দৃশ্যভাষ্য I রিভেঞ্জ ড্রেস অ্যান্ড লেডি ডি
ফ্যাশন ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল স্টেটমেন্ট হিসেবে গণ্য। কেননা কোনো সাক্ষাৎকার, বিবৃতি কিংবা প্রতিক্রিয়া ছাড়াই একটি ছবির মাধ্যমে প্রিন্সেস ডায়ানা পুরো পৃথিবীকে তার অবস্থান বুঝিয়ে দিয়েছিলেন
২৯ জুন ১৯৯৪। তৎকালীন ব্রিটিশ রাজপুত্র (বর্তমানে রাজা) চার্লস ও রাজকুমারী ডায়ানায় দাম্পত্যে ভাঙনের সুর বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম। সেদিন রাতে ব্রিটিশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হচ্ছিল প্রিন্সের বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকার ‘চার্লস: দ্য প্রাইভেট ম্যান, দ্য পাবলিক রোল’। সেখানে তিনি ক্যামিলা পার্কার বোলসের সঙ্গে গোপন সম্পর্কের কথা প্রথম প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। পুরো ব্রিটেন অপেক্ষা করছিল রাজপরিবারের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। সেই রাতেই ভ্যানিটি ফেয়ারের অ্যানুয়াল ফান্ড রাইজিং প্রোগ্রামে অংশ নেন প্রিন্সেস ডায়ানা স্পেন্সার। লন্ডনের কেনসিংটন গার্ডেনের সার্পেন্টাইন গ্যালারির সামনে গাড়ি থেকে নেমে এসে তিনি পুরো ইতিহাস বদলে দেন। তার পরনে ছিল অফ শোল্ডার, ফিগার-হাগিং, কালো সিল্কের একটি ককটেল ড্রেস। তারপর শুধু একটি ছবি! সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে সব পত্রিকার প্রথম পাতায় ডায়ানাকে দেখে হতভম্ব হয়ে পড়ে বিশ্ব।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে বলে। নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে নামছেন লেডি ডি। দৃপ্ত পদচারণ আর ভঙ্গিমায় সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাস। হাসছেন তিনি। তবে কিছু একটা বদলে গেছে, যা ধরা পড়ল আলোকচিত্রীর ক্যামেরায়। নিজেকে যেন আগাগোড়াই বদলে ফেলেছেন রাজকুমারী। পুরোনো কোমলতার খোলস খসে গেছে। ঠিক যেমন গুটিপোকা নিজের খোলস ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে প্রজাপতি। ডায়ানা যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন নতুনভাবে। গ্রিক-ব্রিটিশ ডিজাইনার ক্রিস্টিনা স্ট্যাম্বোলিয়ানের গাউনে তাকে দেখাচ্ছিল প্রজাপতির মতোই। কালো সিল্কের অ্যাসিমেট্রিক্যাল হেমলাইন, বডি-স্কিমিং কাট, ড্রেপড শিফন ট্রেইল এবং ব্ল্যাক সি-থ্রু টাইটস—সব মিলিয়ে এটি ছিল সেই সময়ের রাজকীয় পোশাকধারার সম্পূর্ণ বিপরীত। একরাতেই পোশাকটি পরিচিতি পায় ‘দ্য রিভেঞ্জ ড্রেস’ নামে। গোধূলির আলোয় তৈরি হয় অসাধারণ এক মুহূর্ত। রাজকীয়তার বেড়াজাল ভেঙে বেরিয়ে আসার প্রতীক হয়ে ওঠে ডায়ানার সেই ছবি।
ছবিটির ফটোগ্রাফার টিম গ্রাহামের মতে, গাড়ি থেকে প্রিন্সেসের নামার পুরো মুহূর্ত ছিল মাত্র ৩০ সেকেন্ডের। কিন্তু সেই স্বল্প সময়ে যেন মিডিয়া ন্যারেটিভ পুরো উল্টে যায়। পরদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় চার্লসের সাক্ষাৎকারকে ছাপিয়ে গিয়েছিল এই ছবি। ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড দ্য সান শিরোনাম করেছিল, ‘ক্যামিলার কাছে যাওয়ার জন্য যে ঝড় তিনি (চার্লস) পেছনে ফেলে গেলেন’। ব্রিটিশ ভোগ ও ট্যাটলারের ফিচার অনুযায়ী, ফটোগ্রাফারের ধারণা ছিল, প্রিন্সেস জানতেন সেদিন শত শত ক্যামেরা তার অপেক্ষায় থাকবে এবং তিনি ঠিক কী বার্তা দিতে চান, সেটিও স্পষ্টভাবে বুঝেছিলেন। টিম ছিলেন ব্রিটিশ রয়্যাল ফটোগ্রাফার। আশি থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত নিয়মিতই প্রিন্সেসের বিভিন্ন মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করেছেন। বিশেষ করে রাজবধূর জনসমক্ষে উপস্থিতি, মানবিক কাজ, বিদেশ সফর এবং ব্যক্তিগত অভিব্যক্তিকে খুব কাছ থেকে নথিভুক্ত করার জন্য তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তার তোলা ছবিগুলোর বড় অংশ আজও গেটি ইমেজের টিম গ্রাহাম ফটো লাইব্রেরি আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রিন্সেসের সঙ্গে এই আলোকচিত্রীর পরিচয় তৈরি হয় রয়্যাল প্রেস কভারেজের মাধ্যমে। ডায়ানার জীবন তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং ক্যামেরাবন্দি করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন চ্যারিটি ভিজিট, অস্ট্রেলিয়া ট্যুর, উইলিয়াম ও হ্যারির সঙ্গে পারিবারিক মুহূর্ত এবং ডায়ানার ফ্যাশন বিবর্তনের বহু বিখ্যাত ছবি। ব্রিটিশ ও আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনে লেডি ডির যেসব ছবি সবচেয়ে বেশি পুনর্মুদ্রিত হয়েছে, তার অনেকগুলোই টিম গ্রাহামের তোলা। তবে দ্য রিভেঞ্জ ড্রেসের রাত তার ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত। এই ছবি তাকে ফ্যাশন ও পপ-সংস্কৃতির ইতিহাসে স্থায়ীভাবে স্মরণীয় করে তুলেছে।
১৯৯৪ সালের সেই সন্ধ্যায় লেডি ডির আসলে ভ্যালেন্তিনো গারাভানির ডিজাইনের একটি গাউন পরার কথা ছিল। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর আগেই সংবাদমাধ্যমে সেই খবর ফাঁস হয়ে যায়। ডায়ানা বিরক্ত হয়ে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলান। বেছে নেন বহুদিন ধরে আলমারিতে পরে থাকা কালো স্ট্যাম্বোলিয়ান ড্রেসটি। সঙ্গে ছিল মুক্তার চোকার নেকলেস, কালো পাম্প হিল, স্কারলেট লিপস্টিক এবং আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি। ডায়ানার সাবেক স্টাইলিস্ট আনা হার্ভে পরে বলেছিলেন, নিজেকে অমূল্য রূপে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন প্রিন্সেস। তাতে যে পুরোদস্তুর সফল হয়েছেন, বলা বাহুল্য। সেদিনের ঘটনাকে শুধু একটি ফ্যাশন মোমেন্ট বললে ভুল হবে, এটি ছিল দৃশ্যমান প্রতিবাদ। ব্রিটিশ রাজপরিবারে কালো রং সাধারণত ব্যবহৃত হতো শোকের প্রতীক হিসেবে। অথচ ডায়ানা সেই রংকেই নতুন আত্মপরিচয়ের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণে বলা হয়, এই পোশাক ছিল একটি দাম্পত্যজীবনের মৃত্যু এবং একজন স্বাধীন নারীর পুনর্জন্মের প্রতীক।
সেদিন জেনে-বুঝে এভাবে ক্যামেরায় ধরা দিয়েছিলেন ডায়ানা। সাংবাদিক, ফটোসাংবাদিক ও ফ্যাশন বিশ্লেষকদের মতে, ওই সন্ধ্যাকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন পোশাকের মাধ্যমে আত্মমর্যাদা পুনর্দখলের জন্য। ছবির মাধ্যমেই স্পষ্ট বার্তা তুলে ধরেছিলেন তিনি; খরচ করেননি একটি বাক্যও। বছরের পর বছর রাজকীয় শিষ্টাচার, সংযম এবং ‘শাই লেডি ডি’ ইমেজে আবদ্ধ থাকা ডায়ানা সেদিন নিজেকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। ফ্যাশন বিশ্লেষক এলিজাবেথ হোমসের মতে, প্রিন্সেস জানতেন কীভাবে একটি শো-স্টপিং পোশাক মিডিয়ার ভাষা বদলে দিতে পারে। এই ড্রেসের প্রভাব দ্রুতই ফ্যাশনের সীমানা ছাড়িয়ে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। দ্য রিভেঞ্জ ড্রেস শব্দবন্ধ পরবর্তীকালে এক নতুন ফ্যাশন টার্মে পরিণত হয়। অনুপ্রেরণা জোগায় বহু নারীকে। সম্পর্কে বিচ্ছেদ, অপমান বা ব্যক্তিগত সংকটের পর আত্মবিশ্বাসী, শক্তিশালী ও গ্ল্যামারাস রূপে নিজেদের প্রকাশের জন্য এই স্টাইল স্টেটমেন্ট বেছে নিতে শুরু করেন তারা। হারপার’স বাজারের দাবি, পরবর্তী দশকগুলোতে জেনিফার অ্যানিস্টন, মারিয়া ক্যারি, রিয়ানা কিংবা জেনিফার লোপেজের মতো অনেক আলোচিত তারকাই নিজেদের বিচ্ছেদের পর দ্য রিভেঞ্জ ড্রেসিংয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।
ডায়ানার মৃত্যুর বহু বছর পরও পোশাকটি তার সাংস্কৃতিক শক্তি ধরে রেখেছে। ১৯৯৭ সালে এটি নিলামে বিক্রি হয় শিশুদের চ্যারিটির জন্য অর্থ সংগ্রহে। পরে আয়ারল্যান্ডের মিউজিয়াম অব স্টাইল আইকনসে প্রদর্শিত হয় ‘ডায়ানা: আ ফ্যাশন লিগ্যাসি’ প্রদর্শনীতে। গেল বছর প্যারিসের মিউজিয়াম, মুজে গ্রেভাঁতে ডায়ানার মোমের ভাস্কর্যেও এই পোশাকের ব্যবহার দেখা গেছে।
প্রথম প্রকাশের সময় থেকে এখনো এই ছবির কপিরাইট সংরক্ষিত আছে ফটোগ্রাফার টিম গ্রাহামের কাছেই। লক্ষাধিকবার গেটি ইমেজ থেকে ছবিটি ডাউনলোড করেছেন ডায়ানা-ভক্ত ও ফ্যাশনপ্রেমীরা এবং ফ্যাশন ফটোগ্রাফিতে এটি একটি কালচারাল ব্লু প্রিন্ট হিসেবে মর্যাদা পাচ্ছে।
লাইফস্টাইল ডেস্ক
