FASHON
  • কভারস্টোরি I সংসার

    দুই নর-নারীর পারস্পরিক বোঝাপড়ার বাইরেও সংসারে আছে বহু কিছু- জীবনের যাবতীয় লেনদেন। এ এক দায়িত্বের পাঠশালা। যেখানে ভালোবাসা ও বিরক্তি, নৈকট্য ও দূরত্ব, আগ্রহ ও উদাসীনতা একাকার হয়ে যায়। লিখেছেন বদরুন নাহার

    ১.
    সুরবালা কোলের পুতুলটিকে স্নান করাইতে পুষ্করিণীর ধারে পিচ্ছিল সিঁড়িতে বসিয়া ছিল, তাহার মেজ খুড়িমা পাঁজাকোলা করিয়া তাহাকে ধরিয়া আনিলেন। নতুন কাপড়ে জড়াইয়া সাতপাকে ঘুরাইয়া, একটি পালকীতে করিয়া সুরবালাকে শ্বশুর বাড়ী পাঠাইয়া দেওয়া হইল! দীর্ঘ পথ পাড়ি দিবার ক্লান্তিতে সে রাত্রিটা ঐ ঘুমাইয়া পার করিয়াছিল। সকালবেলা ঘুম হইতে জাগিয়া সুরবালা জানিতে পারিল- ইহা তাহার সংসার।
    সংসারযাত্রার এমন গল্প শুনে শুনে বাঙালি নারী বেড়ে ওঠে। সাত বছর বয়সী দাদিজানের সংসারযাত্রা তাদের জীবনেরই এক অনিবার্য পাঠ। দাদিজান তার শাশুড়ির কোলেপিঠে চড়ে বড় হতে হতে সংসারী হয়ে ওঠেন। আর তাতে সংসারের দায় নিয়ে সুখ এনে দেবার নানা রকম ঘটনা মিথিক্যাল গল্প মনে হলেও তা আসলে কোনো মিথ নয়। তা ছিল বাস্তব।
    ঠাকুরমার আমল পেরিয়ে মায়ের সংসার গমনের গল্পটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খানিকটা পাল্টে যায়। সে নিদেনপক্ষে পঞ্চম শ্রেণি পাস। এমনকি স্নাতক পর্যন্ত পড়ুয়া মেয়ে হয়ে থাকবে। বাড়ির লোকেরা তাকে সাজিয়ে-গুজিয়ে হাতে শরবতের গ্লাস অথবা পানের তশরি ধরিয়ে দেবে। সে ওই পাত্র হাতে নিয়ে সাবেকি পর্দা সরিয়ে পাত্রপক্ষকে সালাম দিয়ে ঘাড় নিচু করে বসার অনুমতির অপেক্ষায় থাকবে। দুই ছত্র গীতা বা কোরআনের আয়াত পাঠ করে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে তবেই শিক্ষিত এক চাকুরে ছেলের বউ হয়ে তার শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া। কিন্তু সংসার হবে শহরে, চাকুরে স্বামীর সঙ্গে। বছরের দু-চারবার পালাপার্বণে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া, গ্রামে থাকা জাদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে উৎসবে মেতে ওঠাও এক সাংসারিক দায় বটে।
    শহরে স্বামী-সন্তানসহ ঘর সামলানোই তার সংসার। সেখানে সন্তানের বিদ্যাপাঠ থেকে জুতা সেলাই পর্যন্ত তাকে করতে হয়। আমাদের দাদির প্রজন্ম পর্যন্ত একান্নবর্তী পরিবার থাকলেও মায়ের আমলে তা আধা একান্নবর্তী হয়ে গিয়েছিল। এখনকার প্রজন্মের বিয়ে ও সংসারের ধারা অন্য রকম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাত্রী দেখার কোনো বালাই নেই, ছেলে-মেয়ের জানাশোনার বিয়ে। তাতে শাশুড়ি-মাতার পছন্দ না করতে পারার খেদ রয়ে যায় শুরু থেকেই। বেশির ভাগ নারীই কর্মজীবী হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসছে। সংসার কেমন হবে? তা খানিকটা নির্ভর করে সন্তানের সংখ্যার ওপর। সত্তরের দশকে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় একধরনের আধুনিকতার বিকাশ ঘটে। এ সময় জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভূমিকাও বেশ সন্তোষজনক। ফলে তখনকার অনেক পরিবারই দুই বা এক সন্তানের জনক-জননী। মূলত এসব পরিবার ঠিক একান্নবর্তী ছিল না। কিন্তু নিজেদের সন্তানকে বিয়ে করিয়ে যৌথ থাকার প্রবণতা তাদের ভেতর কাজ করে। বিশেষত শহুরের বাবা-মায়ের সংসারগুলোতে এ প্রবণতা প্রকট। আবার প্রবাস বা গ্রামে থাকা পরিবারগুলোর চিত্র খানিকটা ভিন্ন।
    এ ক্ষেত্রে নতুন যুগের সন্তানেরা সংসার শুরু করে যৌথভাবে, বাবা-মায়ের সঙ্গে। আর তাতে বেশ কিছু সুবিধা ও অসুবিধার সম্মুখীন হয় পরিবারগুলো। প্রথমত ঘটে ফুলদানি সমস্যা। খুব ছোট্ট একটা বিষয় থেকেই সমস্যার শুরু। শাশুড়ির এত দিনের সংসারে এসে বউ চায় সবকিছু নতুন করে সাজাতে। এত দিন ফুলদানিটা টেলিভিশনের উপরে বা ওয়্যারড্রোবের উপরে ছিল। তা-ও আবার কাগজ বা কাপড়ের ফুল, বউ চায় ফুলের থাকবে আলাদা স্ট্যান্ড। সাবেকি সাজ আজ আর চলে না। তাজা ফুলের বা পাতাবাহারের গাছ এসে ঢুকে পড়ে ঘরে! যে কারণে শাশুড়ি বিরক্ত। যদিও তিনি সংসারের কাজ করতে করতে ক্লান্ত থাকেন। জীবনে অনেক করেছি বাপু, এখন তুমি করো- বলে হালছাড়া এক ভঙ্গিমা নিয়ে তিনি উপস্থিত। কিন্তু ফুলদানি আমার, পুরোনো জায়গাতেই থাকবে, তুমি কেবল সাজাবে। শুরু হয় সংসারে দ্বন্দ্ব। কেননা বউটি চায় নতুন করে সংসার সাজাতে, সেখানে শাশুড়ি থাকবে সহযোগী হয়ে। চাকরিজীবী বউয়ের সন্তান পালনের দায় যাবে শাশুড়ির ওপর।
    অন্যদিকে হয়তো এবাড়ির মেয়েটিও বউ হয়ে সমান সমস্যায় পড়বে। কিন্তু মেয়ের চিন্তায় শাশুড়ি বউয়ের প্রতি সহমর্মী হবে না। মেয়ের বাসার কাছে বাসা নেয়া, তার সন্তানের দেখভালকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা- ইত্যাদি তার কাম্য হয়ে ওঠে। আর এরূপ অন্তঃপুরের দ্বন্দ্ব তৈরিতে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা প্রধান এক প্রভাবক। সংসার জীবন নতুন সমস্যায় জর্জরিত হতে থাকে। কেননা এখানে গ্রামে শ্বশুর-শাশুড়িকে রেখে সংসার যেমন পাতা যাচ্ছে না, তেমনি এত দিনের হাতে গড়া সংসার অন্যের হাতে তছনছ হতে দিতে চান না শাশুড়ি। তিনি যেমন ছেলের বউয়ের ক্ষেত্রে মা হয়ে উঠতে পারেন না, তেমনি ছেলের বউ মেয়ের মতো আন্তরিক হয়ে উঠতে পারে না। কিন্তু এ দেশের পারিবারিক নিয়ম অনুযায়ী মেয়ে চলে যাবে অন্যের ঘরে। পারস্পরিক সমঝোতা ছাড়া এই অবস্থায় পারিবারিক সুখ পরাহত। কেননা দুজন দুই সময়ের সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা নারী।
    এসব কারণে সংসারে ভাঙনের সুর এখন প্রকট। জরিপ ছাড়া সাধারণের জীবনে এই সংকট সম্পর্কে জানা মুশকিল; কিন্তু তারকা দম্পতির জীবনটা বিপর্যয় মিডিয়ার বদৌলতে সামনে আসে। স্বামী-স্ত্রীর পেশাগত দ্বন্দ্ব আর সামাজিক দায় একত্র হয়েই ঘটনাগুলো ঘটছে। সংসারের এই ছবি আগামী প্রজন্মে আরও নতুন কোনো আঙ্গিক নিয়ে সামনে আসবে। কিন্তু এখন এক জটিল সমীকরণে চলছে পরিবার।
    ২.
    এককথায় সংসার এক বিচিত্র জায়গা। এই জগতেই আপনি পুনর্জন্মের স্বাদ পাবেন কেবল সংসারে! একবার রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের দিকে দেখুন, মিলে যাবে। ওই যে ইচ্ছাপূরণ গল্পটি, যেখানে বাবা সুবলচন্দ্র আর ছেলে সুশীলচন্দ্র। ইচ্ছাঠাকরুন এই বাপ-ছেলের পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন, তাদের ইচ্ছামতেই। ছেলেকে বাপের ভূমিকায় আর বাপকে ছেলের ভূমিকায় পাল্টে দিয়ে। ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। এমন দুই জীবনের স্বাদ সংসার ছাড়া আর কোথায় পাবেন?
    আমরা বাবার সংসারে ছোট শিশুটির মতো বেড়ে উঠি, নিজের সংসারে বাবা হয়ে যাই। তবে নারীর জীবনে এ ব্যাখ্যা খানিকটা ভিন্ন। তার জন্য বরাদ্দ বাবার সংসার আর স্বামীর সংসার। সে কখনো কর্তা হয়ে ওঠে না। সংসারের সুখের চাবিকাঠি বলে খ্যাত হলেও মূলত প্রধান কর্মীতে পরিণত হওয়া ছাড়া তার জীবনে আর কোনো ঠিকানা থাকে না। এই যে দুটি সংসার জগৎ- একটিতে আপনি আদরযত্ন, শাসন, ভালোবাসায় বেড়ে ওঠেন, আর অন্যটিতে আপনার দায়িত্বে একটি সংসার গঠন, তার ভরণপোষণ- সবকিছু এসে পড়ে। হয়তো আপনি স্বামী অথবা স্ত্রী- যা-ই হোন না কেন, পরিবারটি তখন জোয়ালের মতো কাঁধে এসে বসবে। তাই অনেকেই সংসারধর্মে বাঁধা পড়তে চায় না, আবার কেউ কেউ বিবাহিত না হয়েও আচারনিষ্ঠ সংসারী হয়ে ওঠে। যেমনটি আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথের রবিবার নামের ছোটগল্পে, বিভার সাংসারিক কর্মে। বিভার সংসারের দায়িত্ব আত্মীয়পক্ষে হালকা ছিল বলেই অনাত্মীয়পক্ষে হয়েছে বহুবিস্তৃত। আপনগড়া সংসারের কাজ নিজের হাতে করাই ওর অভ্যাস, চাকরবাকর পাছে কাউকে অবজ্ঞা করে। সংসারের দায়ে পড়ে, কালচারের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে সে ব্যক্তিগত প্রেম।
    অভয়চরণ, মানে গল্পের নায়ক, যাকে রবীন্দ্রনাথ জাত শিল্পী হিসেবে সংসারের গাঁটবাঁধা থেকে মুক্তি দিয়েছেন, যেখানে দৃশ্যত শিল্পের জন্য স্বার্থপরতা স্বীকৃত। এই জায়গায় এসে পারিবারিক দায়কে এড়িয়ে চলার ইচ্ছা প্রকাশ করতে দেখা গেছে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র অপুর সংসারে। অপু সাহিত্যিক হবার প্রয়াসে যে স্বাধীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল, পরিস্থিতির কারণে বন্ধুর মামাতো বোনকে বিয়ে করে সামাজিক দায় কেবল পূরণ হলো না। অপুর জীবনে প্রেম এলো। অন্যদিকে ধনীর কন্যা হয়েও দারিদ্র্য মেনে নিয়ে অর্পণা আর অপুর সংসার চলছিল ভালোবাসায়। কিন্তু কাজলের জন্ম আর অর্পণার মৃত্যুকে মেনে নিতে পারে না অপু। ছন্নছাড়া সে সন্তানের জন্য মাসোহারা পাঠানোকেই সংসারে যথেষ্ট মনে করে। স্বাধীন জীবনে সে আবার সমস্যায় পতিত হয়। সংসার একটা মায়ার বাঁধন। তাই প্রথমবার কাজলকে দেখে অপু আর তাকে অস্বীকার করতে পারে না। ছেলেকে কাঁধে তুলে নিয়ে গ্রাম ছাড়তে হয় অপুকে। এভাবে বাউ-ুলে জীবনের বারবার ইতি টেনে গড়ে ওঠে অপুর সংসার।
    সাহিত্য জগতে সংসারের চিত্রটি সুনিপুণভাবে তুলে ধরে শরৎচন্দ্র বহু আগেই বাঙালি আটপৌরে নারীর হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন। আর কেবল সংসার থেকে সংসারে যাত্রা করেও আশাপূর্ণা দেবী হয়ে উঠেছিলেন একজন সাহিত্যিক। যার গল্প-উপন্যাসে পারিবারিক অন্তর্যাত্রার বাস্তবতা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ভার্জিনিয়া উলফ সংসারে মনস্তত্ত্বের সংঘাত নিয়ে লিখতে লিখতে একসময় আত্মঘাতী হলেন স্বামীকে মুক্তি দেয়ার জন্য।
    আমার এক বন্ধু, তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সাংসারিক দায়দায়িত্বের চাপে পড়েই কিছুদিন আগে কথায় কথায় বললো, আর তো বছর পাঁচেক! তারপর আমার সব দায়িত্ব শেষ! বিষয়টি খোলাসা করে জানতে চাইলে সে বলল, তার সন্তান পাঁচ বছর পর গ্র্যাজুয়েশন শেষ করবে, তখন দায়দায়িত্ব শেষ। জীবনে আর কোনো কাজ থাকবে না। উল্লেখ্য, পাঁচ বছর পর তার চাকরির মেয়াদ শেষ নয়। পরিবার এমন এক জায়গা, যা মানুষকে সব সময় মুক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। অথচ ভালোবাসায় মানুষ ঘর বাঁধে, সন্তানের জন্ম দেয়। আবার সে মুক্তিও চায়। এ ক্ষেত্রে কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তাঁর পুত্র নবারুণ ভট্টাচার্যের বয়স যখন চৌদ্দ বছর, তখন তিনি স্বামী-সংসার ছেড়ে চলে আসেন। তারপর দীর্ঘ জীবনে তিনি বুকে তুলে নেন শবর, মু-া ও ওরাঁও শিশুদের। ২০১৬ সালে এই লেখকের মৃত্যুর পর অধিকাংশ পত্রিকায় শিরোনামে উঠে আসে ‘চলে গেলেন হাজার চুরাশির মা মহাশ্বেতা দেবী!’ যে নিজ সন্তানের কাছে দূর থেকে ক্ষমা চেয়েছেন। সে সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘শুধু পরিবার তো কখনও আমার জীবন ছিল না। আমার অন্যান্য দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা বরাবরই ছিল।’ (সাক্ষাৎকার। মহাশ্বেতা দেবী, রাহুল দাশগুপ্ত। এই সময়, ১২ আগস্ট ২০১৪।) তাঁর মতো অনেকে সংসারের ক্ষুদ্র পরিসরকে অতিক্রম করে জগৎ-সংসারের দায় নিতে পেরেছিলেন। আবার এই সংসার প্রসঙ্গে সিমন দ্য ব্যোভওয়া আলিস শোয়ার্জার সঙ্গে কথোপকথনে বলেন, ‘আমি মাদের বিপক্ষে নই।

    আমি বিরোধী সেই তত্ত্বের, যা সব মেয়েরাই সন্তান ধারণ করবে এমনটি প্রত্যাশা করে, এবং আমি বিরোধী সেই অবস্থার, যার মধ্যে মেয়েরা সন্তান ধারণে বাধ্য হয়। তারপর মা-সন্তানের সম্পর্কের বিষয়েও একটি ভয়ংকর অতিকথন বিদ্যমান। আমার মতে, সংসার ও সন্তানের ওপর এমন গুরুত্ব দেয়ার কারণ মানুষের একাকিত্ব। তাদের জীবনে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও স্নেহের অভাব রয়েছে। তারা একা। তাই কাউকে পাবার জন্য তারা সন্তান ধারণ করে। এটি তার নিজের ও সন্তানের জন্যও ভয়াবহ। শূন্যতা পূরণের নিমিত্তে এটি একটি সাময়িক সমাধান। যখনই সন্তানটি বড় হয়, সে গৃহত্যাগ করে। সন্তান নিঃসঙ্গতা কাটানোর কোনো নিশ্চয়তা নয়।’ (সিমন দ্য ব্যোভওয়ার সঙ্গে কথোপকথন দ্বিতীয় লিঙ্গের পরে, অ্যালিস শোয়ার্জার, সম্পাদনা: আলম খোরশেদ, খনা।)
    আমার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবন্ধুটি কি এই শূন্যতা পূরণের কথা ভেবেই সন্তান নিয়েছিল? যত দূর জানি তা-ও নয়। তবু কেন এখন তার এই অভিব্যক্তি! আসলে এটা আমাদের সমাজ নির্ধারিত সম্পর্কের নিয়তি। সংসারের যে দায় বা প্রতিশ্রুতির কথা সমাজ বলে, তাতে কোনো সাম্য না থাকায় বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। পরিবারের সবাই যখন নিজস্ব ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন থাকে না, একের উপর সবার চাপ বেশি মাত্রায় এসে পড়ে, তখন সংসার থেকে পালাতে চায় মানুষ।
    সংসারে শুধু স্বামী-স্ত্রী-সন্তানই থাকে না, আমাদের সমাজে এখন পর্যন্ত সংসার আরও বড়। সেখানে স্বামীর মা-বাবা, স্ত্রীর মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই বিদ্যমান। আর মজুরিবিহীন গৃহকর্মের সব বোঝা এসে পড়ে নারীর ওপর! এই বিপুল বোঝা বইতে গিয়ে নিজের ইচ্ছাপূরণের সামর্থ্য সে হারিয়ে ফেলে। অথবা সুযোগই থাকে না। অন্যদিকে স্বামীর দায়িত্বের মধ্যে আয়-রোজগার করতে পারলেই সংসারের দায়িত্ব শেষ! যদিও এখন নারী আয়-রোজগার করছে, তবু তার পারিবারিক দায়, সন্তান লালনের দায় এতটুকুও কমেনি; বরং তার জীবনে দায়িত্বের বোঝাটা আরও বেড়েছে। ঘরে-বাইরে তাকে খেটে যেতে হচ্ছে সমান তালে। আজকাল প্রায়শ দেখছি সংসার ভাঙার খবর। সৃষ্টিশীল জগতে সময় দিয়ে কিংবা ক্যারিয়ারের জন্য তারা এখন আর সংসারের সব দায়দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। ফলে ভেঙে যাচ্ছে একের পর এক সংসার। হয়তো তা ক্ষুদ্র কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্বেই ঘটছে। কিন্তু পরিবারকে টিকিয়ে রাখাও কোনো সহজ নয়, নিজস্ব অবস্থান ঠিক রেখে তা টিকিয়ে রাখা বড় এক চ্যালেঞ্জ। আর এই কাজ পরস্পরের সহযোগিতা ছাড়া অসম্ভব। সংসার যেমন একার নয়, তেমনি এটাকে টিকিয়ে রাখাও কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়।
    কত আগেই তো বলেছিলেন নজরুল, ‘জগতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’। বহু বছর ধরে এই বাণী আওড়ালেও আমরা ক্ষুদ্র পরিসরে এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারিনি বা করতে চাইনি। কেননা আমাদেরকে সমাজ জানায়, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে এবং এই বাণী প্রচারে আমরা অধিক আনন্দ পাই। সে নারী বা পুরুষ- যে-ই হই না কেন।
    ৩.
    সংসারের মানে খুঁজতে গেলে পাওয়া যাবে নানা আঙ্গিক আর অর্থের হদিস। যা মেলে তাই কেবল বলতে পারি। যেমন ২৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক ভোরের কাগজ খেলার খবরের শিরোনাম ছিল ‘বার্সেলোনার সুখের সংসার’! নতুন বছরে ঝড়ের মুখে পড়েছিল বার্সেলোনা নামের প্রফেশনাল ক্লাবটি আর সেই ঝড় সামলে সংসারের সুখ এনে দিল লিওনেল মেসি! এটি এক ফুটবল টিমের সংসারের সুখের খবর। আবার সেই একই সময় এই মেসিরই অনেক দুর্নাম ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে। বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে ছিটকে যাচ্ছিল আর্জেন্টিনা! দায় পড়েছে বার্সেলোনার সংসারের সুখ এনে দেয়া কর্তাটির ওপরই, মানে মেসি যথাসময়ে ভূমিকা রাখতে পারছে না! গত ১২ অক্টোবর প্রথম আলোর শিরোনামে উঠে এলো মেসির স্বর্গীয় বাঁ পায়ে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা। আসলে অদ্ভুত এই জগৎ-সংসার। বাঁধন টিকিয়ে রাখা বড় এক দায়িত্বের কাজ, তাতে মাঝে মাঝে স্বর্গীয় কোনো শক্তিও লাগে বুঝি! সংসারে এই কথা বেশি খাটে।
    লালন সাঁইয়ের দর্শন মনে করা যেতে পারে- সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে...। আমরা আমাদের জাত নির্ধারণে প্রখর হয়ে আছি। মানবতার সৃষ্টি যেমন সংসারে, তেমনি জাত নির্ধারণের অসাম্যে মানবতার ধ্বংসও ঘটে এই জগৎ-সংসারের। তাই আমরা আমাদের যথার্থ ভূমিকা রেখে সংসারকে শান্তির আশ্রয় করে তুলবো- এই হোক প্রত্যাশা।

    মডেল: অভিনেত্রী জয়া আহসান, চাঁদনী ও মৌসুম
    মেকওভার: পারসোনা
    ওয়্যারড্রোব: প্রেম’স কালেকশন
    জুয়েলারি: জড়োয়া হাউজ
    ছবি: আবির হোসেন নোমান, ক্যানভাস আর্কাইভ ও সংগ্রহ


    Subscribe & Follow

    JOIN THE FAMILY!

    Subscribe and get the latest about us
    TRAVELS
    LIFESTYLE
    RECENT POST
    বোটক্সের বদলে
    19 January, 2018 7:26 pm
    আলোকচিত্র
    19 January, 2018 7:11 pm
    BANNER SPOT
    200*200
    SOLO PINE @ INSTRAGRAM
    FIND US ON FACEBOOK