skip to Main Content

এডিটর’স কলাম I বন্ধুত্বের দাবি

বন্ধুত্ব শুধু অন্যের কাছ থেকে পাওয়ার বিষয় নয়; এটি নিজে একজন ভালো বন্ধু হয়ে ওঠারও সাধনা। তবে এই সাধনাকে শুধু ব্যক্তিমানুষের গণ্ডিতে আটকে রাখা অনুচিত

‘দ্য প্রফেট’ কাব্যে বিখ্যাত লেবানিজ কবি কাহলিল জিবরান লিখেছেন, বন্ধু হলো আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল। তার ভাষ্যে, বন্ধুত্ব সেই জমিন, যেখানে আমরা ভালোবাসার বীজ বুনে কৃতজ্ঞতার ফসল ঘরে তুলি। বন্ধুই আমাদের আহারের দস্তরখান এবং শীতের রাতে আগুনের ওম। জিবরানের দৃষ্টিতে বন্ধু হলো একটি পূরণ হওয়া অবচেতন অভাব, নিরাপত্তার জায়গা, যেখানে আমরা ক্ষুধার্ত হৃদয়ে পৌঁছাই আর যেখান থেকে ফিরি স্থির মন নিয়ে। বন্ধুত্ব কোনো সামাজিক চুক্তি নয়; বরং পবিত্র আত্মিক মেলবন্ধন।


মানুষ কেন জীবনের এই বন্ধনগুলোকে এত ব্যাকুলভাবে খোঁজে? একজন প্রকৃত বন্ধু আমাদের মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিধ্বনি হিসেবে কাজ করে। তার সামনে মনের কথা নিঃসংকোচে প্রকাশ করা যায়। তার মনের কথা শোনা যায় নির্দ্বিধায়। একজন সত্যিকারের বন্ধু যখন নীরব থাকেন, তার হৃদয়ের কথা শোনার অপেক্ষায় আমাদের মন তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। জীবনে চলার পথে বন্ধুর প্রয়োজন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, তিনি এমন এক বিরল পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে ভাষার প্রয়োজন পড়ে না। প্রকৃত বন্ধুত্বে সব ভাবনা, ইচ্ছা আর প্রত্যাশা নিঃশব্দে জন্ম নেয় এবং ভাগাভাগি হয়ে যায়।

এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে পরিচিত মানুষ, ফলোয়ার আর আড্ডার সঙ্গীদের ভিড়ে আমরা প্রায়ই বন্ধু চিনতে ভুল করি। শুধু একাকিত্ব দূর করা বা অলস সময় কাটানোর জন্য যারা পাশে থাকেন, অনেক সময় তাদেরই বন্ধু ভেবে ভ্রম হয় আমাদের। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানে আছে, ‘বন্ধু, তোমার পথের সাথীকে চিনে নিয়ো।’ অথচ বন্ধু চিনতে হরদমই ভুল হয়ে যায় আমাদের; যা জীবনে ডেকে আনতে পারে মহাবিপর্যয়। ভুল মানুষের হাত ধরে আমরা এমন এক ভিড়ে গিয়ে পড়তে পারি, যারা পাশে থেকেও আমাদের বোঝেন না। স্বার্থ ও লৌকিকতার নিñিদ্র দেয়ালে ঘেরা সেই মেকি সম্পর্কগুলো মানুষের ভেতরটাকে একটু একটু করে মরুভূমি বানিয়ে দেয়। যেখানে ব্যর্থতার গল্প বা নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করলে তা পরে উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়, সেখানে কোনো বন্ধুত্ব থাকতে পারে না। বন্ধুত্বের নামে কোনো একমুখী বা চাতুর্যপূর্ণ সম্পর্কগুলো যখন জীবনকে গ্রাস করে, তখন চারপাশের উৎসবগুলোকেও নীরব অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মনে হতে থাকে! মানুষ তখন ভিড়ের মাঝেও এক অতল একাকিত্বের গহ্বরে তলিয়ে যায়। তাই সঠিক বন্ধু চেনা শুধু আশীর্বাদ নয়; একান্ত প্রয়োজনও।


বন্ধুত্ব শুধু অন্যের কাছ থেকে পাওয়ার বিষয় নয়; এটি নিজে একজন ভালো বন্ধু হয়ে ওঠারও সাধনা। তবে এই সাধনাকে শুধু ব্যক্তিমানুষের গণ্ডিতে আটকে রাখা অনুচিত। আমাদের ভালো বন্ধু হয়ে ওঠা চাই মানুষ, প্রকৃতি এবং সামগ্রিক মানবসভ্যতার জন্য। নিজেকে এমন বন্ধু হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যক্তিগত সম্পর্কে অহেতুক অধিকারবোধ আর অবাস্তব প্রত্যাশার ভার কমানো চাই। বন্ধু মানে অপর পক্ষের শূন্যতা ভরিয়ে দেওয়া, তার প্রয়োজন পূরণের দাসত্ব নয়। এই উদারতা যখন আমরা নিজেদের মধ্যে তৈরি করতে পারব, তখনই প্রকৃতির প্রকৃত বন্ধু হতে শিখব। যে প্রকৃতি আমাদের নিঃশর্তভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে, তার প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। একটি গাছ বা নদীকে বন্ধুর চোখে দেখা এখন সময়ের দাবি। একইভাবে, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হিংসা আর অসহিষ্ণুতায় জর্জরিত এই পৃথিবীতে মানবসভ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের একে অপরের সহযাত্রী ও বন্ধু হয়ে উঠতে হবে। কবীর সুমন যেমনটা গেয়েছেন গানে, ‘পৃথিবীটা পাখি, গাছ, মানুষ—সবার।’


ডিজিটাল স্ক্রিনের যান্ত্রিক সংযোগের চেয়ে আমাদের আজ অনেক বেশি প্রয়োজন হৃদয়ের স্পন্দন টের পাওয়া। সাময়িক বা জাগতিক সুবিধাপ্রাপ্তিকে বিবেচনায় না নিয়ে, নিঃস্বার্থভাবে নিজে প্রকৃত বন্ধু হয়ে ওঠা এবং নিজের জন্য সত্যিকারের বন্ধুকে খুঁজে নেওয়া।

পৃথিবীজুড়ে বন্ধুত্ব ছড়িয়ে থাক। সবার মঙ্গল হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top