ফিচার I ফুটবল গ্লাম
বিশ্বকাপের মেকআপ উন্মাদনা বৈশ্বিক কসমেটিক ব্যবসার রূপরেখা অনেকটাই বদলে দেয়। এবারও যে ব্যতিক্রম হবে না, ঠাওর করা যাচ্ছে বেশ
স্টেডিয়ামের গর্জন, পতাকার রং আর কোটি মানুষের আবেগ; ফিফা বিশ্বকাপ এখন শুধু ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়; বৈশ্বিক সংস্কৃতি আর যাপিত জীবনেরও বিশাল উৎসব। মাঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ফ্যাশন, গ্রুমিং ও মেকআপ ট্রেন্ডে। সমর্থনের ভাষা হয়ে ওঠে নিয়ন আইশ্যাডো, ফেস-পেইন্ট, গ্লিটার আর টিম-কালারের বিউটি লুক। ফলে বিশ্বকাপ ঘিরে কসমেটিক ইন্ডাস্ট্রি পায় নতুন গতি; বদলে যায় ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইন, পণ্যের ধরন আর বাজার। ফুটবল ও বিউটির এই ঐকতান আজ গ্লোবাল বিউটি বিজনেসের এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
এই ক্রীড়া উৎসব ঘিরে বিউটি ইন্ডাস্ট্রিতে মূলত চারটি বড় পরিবর্তনের দেখা মেলে। বিশ্বকাপ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে হাই পিগমেন্ট আইশ্যাডো প্যালেট এবং নিয়ন রঙের কসমেটিকস বিক্রি বেড়ে যায় বহুগুণ। স্টেডিয়ামের গরম, উত্তেজনা আর কান্নায় যেন মেকআপ নষ্ট না হয়, সে জন্য লং ওয়্যার ফাউন্ডেশন, ওয়াটারপ্রুফ লাইনার এবং সেটিং স্প্রের চাহিদা হু হু করে বাড়ে।
বড় বড় কসমেটিক ব্র্যান্ড এখন আর শুধু ফ্যাশন উইকে সীমাবদ্ধ নেই; ফিফা বিশ্বকাপে যুক্ত হচ্ছে সরাসরি। চলতি বছরের প্রতিযোগিতায় বিখ্যাত স্কিন কেয়ার ব্র্যান্ড পাওলা’স চয়েস অফিশিয়াল স্পন্সর হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ইউনিলিভার তাদের ডাভের মেন কেয়ার ব্র্যান্ডের মাধ্যমে ‘খেলার মতো ত্বকেরও যত্ন নিন’ ক্যাম্পেইনের সূচনা ঘটিয়েছে, যা ম্যাচ শেষে মুখের ভারী ফ্যান-পেইন্ট ধুয়ে ফেলার জন্য বিশেষ স্কিন কেয়ার সামগ্রী বাজারজাত করছে। আগে কসমেটিক ব্র্যান্ডগুলো শুধু হলিউড অভিনেত্রী বা সুপার মডেলদের মডেল বানাত। এখন আলিশা লেম্যানের মতো তারকা নারী ফুটবলাররা মাঠে ফুল-গ্ল্যাম মেকআপ নিয়ে খেলে বিশ্ব জয় করছেন। ফলে বিউটি ব্র্যান্ডগুলো অ্যাম্বাসেডর হিসেবে স্পোর্টস আইকনদের বেছে নিচ্ছে, যা তরুণ প্রজন্মের কাছে শক্তির পাশাপাশি সৌন্দর্যের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করছে।
বিশ্বকাপের অনিশ্চয়তা ব্র্যান্ডগুলোকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। যদি কোনো ফুটবল আন্ডারডগ অপ্রত্যাশিতভাবে কোয়ার্টার ফাইনালে চলে যায়, তখন কসমেটিক ব্র্যান্ডগুলোকে রাতারাতি সেই দেশের পতাকার রঙের পণ্য, নেইল র্যাপ বা মেকআপ কিট বাজারে আনতে হয়। যেসব ব্র্যান্ড যত দ্রুত এই ট্রেন্ড ধরতে পারে, বিশ্বকাপে তাদের ব্যবসা তত লাভের মুখ দেখে।
এই প্রতিযোগিতা ঘিরে সরাসরি বিউটি রেভিনিউর হিসাব খুব কম প্রকাশিত হলেও এটি কসমেটিক বাজারের নির্দিষ্ট কিছু খাতকে ব্যাপকভাবে চাঙা করে তোলে। মূলত তিনটি বড় পথে বিউটি ইন্ডাস্ট্রির বিক্রি বাড়াতে ভূমিকা রাখে বিশ্বকাপ।
ফ্যান মার্চেন্ডাইজিং ও ফেস পেইন্ট কালচার
চলতি বিশ্বকাপে প্রায় সাড়ে ৬ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীর উপস্থিতি প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ফলে দলভিত্তিক রঙের ফেস পেইন্ট, টেম্পরারি হেয়ার কালার, বডি গ্লিটার ও থিমেটিক নেইল আর্টের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কেননা, ফুটবলের ভক্তরা নিজেদের সমর্থন প্রকাশ করতে সৌন্দর্যচর্চাকেও উৎসবের অংশে পরিণত করেন।
অ্যাথলেটিক ও হাই পারফরম্যান্স স্কিন কেয়ার
বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্ট অ্যাথলেজার বিউটি ধারণাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। দীর্ঘ সময় স্টেডিয়ামে থাকা দর্শকদের জন্য সোয়েট প্রুফ মেকআপ, লং ওয়্যার ফাউন্ডেশন এবং উচ্চ এসপিএফ-সমৃদ্ধ সানস্ক্রিনের বাজার দ্রুত বিস্তৃত হয়। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার খোলা স্টেডিয়ামগুলোর আবহাওয়া মাথায় রেখে ব্র্যান্ডগুলো এসব পণ্যের প্রচারণা জোরদার করছে।
ট্রাভেল সাইজ পারসোনাল কেয়ার পণ্যের উত্থান
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি হোস্ট সিটির মধ্যে লাখো দর্শনার্থীর আসা-যাওয়ার কারণে বিমানবন্দর ডিউটি ফ্রি শপ, হোটেল এবং ট্রাভেল রিটেইলে স্কিন কেয়ার মিনিস, গ্রুমিং কিট ও লাক্সারি বিউটি আইটেমের বিক্রি বেড়ে যায়। ফলে বৈশ্বিক বিউটি ও পারসোনাল কেয়ার সাপ্লাই চেইনকে সক্রিয় করে তোলে এই ক্রীড়া প্রতিযোগিতা।
ফুটবল বিশ্বকাপ এখন শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়; বিশ্বজুড়ে ক্রীড়াপ্রেমীদের আত্মপ্রকাশ ও সৃজনশীলতার এক মহোৎসবও। এই আনন্দের হাওয়া গ্লোবাল বিউটি ইন্ডাস্ট্রিকে আরও বৈচিত্র্যময় ও লাভজনক করে তুলতে ভূমিকা রাখে। ফুটবল আর বিউটির এই সংযোগ দেখিয়ে দেয়, আধুনিক বিশ্বে খেলা আর সুন্দরতা আলাদা জগৎ নয়; এরা একে অপরের পরিপূরক। বিশ্বকাপ যত এগোয়, ততই বদলে যায় সৌন্দর্যের ভাষা, রঙের ব্যবহার এবং আত্মপ্রকাশের ধরন। মাঠের খেলা তাই গ্যালারি ছাপিয়ে, ছড়িয়ে পড়ে মেকআপ কিট, ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইন আর ডিজিটাল ট্রেন্ডে। শেষ পর্যন্ত, ফিফা টাইম মেকআপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বকাপ ফুটবল এক সর্বজনীন উৎসব।
বিউটি ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট
