FASHON
  • কভারস্টোরি I পতনের উদযাপন

    হাওয়া ক্রমে শীতল হওয়ার মৌসুমে ফ্যাশনের রূপটি কেমন? একদিকে প্রকৃতির সঙ্গে বোঝাপড়া, অন্যদিকে নিজেকে সুন্দর করে তোলা। লিখেছেন শেখ সাইফুর রহমান


    শরৎ দ্বিতীয় বসন্ত যেখানে পাতারাই ফুল
    - আলবেয়ার কাম্যু
    সেপ্টেম্বর এলেই পাতারা রঙিন হতে শুরু করে। রাত বড় হয়। ঝরাপাতার মর্মর উদাস করে। ইউরোপ-আমেরিকা মহাদেশে এটাই প্রকৃতির দস্তুর। এই অটামই তাদের প্রিয়তম ঋতু। দ্বিতীয় বসন্ত। ফলের শুরু; যা প্রলম্বিত শীতে। গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া মানুষ সময়টির উদযাপনে মেতে ওঠে। আহার থেকে অশন, ক্রীড়া থেকে আচার-অনুষ্ঠান।
    ওদের এই অটাম আসলে আমাদের শরৎ। আর হেমন্ত মানে লেট অটাম। আমাদের মতো ওরাও মেতে ওঠে নবান্নের উৎসবে। হারভেস্টিং সিজন। ফসল তোলার মৌসুম। নিজেদের গুছিয়ে নেয়ার বেলা। না হলে বিপদ। কারণ, তারপরেই তো এসে হাজির হবে শীত। সে বড় সাংঘাতিক। পেঁজা তুলার মতো চলবে তুষারবৃষ্টি। লাগাতার। সঙ্গে দমকা ঠান্ডা বাতাস।
    আমাদের আশ্বিন থেকে কার্তিকের পরিবর্তনটা বেশ। আদিগন্ত প্রান্তরে বিস্তৃত ধান সবুজ থেকে সোনালি হয়ে ওঠে। মানুষের মনও ফুরফুরে হয়। একসময় গ্রামে দেখা যেত আশ্বিনের শেষ সন্ধ্যায় লক্ষ্মীর আবাহন- আশ্বিন যায় কার্তিক আসে/ মা লক্ষ্মী গর্ভে বসে। আজ আর সেসব নেই। বাঙালি নিজেকে প্রতিনিয়ত হারাচ্ছে। এ এক অদ্ভুত পোলারাইজেশন। সেটা দ্বিমুখী। কখনো ধর্ম, কখনো বিদেশি সংস্কৃতি এখানে নিয়ামক। অনুঘটক।
    আমাদের হেমন্তে অলস গেঁয়োর মতো কার্তিকের ক্ষেতে ডাঁই করে রাখা ধানের উপরে মাথা পেতে শোয় ভোরের রোদ। আর পশ্চিমে পপলার ফোটা সরণি। মাঠে মাঠে ফসল তোলার ধুম। উচ্ছল কৃষাণ-কৃষাণি। কুয়াশার স্বচ্ছ চাদর ভেদ করে সেখানকার মাঠেও খড়ের গাদার উপর মাথা রাখে বিকেলের অলস রোদ। অভিন্ন চিত্র। কেবল বদলে যাওয়া ভূ-প্রকৃতি, মানুষ, সমাজ আর সংস্কৃতি।
    শরৎ মানে সেই কোন ছেলেবেলায় পড়া রবীন্দ্রনাথ: এসেছে শরৎ, হিমের পরশ/ লেগেছে হাওয়ার ’পরে। আমাদের শরৎ আছে, আছে হেমন্ত, শীত। প্রতিটি আলাদা। রঙে, রূপে, আয়োজনে। এই তিনে মিলেই পশ্চিমের পতন (ফল)। অবশ্য এই ঋতুবদল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ বদল কেবল প্রকৃতির নয়, মানুষেরও। বদল আসে শরীরে, মনে, সমাজে, উদযাপন। মেজাজ-মর্জির বদলে যাওয়া যেমন আমরা দেখি, তেমনি পোশাকের পরিবর্তনও। আস্তে আস্তে পরিধেয় পুরু হতে শুরু করে। মনে পড়ে কারও, এই সময়ে বাড়ির ছাদে কিংবা উঠানে মাদুর পেতে বাক্স-পেটরা, তোরঙ্গ, আলমারিতে বন্দি হয়ে থাকা সব কাপড়কে এক দিনের জন্য মুক্তি দেয়া হতো। দেয়া হতো সোনাঝরা রোদের সঙ্গে মিতালির সুযোগ। পরে সেসব গুছিয়ে রাখা হতো। পাতলা কাপড় উঠে যেত। নামত মোটা কাপড়। ভোরের আলতো শিরশিরানি থেকে মুক্তি মিলত বাড়িতে তৈরি কাঁথায়। তারপর শীত ঘন হয়ে এলে বিছানায় স্থান হতো লেপের। রাস্তায় শোনা যেত ধুনরির হাঁক। আজ তারা বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী। এখন লেপ নয়, আমরা কুইল্ট গায় দিই। সেই কাপড় রোদে দেয়ার রেওয়াজ আজ আর নেই। নতুন মায়েরা জানেনও না হয়তো। হায় প্রযুক্তিসর্বস্ব বাঙালি জীবন!
    মানুষের এই উচ্চাভিলাষের বলি প্রকৃতিরও যথেষ্ট বদল হয়েছে। সেও আজ রুষ্ট। আবিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন সর্বত্র। থাক সে কথা। বরং ফল নিয়ে আরও এগোই।
    পৃথিবীর সব দেশের সাহিত্যেই এই ফল বা শরৎ-হেমন্ত-শীত নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। রচিত হয়েছে উৎকৃষ্ট উপন্যাস, গল্প, কবিতা। আবার ছায়াছবিও। সাহিত্যের কথা যখন উঠলো, তখন রবীন্দ্রনাথ বাদ যায় কী করে? ‘শরৎ’ নামে তাঁর অনবদ্য প্রবন্ধের শুরুতে বলা হয়েছে, ‘ইংরেজের সাহিত্যে শরৎ প্রৌঢ়। তার যৌবনের টান সবটা-আলগা হয় নাই, ওদিকে তাহাকে মরণের টান ধরিয়াছে; এখনও সব চুকিয়া যায় নাই কেবল সব ঝরিয়া যাইতেছে।’
    তাহলে কেমন আমাদের শরৎ। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘কিন্তু এ শরৎ আমাদের শরৎ একেবারেই নয়, আমাদের শরতের নীল চোখের পাতা দেউলে-হওয়া যৌবনের চোখের জলে ভিজিয়া ওঠে নাই। আমার কাছে আমাদের শরৎ শিশুর মূর্তি ধরিয়া আসে। সে একেবারে নবীন। বর্ষার গর্ভ হইতে এইমাত্র জন্ম লইয়া ধরণী-ধাত্রীর কোলে শুইয়া সে হাসিতেছে।’
    এই সময়কে পৃথিবীর নানা প্রান্তে যেভাবেই দেখা হোক না কেন, একটা জায়গায় মিল থেকেই যায়। সময়টা পুরন্ত প্রকৃতির পটবদলের, পরিণতির, সৌন্দর্যের যেমন, তেমনি আবার বিষাদেরও। কোথায় যেন সেই সুরটা রয়েই যায়। আমাদের বাংলায় দেবী বিদায়ের বিষণ্নতা তো থাকেই। শরতে মেয়েকে বাপের বাড়ি পাঠানোর রেওয়াজ ছিল। তাই উমা আসে পিত্রালয়ে। শচীনকত্তাই তো গেয়েছেন: আমার ভাই ধন রে কইও নাইওর নিতো বইলা। আবার পশ্চিমে তাপ কমে আসতে থাকলে পাখিরা পরিযায়ী হয়।
    এভাবেই চলছে পৃথিবী। আহ্নিক আর বার্ষিক গতির নিয়মে। সময় বদলাচ্ছে বলে অনেক কিছুই হয়তো বদলে যাচ্ছে। তার মধ্যেও একটা ধারা থেকে যাচ্ছে বহমান।
    সেই ত্রিশের দশকের ইউরোপ বা আমেরিকার দিকে তাকানো যাক। কিংবা পরবর্তী দশক থেকে দশকে একই ছবি আমরা দেখতে পাই। অন্তত আজকের মতো সবকিছু হাতের নাগালে আসার আগে। জুলাই বা বড়জোর আগস্ট। শেষ হয়ে আসে গ্রীষ্ম। মানুষ তখন তৈরি হয় নতুন ঋতুকে স্বাগত জানাতে। এর বড় একটা অংশজুড়ে থাকে পোশাক। আশপাশের শহর থেকে লন্ডন, প্যারিস বা নিউইয়র্কে মানুষ জমায়েত হয়েছে নতুন ঋতুর উপযোগী পরিধেয় কিনতে। একই জিনিসই বছরের পর বছর তারা কিনেছে তাদের এই বার্ষিক গন্তব্য থেকে। সম্প্রতি কিছু ছবি প্রকাশ করেছে টাইম ম্যাগাজিন। ছবিগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া সাময়িকী ‘লাইফ’ ম্যাগাজিনের।
    ডিজাইনাররা যে একেবারে রকমফের করেনি, তা নয়। তবে কিছু পোশাক চিরকালের ক্ল্যাসিক। মানুষের সবকালের পছন্দ। তাই যেমন বছরের পর বছর কিনেছে কার্ডিগান, ট্রেঞ্চকোট ফ্রিঞ্জ দেয়া জ্যাকেট বা প্লেইড দেয়া ড্রেস। এই প্লেইড কিন্তু এবারের ফলেও বিশেষ কদর পাচ্ছে।
    পশ্চিম যখন এভাবে সময় পার করেছে; পার করেছে তাদের ফল- তখন আমাদের এই বাংলায়, মায়েরা সুতি শাড়িতেই থেকেছেন স্বচ্ছন্দ। শীত বলে একটু মোটা সুতোয় বোনা শাড়িকে প্রাধান্য দিয়েছেন। উৎসবের জন্য শরণ নিয়েছেন গরদ, ঢাকাই (জামদানি), টাঙ্গাইল, শান্তিপুর, ফরাসডাঙ্গা শাড়ির। রবিবাবুর লাবণ্য অবশ্য আলোয়ানের শাড়িই পরেছে। মেয়েদের শাড়িই ভরসা। বালিকা থেকে কিশোরী হলেই ফ্রক বা সেমিজ ছেড়ে বাধ্যতামূলক শাড়ি। তখন তো আর আজকের মতো সালোয়ার-কামিজ পরা শুরু হয়নি। মা-নানিরা দূরে থাক, কিশোরীরাও নয়। শাড়ির বাইরে এখনকার মতো ম্যাক্সি ড্রেস (আবায়া) পরারও চল তখন ছিল না।
    আর পুরুষের পরিধেয় ছিল ধুতি। বড়জোর প্যান্ট। মেয়েরা শীতে আলোয়ান বা পশমি চাদর, কাশ্মীরি শাল। এই তো ভরসা। উলের সোয়েটার, ব্লাউজও পরা হতো। সময় বদলের সঙ্গে উদার বাঙালি নিজেদের শাড়িকে প্রায় নির্বাসন দিয়ে অনেক কিছু নিয়েছে। পরছে।
    পশ্চিম সব সময়ই এগিয়ে। তাই একসময় ফ্যাশনকে সময়ের আগে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে খদ্দেরের উৎসাহ বাড়াতে। তাদের ইচ্ছাকে উসকে দিতে। এ ক্ষেত্রে নিউইয়র্কই পথিকৃৎ। সেই ১৯০৩ সালে সেখানকার স্টোরগুলো এটা শুরু করে। তবে ফ্যাশন উইক আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৯৪৩ সালে। নিউইয়র্কেই। কিন্তু ফল বা অটাম/উইন্টার ফ্যাশন উইক কবে কোথায় প্রথম শুরু হয়েছে, তা জানা যাচ্ছে না আপাতত। ঠিক ৬ মাস আগে ফ্যাশন উইকে ডিজাইনাররা জানিয়ে দেন, সিজনে কী আসবে। এটাই চলে আসছে। কিন্তু এরই মাঝে দুটো নতুন কনসেপ্ট ফ্যাশন বিশ্বকে একটু হলেও ঝাঁকি দিয়েছে। একটাকে বলা হচ্ছে ইন সিজন শো। টমি হিলফিগার গত বছর থেকে এটা চালু রাখছে। এর মানে আর কিছুই নয়, মৌসুম শুরুর ঠিক আগে ফ্যাশন শো করে দর্শককে আপডেট করে দেয়া। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। সেপ্টেম্বরে চার বড় শহরে যখন একের পর এক আগামী স্প্রিং-সামারের আয়োজন দেখানো হচ্ছে, হিলফিগার তখন দেখালেন ফল। এর সঙ্গে আরও একটি ধারণা বেশ আলোচনায়। ফ্যাশন ইমিডিয়েসি। একে ‘তৎক্ষণাৎবাদ’ বললে মন্দ হয় না। কারণ, এটা হচ্ছে তেমনই। রানওয়ে থেকে স্টোর, সেখান থেকে ক্রেতার হাতে। তাও বিলম্বিত নয়। ফ্যাশন শো শেষ হতে না-হতেই। অর্থাৎ ক্রেতাকে তর সইতে দেয়া যাবে না।
    এবার নজর দেয়া যাক এ বছরের এই ঋতুর উপচারে। প্রাচ্য কিংবা প্রতীচ্যে। ফ্যাশন নিয়ে আমরা যারা একটু নাড়াচাড়া করি বা খোঁজখবর রাখি, তারা কিছুটা হলেও ওয়াকিবহাল বৈকি- এবারে ফল কতটা রঙিন, এ সময়ের ট্রেন্ড কতটা ঋদ্ধ, লুক কেমন আকর্ষক; আর মেকআপ কতটা রোমাঞ্চকর।
    কিশোর কুমারের গানটা মনে পড়ে? পৃথিবী বদলে গেছে। পৃথিবী তো বদলাচ্ছেই। তবে ফ্যাশনের পৃথিবী কিন্তু বেশ বদলাচ্ছে। মনোভাবের বদল ঘটছে বলেই নিয়মের ব্যত্যয়ও পরিলক্ষিত হচ্ছে। আগে যেমন এক মৌসুম এলে ওয়্যারড্রোব সাফসুতরো করে নতুন পোশাক ঢোকানো হতো। ঝেঁটিয়ে বিদেয় করা হতো পুরোনো। যে এমনটি করছে না, তাকে ফ্যাশনেবল ধরাই হতো না। কিন্তু সেই গড্ডলিকা কয়েক বছর ধরে পুরোপুরি না হলেও খানিকটা অনুপস্থিত। আগল ভেঙেছেন ডিজাইনাররা। অনেকেই পুরোনোকে সঙ্গে নিয়েই এগোচ্ছেন। এটাও সময়ের চাহিদা। যেমন চাঙ্কি নিট আর মিনি স্কার্টের কম্বিনেশন। কয়েক মৌসুম কিন্তু চলছে। সেটাকেই নতুন মাত্রা দেয়ার কাজ করেছেন ডিজাইনাররা।
    পাশাপাশি অস্থির এই পৃথিবীতে মানুষকে দমবন্ধ অবস্থা থেকে বের করে আনার চেষ্টা তারা করেছেন। সেই চেষ্টায় আছে উজ্জ্বল আর উচ্ছল রঙ, কারুকার্যময় পালক আর ফ্রিলে ভুবন ভরিয়ে দেয়ার প্রয়াস। প্রত্যেকের সৃষ্টিতে স্পষ্ট আনন্দলহরী। ফেন্দি, ম্যাক্স মারা, রোকসান্দা খেলেছেন রঙ নিয়ে। যেন মানায় বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যেকোনো ত্বকের নরনারীকে। ব্যালাসিয়াগাঁ, মালবেরি আর সেলিন নকশার কেরামতি দেখিয়েছেন জুতা আর ব্যাগে। মারনি, প্রাদা ও সনিয়া রিকেলের মুনশিয়ানা কাপড়ের জমিনে দৃশ্যমান। ম্রিয়মাণ আর শীতল হয়ে আসা আবহাওয়ায় প্রাণোচ্ছল করতে শিয়ারলিং কোট। যেখানে স্টাইল আর রঙের উচ্ছ্বাস পরিধানকারীকে জোগাবে বাড়তি আত্মবিশ্বাস। গ্রীষ্মে ছিল ছোট ব্যাগের ট্রেন্ড। কিন্তু এই ফলে তা একেবারে বেমানান হচ্ছে না। যারা হাতে কিছু না কিছু রাখতে চান, তাদের জন্য থেকেই যাবে মিনি ব্যাগ। তবে পেল্লাইপ্রিয়দের জন্য জিল স্যান্ডার, মাইকেল করস আর প্রোয়েঞ্জা শুলারের প্রেসক্রিপশন বড় বড় কাঁধব্যাগ আর হাতব্যাগ। চমৎকার সেলাই, দৃষ্টিনন্দন গেরো আর টাসেলে দারুণ। চাঙ্কি জাম্পার ও মিডি স্কার্ট জুটি দিয়ে এবার মাত করতে চায় ব্যালাসিয়াগাঁ, দিওর ও এমএসজিএম। সঙ্গে আজানুদীর্ঘ বুট। তাতে নানা কারুকাজ। একটু খেয়াল করলে কিন্তু নজর এড়াবে না ইউরোপ বা আমেরিকার বড় শহরের রাস্তায় মিডি স্কার্ট আর সোয়েটারের সঙ্গে বুটের কোরাস। সেসব সড়কে এরই মধ্যে সমসময়ের ফ্যাশনের জেল্লা ছড়িয়ে ‘ললনারা যায়’।
    পাঠক ভুললে চলবে না, পশ্চিমের ফল ফ্যাশনের এবারের প্রধান একটি আকর্ষণ করসেট বেল্ট; সঙ্গে হ্যাটের যুগলবন্দি। সেখানে বুনো পশ্চিমের মাতাল মৌতাত। মাইকেল করস, দিওর আর কোচের ব্যবস্থাপত্র তাই বলে। তবে সেই ফেব্রুয়ারি-মার্চের ফ্যাশন উইকের পর ব্র্যান্ডস্টোরগুলোতে এসব পোশাক আসার আগেই পথ উতরোল হয়েছে। হস্তশিল্পের প্রেরণায় উচ্চকোটির জন্য পোশাক সৃজনের এই কাফেলায় এবার উল্লেখযোগ্য গুচি, ভ্যালেন্তিনো আর আলেকজান্ডার ম্যাককুইন। পোশাকের অনিন্দ্য নকশার জৌলুশে তাদের ঋতুমতী ফলকে যারপরনাই রোম্যান্টিক না বলে উপায় কী! অনুজ্জ্বল রঙের জমিনে জোড়াতালির (প্যাচওয়ার্ক) স্নিগ্ধতা। বিশ্বসংসার তন্নতন্ন করে খুঁজে আনা মোটিফের ছাপাই সৌকর্য। স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক যেন এসব পোশাক।
    বুনো পশ্চিমের রাখালিয়া টুপির কথা আগেই বলেছি। তবে তাদের বুটের কথাটা বলা হয়নি। হ্যাঁ, তাকে ফিরিয়ে এনেছেন কেলভিন ক্লেইনে পা রাখা র্যাফ সিমনস। সঙ্গে রঙ নিয়ে মাস্তানি তো আছেই। এর সঙ্গে না বললে অন্যায় হবে, সেই আশিতে জাতে ওঠা ডেনিম কিন্তু এবারও আছে নানা নিরীক্ষায় ধ্রুপদি আবেশ ছড়িয়ে।
    এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপাদানের কথা উল্লেখ করতেই হয়। প্রাচীন-প্রাণিত ফার, সত্তরের প্লেইড, ভিক্টোরিয়ান কলার, লেজার স্যুট, মাছের জাল (ফিশনেট), হাঁটু ছোঁয়া স্কার্ট, চওড়া বেল্ট আর ফরমাল ভেলভেট।
    এই ফল- আমাদের শরৎ-হেমন্ত-শীতে অসংখ্য মৌলিক সৃজনভাবনার প্রকাশ দেখে আপ্লুত বিশ্বের বোদ্ধা থেকে ফ্যাশনিস্তা। মিলিয়ে নিতে তাদের কষ্ট হচ্ছে না গেলবারের সঙ্গে এবারের। পুরোনোর পাশে নতুনকে স্বমহিমায় স্থান তো দিতেই হবে। তবে হ্যাঁ, পজিটিভ নোটে ফ্যাশন আঁতেলরা বলছেন, ডিজাইনাররা এখন অনেক বেশি প্রকৃতিনির্ভর। রঙ খুঁজে নিচ্ছেন ধরিত্রীর নানা উপাদান থেকে। এসব রঙ মন ভোলায়; ভেসে যায় না পুনরাবৃত্তির বেনো জলে। এবার দৃশ্যমান সাগরের নীলে সোনালি, লাল-বেগুনি, প্রবাল আর পামের জমাটি রসায়ন। গোলাপি। মøান। তাও আবার হয় নাকি? কিন্তু হয়েছে তো। সিল্কি টেক্সচারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই নিষ্প্রভ আবেশ। নিটেড কার্ডিগান, স্যাটিন ড্রেসে চামড়ার ফিতা, বুট আর ভারসাম্যে ঘন কালো টাইটস। এককথায় দারুণ। এবার লালে মাতিয়েছেন ডিজাইনারদের অনেকেই। তাদের সৃজনরঙে লালের বাহার- সিরাপের লাল, বেদানার কালচে লাল, চেরির টুকটুকে লাল, মোহিনী কোহলের প্রগাঢ় উচ্ছ্বাস। পূর্ণ প্যালেট। আরও আছে ম্যাপলের ঝরাপাতার রঙ। কেমন সেটা- লালাভ-কমলা নাকি কমলাভ লাল? এদের সঙ্গে জায়গা হয়েছে নৈসর্গিক ধূসর থেকে ধূসরাভ হলুদ (বেজ-ইয়েলো), সর্ষে ফুলের হলুদ। এসব রঙের সঙ্গে তালমিলের খেলায় মেতেছেন ডিজাইনাররা সাদা-কালোর ধ্রুপদি ঐকতানে। সৃষ্টিকে পুরন্ত করতে টেনে নিয়েছেন পাতিলেবুর সোনালি হলুদ, গোলাপি আভা। সবুজ তাই বলে অপাঙ্ক্তেয় নয়। আছে জলপাই থেকে খাকি, আরও নানা শেড।
    কেবল পোশাকই তো শেষ নয়। লুকের পূর্ণতায় সজ্জাও প্রণিধানযোগ্য। এবার প্রেরণা হবে নানা ছাঁটের ছোট চুল, ছাড়া চুল, বেণি, আবার চুলে কালো ফিতা, রাপানজেল চুলও বাদ যাচ্ছে না। তবে সবার নজর কাড়বে রঙিন চুল। চোখের পাতার চারপাশে রঙের তীব্রতা, চোখের নিচের পাতার লোমে গাঢ় মাসকারার আস্তরণ, কিংবা কখনো প্রগাঢ় কখনো স্নিগ্ধ অধর ধরাবে আবেশ। ক্যাজুয়ালি ক্ল্যাসিতে সেনসুয়ালিটির পরাকাষ্ঠা। কিন্তু এই নারী প্রগলভ নয়, বরং আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ়চেতা আর অসংকোচ।
    এ তো গেল পশ্চিম-কথন। বছরের প্রথম দিকে বিশ্বকে এসবেরই জানান দিয়েছেন ডিজাইনাররা, দেখিয়ে দিয়েছেন হাতের পাঁচ। আর তারা পূর্বাভাস অনুসরণে বেশ আগেই নিজেদের সৃষ্টিকে গুছিয়েছেন। এই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু ঝরাপাতার মৌসুমে এটাই দেখা যাচ্ছে। চলবে শীত শেষের বেলা ইস্তক।
    কিন্তু আমাদের বেলা? উত্তর হবে: থোড় বড়ি খাড়া। আমাদের বিশেষ হেলদোল নেই। এই সময় ক্রমেই বাতাস শীতল হতে শুরু করে। তাই কাপড়ও মোটা হতে থাকে। এ সময় পূজা থাকে বলে কোনো কোনো হাউজ শারদীয় সংগ্রহ সাজায়। সেখানেও খুব বৈচিত্র্য মেলে না। কিছু গৎবাঁধা মোটিফ প্রাধান্য পায়। তাতে বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা- এ তো পূজার জন্য। লাল আর সাদায় মাখামাখি।
    আমাদের এই কাশ-উচ্ছল, শিউলি-সুবাসিত শরতে হ্যান্ডপেইন্টেড শাড়ি বা পাঞ্জাবি, কিছু উদ্ভাবনী ছাপা মন্দ লাগে না। এই সময়টায় মনটা কেমন একটু উড়ুউড়ু থাকে। শরতের উচ্ছলতা মিইয়ে আসে হেমন্তে। ভর করে ঔদাস্য। আর আমাদের শীত সে তো ডুমুরের ফুল। বছরে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হওয়া দহনে গ্রিলড বাঙালির জীবন ইদানীং সমান তালে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে কারণ-অকারণের বৃষ্টিতে। শীত সেখানে নেহাতই কাক্সিক্ষত প্রেয়সী। কিন্তু সে তো দেখা দিয়েই চলে যায়। শীতলতার প্রকোপ সেভাবে থাকে না বলে ঘরোয়া ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সৃজনও বৈচিত্র্যহীন। বরং ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষনির্বিশেষে সিংহভাগই পশ্চিমাশ্রয়ী হয়ে পড়ে। এরই মাঝে কখনো-সখনো শখ করে চাদর বা শাল পরা হয়। না হলে তো সোয়েটার আর জ্যাকেটই ভরসা।
    শরৎ থেকে হেমন্ত হয়ে শীত। ইউরোপ-আমেরিকার অটাম-উইন্টার। দিন ছোট হয়ে রাতের বড় হওয়া, পাতা ঝরার শব্দে বিষণœ আর শিশিরপাতে উচাটন মন। এভাবেই তো বাঙালির পতনের (ফল) উদ্যাপন। অতএব এবার মুড়োনো যাক জলের গানের পাতা ঝরার গানে- ও ঝরা পাতা, ও ঝরা পাতা গো/ তোমার সঙ্গে আমার রাত পোহানোর কথা গো/ তোমার সঙ্গে আমার দিন কাটানোর কথা...।

    লেখক: নিউজ এডিটর, এটিএন নিউজ এবং ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল কলামিস্ট
    sksaifurrahman@gmail.com

    মডেল: ইন্দ্রাণী
    মেকওভার: পারসোনা
    ছবি: তানভীর খান ও ইন্টারনেট
    ওয়্যারড্রোব: জে এস ফ্যাশন বাই ঝুনু


    Subscribe & Follow

    JOIN THE FAMILY!

    Subscribe and get the latest about us
    TRAVELS
    LIFESTYLE
    RECENT POST
    ওজন কমাতে টেকার
    15 December, 2017 3:35 pm
    BANNER SPOT
    200*200
    SOLO PINE @ INSTRAGRAM
    FIND US ON FACEBOOK