FASHON
  • আলাপন I কনিষ্ঠদের চ্যালেঞ্জ নিয়েই কাজ করতে হয়- নাফিস বিন যাফর

    বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও অ্যানিমেশন বিশেষজ্ঞ নাফিস বিন যাফর। অ্যানিমেশন নিয়ে কাজ করেছেন হলিউডের বেশ কিছু সাড়া জাগানো চলচ্চিত্রে। পেয়েছেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড বা অস্কার। গত ডিসেম্বরে আয়োজিত ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের একটি সেশনে অংশ নিতে আসেন তিনি। কথা বলেছেন ক্যানভাসের সঙ্গে। সে আলাপনের চুম্বক অংশ জানাচ্ছেন নাজমুল হক ইমন

    ক্যানভাস: অ্যানিমেশন দুনিয়ায় কীভাবে আপনার আবির্ভাব ঘটে?
    নাফিস: চার্লসটন কলেজে ঢুকে আমি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শুরু করি। মা-বাবা ভেবেছিলেন, আমি বোধ হয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার দিকে ঝুঁকবো। কিন্তু কলেজের শেষ দিকে নাসার জন্য একটা প্রোগ্রাম তৈরি করি আর সেটি নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকি। বলতে পারেন এভাবেই শুরু অ্যানিমেশনের দুনিয়ায় যাত্রা। এরপর ১৯৯৮ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক হয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রোগ্রাম বানাতে শুরু করি। পরে যোগ দিই ডিজিটাল ডোমেইন নামের প্রতিষ্ঠানে। সেখানেই ফ্লুয়িড অ্যানিমেশন কৌশল তৈরি করি। পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ানসহ নানা ছবিতে ব্যবহার করা হয় এই বিশেষ আবহ। ডিজিটাল ডোমেইনের পর ড্রিমওয়ার্কস। এরপর পিবাডি অ্যান্ড শারম্যান, হাউ টু ট্রেইন ইয়োর ড্রাগন-টু এর মতো মুভি। এর আগে করেছি শ্রেক ফরএভার আফটার, ২০১২, কুংফু পান্ডা টু-এর মতো ব্লকবাস্টার ছবি। তারও আগে ছবির তালিকায় আছে ট্রন, ট্রান্সফরমার-টু ছবির অ্যানিমেশন। ছবির পাশাপাশি অনেক বিজ্ঞাপনের কাজও করা হয়েছে।
    ক্যানভাস: আমরা জানি, কবি গোলাম মোস্তফা আপনার দাদা হন। জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি প্রয়াত সৈয়দ মাইনুল হোসেন আপনার মামা। আর শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার সম্পর্কে নানা। তাঁদের সৃজনচর্চা আপনার মাঝে কোনো প্রভাব ফেলেছে?
    নাফিস: এই প্রশ্নের আমার একটাই উত্তর- সৃজনশীলতা আমার রক্তেই মিশে আছে। কারণ নানা, দাদা আর মামা ছাড়াও আমার মা ফুলেল নকশা নিয়ে কাজ করেন আর বাবা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তাই মা মাঝে মাঝে মজা করে বলেন, ‘বাবার কাছে গণিত আর বিজ্ঞান পেয়েছি আর আমার দিক থেকে সৃজনশীলতা।’
    ক্যানভাস: বিশ্ব চলচ্চিত্রের সেরা পুরস্কার অস্কার পেয়েছিলেন ২০০৮ সালে। পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান চলচ্চিত্রের জন্য। এরপর কারিগরি অস্কারের বিচারকম-লীর একজন সদস্যও হন আপনি। বিচারকের কাজটি কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?
    নাফিস: মজার কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো বলতে চাই। সম্ভবত প্রথমবারের মতো যখন বিচারক হয়েছি, তখন বিচারকমন্ডলীর সদস্যদের মধ্যে আমি সবচেয়ে কনিষ্ঠ। তারা আমার সামনে ৩০ বছর, ৪০ বছরের অভিজ্ঞতার কথা বলতে থাকেন। আমি শুধু চুপ করে শুনি। তাদের অভিজ্ঞতা এত বেশি যে, সেখানে আমি কিছুই নই। তবে আমি বলবো, চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। আর চ্যালেঞ্জ ব্যাপারটা তো আছেই। শুধু বিচারক হিসেবে নয়, প্রতিটি কাজই আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করি। কারণ, যে বছর অস্কার বিজয়ী হয়েছি, সে বছরও আমি সবচেয়ে কনিষ্ঠ ছিলাম। এরপর বিচারক হিসেবেও। কনিষ্ঠদের একটু চ্যালেঞ্জ নিয়েই কাজ করতে হয়।
    ক্যানভাস: বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার যদি তুলনা করতে বলি...
    নাফিস: পড়াশোনা নিয়েও আমার মজার কিছু অভিজ্ঞতা আছে। আমি কিন্তু ১৬ বছর বয়সেই ১২ বছরের শিক্ষাজীবন শেষ করেছি। কুমিল্লা ইস্পাহানী স্কুল, ঢাকায় শহীদ আনোয়ার স্কুল ও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়াশোনা করেছি। শহীদ আনোয়ার স্কুলে চতুর্থ শ্রেণির পর ছেলেদের পড়ার সুযোগ নেই। মা-বাবা তখন আমাকে মানারাতে ভর্তি করানোর কথা ভাবেন। ইংরেজি মাধ্যম, তাই ক্লাস ফোরেই ভর্তি করাতে চাইলেন। কিন্তু আমি বেঁকে বসলাম। কারণ, এক বছর ধরে ফোরে পড়ি, আরও এক বছর ফোরে পড়তে হবে। ভর্তি পরীক্ষায় খুব ভালো করলাম। ভর্তি হলাম পঞ্চম শ্রেণিতে। আমার বয়স যখন ১০ বছর, তখন আমরা তিনজন ছয়টা স্যুটকেস নিয়ে পাড়ি জমাই যুক্তরাষ্ট্রে। দক্ষিণ ক্যারোলাইনার চার্লসটনের স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হই। এরপর একাডেমি ম্যাগনেট হাইস্কুল। তারপর চার্লসটন কলেজে ঢুকে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শুরু করি। আর যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলতে গেলে শুধু একটা কথাই বলবো- যে দেশ যত উন্নত, সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও তত উন্নত।
    ক্যানভাস: বাংলাদেশের প্রযুক্তি অঙ্গনের খোঁজখবরও নিশ্চয় রাখেন। এখনকার সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?
    নাফিস: আমাদের দেশের প্রযুক্তি অঙ্গনের খোঁজখবর রাখি। না হলে তো আমি এবারের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে অংশ নিতাম না। আমি বাংলাদেশের সম্ভাবনা দেখি সব সময়। কারণ, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ যতটুকু এগিয়েছে, তা আসলেই বিস্ময়কর। বিশ্বে অনেক দেশের চেয়ে আমরা এগিয়ে। তবে আমাদের আরও জানতে হবে। বিশ্ব যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে যারা জানবে না, বুঝবে না বা শিখবে না- তাদের কোনো ঠাঁই হবে না।
    ক্যানভাস: বাংলাদেশের নির্মাতারা আপনাকে নিয়ে অ্যানিমেশন মুভি তৈরির আগ্রহ প্রকাশ করলে আপনাকে কি পাশে পাওয়া যাবে?
    নাফিস: সুযোগ পেলে কি আর হাতছাড়া করবো? কিন্তু শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি, আমি যে ধরনের কাজ করি সেটি বাংলাদেশে করা এখনো সম্ভব নয়। তাই ইচ্ছে থাকলেও তা করতে পারবো না। তবে মনে করি, পর্যাপ্ত অবকাঠামো আর, সুযোগ পেলে দেশেই তরুণেরা ভালো কিছু করে দেখাবে। তারা আর কখনো বিদেশে গিয়ে কাজ করতে চাইবে না। আমার মতো তরুণেরা আর প্রবাসী হবে না। সে জন্য বাংলাদেশকে প্রস্তুত হতে হবে। আর অ্যানিমেশন হচ্ছে শিল্পের একটি ডিজিটাল মাধ্যম। রংতুলির বদলে এখানে শিল্পী কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে তার দক্ষতা ফুটিয়ে তোলেন। ভালো প্রোগ্রামার যে কেউ হতে পারেন। তবে ভালো অ্যানিমেটর হতে হলে শিল্পমন থাকাটা জরুরি। এখানে প্রোগ্রামার তার কল্পনাটাকে ভিজ্যুয়ালাইজ করবেন। এ ক্ষেত্রে সহজাত প্রতিভা যাদের আছে, তারা নিঃসন্দেহে ভালো করবেন। তবে কাজের প্রতি সিনসিয়ারিটি ও ভালোবাসা থাকলে আমার মনে হয়, যে কেউ অ্যানিমেটর হিসেবে সফল হতে পারেন।
    ক্যানভাস: আপনার মতো কাজ করতে চাইলে তরুণদের কী করা উচিত?
    নাফিস: আমি তো মনে করি তরুণদের প্রথমেই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে। সেটা এক মিনিট হোক কিংবা দেড় মিনিট। এই কাজটাকেই শুরুতে খুব কঠিন মনে হবে। তবে হাল ছাড়া যাবে না। সিনেমা মানে একটা টিমওয়ার্ক। সেই টিমওয়ার্কের সঙ্গে সিনেমার সব কটি প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। আমি নিজেও সব সময় দল বেঁধে কাজ করি। মনে হয় প্রতিদিন নতুন কিছু শিখছি। তরুণদের বলবো, শুরুতে একটি-দুটি ছবি বানিয়ে এক্সপেরিয়েন্স নাও। বিগ প্রজেক্টের জন্য অপেক্ষা করো।
    ক্যানভাস: সামনে কোন কোন চলচ্চিত্রের কাজ করছেন?
    নাফিস: খুব শিগগির একটি অ্যানিমেটেড-অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রের জন্য কাজ করবো। আরও কিছু চলচ্চিত্রে কাজ করার কথা রয়েছে। তবে এখনই এসব নিয়ে কিছু বলতে চাই না।
    ক্যানভাস: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দেখেন?
    নাফিস: দেশের চলচ্চিত্র খুব একটা দেখা হয় না। তবে আমি সিনেমার গল্পগুলো শুনি। অনেক গল্প আছে, যেগুলো আমাকে মুগ্ধ করে। দেশের তরুণেরা চাইলে এগুলো নিয়ে অ্যানিমেশন ফিল্ম তৈরি করতে পারে।
    ক্যানভাস: দেশের তরুণদের মধ্যে কেমন সম্ভাবনা দেখেন?
    নাফিস: বাংলাদেশের তরুণ, বিশেষ করে যারা তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, তাদের অমিত সম্ভাবনা আছে। আমি জানি, তরুণেরা এখন অ্যানিমেশনে দারুণ কিছু করে দেখাচ্ছে। মোবাইল বা অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ, গেম ডেভেলপমেন্টের মতো এই অ্যানিমেশন ব্যাপারটা নিয়ে ওরা ভাবছে। উদ্ভাবনী কিছু করেও দেখাচ্ছে। ওদের মধ্যে যে ট্যালেন্ট আছে, তা কাজে লাগাতে হবে।
    ক্যানভাস: জীবন সম্পর্কে আপনার ভাবনা কী?
    নাফিস: আমি মানুষ হতে চাই। পূর্ণাঙ্গ একজন মানুষ। আর সেই লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি। বাবা-মা, নানা, দাদা, মামা সবাইকে দেখেছি তারা কতটা সৃজনশীল। তাদের আদর্শ, তাদের শেখানো পথ ধরেই বলতে গেলে হাঁটছি আমি। আরও এগিয়ে যেতে চাই। আরও শিখতে চাই। কারণ, শেখার কোনো শেষ নেই। মা সব সময় বলে, আমি তাদের লক্ষ্মী ছেলে। তাই লক্ষ্মী ছেলে হয়েই সব সময় থাকতে চাই। এ ছাড়া ভবিষ্যতে একজন প্রকৃত শিল্পী হয়ে বেঁচে থাকতে চাই। আরও নিখুঁত ও নান্দনিকভাবে নিজের কাজকে ফুটিয়ে তুলতে চাই। ব্যবসায় বা প্রশিক্ষণের মতো কোনো কাজে জড়ানোর আগ্রহ নেই।
    ক্যানভাস: গানের প্রতি আপনার আগ্রহ আছে। কারা প্রিয় শিল্পী?
    নাফিস: আমি কনসার্টে গিয়ে গান শুনি। অনেক দূর কনসার্ট হলেও অবসর থাকলে সেখানে ছুটে যাই। কাজ করতে করতেও অনেক সময় গান শোনা হয়। উপমহাদেশীয় গানের মধ্যে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ভালো লাগে। অনেকের গানই শুনতে পছন্দ করি, কিন্তু নামগুলো বলতে চাই না।
    ক্যানভাস: আপনি রান্না করতে পছন্দ করেন। কোন ধরনের রান্নায় আগ্রহ বেশি?
    নাফিস: বরাবরই আমি রান্না করতে পছন্দ করি। সময় কম পাই, কিন্তু চেষ্টা করি বিশেষ দিনে কিংবা কোনো উপলক্ষ থাকলে রান্না করার। দেশিসহ অন্যান্য রান্নাও পারি। তবে দেশি খাবার তৈরিতে মন বেশি টানে।
    ক্যানভাস: আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য ক্যানভাসের পক্ষ থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
    নাফিস: আপনাকেও ধন্যবাদ। ক্যানভাস পাঠকদের নতুন বছরের শুভেচ্ছা।

    ছবি: সংগ্রহ


    Subscribe & Follow

    JOIN THE FAMILY!

    Subscribe and get the latest about us
    TRAVELS
    LIFESTYLE
    RECENT POST
    বোটক্সের বদলে
    19 January, 2018 7:14 pm
    আলোকচিত্র
    19 January, 2018 7:11 pm
    BANNER SPOT
    200*200
    SOLO PINE @ INSTRAGRAM
    FIND US ON FACEBOOK