skip to Main Content

এডিটর’স কলাম I বরিষণ ভেতর ও বাহিরে

যে মানুষ নিজেকে ধুয়ে মুছে নতুন করে দেখতে শেখে, জীবনের প্রতিটি ঋতুকেই সে ভিন্ন আলোয় অনুভব করতে পারে। বর্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোমল হওয়া দুর্বলতা নয়; বরং গভীর শক্তির আরেক রূপ

আষাঢ়-শ্রাবণ, ঝুমুর তালে আকাশ দোলে। রিনি রিনি ছন্দে টলটলে পুকুরের জলে, কচি সবুজ পাতার কোলে, স্যাঁতসেঁতে মাটিতে গজিয়ে ওঠা ব্যাঙের ছাতায়, গাছের ডালে বসে থাকা ফিঙ্গের ওপর বর্ষা নাচে। নাচে ময়ূর, গায় কেকা; নতুন পাতায় ছেয়ে যায় আমের ডাল। সে এক অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য, অন্তর্লীন সুরের বিস্তার। মেঘের ঘনঘটা, দূরের বাঁশবনের দুলে ওঠা, ভেজা মাটির ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে বর্ষা মানুষের মাঝে সুপ্ত কোমলতা জাগিয়ে তোলে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস কিংবা সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’র বর্ষা স্মরণে আনে, দুর্গার মুখে বৃষ্টির ছটা। তুমুল বৃষ্টিতে দিদিকে ঘুরতে দেখে অপুর সেকি আনন্দ! এই নির্মলতাক, মলিন মর্ম মুছিয়ে অন্তরকে সবুজ করে তুলবার এই মোহনীয় স্নিগ্ধতাকে, সঙ্গে আনে বর্ষা।

দুই
জীবনের বাঁকে মনের আকাশে ঘনীভূত হয় মেঘ। অভিমান, ক্ষোভ, ক্লান্তি আর অপ্রাপ্তি গড়ে তোলে পাহাড়; বদলে যায় দৃষ্টি। অভিমান মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি। প্রিয়জনের অবহেলা, ভেঙে যাওয়া কোনো প্রত্যাশা কিংবা নিজের প্রতি অসন্তুষ্টি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয় মানুষ। সহজ সৌন্দর্য অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে অজান্তেই। শক্ত থাকার অভিনয়ে নিজস্ব অনুভূতিগুলোকে অস্বীকার করে একসময়। অথচ সব ব্যর্থতা নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ নয়। কিংবা সম্পর্ক হারানো মানেই নয় জীবনের সমাপ্তি। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে শেখাতে, কিছু স্মৃতির প্রবাহ ঘটে বেড়ে ওঠায় সাহায্য করতে। নিজেকে প্রমাণের অবিরাম চাপ থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ যখন নিজ সত্তাকে গ্রহণ করতে শেখে, জীবনের তিক্ততাগুলোও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। অন্তরের সৌন্দর্য তখন বাহ্যিক সাফল্যের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
তিন
বর্ষা ও অন্তরের যোগসূত্রে কাব্যিক ও আক্ষরিক সমঝোতা স্পষ্ট। বর্ষায় প্রকৃতির উচ্ছ্বাস, সবুজের শ্যামলিমা, বাতাসের কোমল সুর মানুষের মনে নবজাগরণ আনে। চারপাশ যেমন ধুলোমুক্ত হয়ে ওঠে, তেমনি ভেতরের মরূদ্যানও ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পেতে থাকে। বর্ষা মানুষকে কোমল হতে শেখায়; অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার দেয় পাঠ। এই ঋতুর গভীরতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রশান্তি আদতে বাইরে থেকে আসে না; জন্ম নেয় নিজের ভেতরে।

চার
অন্তরের দ্যুতি যদি নিজের মাঝেই সুপ্ত থাকে, তবে তা পূর্ণতা পায় না। মানুষের ভেতরের আলো ছড়িয়ে পড়ে তার আচরণ, ভাষা ও দৃষ্টিতে। একটি শান্ত মন অন্যের অস্থিরতাকেও কোমল করতে পারে। একটি সহানুভূতিশীল বাক্য, নম্র আচরণ কিংবা নিঃশব্দ উপস্থিতিও কারও সংকট বা সংগ্রামকে সহজ করতে সক্ষম। ভেতরের প্রশান্তি একজন মানুষের চারপাশে মায়ার আবহ তৈরি করে। সে তখন অন্যের জন্যও আশ্রয় হয়ে ওঠে। এই নমনীয়তা ও স্নিগ্ধতা সমাজকে মানবিক, সম্পর্কগুলোকে উষ্ণ এবং জীবনের কঠোরতাকে কিছুটা হলেও সহনীয় করে তোলে।

পাঁচ
যে মানুষ নিজেকে ধুয়ে মুছে নতুন করে দেখতে শেখে, জীবনের প্রতিটি ঋতুকেই সে ভিন্ন আলোয় অনুভব করতে পারে। বর্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোমল হওয়া দুর্বলতা নয়; বরং গভীর শক্তির আরেক রূপ। জীবনের কোলাহলের মাঝেও যে মানুষ নিজের ভেতরে প্রশান্তির জায়গা তৈরি করতে পারে, সে-ই সত্যিকারের পরিপূর্ণ। মন যখন প্রকৃতির মতোই গ্রহণ ও বর্জন করতে শেখে, তখন সেই সৌন্দর্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাঁচার দীক্ষা পায় জীবন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top