FASHON
  • রংতুলি I মেকআপের পোকাটা মাথা থেকে যায়নি -বাপন রহমান

    ক্যানভাস: সৌন্দর্য অঙ্গনে আসার পেছনের গল্পটা কী?
    বাপন: ছবি আঁকতাম ছোটবেলায়। বেশি আঁকতাম মানুষের মুখ। তারপর আম্মার লিপস্টিক, ব্লাশঅন দিয়ে সেগুলো রঙ করতাম। এরপর একসময় নিজের কাজিন ও বোনদের সাজাতে শুরু করলাম। যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, সেটা ১৯৮৬ সালের কথা। তখন একটা হিন্দু ব্রাইডকে সাজিয়েছিলাম। চট্টগ্রামে। সবাই প্রশংসা করলো আমার কাজের। তখন ভাবলাম, শখ করে করি না এগুলো। এর কয়েক বছর পর ঢাকা থেকে একটা টিম চট্টগ্রামে যায়। আমার মা একটি বিউটি পার্লারে যেতেন, নাম শাহিদা’স বিউটি পার্লার। এখন তিনি আমেরিকায় পার্লার খুলেছেন। যা হোক, এর স্বত্বাধিকারী শাহিদা তখন পোশাকও ডিজাইন করতেন। মা সেখানে গিয়ে বলতেন, আমার ছেলে তোমাদের মতো বিউটিশিয়ান হবে কি না জানি না, সে মানুষকে সাজাতে পছন্দ করে। তিনি মাকে বললেন, আমার একটা ফ্যাশন শো আছে সামনে। ঢাকা থেকে একটা টিম আসছে। টিমটা লিড করছেন শাহরুখ আমিন। তো তিনি সেখানে কাজ করার অফার করলেন। এটা ’৯১-এর দিকের কথা। হোটেল আগ্রাবাদে শোটি হয়েছিল। শাহরুখ আমিন করেছিলেন কোরিওগ্রাফি। তিনি বললেন, তুমি এত ভালো কাজ করো, ঢাকায় মুভ করো না কেন? তখন কারুজ নামের একটি মডেল এজেন্সি ছিল। স্বত্বাধিকারী কাওসার ভাই (কাওসার মাহমুদ)। তাঁকে একদিন ফোন দিলাম, কীভাবে কী করবো। তিনি জানতে চাইলেন, তুমি কি সেই বাপন যে শাহিদা’স কালেকশনের ফ্যাশন শোতে মেকওভার করেছিলে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তুমি তাহলে ঢাকায় আসো। ওই সময়টায়, ’৯২ তে বাবা ঢাকায় বদলি হন। তখন কারুজে যাই। ফটোগ্রাফির মেকআপ কী হবে, সে সম্পর্কে ধারণা ছিল, কিন্তু অভিজ্ঞতা ছিল না। কারুজের মাধ্যমেই তখন আমার শুরুটা হয় ফটোগ্রাফার ডেভিডদার (ডেভিড বারিকদার) সঙ্গে। যতগুলো পোর্টফোলিও ওখানে হতো, ওগুলোর মেকওভার করতাম। ৬ কি ৭ বছর আমি টানা এখানে কাজ করি। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার হিসেবেও কাজ করি। ১০/১১ বছর ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করেছি। বিভিন্ন ম্যাগাজিনের সঙ্গে কাজ করি, ফ্যাশন শোগুলোতে কাজ করি। বিখ্যাত প্রায় সব ফটোগ্রাফারের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা হয়। রফিকের সঙ্গে কাজ করেছি। আবু নাসেরের বেশির ভাগ কাজ করেছি। বিশেষত তাঁর ফরেইন সব শ্যুটে। বিলবোর্ডের কাজ করেছি।
    ক্যানভাস: তারপর?
    বাপন: বাংলাদেশে প্রথম ন্যুড মেকআপ, সেটাও আমি পরিচিত করি। মানুষ তখন জানতো না যে খুব হালকা একটা মেকআপেও খুব সুন্দর লাগতে পারে। আমার সিগনেচার হলো খুবই লাইট টোনের মেকআপ এবং খুব নিট একটা লুক। ব্রাইডালের ক্ষেত্রেও। তো, এভাবে কাজ করতে করতেই আমি দুবাই চলে যাই। এক বছর ছিলাম। ওখানে আমি খ্যাতনামা প্রসাধনী ব্র্যান্ড ম্যাকে যোগ দিই। আট-নয় মাস কাজ করি। তারপর দেশে ফিরে ২০০০ সালে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে এক বছরের ডিপ্লোমা করি ইন্সপিরেশন ইনস্টিটিউট অব ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে। প্রায় ছয় বছর মেকআপ থেকে বাইরে ছিলাম, ফ্যাশন ডিজাইনিং করতাম। আমার হাউজের নাম ছিল রানী বুটিক। ওটা দু-তিন বছর চালাই। ইন্টেরিয়রও করেছি। ক্রিয়েটিভ প্রায় সব সেক্টরেই একটু একটু করে নক করেছি। কিন্তু মেকআপের পোকাটা মাথা থেকে যায়নি। সবাই বলতো, তুমি ইনগ্রোন মেকআপ আর্টিস্ট, কেন এটাকে কন্টিনিউ করো না? তারপর আবার ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ শুরু করি। আমি স্টিল ফটোশ্যুটে বেশি আগ্রহী ছিলাম। মূলত বিলবোর্ডের জন্য বেশি কাজ করি, টিভিসি কম করেছি। সেলিব্রিটিদের সঙ্গেও অনেক কাজ করেছিলাম। এগুলো করতে করতেই আমার বন্ধু বিউটি স্যালন বানথাইয়ের কামরুল ইসলাম বললো, বাপন, তুমি আমার এখানে মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে কিছুদিন কাজ করো। তারপর চার বছর বানথাইতে কাজ করি। এবং তখন থেকে আমি ব্রাইডটা ফোকাস করছি। এরপর সানজিদা খানকে সঙ্গে নিয়ে ডিভাইন বিউটি লাউঞ্জ শুরু করি বছর তিনেক আগে।
    ক্যানভাস: প্র্যাকটিক্যাল কাজের বাইরে কোনো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন?
    বাপন: ক্রায়লন নামের একটা কোম্পানি আছে। অনেক বড় প্রসাধনী কোম্পানি এটা। প্রফেশনাল মেকআপ করে। ঢাকাতে এর দুটি ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছিলাম। সেখান থেকে অনেক কিছু শিখেছি। দেশের বাইরেও বিভিন্ন ডেমনস্ট্রেশনে অংশগ্রহণ করি। ওয়ার্কশপগুলোতে যাই। ব্যাংককে যাই, ইংল্যান্ডে যাই। শখ করেই অংশগ্রহণ করি।
    ক্যানভাস: মাঝে কালার অ্যান্ড ক্লিক নামের একটা প্রদর্শনীও তো করেছেন...
    বাপন: এটা একটা পোর্ট্রটে একজিবিশন ছিল। যেটা বে এইজ গ্যালারিতে হয়েছে, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। কনসেপ্ট ছিল, একজন মেকআপ আর্টিস্ট আর একজন ফটোগ্রাফার। এটাতে আমি ডিভাইন বিউটি লাউঞ্জের পক্ষ থেকে ৪৪টা মেকওভার করেছিলাম। ছবি তুলেছেন আনোয়ার হোসেন এনাম। এতেও বেশ ভালো সাড়া পেলাম।
    ক্যানভাস: সৌন্দর্যচর্চায় ২৯ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছেন। মেকআপে কী ধরনের পরিবর্তন দেখলেন?
    বাপন: মেকআপে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাই। এখন সবাই বাইরের দেশগুলো ফলো করছে। কিন্তু এখানে আমার একটা কথা আছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি ট্র্যাডিশনটা বজায় রাখার চেষ্টা করি। লেটেস্ট মেকআপ যেটা হচ্ছে সেটা অবশ্যই আমাকে জানতে হচ্ছে। কিন্তু তিন-চারটা ক্ষেত্রে আমি কম্প্রোমাইজ করছি না- ঈদের সাজ, বিয়ে, পয়লা বৈশাখ, পূজা ইত্যাদি ক্ষেত্রে। কেন যেন মনে হয়, এগুলোয় এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে অন্য একটা ফরমেটে আমরা দাঁড় করিয়ে ফেলছি। আর পরিবর্তন প্রসঙ্গে বলবো, মেকআপটা ঘুরেফিরে আসে। ফলে আগেকার দিনের মেকআপও এখন ট্রেন্ডে চলে আসছে- একটু টানা চোখ, ডার্ক লিপস্টিক। আবার বিদেশি ট্রেন্ড অনুসরণ করেও মেকআপ করছি। কিন্তু ট্রেন্ড অনুসরণ করতে গিয়ে যেটা হচ্ছে, আমরা অনেকেই কোন কাপড়ের সঙ্গে কোন ধরনের মেকআপ যাবে- তা ফলো করছি না।
    ক্যানভাস: প্রসাধনীর পরিবর্তনটা কীভাবে দেখছেন?
    বাপন: এটা আমি পজিটিভলিই দেখছি। আগে আমরা অনেক কিছু হাতের কাছে পেতাম না, বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হতো। এখন কিন্তু আমরা দেশের বাজারেই অনেক কিছু পাচ্ছি। এখানে একটা ব্যাপার বলে নিচ্ছি, আমি একজন মেকআপ আর্টিস্ট। একটা নতুন প্রডাক্ট বের হলে ওটাতে কী উপকরণ আছে, পিগমেন্টগুলো কেমন, লিপস্টিকের কালার- সবকিছু জানতে হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের পুরোনোদের মধ্যে জানার যে আগ্রহ আছে, নতুনদের মাঝে তেমন নেই।
    ক্যানভাস: সাজের ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টের চাহিদা কতটা বাস্তবসম্মত থাকে?
    বাপন: ধরুন, ছোট একটা মুখের মেয়েকে যদি আমি হিউজ একটা হেয়ার করি, তাহলে তাকে ভালো লাগবে না। কিন্তু অনেকেই এক্সপেরিমেন্ট করতে চায়। অনেকে উদ্ভট উদ্ভট ছবি রেফারেন্স হিসেবে দেখায়। সেভাবে সাজতে চায়। তখন তাদের বলি, দেখেন এই মেয়েটা বিদেশি। ওর ফেসিয়াল স্ট্রাকচার আর তোমার স্ট্রাকচার কিন্তু একরকম না। তখন তারা ব্যাপারটা বুঝতে পারে। বলে, আপনি আপনার মতো করে করেন। এরপর যখন শেষ করি, তখন তারা কিন্তু তাদের লুকে সন্তুষ্ট থাকে।
    ক্যানভাস: কোন কোন প্রসাধনী ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
    বাপন: ক্রায়লন আমার সবচেয়ে পছন্দের ব্র্যান্ড। এর সব প্রসাধনীই আমার কালেকশনে থাকে। মাসকারার ক্ষেত্রে মেবেলিন আমার পছন্দ। ল’রিয়েলও পছন্দের ব্র্যান্ড। আই জেলের ক্ষেত্রে ম্যাক ব্যবহার করছি, ববি ব্রাউন ব্যবহার করছি। যেটাই করি, একটু ভালো ব্র্যান্ড ব্যবহার করি।
    ক্যানভাস: নিজেকে সাজানোর প্রক্রিয়ায় কোন ভুলগুলো মেয়েরা করে?
    বাপন: অনেককে দেখেছি, খুব দামি একটা ব্যাগে খুব দামি কমপ্যাক্ট পাউডার বহন করছে। কিন্তু তার স্পঞ্জটায় কালো ফাঙ্গাস পড়ে গেছে। সেটাই সে ব্যবহার করছে। একজন মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে আমি মনে করি, প্রতি মাসে বা সর্বোচ্চ দুই মাসে স্পঞ্জ পরিবর্তন করা উচিত। হঠাৎ করে দু-তিনটা ব্রণ উঠলো, তারপরও বেইজ করে যাচ্ছি মুখে। ভারী মেকআপ নিচ্ছি। অথচ সে সময় এটা ঠিক না। কারণ, আপনার কম ব্রণ হলে অল্পতেই তা ঠিক করতে পারবেন। কিন্তু ব্রণ বেশি হলে তা ঠিক করতে সময় লাগবে, কষ্ট হবে। আর আমি বলি যে, প্রতিদিন মেকআপের দরকার নেই, কমপ্যাক্ট পাউডারই যথেষ্ট। ফাউন্ডেশনের দরকার নেই। হেয়ার আর স্কিন নিয়ে বেশি এক্সপেরিমেন্ট করা উচিত না। এ দুটি খুব সেনসেটিভ। চুল ও ত্বক নিয়ে কিছু করতে গেলে এক্সপার্টের কাছ থেকে সাহায্য নেয়াই ভালো। আমার পরামর্শ, ন্যাচারালি তুমি ভালো থাকো, নিজের যত্ন নাও। কেমিক্যাল অ্যাপ্লাই করো না। তখনই করো, যখন যিনি অ্যাপ্লাই করছেন তার ওই কেমিক্যাল সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা আছে।
    ক্যানভাস: আগামী দিনের জন্য কী পরিকল্পনা?
    বাপনা: মেকআপ নিয়েই মরতে চাই (হা হা হা)। এখনো শিখছি, এখনো জানছি অনেক। শুধু আমার একটাই চিন্তা, আমাদের ছেলেদের মেকআপ অ্যাসোসিয়েশন নেই। এটা করা খুব প্রয়োজন। ইচ্ছা আছে ছেলে মেকআপ আর্টিস্টদের জন্য একটা অ্যাসোসিয়েশন করার।
    ক্যানভাস: ধন্যবাদ আপনাকে।
    বাপন: ক্যানভাস পাঠকদের অনেক ধন্যবাদ।

    ছবি: আলী ইমাদ সরকার


    Subscribe & Follow

    JOIN THE FAMILY!

    Subscribe and get the latest about us
    TRAVELS
    LIFESTYLE
    RECENT POST
    বোটক্সের বদলে
    19 January, 2018 7:04 pm
    আলোকচিত্র
    19 January, 2018 6:57 pm
    BANNER SPOT
    200*200
    SOLO PINE @ INSTRAGRAM
    FIND US ON FACEBOOK