FASHON
  • শ্রদ্ধাঞ্জলি I এক স্বাপ্নিকের প্রস্থান

    বনানীতে যখন তাঁকে অন্তিমশয্যায় রেখে এলেন স্বজনেরা, কিছু আগে সূর্য অস্ত গিয়েছে, শহরজুড়ে নেমে এসেছে রাতের অন্ধকার। এই শহর নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল। তবে তা যে ছিল, সেটা আমরা প্রায় কেউই জানতাম না, যদি না তিনি দুই বছর আগে ঢাকা উত্তরের মেয়র নির্বাচনে দাঁড়াতেন। সবারই স্বপ্ন থাকে, কিন্তু কিছু কিছু মানুষ তাদের স্বপ্নকে মুঠোয় আনার জন্য নিজের আরামদায়ক জগৎ ছেড়ে একদম নতুন সমস্যাসংকুল জগতে পা দিতে একধরনের রোমাঞ্চ অনুভব করেন। আমাদের আনিসুল হক ছিলেন সেই ধারার মানুষ। যিনি যত দিন পৃথিবীতে ছিলেন, প্রবলভাবে বেঁচে ছিলেন।

    তাঁর জীবনের গল্প হলো নতুন জগতের হাতছানিতে অবিরাম ছুটে চলা এক মানুষের বিজয়গাথা। ফেনীর সোনাপুর গ্রামের সেই ছেলেটা সোনালি ফসলের খেত, মাটির রাস্তা, চায়ের দোকান, গ্রামের হাট, মাটির ঘর পেরিয়ে কয়েক মাইল পথ হেঁটে স্কুলে যেতেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে তিনি বাড়ি থেকে আরও কয়েক শ মাইল দূরে চলে গেলেন। ফেনী থেকে রাজশাহী, রাজশাহী থেকে চট্টগ্রাম; পড়াশোনার জন্য, জীবনের জন্য তিনি যেতে লাগলেন দূরে, আরও দূরে। তিনি দেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে সুযোগ পাননি। তাই বলে থেমে থাকেননি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সামনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়তো পাইনি। তাই বলে কি হারিয়ে যাব আমরা?’ হারিয়ে যাননি তিনি। তাঁর জন্য কোনো কিছু কেউ সাজিয়ে দেয়নি, তিনি নিজে সাজিয়ে নিয়েছিলেন তাঁর জীবনকে। তিনি বলতেন, ‘জীবন এত সহজ নয়, জীবন একটা যুদ্ধক্ষেত্র’। আর এই যুদ্ধকেই যেন তিনি নিজের মতো করে উপভোগ করতেন। সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় জীবনসংগ্রামের প্রতিটি পর্বে সফল হয়েছেন। এই জন্যই তাঁর জীবনের দিকে তাকালে সবচেয়ে বেশি যেটা দেখে আমরা আজ চমকে যাই, তা হলো বৈচিত্র্য। যে মানুষটি অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেন, তিনি সহজ পথে হেঁটে ব্যাংকে কিংবা কোনো সরকারি চাকরিতে যোগদান করলেন না। দেড় বছর তিনি বেকার ছিলেন। হয়তো ছিলেন না। এই দেড় বছর তিনি তাঁর পরবর্তী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন হয়তো। কারণ, এরপরে আমরা যে আনিসুল হককে দেখেছি তিনি জনপ্রিয়, সফল, বিখ্যাত, তাঁর পেছনে লাখ লাখ ভক্ত-কর্মী। আশি থেকে নব্বইয়ের দশকে তাঁকে সবাই দেখলেন টেলিভিশনের একজন উপস্থাপক হিসেবে। অনেকেই মনে করেন, তাঁর যে আজকের বিশাল জনপ্রিয়তা, এর পেছনে রয়েছে তাঁর এই উপস্থাপক পরিচিতি। তিনি শুধু একই ধরনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেননি। বৈচিত্র্যময় ছিল তাঁর অনুষ্ঠানের ধরন। দারুণ জনপ্রিয় ছিল ‘অন্তরালে’ আর ‘বলা না বলা’ অনুষ্ঠান দুটি। এ ছাড়া ঈদের সময় ‘আনন্দমেলা’র উপস্থাপনা তিনি করতেন। উপস্থাপক আনিসুল হকের প্রতিটি অনুষ্ঠানই তাঁর সৃষ্টিশীলতার উদাহরণ হয়ে থাকবে। আমাদের দেশে সব সময় ব্যান্ডের শিল্পী আর ক্ল্যাসিক্যাল সংগীতবোদ্ধাদের মধ্যে একটা অলিখিত টানাপোড়েন ছিল। মাঝে মাঝে এই টানাপোড়েন বেশ প্রকাশ্য হয়ে ধরা পড়তো। সংগীতাঙ্গনের এই দুটি দলকে আনিসুল হক তাঁর একটি টিভি প্রোগ্রামের মাধ্যমে একই মঞ্চে নিয়ে এলেন। সবচেয়ে মজার যে বিষয়টি ছিল, তা হলো, ব্যান্ড সংগীতের শিল্পীরা এই অনুষ্ঠানে গাইছেন রবীন্দ্রসংগীত আর রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীরা গাইছেন ব্যান্ডের গান। এবং এরা সবাই প্রাণপণ চাইছেন তাদের গাওয়া গানটি সুন্দর হোক, মানুষ পছন্দ করুক। আনিসুল হকের মধ্যে যে একজন রাজনীতিকের সত্তা ছিল, সেই খবরটি তাঁর ভক্তরা অনেক আগেই পেয়েছিলেন তাঁর একটি তুমুল জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘সবিনয়ে জানতে চাই’-এর মাধ্যমে। এখন আমাদের দেশের অনেক টক শোতে রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত হন। কিন্তু আজ থেকে ২০ বছর আগে এটা খুব অদ্ভুত একটি ঘটনা ছিল। আর সে সময়, অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতাদের টক শোতে নিয়ে আসেন। তাঁর অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিজের শান্তিকামী সত্তার উপস্থিতি পাওয়া যায়। তিনি একাধিক বিবদমান দলকে একটি প্ল্যাটফর্মে এনে সংলাপের সুযোগ করে দিয়েছেন। এমন একটি যুগে, যখন সংলাপের ধারণাটি এ দেশে ছিল না।
    একজন সাধারণ মানুষ যখন কোনো কাজে জনপ্রিয়তা পান, স্বাভাবিকভাবে সে কাজটিকেই তিনি প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরেন। অনেক সময় এমনভাবে ধরেন যে, মাঝে মাঝে অনুষ্ঠানটির শ্বাসরোধ হয়ে যায়। কিন্তু আনিসুল হক সাধারণ মানুষ ছিলেন না। আর তাই জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা এই মানুষটি হঠাৎ জনমানুষের আড়ালে চলে যান। তারপর অনেক দিন তিনি সংবাদে ছিলেন না। এই সময়টিতে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মোহাম্মদী গ্রুপকে নিয়ে গিয়েছিলেন সাফল্যের চূড়ায়। এর অনেক দিন পরে ২০০৫ সালে আবার আনিসুল হক সংবাদপত্রের পাতায় উঠে আসেন। উপস্থাপক আনিসুল হকের ভক্তরা অবাক হয়ে দেখেন, তাঁদের প্রিয় এই মানুষ এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী এবং বিজিএমইএর সভাপতি। এরপর ২০০৮ সালে তিনি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি নির্বাচিত হন। ব্যবসায়ীদের যে ছবি আমাদের দেশে দেখা যায়, এই মানুষটি ঠিক তাদের মতো নন। সবাইকে তিনি হয়তো অবাক করে দিতে পছন্দ করতেন, প্রচলিত সংস্কার ভেঙে দিতে পছন্দ করতেন। মানুষ আবার চমকে ওঠে ২০১৫ সালে, যখন একসময়ের জনপ্রিয় উপস্থাপক, তখনকার সফল ব্যবসায়ী এবং অরাজনৈতিক এই ব্যক্তি হঠাৎ ঢাকার মেয়র নির্বাচনে দাঁড়ান। যে দেশে বেশির ভাগ রাজনীতিকের ইমেজ সব সময় প্রশ্নবিদ্ধ, সে দেশে নিজের অবস্থানে চূড়ান্ত সফল হবার পরেও আবার মেয়র নির্বাচনে দাঁড়ানো খুব সহজ কথা নয়। আনিসুল হক ফের সবাইকে নিজের অবস্থান জানান দিলেন। জানালেন এই শহর নিয়ে তাঁর স্বপ্নের কথা, যে স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি এই বন্ধুর পথে হাঁটতে এসেছেন। মেয়র নির্বাচিত হবার পর দারুণ সাহসী বেশ কিছু পদক্ষেপ তিনি নিয়েছিলেন, যা নেয়ার সাহস এর আগে কখনো কেউ করেননি। মেয়র হিসেবে তাঁর চলার পথ খুব সহজ ছিল না। অনেক সমালোচনার মুখোমুখিও হতে হয়েছে তাঁকে; কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। চেষ্টা করে গিয়েছেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আর ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে আসা নতুন কিছু নয়। তবে রাজনীতিতে আসার পরেও বিপুল জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারাটা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অবশ্যই বিস্ময়কর। আনিসুল হকের আকস্মিক মৃত্যুর পর তা দেখেছেন সবাই। দেশের সব স্তরের মানুষ একবার হলেও এই অসাধারণ মানুষটির জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন। যারা নিতান্তই তাঁকে পছন্দ করেন না, তারাও বলেছেন, ‘না, মানুষটার চেষ্টা ছিল’।
    সারা জীবন তিনি চেষ্টা করে গেছেন, স্বপ্ন দেখে গেছেন। প্রায়ই তিনি বলতেন, ‘স্বপ্ন নেই জীবনে এমন কোনো মানুষ নেই, স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। মানুষ মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও স্বপ্ন দেখে।’ মৃত্যুর আগে যুক্তরাজ্যের হাসপাতালের আইসিইউতে শুয়ে কী স্বপ্ন দেখেছিলেন আনিসুল হক- জেগে ওঠার স্বপ্ন, নাকি নতুন কোনো জগৎ জয়ের স্বপ্ন?

        জান্নাতুল মাওয়া


    Subscribe & Follow

    JOIN THE FAMILY!

    Subscribe and get the latest about us
    TRAVELS
    LIFESTYLE
    RECENT POST
    বোটক্সের বদলে
    19 January, 2018 7:14 pm
    আলোকচিত্র
    19 January, 2018 7:11 pm
    BANNER SPOT
    200*200
    SOLO PINE @ INSTRAGRAM
    FIND US ON FACEBOOK