মনোযতন I ভক্তের ভক্তি বিড়ম্বনা
একদিকে প্রিয় দল ও খেলোয়াড়ের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের প্রতি কখনো ঘৃণা, নয়তো তীব্র বিরক্তি। বিশ্বকাপ এলেই ফ্যানদের এমন ভক্তি বিড়ম্বনার পেছনের মনস্তত্ত্ব খুঁজেছেন আবৃতি আহমেদ
আর্জেন্টিনা বনাম আলজেরিয়ার ম্যাচ। প্রজেক্টর-চালিত বড় পর্দার সামনে ব্যাপক জনসমাগম। জার্সি আর পতাকার জোয়ার। আর্জেন্টিনার সমর্থকই বেশি। সীমাহীন উল্লাসে ফেটে পড়ছেন তারা। ওদিকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের খেলা দেখতে এসেছেন ব্রাজিল-সমর্থকেরা। সমর্থন জানাচ্ছেন আলজেরিয়াকে। বিতর্কে মেতেছেন আর্জেন্টিনা-ভক্তদের সঙ্গে। প্রথমে হাস্যরস, তারপর কথা-কাটাকাটি। একপর্যায়ে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনা-ভক্তরা। প্রথমে বোতল, তারপর ইট-পাথর ছুড়ে দেন ব্রাজিল-ভক্তদের দিকে। ঘটনাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, প্রাণ বাঁচাতে ছুটছেন ব্রাজিল-ভক্তরা। দেখে কেউ হাসছেন, কেউবা জানাচ্ছেন নিন্দা। আরেকটি ভাইরাল ভিডিওতে এক আর্জেন্টিনা-ভক্তকে তুলে নিয়ে পানিতে ফেলে দিতে দেখা গেছে ব্রাজিল-ভক্তদের। বিশ্বকাপ মৌসুমজুড়ে ঘটতে থাকে এ ধরনের ঘটনা। চার বছর আগেও, এখনো। দিশা হারায় ভক্তের ভক্তি। অন্যকে আক্রমণ করা ছাড়াও খেলা দেখতে বসে উৎকণ্ঠায় ভোগা, মানসিকভাবে ভেঙে পড়া, এমনকি হিতাহিত বোধ হারিয়ে ফেলার ঘটনাও ঘটে অনেক সময়।
মানব মনস্তত্ত্বের গভীরে নিহিত এই আচরণের সূত্র নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি প্রদেশের মাররে স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডা. ড্যানিয়েল ওয়ান। তিনি ভক্তদের আগ্রাসন, মানসিক সুস্থতা, দলের দুর্বল পারফরম্যান্সের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল, আচরণগত আনুগত্য, কুসংস্কার বা অলৌকিকে বিশ্বাসজনিত ভক্তি নিয়ে বোঝাপড়া করছেন। এ বিষয়ে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে খেলা ও খেলোয়াড় ঘিরে ভক্তের ভক্তি নিয়ে ষোলোটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তিনি। ওয়ানের মতে, এই আচরণ মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মানুষ শুধু বিনোদনের জন্য কোনো দলের সমর্থক হয় না; বরং একটি দলকে সমর্থন করা তার গুরুত্বপূর্ণ মানসিক চাহিদা। রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি কারণ।
অন্তর্ভুক্তি ও বৈপরীত্য
মানুষ যে সত্যিই সামাজিক জীব, তা-ই যেন প্রমাণ করে বিশ্বকাপের এই দলভক্তি। কেউ কেউ শত শত্রুতাও ভুলে যান, যদি শত্রু হন তার প্রিয় দলের সমর্থক। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেলা দেখেন দুজনে। আবার বন্ধু যদি হন প্রতিপক্ষের সমর্থক, তাহলে বন্ধুকেও শত্রু মনে করেন। চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এলে এভাবেই হাওয়ায় ভাসে অন্তর্ভুক্তির আনন্দ। কোনো একটি দলের সমর্থন, অনেক সতীর্থ জোগায়। গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। একাকিত্ব কমে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হ্রাস পায়। নিজেকে কোনো একটি গোষ্ঠীর লোক গণ্য করেন। এই অনুভূতি স্বস্তি দেয়। অন্য দলের ভক্তদের প্রতি একধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়। এই অনুভূতি নেতিবাচক হলেও আনন্দ দেয়। কারণ, বিভাজন না থাকলে ঐক্যের অনুভূতি চূড়ান্ত হয় না।
স্বাতন্ত্র্য তত্ত্ব
কোনো একটি গোষ্ঠীর অংশ হতে চাওয়ার পাশাপাশি নিজেকেও আলাদাভাবে জাহির করতে চায় মানুষ। অনেকে নিজের অনুভূতির প্রতি সমর্থন পাওয়ার এই মানসিক চাহিদা থেকেও একটি নির্দিষ্ট দল বা খেলোয়াড়ের সমর্থন করেন এবং সেটিকে বা সেই ব্যক্তিকে সর্বোত্তম প্রমাণের প্রয়াস চালান। আর্জেন্টিনা নাকি ব্রাজিল, মেসি নাকি রোনালদো, একে অপরের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কের জায়গা তৈরি করে নিজেদের মতামত রাখতে চান।
সাময়িক মুক্তি
বাস্তব জীবন, নানাবিধ সমস্যা এবং পারিপার্শ্বিকতার চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি দেয় ভক্তির অনুভূতি। খেলা চলাকালীন প্রিয় দল জিতবে কি না—সেই চিন্তা যেন সবকিছু ছাপিয়ে যায়। দূর হয় একঘেয়েমি। মুক্তিকামী মানুষ তাই একটি দলকে বেছে নেন এবং সমর্থন করেন। এ ছাড়া ফ্যানরা অনেক সময় খেলোয়াড়দের সঙ্গে একধরনের একতরফা মানসিক সম্পর্ক তৈরি করেন। তারা আবেগ, সময় ও মনোযোগের বিনিয়োগ ঘটান এবং বাস্তবে ব্যক্তিটি তাদের না চিনলেও এতে ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি তৈরি হয়। এটি ভালো লাগার অনুভূতিকে উদ্দীপ্ত করে এবং মনে আনন্দ দেয়।
বৈপরীত্যে জয়-পরাজয়
প্রিয় দল জিতলে নিজে জিতে যাওয়ার অনুভূতি হয়। হেরে গেলে এর উল্টো। এমনই আবহ তৈরি করে খেলা। জয়-পরাজয়ের বৈপরীত্যে একেকজন একক রকম আচরণ করেন। দল হেরে গেলে মন খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু আগ্রাসী আচরণ করে বসেন কেউ কেউ। আবার নিজের দল জিতে গেলে জয় উদ্যাপন করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে পড়েন অনেকে। মনস্তত্ত্বের ভাষায়, মানুষের আচরণ সব সময় অনিশ্চিত। ভক্তদের ভক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপারটি যেন আরও একধাপ এগিয়ে।
সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স
নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের চেষ্টা মানব মস্তিষ্কের পুরোনো তত্ত্ব, যা খেলার সময় আরও তীব্র হয়ে ধরা দেয়। নিজের প্রিয় দলকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের চেষ্টায় থাকেন অনেকে। যুক্তি-তর্ক করেন। ভক্তরা প্রায়ই নিজেদের দলের শক্তিকে অতিরঞ্জিত করেন, পক্ষপাত নেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অর্জনকে ছোট করে দেখেন। স্বাস্থ্যকর পর্যায়ে এই শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি উত্তেজনা, আনুগত্য ও প্রতিযোগিতার আনন্দ বাড়ায়; তবে এটি অতিরিক্ত মাত্রায় পৌঁছালে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের প্রতি অসম্মান, আক্রমণাত্মক আচরণ এবং ঘৃণার জন্ম দিতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কাউন্সেলর (লাইফস্প্রিং) জিনাত আলফাজ জানান, যারা খেলা দেখেন, তাদের জন্য খেলা একধরনের অনুভূতির জায়গা। নিজের পছন্দের দল যেন নিজের পরিচয়ের অংশ। মজার বিষয় হলো, বেশির ভাগ মানুষ কোনো দলকে খুব বেশি যুক্তি-বিশ্লেষণ করে সমর্থন শুরু করেন না। অনেকে বাবা-মা, বড় ভাই-বোন, পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের দেখে একটি দলের সমর্থক হন। আবার কখনো কোনো খেলোয়াড় বা দলের খেলার ধরন দেখে ভালো লেগে যায়। সেখান থেকে আবেগের সম্পর্ক তৈরি হয়। তাই সমর্থনের শুরুতে যেমন খুব বেশি যুক্তি থাকে না; তেমনি খেলা নিয়ে অতিরিক্ত আবেগের সময়ও অনেক ক্ষেত্রে যুক্তির চেয়ে অনুভূতিই বেশি কাজ করে। যখন কেউ একটি দলকে সমর্থন করেন, তখন সেই দলের জয়-পরাজয়কে নিজের মনে হয়। ফলে অন্য দলের সমালোচনা বা সাফল্যও ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে ফেলেন। এভাবেই সাধারণ খেলার আলোচনা কখনো কখনো তর্ক বা রাগে পরিণত হয়।
এই আবেগকে নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়ে জিনাত আলফাজ আরও বলেন, মনে রাখা ভালো, খেলা জীবনের অংশ; পুরো জীবন নয়। নিজের পছন্দের দল থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন অন্যের প্রতি রাগ বা ঘৃণার কারণ না হয়। খেলা নিয়ে খুব বেশি উত্তেজিত হয়ে গেলে, তখনই নিজেকে মনে করিয়ে দিন, এটি শুধুই বিনোদনের অংশ। আর আশপাশের মানুষেরাই আপনার আপনজন। তাই আবেগে ভেসে এমন কিছু বলা বা করা যাবে না, যাতে পরে নিজেরই খারাপ লাগে। যে দলের জন্য এত আবেগ, সেই দলের খেলোয়াড়েরাও খেলা শেষে একে অপরকে সম্মান করে। যেমন মেসি ও নেইমার ব্যক্তিজীবনে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই ভিন্ন মত ও দলকে সম্মান করতে পারলে ভক্তি বিড়ম্বনা অনেকটাই কেটে যাবে।
ছবি: ইন্টারনেট
