FASHON
  • ফিচার I তারকাশোভিত কান উৎসব

    বারো দিনের এই উৎসব জমজমাট, আগের যেকোনোবারের চেয়ে। রেড কার্পেটে বিখ্যাত ডিজাইনারদের উদ্ভাবনী পোশাকে বিশ্বের নামিদামি তারকার উপস্থিতিতে, সেরা সব চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীতে। লিখেছেন জান্নাতুল মাওয়া

    সৈকতশহর, বারো হাজার চলচ্চিত্রকর্মী, শতাধিক চলচ্চিত্র, বিশ্বের বিখ্যাত ফ্যাশন আইকনদের চোখধাঁধানো উপস্থিতি, লেট নাইট পার্টি- সব মিলিয়ে ৭০ বছর বয়সে এসেও কান চলচ্চিত্র উৎসব এখনো ঝলমলে তরুণ। প্রতিবছরই আয়োজকেরা সচেষ্ট থাকেন আগের বছরের আয়োজনকে ছাড়িয়ে যেতে। ১৭ মে শুরু হয়েছিল চলচ্চিত্র আর ফ্যাশনের এই আনন্দযজ্ঞ, যার পর্দা নামে ২৮ মে।
    এবার দীর্ঘ ১৪ বছর পরে আবার কান চলচ্চিত্রের উপস্থাপনায় আসেন ফরাসি-ইতালীয় অভিনেত্রী মনিকা বেলুচ্চি। এর আগে, ২০০৩ সালে এই উৎসবের উপস্থাপনায় তিনি এসেছিলেন। এবারের কান উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরুর আগেই ঘোষণা দেন, আজকের অনুষ্ঠানে তিনি কোনো আলো নিতে আসেননি, বরং দিতে এসেছেন। কথাকে কাজে পরিণত করতে অনুষ্ঠানের মূল কেন্দ্র পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনের গ্র্যান্ড থিয়েটারে এসেছিলেন ক্রিশ্চিয়ান দিওরের পোশাকে। যে নেকলেসটি তিনি পরেছিলেন, তাও তাকে অনন্য করে তুলেছে। আসর জমাতে দারুণ পটু এই অভিনেত্রী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সহ-উপস্থাপক ফরাসি নির্মাতা ও কমেডিয়ান এলেক্স টুজকে চুম্বন করলে মুহুর্মুহু করতালিতে অডিয়েন্স ভরে ওঠে। উৎসবের পরবর্তী দিনগুলোতেও তিনি তার ফ্যাশনের ধারা অব্যাহত রাখেন। একদিন স্টেলা ম্যাককার্টনির কালো প্লেইন একটি জাম্পস্যুট পরে রেড কার্পেটে আসেন। তবে তাতে একটি পাথরের ব্রোচ লাগিয়ে তিনি একে নতুন মাত্রা দেন। সমাপনী উপস্থাপনায় পরে আসেন ডলশে অ্যান্ড গ্যাবানার ডিজাইনের কালো গাউন। এদিনও তার গলায় ছিল আকর্ষণীয় নেকলেস। সঠিক গয়নার ব্যবহার যে পোশাকেও যোগ করে ভিন্নমাত্রা, তা এবারের উৎসবে মনিকা বেলুচ্চির কাছ থেকে শিখে নেয়া যেতে পারে।
    এবারের উৎসবে নারী নির্মাতা আর অভিনেত্রীরা শুধু রেড কার্পেটই আলোকিত করেননি, বরং রুপালি পর্দায়ও দেখিয়েছেন সমান ঝলক। ৭০ বছরে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো নারী পরিচালক সোফিয়া কপ্পোলা দ্য বিগিল্ড ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার জিতে নেন। এর আগে ১৯৬১ সালে সোভিয়েত নির্মাতা ইউলিয়া সলতসেভা প্রথম নারী হিসেবে শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার হাতে নিয়েছিলেন। বোঝা যাচ্ছে, নারী পরিচালকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে আরেকটি সাফল্যের জন্য।
    ৪৯ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান অভিনেত্রী নিকোল কিডম্যানেরও জয়জয়কার ছিল এবার। তিনি আসেন টিভি শো আর ফিল্ম মিলিয়ে চারটি বড় বড় প্রজেক্ট হাতে নিয়ে। তার চলচ্চিত্র দ্য বিগিল্ড উৎসবে স্বর্ণ পাম জয়ের প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছিল। এ ছাড়া তার অভিনীত কিলিং অব আ স্যাক্রেড ডিয়ার এবং টিভি শো হাউ টু টক টু গার্ল অ্যাট পার্টিস দর্শকদের প্রশংসা পায়। চলচ্চিত্রে ভূমিকার জন্য উৎসবের ৭০ বছর উদ্যাপন উপলক্ষে জুরি পুরস্কার পান নিকোল। স্বাভাবিকভাবেই রেড কার্পেটে তিনি ছিলেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। ক্যালভিন ক্লেইনের করা সাদা-কালো ব্যালেরিনা পোশাকে তাকে মনে হয়েছে সদ্য বিশ পেরোনো কোনো উচ্ছল তরুণী। সঙ্গে ছোট মুক্তার দুল তাকে এনে দিয়েছিল ছিমছাম ও অভিজাত লুক। উৎসবের বাকি দিনগুলোতেও তিনি ছিলেন সমানভাবে আকর্ষণীয়।
    বড় বড় তারকার অনেকেই এবার ছিলেন পর্দার আড়ালে। টোয়াইলাইট তারকা ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট ‘কাম সুইম’ নামের একটি শর্ট ফিল্ম নিয়ে এসেছিলেন উৎসবে। চলচ্চিত্রটির মূল গল্প ছিল একজন পুরুষকে নিয়ে। ক্রিস্টিন স্টুয়ার্ট এবারে লালগালিচায় আসেন ছোট চুলে। তিনি চিরাচরিত ঝলমলে গাউন বাদ দিয়ে পরেন একেবারেই সাধারণ পোশাক।
    এর আগে রেড কার্পেটে ঝলকানি তোলা আরেক তারকা রবিন রাইটও নিজের চলচ্চিত্র নিয়ে হাজির হয়েছিলেন উৎসবে। নাম দ্য ডার্ক অব নাইট। তার চলচ্চিত্রটি ছিল একজন নারীকে নিয়ে।
    টিভি শো আর নেটফ্লিক্সও এবার জায়গা করে নেয় কানে। উৎসবের তৃতীয় দিনে নেটফ্লিক্সের ওকজা ছবিটি প্রদর্শিত হয়। রিহানা আর বেলা হাদিদের ঝলমলে উপস্থিতি এদিন সবার নজর কাড়ে। বেলা ছিলেন বেশ সাহসী পোশাকে। লম্বা সাটিন গাউন তার ডান পা-টি ঢাকতে পারেনি। রেড কার্পেটে পুরো পা ছিল উন্মুক্ত। তবে গলায় স্যাফায়ার, এমারেল্ড, হীরা আর স্বর্ণখচিত অসাধারণ গয়নাটির দিকে গিয়ে তাকাতে দর্শকেরা তার উন্মুক্ত পা নিয়ে খুব ভাবতে পারেননি সম্ভবত।
    সৈকতের শহর তারকাদের ছবি তোলার তৎপরতা বাড়িয়ে তোলে বহুগুণ। ইনস্টাগ্রামের বদৌলতে বেলা হাদিদসহ আরও অনেক তারকা ছবি তুলে সঙ্গে সঙ্গেই পোস্ট করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায় আর ভক্তরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন সেসব ছবিতে। এ ছাড়া উৎসবের সপ্তম দিনে ছিল গ্রুপ ফটোসেশন। এদিন সব সেলিব্রিটি একত্র হয় ছবি তুলতে। উৎসবস্থল পরিণত হয় আলোর মেলায়।
    শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেছেন জার্মান অভিনেত্রী ডায়ান ক্রুগার। সমাপনী দিনে জোনাথন সিমকাইয়ের কাঁধ ছাঁটা একরঙা কালো গাউন তাকে দিয়েছিল এলিগেন্ট লুক। পোশাকের ছাঁট যে স্টাইলিংয়ে ভিন্ন মাত্রা এনে দিতে পারে, তার অনন্য উদাহরণ ছিল ডায়ানার পোশাকটি। এর সঙ্গে শোপারডের হলুদ হীরার গয়নায় এই সেরা অভিনেত্রী সবার মাঝে আলোকিত হয়ে ওঠেন।
    কানে এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রের উপস্থিতি তেমন ছিল না। অথচ বেশ কয়েক বছর আগেও এই উৎসবে তা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রদর্শিত হতো। ১৯৪৬ সালে চেতন আনন্দের নিচা নগর পুরস্কৃত হয়েছিল। বিমল রায়ের দো বিঘা জমিন (১৯৫৪), সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী (১৯৫৬) ছিনিয়ে এনেছিল পুরস্কার। তবে এই অনুপস্থিতি পুষিয়ে দিতে ভারতীয় সুন্দরীরা বিন্দুমাত্র কসুর করেননি। তাদের প্রত্যেকেই এসেছিলেন কোনো না কোনো পণ্যের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে। যখন তারা লালগালিচায় আসেন, শত শত ক্যামেরা। এবার টুকটুকে লাল পোশাকে এসেছিলেন ঐশ্বরিয়া। বলিউড সুন্দরীর এই উপস্থিতি রেড কার্পেটকে স্নিগ্ধ করে তুলেছিল। রালফ অ্যান্ড রুসোর ডিজাইনের লাল গাউনে তাকে সত্যিই অপূর্ব দেখাচ্ছিল। আগের দিন তিনি সেজে এসেছিলেন ডিজনি প্রিন্সেসের মতো। বরফ সাদা বল গাউন পরা এ সুন্দরীকে লালগালিচায় দেখে মনে হচ্ছিল, এক টুকরো রূপকথার কোনো সুন্দরী হেঁটে যাচ্ছে। ল’রিয়েলের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডার ঐশ্বরিয়ার আগমন প্রতিবারই কানের আকর্ষণীয় অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারতের আরেক সুন্দরী দীপিকা পাডুকোনের চোখের সবুজ মেকআপটি এবারের উৎসবের সেরা লুকগুলোর একটি। বলিউডের আরেক লালগালিচা কাঁপানো তারকা সোনম কাপুর এসেছিলেন এলি সাবের ডিজাইনে তৈরি সোনালি গাউন পরে।
    তবে জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে এবারে বলিউড তারকাদেরও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন ১৯ বছর বয়সী এলি ফ্যানিং। গুচ্চির ফুলের ডিজাইন করা পোশাকে তাকে দেখে দৃষ্টি আরামের অনুভূতিতে ভরে উঠেছে। আরেক দিন তিনি পরেন ভিভিয়েন ওয়েস্টউডের ডিজাইনে ইউনিকর্ন প্রিন্টেড বল গাউন। পোশাকটি তৈরি করতে অর্ধশতাধিক পোশাককর্মী নাকি ৩০০ ঘণ্টা কাজ করেছিলেন। অন্যদিকে কানের পূর্বদেশীয় রানি হিসেবে আবির্ভূত হন ফ্যান বিংবিং, ক্রিস্টোফার ব্লু এর ডিজাইনে করা তার পোশাকে ছিল পাশ্চাত্যের পাশাপাশি চীনা ঐতিহ্যের ছাপ। জুরি সদস্য ফ্যান উৎসবের প্রথম দিনে পরে আসেন এলি সাবের ডিজাইন করা বরফ নীল গাউন। সঙ্গে ছিল ছিমছাম হীরার গয়না। সব মিলিয়ে ফ্যানের দিক থেকে চোখ ফেরানোই দায় হয়ে পড়েছিল।
    উৎসবটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ স্বর্ণ পামের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ ১৯টি চলচ্চিত্র। দ্য স্কয়ার ছবিটিই তা জিতে নেয়।
    বিচারকদের তালিকায় চোখ বোলালেই বোঝা যায়, উৎসবটি ছিল সত্যিকার অর্থেই বিশ্বজনীন। এবার প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকদের সভাপতি হয়েছেন স্প্যানিশ নির্মাতা পেদ্রো আলমোদোভার। অস্ট্রেলীয় পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক জর্জ মিলারের নেতৃত্বে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন উইল স্মিথ, জেসিকা চ্যাস্টেইন, ফ্যান বিংবিং, ফরাসি অভিনেত্রী অ্যাগনেস জাউই, ইতালিয়ান নির্মাতা পাওলো সোরেন্তিনো, দক্ষিণ কোরীয় চলচ্চিত্রকার পার্ক চ্যান-উক, জার্মান নির্মাতা মারেন আদে ও অস্কারজয়ী ফরাসি সংগীত পরিচালক গ্যাব্রিয়েল ইয়ারেদ।
    বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দাগ’ কানের স্বল্পদৈর্ঘ্য বিভাগে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এর নির্মাতা জসীম আহমেদ।
    সব মিলিয়ে এটি ছিল ১২ দিনের এক বিশ্বজনীন মিলনমেলা। তবে সারা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদের আতঙ্ক সমুদ্রতীরের শহর কানকেও কিছুটা অস্থির করে তুলেছিল। তাই নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল আগের চেয়ে বেশি জোরালো। প্রতি ১৬০ মিটার পরপর ছিল তল্লাশির ব্যবস্থা। আগতদের ওপর নজরদারি করার জন্য বসানো হয়েছিল ৫৫০টি সিকিউরিটি ক্যামেরা। এত কড়াকড়ির মাঝেও থেমে থাকেনি চলচ্চিত্র আর ফ্যাশনের জয়যাত্রা। সৃষ্টিশীল মানুষ যুগে যুগে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে জয়ের পতাকা উড়িয়েছেন সর্বত্র।

    ছবি: ইন্টারনেট


    Subscribe & Follow

    JOIN THE FAMILY!

    Subscribe and get the latest about us
    TRAVELS
    LIFESTYLE
    RECENT POST
    জিওমেট্রিক
    23 July, 2017 10:30 pm
    একঝলক
    23 July, 2017 10:35 pm
    BANNER SPOT
    200*200
    SOLO PINE @ INSTRAGRAM
    FIND US ON FACEBOOK