মনোযতন I অশুভের আশঙ্কা
চারদিকে দুঃসংবাদ! সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বাস্তব জীবন—কোথাও মুক্তি নেই। অন্যের বিপদে সহানুভূতির পাশাপাশি ভয়ও কাজ করে মনে—না জানি কখন নিজের সঙ্গেও ঘটে! অশুভের এই আশঙ্কায় তটস্থ মন। অজানা আর অনাহূত বিপদের ভয়ে ভীত মনের পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছেন আবৃতি আহমেদ
বিপদ বলে-কয়ে আসে না। অকস্মাৎ কালো মেঘে ঢেকে যাওয়া আকাশের মতোই। সহানুভূতিশীল মানুষ অন্যের বিপদে কষ্ট পান। প্রার্থনা করেন। কেউ আবার দুশ্চিন্তায় পড়েন। নিজের সঙ্গেও এমনটা হতে পারে ভেবে পান ভয়। তখন নিজেই নিজের মনের জন্য হুমকি হয়ে ওঠেন। বিপদ আসার আগেই শঙ্কা জমতে জমতে বিষিয়ে ওঠে মন; বাস্তবতা বাদ দিয়ে বুঁদ হন অবাস্তবের তাড়নায়। সারাক্ষণ এই অশুভের আশঙ্কা, ধীরে ধীরে রূপ নিতে পারে জটিল সব মনের অসুখে।
ফিলিং অব ইমপেন্ডিং ডুম
বিপদ আসার আগেই বিপদের এই শঙ্কাকে বলে ‘দ্য ফিলিং অব ইমপেন্ডিং ডুম’। সরল বাংলায়, সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কা। ভীষণ নেতিবাচক এক মানসিক পরিস্থিতি। বিপদের কোনো আভাস নেই; অথচ সব সময় মনে হতে থাকে খুব খারাপ কিছু ঘটবে। মনে হয় যেকোনো মুহূর্তে হুমকির মুখে পড়বে জীবন, প্রিয়জনের সঙ্গে খারাপ কিছু হবে, নয়তো মর্মান্তিক কিছু ঘটবে। এটি একই সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক অভিজ্ঞতা। কারণ, মনের এই অবস্থার লক্ষণ ফুটে ওঠে শরীরে, যা কোনো রকম পূর্বাভাস ছাড়াই দেখা দিতে পারে। এর লক্ষণের মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড ভয় বা আতঙ্ক অনুভব, হাত-পা বা সারা শরীরে কাঁপুনি, হঠাৎ বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভূত হওয়া, মনোযোগে অসুবিধা, হালকা থেকে মাঝারি শ্বাসকষ্ট, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, বিনা কারণে ঘামতে থাকা, উচ্চ রক্তচাপ, মাথা ঘোরা বা ফাঁকা ফাঁকা লাগা ইত্যাদি। এমন দুশ্চিন্তা মানসিক চাপ বাড়ায়, স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়। বিপদ আসার আগেই শরীরকে বিপদের অনুভূতি দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতও করে।
কেন এমন হয়
হঠাৎ হঠাৎ সবারই ভয় হয়। জীবন খুব একটা ভালো না চললে যেমন, তেমনি এর বিপরীত সময়েও মনের কোণে উঁকি দিতে পারে অশুভের আশঙ্কা। সাধারণত, অন্যের বিপদ দেখে নিজের সঙ্গেও তা ঘটার ভয় থেকে জন্ম নেয় এ ধরনের অনুভূতি। দায়ী হতে পারে অতীতের কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা। শারীরিক কোনো অসুখ বা দুর্বলতার কারণেও আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা উঁকি দিতে পারে মনে। যেমন শরীরে ছোট্ট কোনো দাগ দেখে ক্যানসারের ভয় কাবু করে ফেলে অনেককে। কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা গুরুতর মানসিক রোগও কলকাঠি নাড়াতে পারে এমন অনুভূতিতে।
মানসিক কারণ
ছয় মাস বা তার বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিদিনই উৎকণ্ঠা অনুভব করলে এই অবস্থাকে বলা হয় জেনারেলাইজড অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার (জিএডি)। প্যানিক ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি না চাইতেও দুশ্চিন্তা করেন। তীব্র ভয়ে প্যানিক অ্যাটাক করেন কেউ কেউ। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) এবং কম্পালসিভ ডিজঅর্ডারের (ওসিডি) মতো মানসিক রোগের কারণেও তীব্র ভয় হতে পারে, যার সঙ্গে প্রায়শই আসন্ন বিপদের অনুভূতি মিশে থাকে। বাইপোলার বা অন্যান্য মুড ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি তীব্র ভয় বা ভ্রান্ত বিশ্বাসের সম্মুখীন হতে পারেন। অনেক দিন ধরে জমতে থাকা মানসিক চাপ থেকেও এমনটা হওয়ার শঙ্কা থাকে।
শারীরিক কারণ
কিছু ক্ষেত্রে মনের এই অবস্থার পেছনে দায়ী থাকে শারীরিক নানা জটিলতা। যেমন হার্ট অ্যাটাক হলে বুকে ব্যথা ও বমি বমি ভাব হয়। ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে হাত বা চোয়ালে। এ সময় তীব্র ভয় অনুভূত হতে পারে। অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশনের কারণে শ্বাসকষ্ট, নিম্ন বা উচ্চ রক্তচাপ, ত্বকের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে তীব্র আতঙ্কের অনুভূতি হতে পারে। ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধার কারণে পালমোনারি এম্বোলিজম (পিই) হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে বুকের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, রক্ত কাশির সঙ্গে হতে পারে তীব্র ভয়। বিভিন্ন স্নায়বিক ও হরমোনজনিত সমস্যার কারণে আবেগে ঘটা সম্ভব পরিবর্তন, যার মধ্যে স্পষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই ভয় বা আতঙ্ক অনুভব অন্তর্ভুক্ত।
পরিস্থিতি প্রতিরোধ
কাজ হতে পারে থেরাপিতে। পরিবর্তন করা সম্ভব জীবনযাপনের ধরন ও খাদ্যাভ্যাস; যেমন ক্যাফেইন সীমিত করা। নিয়মিত ব্যায়াম স্ট্রেস হরমোন কমাতে সহায়ক। পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। এতে উদ্বেগ এমনিতেই কমে আসে। এ ছাড়া সাহায্য করতে পারে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, ইয়োগা, গ্রাউন্ডিং কৌশল, জার্নালিং এবং দলগত বৈঠক সেশন। হঠাৎ অনুভূত হওয়া তীব্র ভয় সামলে নেওয়া যেতে পারে শ্বাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। টানা ৪ সেকেন্ড শ্বাস নিয়ে, তা ৪ সেকেন্ড ধরে রেখে এবং ৬ সেকেন্ড ধরে ছাড়লে মন শান্ত হতে পারে। ভয়ও অনেকটা কমার সম্ভাবনা থাকে।
মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কাউন্সেলর (লাইফস্প্রিং) জিনাত আলফাজ জানান, আমাদের মস্তিষ্ক অনেক সময় বেশি চিন্তা করতে করতে সবচেয়ে খারাপটাই কল্পনা করে ফেলে। তার ওপর সোশ্যাল মিডিয়া তো আছেই। সেখানে বারবার খারাপ খবর দেখেও ভয় বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকা মঙ্গল। খারাপ খবর দেখে খুব বেশি ভয় হলে টেলিভিশন দেখা বা খবরের কাগজ পড়া থেকেও বিরত থাকা যেতে পারে। স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য একটি নির্ধারিত রুটিন মেনে চলা শ্রেয়। নিজের মনকে বারবার বোঝানো দরকার, সব আশঙ্কাই সত্যি হয় না। খুব ভয় করলে পরিবার বা কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বললে হালকা লাগতে পারে। কারণ, মুখে ভয় প্রকাশ করলে তার তীব্রতা কমে যেতে পারে। আর স্বাভাবিক জীবন, ঘুম বা কাজকর্ম ব্যাহত হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ছবি: ইন্টারনেট
