FASHON
  • এডিটর’স কলাম I আমাদের পিঠাপুলি

    প্রশ্ন জাগে, আমরা কি আমাদের সংস্কৃতির অনুষঙ্গ এই খাবারের গুরুত্ব ভুলে যাচ্ছি? প্রায় আড়াই শ রকমের পিঠা তৈরি হতো একসময়, যেগুলোর বেশির ভাগই এখন আর নেই। কেবল শীতকালের ফুটপাতে চিতই আর ভাপা ছাড়া কোনো পিঠাই তেমন নজরে পড়ে না

    পিঠার ঘ্রাণ পেলেই আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। তখনকার যেকোনো উৎসব, বিশেষ অনুষ্ঠান কিংবা আত্মীয় আপ্যায়নে পিঠা তৈরি হতো। আর বানানোর সময় গল্প, হাসি, ঠাট্টা মিলে আনন্দমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হতো। সেই সব দিন কোথায় যে হারিয়ে গেল! অথচ আমাদের দেশে পিঠা বানানোর এই ঐতিহ্য অনেক পুরোনো। সেই আদিকাল থেকে হেমন্ত ঋতুতে কৃষকের ঘরে নতুন ফসল উঠলে গ্রামে আয়োজিত হতো পিঠা উৎসব। তা চলত শীতকাল পর্যন্ত। নতুন চালের গুঁড়ায় কতো রকমের পিঠা যে তৈরি হতো! বোঝা যাচ্ছে, এটি আমাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজকাল সেই নবান্ন নেই, পিঠার গন্ধে জড়ানো গ্রামও নেই; কিন্তু একেবারে যে হারিয়ে গেছে, এমনটা বলার উপায় নেই।

    সেই সময়ের গল্প বলি। বছরজুড়েই তখন নানা বাহানায় পিঠাপুলির উৎসব করা হতো। পয়লা বৈশাখে নকশি পিঠা, গ্রীষ্মকালে তালের পিঠা- সবই উপাদেয়। আসলে বাঙালির জীবনে পিঠা ছাড়া হেমন্ত বা শীত ঋতুর কথা ভাবাই যায় না। একসময় মধ্যবিত্ত শহুরে বাঙালি কিছুদিনের জন্য গ্রামে বেড়াতে যেতো এটি খাওয়ার জন্য। আজকাল সেই রেওয়াজ আছে কি না জানি না। তবে শীত আসার আগে অর্থাৎ হেমন্তের শেষে ফুটপাত থেকে শুরু করে পাঁচ তারকা হোটেলের লবিতে বসে পিঠার আস্বাদে মেতে থাকে এখনকার শহুরেরাও। আজকাল শীতকালে ড্রয়িংরুমের নাশতায়, ছাদের আড্ডায়, পিকনিকে, রাষ্ট্রীয় অতিথি আপ্যায়নে বা কোনো প্রদর্শনী উদ্বোধনে পিঠার সমারোহ থাকা একরকম ফ্যাশন। বলা বাহুল্য, তাতে আর যা-ই থাকুক, আগেকার সেই আন্তরিকতা খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই। একসময় পিঠা বানানো ছিল মা, বোন, নানিদের গেট টুগেদারের উপলক্ষ। পড়শি খালা-চাচিরাও আসতেন আর বসে যেতেন পিঠা বানাতে। পান খেতে খেতে গল্প করতে করতে নিপুণ হাতে চলতো পিঠা বানানোর আয়োজন। ভাপা পিঠা, চিতই, ছাঁচ, ছিটকা, সুন্দরি পাকোয়ান, পানতোয়া, মুঠি, পুলি, কাটা, কলা, খেজুর, লর্গি লতিকা, রসফুল, হাঁড়ি, জামদানি, ঝিনুক, নকশি ইত্যাদি নামের কত পিঠা যে বানানো হতো! বিচিত্র সেসবের ঘ্রাণ আর স্বাদ। লেপে মুড়ি দিয়ে ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা খাওয়া কিংবা আগুনের পাশে বসে চিতই পিঠা খাওয়ার সেই স্মৃতি আজও জ্বলজ্বল করে।
    পিঠার উপর আঁকা হতো পদ্ম, বৃত্ত ইত্যাদি। মায়ের কাছে শুনেছি, তাঁদের আমলে পিঠায় শুভবিবাহ, মনে রেখো আমায়, কে তুমি? ভুলো না আমায় ইত্যাদি লিখে পাঠানো হতো প্রিয় মানুষের কাছে। সাধারণত ফুল পিঠা, পাকোয়ান পিঠায় আঁকা হতো এমন নকশা। অনেক জায়গায় আবার এই পিঠাগুলোকে ফুল পিঠা নামেও ডাকে। আঙুল, নখ ও ছাঁচের সাহায্যে নানা রকম নান্দনিক নকশা ফুটিয়ে তোলা হতো পুলি পিঠায়। নকশা অনুযায়ী নামও হতো ভিন্ন। শঙ্খলতা, কাজল লতা, চিরলপাতা, সজনে পাতা, পদ্মদিঘি, সাগরদিঘি ইত্যাদি। পিঠার এমন বৈচিত্র্য আজকাল আমার নজরে পড়ে না। আসলে ব্যস্ততা এত বেড়েছে যে পিঠার উপর মনের মাধুরী মিশিয়ে নকশা আঁকার সময় কারও নেই। যদিও গত দু-তিন বছরে শহুরে জীবনেও পিঠার গুরুত্ব বেড়েছে বলা যায়। তবে সেই ভালোবাসা আর নেই।
    পিঠার জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলেই আজকাল ফাস্টফুডের দোকানের পাশাপাশি ঢাকায় পিঠাঘরও বাড়ছে। যেখানে অনায়াসেই পাওয়া যায় ভাপা, চিতই, ভাপা পুলি, রস চিতই, দুধ চিতই, পাটিসাপটা, ক্ষীর পাটিসাপটা, মালপোয়া, কলার বড়া, পাতা পিঠা, সেমাই পিঠা ইত্যাদি। কিনে আনা পিঠার মধ্যে আন্তরিকতা খুঁজে না পেলেও জিভের চাহিদা পূরণে তা মন্দ নয়। আমার কেন জানি মনে হয়, একমাত্র পুরান ঢাকার মানুষেরাই পিঠার আগের সেই ঐতিহ্য কিছুটা হলেও ধরে রেখেছে। এখনো যেকোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে শাহি ভাপা, খ্যাতা পুরি, গোজা পিঠা, ডিম পিঠা, ঝাল পিঠা পরিবেশিত হতে দেখি। বিশেষ করে পুরোনো অনেক পরিবার বিয়েশাদিতে এই রেওয়াজ এখনো ধরে রেখেছে।
    একসময় জামাই পিঠার রেওয়াজ ছিল গ্রামে। কোনো বাড়িতে নতুন জামাই এলে প্রতিবেশীরা অংশ নিতো সেই পিঠা বানানোর উৎসবে। সারা রাত ধরে পিঠা বানাতে বানাতে গান করতো তারা। আবার নাইওরেও পিঠা দেয়া হতো মেয়ের সঙ্গে। যে বউ বাড়ি থেকে যত রকম ও সুস্বাদু পিঠা নিয়ে আসতো, তার কদর তত বেশি হতো! আজকাল অবশ্য হলুদের কোনো কোনো অনুষ্ঠানে মেয়ের সামনে অনেক খাবারের পাশে পিঠাও দিতে দেখেছি।
    প্রশ্ন জাগে, আমরা কি আমাদের সংস্কৃতির অনুষঙ্গ এই খাবারের গুরুত্ব ভুলে যাচ্ছি? প্রায় আড়াই শ রকমের পিঠা তৈরি হতো একসময়, যেগুলোর বেশির ভাগই এখন আর নেই। কেবল শীতকালের ফুটপাতে চিতই আর ভাপা ছাড়া কোনো পিঠাই তেমন নজরে পড়ে না। ঘরে তো কেউ বানায়ই না। নকশি, ফুল পিঠা, চন্দ্রফুলি, পাকোয়ান, মোরগ সমসা, চিলি, দুধ কুলি, গোকুল, রসফুল, লবঙ্গ লতিকা, বিবিখানা ইত্যাদি পিঠার স্বাদ-গন্ধ মানুষ বোধ হয় ভুলেই গেছে। আর একটা পিঠার কথাও মনে পড়ছে। চালের গুঁড়ার সেদ্ধ খামির করে মোরগের মতো ডিজাইন করা হতো। এর ভেতরে দেয়া হতো মোরগের মাংস, তারপর ভাজা হতো গরম তেলে। কত না সুস্বাদু ছিল সেই পিঠা!
    আমরা কি পারি না আমাদের নতুন প্রজন্মকে এই পিঠাগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে? কেবল শীতেই নয়, বছরজুড়েই যদি ক্ষতিকর ফাস্টফুড আর বিদেশি খাবারের পরিবর্তে তাদের জিভে পিঠার স্বাদ ধরিয়ে দেয়া যায়, তবে এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে! শহরের নানা জায়গায় বিভিন্ন পিঠা উৎসবের যারা আয়োজক, তারা ভেবে দেখতে পারেন!

    মডেল: নুজহাত, সারিকা, ফ্লোরা
    ওয়্যারড্রোব: রিলা’স
    ছবি: ক্যানাভাস আর্কাইভ


    Subscribe & Follow

    JOIN THE FAMILY!

    Subscribe and get the latest about us
    TRAVELS
    LIFESTYLE
    RECENT POST
    ওজন কমাতে টেকার
    15 December, 2017 3:35 pm
    BANNER SPOT
    200*200
    SOLO PINE @ INSTRAGRAM
    FIND US ON FACEBOOK