরটির সঙ্গে আকাশপথে ভ্রমণশেষে অজস্র্র মানুষের আলিঙ্গনের দৃশ্যাবলি। আজ পর্যন্ত সুরটি শুনলে মনে হয়, মানুষ ফিরছে মানুষের কাছে, উৎসবের সূচনা ঘটছে। এমন মানুষও দেখা গেছে, যারা ইচ্ছে করে বিমানবন্দরের অ্যারাইভাল লাউঞ্জে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন- শুধু মানুষ ফিরছে মানুষের কাছে- এইটুকু দেখবার জন্য। ঈদে বাঁধ ভেঙে পড়া ভিড়ে বাসস্টেশন, রেলস্টেশন আর লঞ্চ টার্মিনাল থেকে যারা অসম সাহসে যাত্রা করেন ঘরে, তারা নিশ্চয়ই এই অনুভূতির দাম চোকাতেই এমন দুর্ভোগে পড়েন।
    অল্প বয়সে আমাদের এক শিক্ষকের মুখে গল্প শুনেছি, তাঁর শহরযাত্রার দিন জলে ভাসা সাবান দিয়ে ফর্সা করে কেচে শাদা থানখানা পরে তালাবের পাড়ে দাঁড়াতেন মা, কাজীবাড়ির তালগাছটার পাশ দিয়ে পথ বেঁকে যাওয়ার আগ অব্দি পিছু ফিরে তাকাতেন তিনি, বহুদূর থেকে ফটফট করতো মায়ের শাদা শাড়ি, একটা ঝকঝকে চিহ্ন শুধু এইটুকু বলে দিচ্ছে ‘আবার দেখা হবে’, ‘তুমি ফিরে এসো’। এমন স্মৃতি আপনাদের অনেকের আছে। কুমড়ো ফুলে নোয়ানো লতা আর সজনে ঝাঁপানো গাছটা দেখে মা প্রতীক্ষায় আছেন, আপনি কবে ফিরবেন। শহরের যান্ত্রিকতাকে পরিত্যাগ করে, চাকরির নিষ্পেষণকে পাশ কাটিয়ে ফিরে আসবেন বাড়িতে- যে ফেরার নাম ‘উৎসব’, যে ফেরা নবজন্ম দেয় ক্লান্ত শ্রান্ত হতশ্রী কর্মীর জীবনকে। পাকদ-ীর পরে আলো জ্বালা ঘর, সে ঘরের নাম বাবা-মা। শুধু কি বাবা-মা? যে বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে ‘রজনী হলো উতলা’ পড়তে পড়তে দুপুরের ভাতঘুম দিতেন আপনি, সেই পরিচিত বিছানায় সুশীতল সুজনির মাঝখানটিতে ফোঁড় তোলা পদ্মফুল, বালিশে বহুদিনের জমাট তুলোর কাঠিন্য আর পরিচিত চুলের গন্ধ; হয়তো কৈশোরের তিক্ত কান্নাও স্ফটিক হয়ে জমে আছে এর তুলোয়। আরশিলতায় জড়ানো কবেকার হাত-আয়না, কাজল, রূপটান রয়ে গেছে সাজটেবিলের ড্রয়ারে। একসময় আপনি যে প্রসাধন ব্যবহার করতেন, সেই সব প্রসাধনীর ফাঁকা বোতল আশ্চর্যভাবে সারিবদ্ধ রয়ে গেছে সাজটেবিলের উপরে। সকালবেলা যে চিরপুরাতন বাড়িটিতে এখনো কেউ রেডিও শোনে, রেডিওর শব্দে জেগে ওঠার পর আপনার মনে হবে- আপনি আসলে কখনো কোথাও যাননি, এখানেই ছিলেন, এই তো এখানেই আছেন। আলনায় রয়ে গেছে মৃত প্রিয়জনের জায়নামাজ কিংবা ক্যাপস্টান গেঞ্জি। যারা আজ স্টিমারের ভোঁ-ধ্বনির মতন দূরের, দূরে বলেই বিষাদময়, সেই তাদের কাছে ফিরে আসবার সকালে যেমন রোদ ওঠে, তেমনি রোদ উঠেছে। ফিরে আসবার বর্ণে-গন্ধে উন্মনা এই সকাল শুরুর সময় চড়িয়েছে সেদ্ধ আটার রুটির কাই; গরম হাতরুটির গন্ধে ভরে গেছে ঘর, বঁটি দিয়ে সরু করে কাটা যে আলুভাজা এখন প্রায় জাদুঘরের বস্তু, কিংবা মুক্তোদানার মতন সাবুদানার সঙ্গে আম-দুধের ক্বাথ, যা ভাইবোনদের ভেতর আপনিই কেবল ভালোবেসে খেতেন, সেই সবের আয়োজন চলছে। পুকুরপাড়ের যেদিকটা থেকে আপনার ছোট ফুফু আমরুল শাক তুলে আনতেন, যেখানে বসে লুচিপাতা নামের আগাছার চকচকে পাতা দিয়ে ভাইবোনেরা মিলে রান্নাবাটি খেলতেন, সেই পুকুরের পাড়ে অনেক দিনের পুরোনো অর্জুনগাছটা কেটে ফেলা হয়েছে। পুকুর বুজিয়ে ঘর তুলছে পড়শিরা। বাজারফেরতা সলজ্জ সুরে আপনার বাবা কিংবা কাকা বলছেন, আপনার প্রিয় খাবারগুলো সবই আজকে বাজারে পেয়ে গেলেন, কী কাকতাল! দুপুরে খেতে বসে কাউকে ধরতে না দেয়া আমের আচারের বোতলটা এই প্রথম খোলেন আপনার মা। আর কত বলবো, আপনিও জানেন, আমিও জানি, এমন অজস্র প্রিয় দৃশ্যের অবতারণা হবে। এসব অসহ্য মধুর সময় ফিরে আসবে আপনাকে ঘিরে পানাপুকুরের পানার মতন। প্রাপ্তবয়স্কতার সব গুরুভার হঠাৎ যেন নির্ভার হয়ে আসবে। বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম সহনীয় হয়ে আসবে। আন্তনগর বাসে বা ট্রেনে বাদুড়ঝোলা হয়ে কিংবা লঞ্চে মরি-বাঁচি ভিড়ে কোণঠাসা হয়ে ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরবার গ্লানিটুকু মনেই করতে পারবেন না। এর নাম বাড়ি ফেরা। এর নাম জন ডেনভারের গান-
    ‘লাইফ ইজ ওল্ড হিয়ার,
    ওল্ডার দ্যান দ্য ট্রিজ
    ইয়ঙ্গার দ্যান দ্য মাউন্টেনস
    ব্লোয়িং লাইক দ্য ব্রিজ।
    কান্ট্রি রোডস টেইক মি হোম,
    টু দ্য প্লেইস আই বিলং।’
    বাড়ি ফিরবার এই আকুতি চিরন্তন, ফিরবার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই নস্টালজিয়া আর আনন্দের অনুভূতিও চিরদিনের। বাড়ি তো একটি স্থানমাত্র নয়, বাড়ি-বাড়ি বোধটা একটা অনুভূতি। এই অনুভূতি প্রিয়জনের গায়ের স্পর্শ আর গন্ধে জড়িয়ে থাকে, জীবিতদের তো বটেই, সমাধিস্থ প্রিয়জনদের সঙ্গেও থাকে। তাই তো উৎসবে এমন টান পড়ে মূলে, এমন করে ত্যাগ স্বীকার করে প্রিয়জনের কাছে ফেরে মানুষ।
    এত প্রিয় বাড়ি আর এত ঘনিষ্ঠ প্রিয়জন ছেড়ে কেন গেছিলেন আপনি? কেমন করে একদিন আপনার চোখেও লেগেছিল সিটিলাইটসের ঝলকানি আর একটা অদ্ভুত উজ্জ্বল চোখের চৌম্বক দৃষ্টির মতন করে বড় শহরের আলো আপনাকে টেনে নিয়ে গেছিল নিজের কাছে। নতুন জীবনের সন্ধান, বৃহত্তর সম্ভাবনার আবেদন, নতুন নতুন সম্পর্ক নির্মাণের হাতছানির কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছিল এই পুরাতন ঘরের সুজনি বিছানো শোবার খাট, পুকুরপাড়ের অর্জুনগাছ, সকালে মায়ের হাতের রচিত খাবার আর রেডিওর শব্দ। কিংবা হয়তো ভেবেছিলেন, এ যাওয়া সাময়িক। অবস্থা ফিরলে এই বিয়োগব্যথাকে মিলনের আনন্দ দিয়ে বদলে ফেলতে পারবেন, প্রিয়জনকে নিয়ে আসতে পারবেন কাছে। যাওয়াটা যত সহজ, ফিরে আসাটা তত নয়। যাওয়াটাই বা সহজ কেন বলি? সহজ তো নয় ‘চেনা চেনা হাসিমুখ, চেনা আলো চেনা অন্ধকার’-এর হাত ছাড়িয়ে দূরের পাল্লা দেয়া, অচেনার উদ্দেশে রওনা দেয়া। এই যেমন নিজের অবস্থা বদলাবার পরে আপনি দেখলেন, প্রিয়জনদের আপনার কাছে যাওয়াটা সহজ নয়। পরিণত বৃক্ষকে যেমন উন্মূল করা যায় না, ব্যাপারটা তেমন। বাড়ি তো আমাদের কাছে কেবল একটি আবাসস্থল নয়, ‘বাড়ি’ বলতে কথ্যভাষায় আমরা যা বোঝাই তা একটি পাড়া, একটি সমাজ, একটি গ্রাম কিংবা একটি অঞ্চল। বাড়ি ছাড়া মানে এই পুরো অঞ্চলটিকে ছেড়ে আসা। পরিচিত পরিম-ল ছেড়ে যাওয়ার সাহস বা অমøানবদন সবার থাকে না। অতএব প্রিয় মানুষের সঙ্গে আপনার একটি ভৌগোলিক দূরত্ব সূচিত হলো। এই দূরত্ব ঘুচে যায় কেবল বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে, সামাজিক সম্মিলন ছাড়া যেসব দিন পূর্ণতা পায় না, সেই সব দিনেই আপনি এই আপনজনদের কাছে ফিরতে পারেন। ছেড়ে যাওয়ায় উভয় পক্ষের ব্যথাবোধ ছিল বলেই ফিরে আসায় উভয় পক্ষের এমন দারুণ আনন্দ।
    শুধু কি আনন্দ? প্রাথমিক আনন্দকে ছাপিয়ে পুরোনো আঘাত-সংঘাতের স্মৃতিও তো ফিরে আসে, পুরোনো শাস্তি, পুরোনো নির্যাতন, পুরোনো অমীমাংসিত বিতর্ক আর পুরোনো লেনদেনের স্মৃতিও ফিরে আসে এই উৎসবে বাড়ি ফিরতে গিয়ে। কোনো কোনো স্মৃতি এতই তিক্ত আর এখনো বেদনার জায়গাটা এত সংবেদনশীল যে মনে পড়ে না মাঝখানে কেটে গেছে কতকাল। ক্রিসমাসে বাড়ি ফেরা নিয়ে যত চলচ্চিত্র আছে, বিশ্বযুদ্ধের পরে বাড়ি ফেরা নিয়ে যত চলচ্চিত্র আছে, তার উপজীব্য হিসেবে এই পুরাতন লেনাদেনার ব্যাপারটা ঘুরেফিরে আসে, আসবেই। স্কট ফিটজেরাল্ড বলে গেছেন, ‘বাড়ি ফেরাটা বেশ আজব। কিছুই বদলায়নি, সবকিছু আগের মতোই দেখায়, আগের পরশ ফিরে আসে, আগের মতোই তাদের গন্ধ। মাঝখানে শুধু বদলে গেছ তুমি স্বয়ং।’ মেলা থেকে তালপাতার বাঁশি কিনে আনা যায় সত্যি, ‘বাঁশি কই আগের মতো বাজে না’। মানুষে মানুষে উৎসবকে কেন্দ্র করে সকল সম্মিলনেই এমন কিছু ঘটনায় বেসুর বাজে, কলহের উদ্রেক হয়, শুরু হয় মন-কষাকষি, কোনো তিক্ততার সূত্রপাত অবিলম্বে মিটে যায়, কোনোটি মানুষ বহন করে নিয়ে যায় আগামীর বছরগুলো অব্দি। তবে এ রকম না হওয়াটাই স্বাস্থ্যকর।
    শামসুর রাহমান তাঁর ‘এক ধরনের অহংকার’ বইটিতে একটি কবিতা রেখেছিলেন, নাম ‘বাড়ি ফেরা’-
    ‘কোনো পিছুটান নেই, সূর্যাস্ত দেখার লোভে কোনো
    নদীতীরে অথবা টিলায় দাঁড়ানোর অবসর
    আজকাল মেলা ভার। পার্কে ব’সে কিংবা ঘাসে শুয়ে
    ভাবনা বিলাসে মেতে উঠবো যে,
    তারও জো নেই সম্প্রতি, তবু
    বাড়ি ফিরতে রোজ আমি দেরি করে ফেলি,
    বড় বেশি দেরি করে ফেলি।’
    বাড়ি ফেরা নিয়ে একটি সংরক্ত গল্প আছে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের, শহরে ছোটখাটো চাকরি করা একটি যুবক রাতটুকুর জন্য শুধু বাড়ি ফেরে। অন্ধকার ঘাটে বসে সন্ধ্যার বিশ্রম্ভালাপ করছিল যে ভাইবোনরা তারা তাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে, মা তার সংবর্ধনায় তড়িঘড়ি বউটিকে নিয়ে পোলাও বসায়। রাত্রি অর্ধেক হবার পর কোনোমতে স্ত্রীর সঙ্গে বিরলে মিলিত হয় সে, নবজাতককে নিয়ে কিছু স্নেহাতুর সময় কাটায়, স্ত্রী তার অনুরোধে তুলে রাখা বিয়ের শাড়িটা পরে। ভোররাতের দিকে সে যখন চলে যাচ্ছে, ছোট ভাইবোনদের একজন তীক্ষè স্বরে জিজ্ঞেস করে, ভাবি বিয়ের শাড়ি পরেছে কেন? বড় মায়াবী সেই গল্প।
    ফিরে যাওয়া নিয়ে অনেক উপন্যাস আছে বিশ্বের সাহিত্যভান্ডারে। আমরা কৈশোরে যে ‘লিটল উইমেন’ পড়েছি, তাতে বারেবারে ফিরে এসেছে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা মানুষ, ফিরে এসেছে পুরোনো সম্পর্কগুলোতে ফিরে ফিরে যাওয়া মানুষ। চারটি কম বয়স্ক মেয়ে, তাদের বাবা যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরেন, সেটাই তাদের উৎসব। বিমল করের ‘বালিকা বধূ’তেও বারংবার উৎসবে কিশোর স্বামী-স্ত্রীর দেখা হবার প্রসঙ্গ বারবার এসেছে, এই দেখা হতে হতে তারা একসময় একে অপরের প্রতি টান অনুভব করতে থাকে, তাকিয়ে থাকে সামনের ছুটির দিনগুলোর দিকে। একটি বিখ্যাত চীনা উপন্যাস আছে, তার নাম ‘প্রতীক্ষা’, প্রতিবছর সেখানে একজন বাল্যবিবাহিত লোক উৎসবে শহর থেকে বাড়ি ফেরে। শহরে তার নতুন প্রেমিকা হয়েছে, নতুন জীবনের টান তাকে বাধ্য করেছে বিবাহবিচ্ছেদের ব্যাপারে কৃতসংকল্প হতে। প্রতিবছর সেই সংকল্প নিয়েই সে বাড়ি ফেরে, কিন্তু বাড়ি ফিরে প্রতিবছর নানানভাবে তার মন বদলে যায়, সে আর বিচ্ছেদের কথা তুলতে পারে না। বাল্যবিবাহিত স্ত্রীটি কোনোকালেই তার মনঃপূত ছিল না, স্ত্রীর পায়ে ফেট্টি বেঁধে রচিত চীনারীতির ক্ষুদে পা থেকে শুরু করে সবই ছিল তার কাছে কুসংস্কারের বোঝামাত্র। অথচ ফিরে এলেই ঘরের আনন্দ আর স্বস্তি এমনভাবে তাকে জড়িয়ে ধরতো, উনুনের আগুনে গরম করা ইটের বিছানা এমন করে তাকে উত্তাপ দিত আর চারপাশের আত্মীয়পরিজন এমন করে তাকে ঘিরে ধরতো যে সে প্রতিবছর বিবাহবিচ্ছেদ মুলতবি রেখে শহরে ফিরে যেত। এইভাবে কুড়ি বছর ধরে সেই লোকটা নিরুপায় স্ত্রী আর অনন্যোপায় প্রেমিকার প্রতীক্ষার মাঝে যাতায়াত বজায় রাখে। পূজার ছুটিতে বাড়ি ফিরে পুরোনো গাঁয়ে কত প্রেম হয়ে যেত শাদাকালো সিনেমায়, কিংবা সে সময়কার উপন্যাসে। বাড়ি ফিরতে না পারা নিয়েও তৈরি হয়েছে কত চলচ্চিত্র, এ মুহূর্তে মনে পড়ছে ফারুক শেখ আর স্মিতা পাতিলের ‘গমন’-এর কথা। ‘আ ওয়াক ইন দ্য ক্লাউডস’-এ চকলেট ফেরি করা যুবকটি বাড়ি ফিরেছিল গভীর আনন্দে, স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের দিন ফুরালো বুঝি এবার, সে জানতো না বেঁচে থাকা প্রিয়জনের সঙ্গেও এমন বিচ্ছেদ রচিত হতে পারে, যা মৃত্যুর সমান।
    বড় বড় শহরের বেশির ভাগ বাসিন্দা দেশের অন্য জেলা থেকে আগত, জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে এরা বড় শহরে ঘাঁটি পাতে, উৎসব এলে তাই ফাঁকা হয়ে যায় ঘনবসতিপূর্ণ বড় বড় শহর। ঈদে এরা বাড়ি ফিরবার জন্য সারা রাত টিকিট কাউন্টারের পাশে লাইন দিয়ে থাকে, নির্ঘুম রাত কাটাবার বদৌলতে একটি টিকিট পাওয়ার আশায়। জাহাজ নষ্ট, লঞ্চ ঘাটতি, ট্রেনের আসনসংকট ইত্যাদি কিছুই ঘরমুখী এসব মানুষের ঢল আটকে রাখতে পারে না। প্রতিবছর ঈদে অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী লঞ্চডুবি, বাস ও রেল দুর্ঘটনা লেগেই আছে। জনসংখ্যাস্ফীতিকে আমরা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, মানুষ তার উৎসবে বাড়ি ফিরতে চাইবেই, সেই বাড়ি ফিরবার মানবিক অনুভূতি যখন হাজারে-লক্ষে এসে দাঁড়ায়, তখন দেশের যোগাযোগব্যবস্থা মার খাবেই। বাড়ি ফিরতে গিয়ে যার প্রিয়জন মারা গেছে, কেবল সে-ই জানে উৎসব বলে আগামীতে আর কিছু বাকি থাকবে না। প্রতিটি ঈদে প্রতিটি পূজায় এইভাবে শুধু বিয়োগের যন্ত্রণা ফিরে ফিরে আসবে।
    গ্রামে যাদের সংসার ফেলে রেখে যেতে হয়, তারা গ্রামে ফেরেন স্ত্রী-সন্তান-মাতা-পিতা সবার সঙ্গে মিলনমেলার অভীষ্ট আনন্দকে বুকে নিয়ে। আর শহরেই যারা সংসার পেতেছেন, তারা উৎসবকে কেন্দ্র করে গাঁয়ে ফেরেন নিজের সন্তানদের সঙ্গে নিজের বয়স্ক বাপ-মায়ের সাক্ষাৎ ঘটাতে। ভাইবোনদের কেউ গ্রামে রয়ে গেলে তাদের জন্য সঙ্গে থাকে উৎসবের সওগাত। ভাইবোন সবাই গ্রাম ছেড়ে একেক শহরে চলে গেলে উৎসবকে কেন্দ্র করে সব ভাইবোন একত্র হতে চেষ্টা করেন বাবা-মায়ের বাড়িটিতে। বাঙালি পুরুষের বেলায় এই বাড়ি ফেরাটা নিঃশর্ত এবং নিঃসঙ্কোচ। কিন্তু বিবাহিত বাঙালি নারীর বেলায় এই ‘বাড়ি’ শব্দটাই দোটানার, সে কি বাপের বাড়ি গিয়ে আপনজনের সঙ্গে মিলিত হবে, নাকি সামাজিকভাবে ধার্য করে দেয়া সর্বাধিক আপনজন তথা ‘স্বামী’র বাড়ি গিয়ে উৎসবের কর্তব্য করবে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টিই হয় একমাত্র গন্তব্য, উৎসবেও ছুটি মেলে না বিবাহিতা নারীর। যারা তার বিবাহক্রমে আপন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যারা তার ‘পরস্য-পর’ এবং রীতিমতো বৈরী, তাদের সঙ্গেই বিবাহিতা বাঙালি নারীর ভাগ করে নিতে হয় উৎসবের বাড়ি ফিরবার কোলাহল। তবে দিন বদলাচ্ছে শোনা যায়। সংসারে চাকরিজীবী নারীর প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক অবদান বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে এই দৃশ্যপট বদলেছে। এখন দুই ঈদ কখনো দুইভাগে ভাগ হয়, বাপের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি, সচরাচর স^ামী এবং স্ত্রী একই ঈদে যে যার বাপের বাড়ি পাড়ি জমান না। সেটা হলেও মন্দ হয় না, তবে স্বামী-স্ত্রী যখন ছোট ছোট শিশুর মাতাপিতায় পরিণত হন, তখন শিশুরা উৎসবে অভিভাবকদের উভয়ের সঙ্গ কামনা করে বলে স্বামী স্ত্রী যে যার বাড়ি ফিরে যেতে পারেন না। উৎসবে উভয়ে উভয়ের সঙ্গ কামনা করেন বৈকি, দুজনে মিলে আনন্দযাপনের এই তো সময়, শ্রমসমবায় করে তারা উৎসবের বাড়তি কাজগুলো সম্পাদন করেন।
    যে বিচ্ছেদ রচিত হয়েছিল জীবন আর জীবিকার তাগিদে, সেই বিচ্ছেদের সুর মোচনে আপনজনদের কাছে এই প্রত্যাবর্তনের এবং উৎসবে মাতবার কোনো বিকল্প হয় না। ঘরে ফিরবার সবচেয়ে বড় স্বস্তি এই যে, নির্ভার শৈশবের মতন এখনো প্রাপ্তবয়স্কের মনের কোথাও বাবা-মায়ের প্রতি তেমনি নির্ভরতা রয়ে যায়, সেই মুখাপেক্ষিতার স্বস্তিটুকু ফিরে পাওয়া যায়। পিটার, পল, মেরির সেই বিখ্যাত গানটিতে যেমন গুমরে গুমরে ফিরে আসে এই অনুভব-
    লর্ড আইয়্যাম ওয়ান,
    লর্ড আইয়্যাম টু,
    লর্ড আইয়্যাম থ্রি,
    লর্ড আইয়্যাম ফোর
    লর্ড আইয়্যাম ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস অ্যাওয়ে ফ্রম হোম
    অ্যাওয়ে ফ্রম হোম, অ্যাওয়ে ফ্রম হোম, অ্যাওয়ে ফ্রম হোম
    বাস-ট্রেন-জাহাজের দূরত্বের আরও বাইরে উড়োজাহাজে ভ্রমণের দূরত্বে গেছে যে, সেই প্রবাসীদের প্রিয়জনদের কাছে শিগগিরই ফেরা হয় না উৎসবে। তার জন্য রয়ে যায় সেই গুমরানি ‘অ্যাওয়ে ফ্রম হোম, অ্যাওয়ে ফ্রম হোম’, চোখের জলে নোনা ঈদের সকালে চাকরিক্ষেত্রে রওনা দেবার পাতালরেল। কিংবা তখন সে নতুন স্বজন গড়ে নিয়েছে পরবাসে, নতুন ঈদগাহ, নতুন গেট-টুগেদার পার্টি।
    শুভ হোক, মঙ্গলময় হোক ক্যানভাসের পাঠকদের দূরের ও কাছের বাড়ি ফেরা। উৎসবের সোনালি সকালে ‘কেহ যেন দুঃখভোগ না করে’।


    মডেল: অভিনেত্রী মাসুমা রহমান নাবিলা, শান্ত খান
    মেকওভার: পারসোনা
    ছবি: তানভীর খান
    ওয়্যারড্রোব: স্বপ্ন লাইফ


    Subscribe & Follow

    JOIN THE FAMILY!

    Subscribe and get the latest about us
    TRAVELS
    LIFESTYLE
    RECENT POST
    চিত্রকর্মে
    23 September, 2017 6:39 pm
    নখ দিয়ে রেকর্ড
    23 September, 2017 6:27 pm
    BANNER SPOT
    200*200
    SOLO PINE @ INSTRAGRAM
    FIND US ON FACEBOOK