skip to Main Content

যাপনচিত্র I মিশু ম্যাজিক

কার্টুনিস্ট মোরশেদ মিশু। তরুণদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় এই শিল্পীর ব্যক্তিজীবনের খোঁজ জানা যাক

জন্ম, বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া—সব ঢাকার মিরপুরে। মেজ ভাইয়ের কাছে আঁকাআঁকির হাতেখড়ি। প্রায় ১৪ বছর আগে শুরু করেন স্যাটায়ার ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’-এর সঙ্গে কাজ করা। এখন সহকারী সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। বেশির ভাগ সময় রাত জেগে কাজ করেন। তাই ঘুম থেকে একটু দেরিতেই জাগেন। আলাদাভাবে নাশতা তেমন না করা হলেও মায়ের হাতের ঝোল ধরনের আলুভাজির সঙ্গে রুটি খেতে ভীষণ ভালোবাসেন।
ভাত খুব একটা খান না। এমনও হয়েছে, টানা তিন-চার দিন ভাত স্পর্শ করেননি। তবে ভাতের সঙ্গে গরুর মাংস, ঢ্যাঁড়স ভাজি, আলুভর্তা, ডাল হলে আলাদা কথা! ভোররাতে খিদে পেলে ফ্রিজ খুলে যা পান, খেয়ে নেন। খাওয়া নিয়ে তেমন আদিখ্যেতা নেই তার। জানালেন, তিনি খাওয়ার জন্য বাঁচেন না; বাঁচার জন্য খান। তেমন বাছবিচার নেই; যে যা খাওয়ায়, তাতেই খুশি। অবশ্য পোলাও কিংবা ভারী খাবারে তৃপ্তি পান না। মেজ ভাইয়ের হাতের আলুভর্তা তার সবচেয়ে পছন্দের রেসিপি; সঙ্গে বোনের হাতের গরুর মাংস আর মায়ের হাতের ডাল।
বিকেল কাটান নিজ এলাকাতেই। কফির চেয়ে চা বেশি পান করেন। পালা করে বন্ধুরা একেকজন বিশেষ উপলক্ষে ট্রিট দেয়। কোনো উপলক্ষ না থাকলে নিজেরাই বানিয়ে নেন কিছু একটা! একটু লেইট ডিনার করা হয়; সে ক্ষেত্রে বরাবরের মতো এড়িয়ে যান ভারী আহার।
তার পছন্দের পোশাক লুঙ্গি। বিধিনিষেধ না থাকলে উৎসবে, অনুষ্ঠানে সর্বত্র তা পরে যান। টি-শার্টের সঙ্গে লুঙ্গি—বলা চলে মোরশেদ মিশু সিগনেচার স্টাইল।
দাড়ি-গোঁফ নিয়ে শোনালেন মজার স্মৃতি। গোঁফের আকার বড় করে, ইলিউশন তৈরি করেছেন; যেন দূর থেকে তাকে ভারিক্কি দেখায়! ত্বকযত্নে খুব একটা নজর না দিলেও চুল ও দাড়ির যত্নে নিয়মিত শ্যাম্পু, কন্ডিশনার ব্যবহার করেন। মজার ছলে বললেন, ‘বউ আসার ফলে আমার বাসার বাথরুম ভর্তি ফ্রি প্রসাধনী!’
বাড়িতে সম্প্রতি যোগ হয়েছে নতুন সদস্য। বেশ কটি বিড়াল রয়েছে সদ্য বিবাহিত মিশু-শিপা দম্পতির। ঘরদোরের গোছগাছে কখনো হাত না লাগালেও বিড়ালের যত্নআত্তি, বারান্দা পরিষ্কার মিশুই করেন। ছবিতে যে টি-শার্ট পরে আছেন, এটিও মোরশেদ মিশুর প্ল্যাটফর্ম ‘এলাকা’র নকশা। দ্য ব্রেকফাস্ট ক্লাবের জন্য ডিজাইন করা। ভ্রমণেও সঙ্গে রাখেন ‘এলাকা’র পোশাক। নিজের ব্র্যান্ডকে ফ্যাশন অ্যানথুজিয়াসদের হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চান।
পাহাড় টানে মিশুকে। সেকেন্ড হোম বলে যদি কোনো জায়গা বেছে নিতে বলা হয়, সে ক্ষেত্রে নেপালের প্রতি তার পক্ষপাত। দেশের অভ্যন্তরে যেকোনো স্থানেই ঘুরতে ভালো লাগে। তবে ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন নয়; বরং বোহিমিয়ান হয়ে ঘুরে বেড়ানোতেই তার বেশি আনন্দ। গন্তব্যের চেয়ে যাত্রার সময়টি বেশি উপভোগ করেন। মোটরবাইকে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। পছন্দসই কোনো জায়গা পেলে সেখানে কাটিয়েছেন সময়।
খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে খুব একটা শৌখিন না হলেও ঘুমের সঙ্গে আপোস করেন না। জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান করেন আর গায়ে মাখেন না কোনো নেতিবাচক মন্তব্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রথম দিকে আক্রমণাত্মক মন্তব্য তাকে মানসিকভাবে আঘাত দিলেও ধীরে ধীরে সেসব সামলে নিয়েছেন। বিশ্বাস করেন, সব মানুষ নিশ্চয় এক মতের হবে না। একজন মানুষের সবকিছু সবার পছন্দ হবে—এমন নয়। আরও বললেন, নিজেকে আঘাত করে, এমন কোনো কিছু সহ্য না করে তরুণেরা যেন স্পষ্টবাদী হয়।
মোরশেদ মিশুর ফ্যাশন স্টেটমেন্ট অনেকে ফলো করেন। এ ব্যাপারে তার সরল স্বীকারোক্তি, ‘ফ্যাশন স্টেটমেন্ট কী, এ আসলে আমার জানা ছিল না। ভাইদের ব্যবহৃত পোশাক পরে বড় হয়েছি। এমনও হয়েছে, বড় ভাই ভারসাচির একটি প্যান্ট দু-তিন বছর পরে ফেলে রেখেছেন, সেটি পরবর্তী সময়ে আরও কয়েক বছর আমি পরেছি। ফাস্ট ফ্যাশনের এই সময়ে এসে সবাই রিসাইকেল, আপসাইকেলের কথা বলছে। আমরা তো ছোটবেলা থেকে তা-ই করে এসেছি।’
সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে মিশু অভিনীত ‘রকস্টার’ চলচ্চিত্র। অভিনয় মূলত শখের বশে করা। ভালো স্ক্রিপ্টে কাজ করতে বরাবর আগ্রহী। তবে নিজের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ট্রান্সফরমেটিভ অ্যাকটিভিটিস। বিশেষ করে ন্যাচারাল কোনো রিসোর্স পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করে তোলা। একে তিনি পারফরম্যান্স আর্ট হিসেবে দেখেন।
ভালোবাসেন সানগ্লাস, হ্যান্ডওয়াচ ও কনভার্স পরতে। কালেকশনের আগ্রহ না থাকলেও ফাস্ট ফ্যাশনে না ঝুঁকে, ভালো মানের অ্যাকসেসরিজ কেনার চেষ্টা করেন।
ছোটবেলায় ধ্যানে-জ্ঞানে ছিল একটিই স্বপ্ন—সেনাবাহিনীতে যোগ দেবেন। বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা, মা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। বড় ভাই নৌবাহিনীতে কর্মরত এবং দুলাভাই সেনাবাহিনীতে। মূলত দেশের জন্য কিছু একটা করার তাগাদা যেন ডিনএতে বহন করছেন। পরপর দুবার আইএসএসবি (ইন্টার সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ড) পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে হৃদয় ভাঙলেও বেছে নিয়েছেন দারুণ সব উপায়। কখনো দল গঠন করে নেমে পড়েন খাল পরিষ্কারে। বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ করে ছুটে যান দুর্গম অঞ্চলে। গাজার বিধ্বস্ত মানুষের জন্য আয়োজন করেন কনসার্ট, দেয়ালে দেয়ালে আঁকেন সম্প্রীতির প্রতিচ্ছবি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে মিশু বলেন, ‘আজকের এই ক্ষণ আর ফিরে আসবে না। তাই প্রতিটি ক্ষণ যেন বাঁচার মতো বাঁচি।’ জীবনে কোনো চেকলিস্ট কিংবা বাকেট লিস্ট নেই; কর্ম যেখানে নিয়ে যাবে, সেখানেই যেতে রাজি তিনি। নিজের প্রতিষ্ঠান ‘এলাকা’কে আরেকটু প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখেন।

 নাঈমা তাসনিম
ছবি: রনি বাউল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top