FASHON
  • ছুটিরঘণ্টা I দানিউবের তীরে

    ছোট হলেও বাতিস্লাভা শহরটি বেশ পুরোনো, আর পরিপাটি। ওল্ড টাউন, ভাস্কর্য, দানিউব নদীতীরের দৃশ্য এর প্রধান আকর্ষণ। লিখেছেন জোবেরা রহমান লীনু

    মেট্রো করেই সিটি সেন্টারে এসেছিলাম। সে পথে তাই শোয়েডেনপ্লাৎজ থেকে হফবানহফে এলাম। ভিয়েনা থেকে বাতিস্লাভা ট্রেনে ঘণ্টাখানেকের পথ; অনেকেই প্রতিদিন বাসিস্লাভা থেকে ভিয়েনায় কাজ করতে আসে, ফিরেও যায়। আমি টিকিট কেটে ট্রেনে চেপে বসলাম। সাজানো গোছানো একটি শহর, সেটা আগেই জেনেছি। ট্রেনে উঠে ভাবছি নামার পর কী করবো। আবার কি মেট্রো নেব, নাকি ট্যাক্সি! ভাবতে ভাবতে চলে এলাম বাতিস্লাভা। ট্রেন থেকে নেমে এগিয়ে দেখি ছোট্ট স্টেশন এটা। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। অন্তত খোঁজাখুঁজির ঝামেলা নেই। একটাই রাস্তা। বের হয়ে দেখলাম, লেখা আছে, ওয়েলকাম টু স্লোভাকিয়া। হঠাৎ মনে হলো বুদাপেস্টের টিকিট কাটা হয়নি। আবার টিকিট কাউন্টারে গেলাম। কোনো লাইন নেই। জেনে নিলাম বুদাপেস্টের টিকিটের দাম। খুবই অল্প। কারণ, এখান থেকে বুদাপেস্ট যেতে ঘণ্টা দেড়েক লাগে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ট্রেন যায়; তাই টিকিটের গায়ে সময় লেখা হয় না। আমি আবার বের হয়ে ট্যাক্সি খুঁজতে থাকলাম। ভাবলাম কিছুদূর এগিয়ে যাই, তাহলে একটু কমে পাব। আট ইউরো দিয়ে ট্যাক্সি নিলাম। ছোট্ট ছিমছাম শহর আমি পছন্দ করি। কারও কাছে কিছু জানতে চাইলে যতক্ষণ পর্যন্ত সে সঠিক উত্তর না দিতে পারছে, ততক্ষণ সে ব্যস্ত থাকে সহায়তার জন্য। অবাক হলাম ওদের ব্যবহার দেখে। ঘটনাটা স্টেশনেই ঘটেছে। আমি স্টেশন থেকে বের হয়ে আমার হোটেলের ঠিকানাটা একজনকে দেখিয়ে জানতে চাই, সেখানে বাসে যাওয়া যাবে কিনা। তিনি আমার হাত থেকে ঠিকানাটা নিয়ে কয়েকজনকে ওদের ভাষায় কী যেন বললেন, কিন্তু বুঝলাম সঠিক তথ্য পাচ্ছেন না। আমাকে অপেক্ষা করতে বলে নিজেই সামনে গিয়ে বাসের রুট দেখলেন। দেখে এসে আমাকে বলেন, এই হোটেলে তুমি বাসে যেতে পারবে না। তোমাকে ট্যাক্সি নিতে হবে। দূরে কিছু গাড়ি দাঁড়ানো আছে; সেগুলো দেখিয়ে বললেন, ওগুলো নিলে তুমি সস্তায় যেতে পারবে। আমি ধন্যবাদ দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম। আমার হোটেলের সামনে গাড়ি থামলো। দশ কি পনেরো মিনিট হবে স্টেশন থেকে হোটেলের দূরত্ব। সেখানে পৌঁছে ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস খেলাম। রুমে ঢুকে মনটা ভালো হয়ে গেল। বিশাল রুম, বিশাল বিছানা। মানুষ আমি একা। জানালার সামনে দাঁড়াতে বসন্তকালের আমেজ পেলাম। আমার রুমটা দশতলায়। নিচের দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। সুন্দর ছিমছাম শহর।
    হোটেল থেকে বের হয়ে হাঁটা শুরু করলাম। এমন হোটেলই আমি বুক করেছিলাম, যেন আশপাশেই দেখার মতো সবকিছু পাওয়া যায়। কারণ, পরদিনই বুদাপেস্ট যেতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে কিংস প্যালেসের সামনে এসে দাঁড়ালাম। এক পথচারীকে ছবি তুলে দেবার অনুরোধ করলাম। ছবি তুলে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। যে দিকে দুচোখ যায়, সেদিকেই যাবো। ওল্ড টাউন যেকোনো দেশেরই পর্যটকদের প্রাণকেন্দ্র। না জেনেই হেঁটে হেঁটে ওল্ড টাউনের দিকে চলে এলাম। সরু রাস্তা, কেমন যেন শিহরণ জাগে। মুভিতে এমন ছোট ছোট অলিগলি দেখেছি, যেখানে দেয়ালে ঠেস দিয়ে গিটার বাজাচ্ছে কোনো বোহেমিয়ান, তার মুখে জ্বলন্ত সিগারেট। সেই দৃশ্য আজ চোখের সামনে পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম ভালো লাগা নিয়ে। বোহেমিয়ান জীবন তার, গালে হালকা দাড়ি, মাথায় ক্যাপ, কেমন যেন ভালো লাগছে তাকে দেখে। বাঁকা হাসি, গানের ফাঁকে সিগারেটে টান। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তার গান শুনলাম। ভালো লাগলো, তাই পাঁচ ইউরো দিলাম। তারপর হাঁটা। সহনশীল ঠান্ডায় হাঁটতে মজা লাগে বেশি। এটা বাতিস্লাভার সবচেয়ে পুরোনো রাস্তা। মাইকেল গেট টাওয়ার দেখতে এ রাস্তা দিয়ে হেঁটে ভেতরে যেতে হবে। আমি দূর থেকে এর সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কাছে এলাম। বাতিস্লাভায় শেষ স্থায়ী ফটক হিসেবে এটি দাঁড়িয়ে আছে। আগে এর নাম ছিল মিহালাকাপু। উচ্চতা ৫১ মিটার। এটাই কিন্তু ওল্ড টাউনে যাবার প্রধান প্রবেশপথ। আমি হাঁটতে হাঁটতে ভেতরের দিকে যাচ্ছি আর আশ্চর্য হচ্ছি। এখানে ক্যাফে আর রেস্টোর্যান্ট আছে। সারি সারি দোকান আছে, সেখান থেকে ইচ্ছেমতো স্যুভেনির কেনা যায়। মাইকেল টাওয়ারের উপরে জাদুঘরও আছে।
    তখন দুপুর। আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে। সুন্দর একটা রেস্টোর্যান্টে বসে বিফ স্টেক অর্ডার দিলাম। খাওয়া আসতে বিশ মিনিট সময় নিল। খেয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। এসে পড়ি টাউন হলের সামনে। কী সুন্দর এর রূপ! দেশের সবচেয়ে পুরোনো এই শহরের এটি প্রাচীনতম পাথরের ভবন। এখানে প্রাচীন জাদুঘরও আছে। কোনো পর্যটক এটা দেখতে ভোলে না। একটু বিশ্রাম নিলাম এমন একটি চেয়ারে, যার পেছনে একটি ভাস্কর্য। তার সঙ্গে একটি ছবি তুললাম। পুরো ওল্ড স্কয়ারটা দেখার মতো আর এখানে প্রচুর পর্যটকের আনাগোনা। এরপর আমি চলে গেলাম বেলা স্ট্রিটে। বাতিস্লাভার সবচেয়ে পুরোনো দোকানে। বিশ শতকের গোড়ার দিকে এটি গড়ে উঠেছিল। এখানে অথেনটিক আসবাব পাওয়া যায়। এগুলোয় দাম ছিল আমার সাধ্যের বাইরে। পুরো ওল্ড টাউন ঘুরে ঘুরে দেখে শেষ করা যায় না এক দিনে। খুব রাগ হচ্ছিল নিজের ওপর। কেন আগেই টিকিটটা কাটলাম। ফেরার পথে অনুভব করলাম আমাদের দেশের বসন্তকালের আমেজ। অন্য দিক দিয়ে ফিরছিলাম বলে আলাদা একটা ফ্লেভার পেলাম। সবুজ গাছপালার মাঝখান দিয়ে আমি হাঁটছি। মনে হলো, কোকিলের ডাক শুনছি। মৃদু ঠান্ডা বাতাসে আমার চুল উড়ছে। দেখি, এক বয়স্ক মহিলা পোষা কুকুর নিয়ে ভিক্ষা করছেন। বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। কত নিঃসঙ্গ তিনি। কেউ হয়তো নেই তার, এই কুকুরটা ছাড়া। আমার হাতে পিৎজা ছিল। আমি কুকুরটাকে খেতে দিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন তিনি। আমি পকেট থেকে ২ ইউরো দিলে সে যে কী আনন্দিত হলেন, তা বলে বোঝাতে পারবো না। খুব পুরোনো একটা পোস্টবক্সের সামনে এসে ছবি তুললাম। চিঠির এই বাক্সের উপর একটি মেয়ে দুই পা ছড়িয়ে বসে আছে, আর নিচে বসে আছে একটি যুবক, যে মেয়েটিকে উপরের দিকে তাকিয়ে দেখছে। এক অসাধারণ শিল্পকর্ম। আমি স্থির হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম সেখানে। তারপর একটি পার্কে এসে বিশ্রাম নিলাম।
    ওল্ড টাউন থেকে বের হয়ে বাসে চেপে দানিউব নদীর তীরে চলে এলাম। নদীর পাশ দিয়ে হাঁটছি। কত যে নৌকা ভাসছে! এসব নৌকায় রেস্টোর্যান্ট আছে। ইচ্ছে করছিল নৌকার ছাদে বসে সূর্যাস্ত দেখতে। দেখলাম, নৌকার ছাদে অনেকেই বসে আছে। কতো কিছু ভাবছি! আসলে কোনো সৌন্দর্যই একা ভোগ করা যায় না। ভালো লাগার ভাবনাগুলো, কথাগুলো পাশে কেউ থাকলে বলতে কতো না ভালো লাগে! এবার আমি নতুন একটা ব্রিজ পার হয়ে বেশ খানিকটা পথ হেঁটে ইউএফও টাওয়ারের কাছে গেলাম। অসাধারণ এক টাওয়ার। এলিভেটর দিয়ে টাওয়ারের উপরে উঠলাম। নয়নাভিরাম দৃশ্য। উপর থেকে সবকিছু কী সুন্দর লাগছে! টাওয়ারের রেস্টোর্যান্ট থেকে পুরো বাতিস্লাভা দেখা যাচ্ছে। দানিউব নদীতে ভাসছে ছোট ছোট লঞ্চ। পাশের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে। বিকেলে বসে নাশতা করলাম। সন্ধ্যা হয়ে আসছে বলে হেডলাইট আর সূর্যাস্তের আলো মিলে পরিবেশকে ভারী রোম্যান্টিক করে তুলেছে। সেই সৌন্দর্য প্রাণভরে উপভোগ করলাম। অন্য রকম এক ভালো লাগা নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। (চলবে)

    লেখক: গিনেস বুকে স্থান পাওয়া সাবেক জাতীয় টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়ন

    ছবি: লেখক ও সংগ্রহ


    Subscribe & Follow

    JOIN THE FAMILY!

    Subscribe and get the latest about us
    TRAVELS
    LIFESTYLE
    RECENT POST
    বোটক্সের বদলে
    19 January, 2018 7:14 pm
    আলোকচিত্র
    19 January, 2018 7:11 pm
    BANNER SPOT
    200*200
    SOLO PINE @ INSTRAGRAM
    FIND US ON FACEBOOK