বহুরূপী I নুনের নকশা
লবণ সম্ভবত মানুষের খাদ্যসংস্কৃতিতে এক অনিবার্য মৌলিক উপাদান। তবে সাধারণ টেবিল সল্ট বা গুঁড়া লবণের বাইরেও ভোজ্য লবণের রয়েছে বিশাল দুনিয়া। যার হরেক রং, টেক্সচার ও উৎস
পাকিস্তানের পাঞ্জাব অঞ্চলের প্রাচীন খেওড়া লবণের খনি থেকে সংগ্রহ করা হয় জগদ্বিখ্যাত হিমালয়ান পিংক সল্ট। খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ এই লবণ আকর্ষণীয় গোলাপি রঙের জন্যও সুপরিচিত। এতে সোডিয়াম ক্লোরাইডের পরিমাণ কিছুটা কম থাকায় সাধারণ টেবিল সল্টের মতো অত কড়া নয়।
ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক, প্রশান্ত মহাসাগরসহ বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয় সি সল্ট। প্রথাগত খনিজ লবণের তুলনায় এর স্বাদ বেশি এবং সামুদ্রিক নোনতা আমেজযুক্ত। বিশেষ করে সামুদ্রিক খাবার ও তাজা সবজিতে সমুদ্রের এক চমৎকার সতেজ স্বাদ আনতে পেশাদার শেফরা এই লবণ ব্যবহার করেন।
লবণের দুনিয়ায় অভিজাত নাম ফ্লুর ডি সেল, যা মূলত ফ্রান্স, পর্তুগাল ও স্পেনের কিছু অংশে বিশেষ উপায়ে হাতে সংগ্রহ করা হয়। এর স্বচ্ছ স্ফটিক দানাগুলো অত্যন্ত ভঙ্গুর ও মুচমুচে প্রকৃতির, যা মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গলে যায়। এই লবণ অত্যন্ত মূল্যবান এবং নাজুক হওয়ায় রান্নায় এর ব্যবহার নেই বললেই চলে; শুধু খাদ্য পরিবেশনের আগে ফিনিশিং সল্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পেশাদার শেফদের কাছে আরেকটি পছন্দ হলো কোশের সল্ট, যা খনি বা সমুদ্রের পানি থেকে পরিশোধন করে বানানো হয়। এই লবণে কোনো অ্যান্টি-কেকিং এজেন্ট বা বাড়তি আয়োডিন রাখা হয় না। খাবার মেরিনেট বা সিজনিংয়ে কোশের সল্টের ব্যবহার দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের সামুদ্রিক পানি থেকে সংগ্রহ করা হয় ব্ল্যাক হাওয়াইয়ান সল্ট, যাতে রয়েছে অ্যাকটিভেটেড চারকোল। এই চারকোল যোগেই লবণটি চমৎকার ও গাঢ় কালো রং লাভ করে। এটি খাবারে মৃদু নোনতার পাশাপাশি মৃদু, মেটে ও ধোঁয়াটে স্বাদ এনে দেয়। মুখে দেওয়ার পর এর শেষ অনুভূতি কিছুটা বাদামের মতো লাগে, যা একে সাধারণ সামুদ্রিক লবণ থেকে সহজে আলাদা করে।
পার্সিয়ান ব্লু সল্ট হলো অন্যতম বিরল লবণ, যা ইরানের সেমনান প্রদেশের প্রাচীন ও খনিজসমৃদ্ধ লবণের খনি থেকে সংগ্রহ করা হয়। এর চোখজুড়ানো নীল আসলে কোনো কৃত্রিম রং নয়, বরং প্রাকৃতিক অপটিক্যাল ইলিউশন, যা লবণটির বিশেষ ক্রিস্টাল গঠনের কারণে ঘটে থাকে। সামান্য মিষ্টি ভাব দিয়ে এর স্বাদ শুরু হলেও শেষ হয় চমৎকার, শুদ্ধ নোনতা অনুভূতি দেওয়ার মাধ্যমে।
রান্নায় ভিন্নমাত্রা যোগ করতে তৈরি করা হয় স্মোকি সল্ট, যা উচ্চমানের সামুদ্রিক লবণকে কাঠের আগুনে প্রায় দুই সপ্তাহ ধোঁয়া দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। এর স্বাদ তীব্রভাবে ধোঁয়াটে, যা মূলত কোন ধরনের কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে। যেমন অল্ডারউড ব্যবহারে হালকা মিষ্টি, হিকরি কাঠ ব্যবহারে কড়া বারবিকিউ এবং অ্যাপলউড ব্যবহারে চমৎকার ফ্লুটি ফ্লেভার পাওয়া যায়।
ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে সমুদ্রের পানি ফুটিয়ে প্রস্তুত করা হয় ফ্লেক সল্ট। এ কাজে ইংল্যান্ডের ম্যালডন অঞ্চল সবচেয়ে বিখ্যাত। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া এই লবণের চমৎকার, পিরামিড আকৃতির ফাঁপা ও পাতলা স্বচ্ছ স্ফটিক অবয়ব দেখে একে সহজে চেনা যায়। এর পাতলা পাপড়িগুলো চিবানোর সময় চমৎকার মুচমুচে ভাব তৈরি করে এবং মুহূর্তে জিবের ওপর গলে যায়।
বিট লবণ বা কালা নমক ভারতীয় উপমহাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়। মূলত বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয়। সালফারের উপস্থিতির কারণে ডিমের মতো একধরনের চেনা গন্ধের জন্য এই লবণ বিশেষভাবে পরিচিত। আমাদের দেশে বিভিন্ন স্ট্রিট ফুড, স্যালাদ ও চাটনি তৈরিতে এবং নিরামিষাশীদের রেসিপিতে এটি নিত্যব্যবহার্য উপাদান।
আমাদের সবার ঘরে সবচেয়ে চেনা রূপটি হলো টেবিল সল্ট। মাটির নিচের খনিজ লবণ কিংবা সমুদ্রের লবণের স্তর থেকে পরিশোধন করে তৈরি হয়। এর দানাগুলো অত্যন্ত মিহি ও সমমানের করা হয় যন্ত্রের সাহায্যে, যাতে লবণদানি থেকে একে সহজে ও ঝরঝরে করে ঢালা যায়। লবণের দলা পাকানো রোধ করতে এতে প্রায়ই অ্যান্টি-কেকিং এজেন্ট ও আয়োডিন মেশানো হয়, যা কখনো কখনো মুখে সামান্য ধাতব স্বাদ ছড়ায়।
ফুড ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট
