FASHON
  • রসনাবিলাস I ঢাকাই পিঠাঘর

    পিঠার চল ক্ষয়িষ্ণু। তবু ঢাকায় কয়েকটি দোকান টিকে আছে হরেক রকম পিঠাপুলির পসরা নিয়ে

    টোনা বললো, টুনি, পিঠা খাবো। কিন্তু হায়! টুনি টোনার হাতে ধরিয়ে দিলো লম্বা ফর্দ। বললো, চাল আনো, গুড় আনো, কাঠ আনো, আগুন আনো, তবেই পিঠা তৈরি করে দেবো- শিশুপাঠ্য এ গল্পটিই বাঙালির সংস্কৃতিতে পিঠার কদরের সাক্ষ্য দেয়। এ ছাড়া বাঁদরের পিঠা ভাগাভাগির চতুর গল্পটি কে না জানে! প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার রসুইঘরে এর সমাদর। অতিথি সৎকার কিংবা জামাই বরণ- পিঠা না হলে একটা সময় চলতোই না। সামাজিকতার নিয়ামক ছিল এটি। বউ-ঝিয়েরা নাইওর যাওয়া কিংবা ফেরত আসা- উভয় সময়ই সঙ্গে বহন করত পিঠাপুলি। মুখরোচক ও হরেক রকম পিঠা তৈরির কলাকৌশল ছিল বাঙালির আভিজাত্যের পরিচায়ক। এখন পিঠার চল ক্ষয়িষ্ণু।
    গ্রামগঞ্জে একটু-আধটু আছে, ঢাকায় ছিটেফোঁটাও নেই। কংক্রিটবাসীদের এখন একমাত্র ভরসা ফুটপাত কিংবা খুঁজে পাওয়া কোনো পিঠার দোকান।
    গোটা ঢাকা এমাথা-ওমাথা করে ফেললেও ভালো পিঠার দোকান ১০টির বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পিঠাঘর সেগুলোর একটি। বংশালের কসাইটুলীতে অপরিপাটি এক দোকানের মধ্যে বিরাজ করছে পিঠার জগতের এক অনন্য রসনা। ছিমছাম গোছের এক ব্যক্তি, নাম মোহাম্মদ দিলু, তিনিই ১৭ বছর ধরে করছেন পিঠা-বাণিজ্য। না, বাপ-দাদার থেকে পাওয়া ব্যবসা নয়। নিজের বুদ্ধিতেই পিঠাঘর।
    ঢাকার সব পিঠার দোকান একই রকম। তবে সিগনেচার আইটেম একটি থাকেই, যেটি সেই দোকানকে অনন্য করে তোলে। দিলু সাহেবের সিগনেচার আইটেম হচ্ছে ঝাল রুটি নামের একধরনের পিঠা। মেয়র হানিফ এসে এখানে পিঠা খেতেন। মোট দশ থেকে বারো পদের পিঠা রয়েছে দিলু মিয়ার ভান্ডারে। তিল পুলি, পুয়াপিঠা, হাতকুলি, ফুলঝুরি, ক্ষীরপুলি, খেজুর পিঠা, ক্ষীরের পাটিসাপটা, ভাজা পিঠা, ভাপা কুলি, দুধ চিতই, ঝাল রুটি, পুয়াসহ আরও কয়েক রকমের পিঠা রয়েছে। এসব তিনি তৈরি করেন নিজের ঘরেই। পিঠা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় নারকেল, তিলের গুঁড়া, গুড়, আতপ চালের গুঁড়া, এলাচি গুঁড়া, দারুচিনি, ডিম, কাজু কিংবা পেস্তাবাদাম, কিশমিশ, গোলাপজল, মাওয়া, সুজি, দুধের ক্ষীর, ময়দা, লবণ, তেল, এলাচির গুঁড়া, বাদাম ইত্যাদি। তবে কোন স্বাদের টানে মানুষ এখানে ছুটে আসেন, সেই রেসিপি গুপ্ত। বিজনেস সিক্রেট। এখানকার পিঠাগুলোর প্রতিটির দাম মূলত ৫ থেকে ৬০ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য না দিলেই নয়। বিকেল চারটার আগে কিন্তু দিলু সাহেব তার দোকান খোলেন না।
    কসাইটুলী থেকে বের হয়ে হাতের ডানে নাক বরাবর হাঁটুন। চিৎকার-চেঁচামেচিতে কান ঝালাপালা হয়ে যাবে। দেখবেন, বড় রাস্তা। সেখান থেকে রিকশাযোগে গুলিস্তান, ৩২ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। চিনতে অসুবিধা হচ্ছে? হকি স্টেডিয়ামের ঠিক উল্টো পাশে খাবার দাবার পিঠাঘর। এর কর্ণধার মিডিয়ার সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর। পিঠা সেকশনে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক হিসেবে রয়েছেন সমরেশ ভট্টাচার্য, ওরফে নয়ন। আশির দশক থেকে এ পিঠাঘরের পিঠার দেখভাল করছেন তিনিই। স্বাধীনতা-পরবর্তী আনুমানিক ১৯৭২ সালে এই দোকানটি ছিল বিজয়নগরে। বছর তিনেকের মাথায় পাট চুকিয়ে গুলিস্তানে একেবারে স্থায়ীভাবে বসে আছে পাক্কা সাড়ে তিন যুগ। সেখানেও পাওয়া যায় প্রায় ১০ প্রকারের পিঠা। ক্ষীরের পুর দেয়া পাটিসাপটা, খেজুর গুড় ও নারকেলের পুর দেওয়া পুলি, শুধু চালের গুঁড়ি ও গুড় দেয়া পোয়া, মুচমুচে নকশি পিঠা, নারকেল, চিনি মিশিয়ে ভাজা চন্দ্রপুলি, চিকেন ও মসলার পুরে ঝাল পুলি, পাক্কন, সুজি ও তিল দিয়ে তৈরি তিলের পিঠা ছাড়াও চিতই ও দুধ চিতই রয়েছে এখানে। ম্যানেজার জানালেন, আরও দুই প্রকার পিঠা অচিরেই যুক্ত হচ্ছে। একটি হচ্ছে ডিম পিঠা; এটির স্বাদ ঝাল, আরেকটি হচ্ছে পুর হিসেবে খাসির কলিজা ব্যবহার করে তৈরি ঝাল পিঠা।
    পাটিসাপটা পিঠা খেতে খেতে কথা হচ্ছিল ম্যানেজারের সঙ্গে। বললাম, গ্রামবাংলায় তো আরও অনেক পিঠা রয়ে গেছে। যেমন ময়মনসিংহের মেড়া পিঠাই তো দেখলাম না এখানে। ম্যানেজার আশ্বাস দিয়েছেন, মেড়া পিঠা রাখারও ব্যবস্থা করা হবে। এখানকার বেশির ভাগ ক্রেতাই হচ্ছেন মিডিয়াসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। এ ছাড়া করপোরেট অফিসগুলোও বিভিন্ন বাঙালিয়ানা উৎসবে পিঠা এখান থেকেই কেনে। এখানকার বেশির ভাগ পিঠা প্রতি পিস ২২ টাকা। কয়েকটি পিঠার দাম অবশ্য ২৫ টাকা।
    বেইলি রোডে কেএফসি ও পিৎজা হাটের গা ঘেঁষে রয়েছে বেইলি পিঠাঘর। ছোটখাটো দোকান, শুরু হবার আগেই যেন শেষ! দুজন খদ্দের প্রবেশ করলেই তৃতীয়জনের পা রাখার জায়গা পাওয়া মুশকিল। তবে এতে করে যে বেইলি পিঠাঘরের খুব বয়েই যাচ্ছে, তা নয়। তাদের বেশির ভাগ পিঠাই যায় পার্সেল। বাসান সাহেব পিঠাঘরের ম্যানেজার। জানালেন, দুই যুগ ধরে এখানেই পিঠার কারবার করছেন তারা। দু-দুটি শাখাও ছড়িয়েছেন ইতিমধ্যে। গুলশান ও বারিধারায়। মোট ৪৫ প্রকার পিঠা মেলে বেইলি পিঠাঘর ও তাদের শাখাগুলোতে। এগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রমী পিঠা হচ্ছে কলা পিঠা, বিবিখানা, মুগসোলা, শাহি রস পাকন, পান পিঠা, ঝিনুক পিঠা, রজনীগন্ধা ফুল পিঠা, পাংশা পিঠা, রস কদম, গোলাপ ফুল পিঠা, ভেজিটেবল ঝাল পিঠা ইত্যাদি। ১৮ টাকা থেকে শুরু করে ৯০ টাকা পর্যন্ত দাম পড়বে একেকটি পিঠার।
    এ তো গেল ঢাকা দক্ষিণের ফিরিস্তি। এখন যাওয়া যাক উত্তরে। মূলত উত্তরার জসীমউদ্দীন মোড় থেকে একেবারে মাসকট প্লাজা পর্যন্ত চারটি পিঠাঘর রয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে, জসীমউদ্দীন মোড়ে নেমে হাতের বাঁ দিকে, অর্থাৎ ১ নম্বর সেক্টরের ১৪ নম্বর রোডে যে ‘উত্তরা পিঠাঘর’ রয়েছে, সেই একই নামে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ১৫ নম্বর রোডে, অর্থাৎ আজমপুর বাসস্ট্যান্ড নেমে বাঁ দিকে এগিয়ে, ট্রাস্ট ফ্যামিলি নিডস-সংলগ্ন আরেকটি পিঠাঘর রয়েছে, সেটির নামও উত্তরা পিঠাঘর। জসীমউদ্দীন মোড়ে অবস্থিত উত্তরা পিঠাঘরের সেলসম্যান ইসমাইল হোসেন এবং আজমপুরের রবীন্দ্রসরণির উত্তরা পিঠাঘরের ম্যানেজার ফারুক খানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নাম এক হলেও এ দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠান। তবে মালিকেরা সহোদর। জসীমউদ্দীনে অবস্থিত পিঠাঘরের মালিক মোশাররফ হোসেন এবং আজমপুরের রবীন্দ্রসরণির পিঠাঘরের মালিক আনোয়ার হোসেন। উভয়ের মেন্যু চার্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, জসীমউদ্দীন-সংলগ্ন উত্তরা পিঠাঘরে কিছু ভিন্ন পিঠা রয়েছে। যেমন ভাপা পিঠা, ঝাল ভাজা পিঠা, শাহি সরপুলি পিঠা, তিতপুলি পিঠা, পান পুলি পিঠা, শাহি ভাজা পুলি পিঠা ও বকুল পিঠা। এগুলো আজমপুরের উত্তরা পিঠাঘরে পাওয়া যায় না। সেখানে রয়েছে তালের পুরের, দুধের সরের এবং চকলেট পুর দেওয়া পাটিসাপটা পিঠা, যেগুলো আবার জসীমউদ্দীন-সংলগ্ন উত্তরা পিঠাঘরে পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া আজমপুরের পিঠাঘরে ডাবল ভাপা পিঠা, লাল চালে ভাপা, সরভাপা, কাল ভাপা, আন্তোয়া পিঠা, ঝুরি পিঠা, ডিম পুলি, মালাই পিঠা, রাজশাহী পিঠা সর ভাপা, কানলতিকা, ঝাল জামাই, ছিট রুটি, দুধ পাক্কন, ছেকা তিল পুলি, চিকেন পুলি এবং মেড়া পিঠা পাওয়া যায়, যা জসীমউদ্দীনের উত্তরা পিঠাঘরে মেলে না। উভয় পিঠাঘরের পিঠাগুলোর দাম ২০ থেকে ৪০০ টাকা।
    উত্তরা পিঠাঘরের মধ্যখানে ছোট পরিসরে দেখা মিলবে বিসমিল্লাহ পিঠাঘরের। রাজলক্ষ্মীতে।

        শিবলী আহমেদ
    ছবি: নাঈন হোসেন তানভীর


    Subscribe & Follow

    JOIN THE FAMILY!

    Subscribe and get the latest about us
    TRAVELS
    LIFESTYLE
    RECENT POST
    বোটক্সের বদলে
    19 January, 2018 7:14 pm
    আলোকচিত্র
    19 January, 2018 7:11 pm
    BANNER SPOT
    200*200
    SOLO PINE @ INSTRAGRAM
    FIND US ON FACEBOOK