প্রাগৈতিহাসিক I এত্রুস্কি এপিক
রোমান সভ্যতারও বহু আগে ইতালির মধ্যাঞ্চলে তেবেরে নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল এক শিল্পসমৃদ্ধ সভ্যতা। সে দেশের প্রাচীন সমাধি, দেয়ালচিত্র ও জাদুঘরে সংরক্ষিত নিদর্শনগুলো সাক্ষ্য দেয়, এত্রুস্কি সভ্যতা ছিল ইউরোপের প্রাচীন ইতিহাসের এক বিস্ময়
বর্তমান ইতালির তুসকানি, লাজিও ও উমব্রিয়া অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল তাদের বসতি। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে এত্রুস্কি (ইংরেজি উচ্চারণে ‘এট্রুস্কান’)। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, এরা ছিলেন স্থানীয় ইতালীয়; আবার কেউ বিশ্বাস করেন, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আগত কোনো জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরি। এত্রুস্কিরা কৃষিনির্ভর সমাজ গড়ে তুলেছিলেন। উর্বর উপত্যকা, পাহাড়ি ঢাল এবং তেবেরে (ইংরেজি উচ্চারণে ‘টাইবার’) নদীর আশপাশের অঞ্চল কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। রোমের পুরাণ লেখকদের মতে, এই নদীর প্রথম নাম ছিল আলবুলা। কথিত আছে, নদীটি পার হওয়ার সময় ডুবে মারা যান ইতালির আলবা লঙ্গার রাজা তেবেরিনুস। পরবর্তীকালে তার নামেই এর নামকরণ।
গম, যব ও আঙুর ছিল এত্রুস্কিদের প্রধান ফসল। জলপাই, ডুমুর, আপেলসহ বিভিন্ন ফলেরও চাষ হতো। আঙুর থেকে কড়া পানীয় তৈরিতে তারা ছিলেন বিশেষ দক্ষ। রোমানদের কড়া পানীয় প্রস্তুতের বহু কৌশল এত্রুস্কিদের হাত ধরে এসেছে। পাহাড়ি অঞ্চলে তারা ধাপচাষ পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, যাতে মাটির ক্ষয় কম হয় এবং বৃষ্টির পানি সহজে ধরে রাখা যায়। নদী ও জলাভূমি নিয়ন্ত্রণে কিছু অঞ্চলে তাদের জলনিকাশ ও বাঁধ নির্মাণের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ওই সভ্যতার জনগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায় শস্য, ফলমূল ও মাছের পাশাপাশি ছিল বন্য প্রাণী ও গৃহপালিত পশুর মাংস। শূকর, ভেড়া ও ছাগল পালন ছিল সাধারণ বিষয়। ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর কল্যাণে জলপাইয়ের তেল ছিল তাদের খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে। থাইম, অরিগানো, রোজমেরির মতো বিভিন্ন ভেষজ পাতা ও সুগন্ধি উদ্ভিদ রান্নায় ব্যবহার করতেন তারা। বনজ পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করা বাদাম, মধু ও বুনো ফলও তাদের খাদ্যের অংশ হয়ে উঠেছিল।
এত্রুস্কিদের খাদ্যাভ্যাস ও রান্নার ধারণা পাওয়া যায় তাদের সমাধিচিত্র, মৃৎপাত্র এবং ভোজের দৃশ্য আঁকা দেয়ালচিত্র থেকে। বহু সমাধিতে এমন চিত্র পাওয়া গেছে, যেখানে অধিবাসীরা একত্রে বসে ভোজ সারছেন, বাদ্যযন্ত্র বাজছে এবং ভৃত্যরা খাবার পরিবেশন করছেন। এসব দৃশ্য থেকে বোঝা যায়, তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে ভোজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এই জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত নানা ধরনের হাঁড়ি, বাটি, কলস ও পানপাত্র পাওয়া গেছে। মাটির পাশাপাশি ব্রোঞ্জের তৈরি পাত্রও ব্যবহৃত হতো ওই সভ্যতায়। বিশেষ করে পানীয় সংরক্ষণ ও পরিবেশনের জন্য ধাতব পাত্র ছিল বেশ জনপ্রিয়।
রান্না ও খাদ্য প্রস্তুত প্রক্রিয়ায়ও এত্রুস্কিরা ছিলেন দক্ষ। শস্য গুঁড়া করার জন্য পাথরের চাকি ও পেষণি ব্যবহার করতেন। খোলা আগুনে রান্নার জন্য তৈরি ছিল মাটির চুলা। রুটি তৈরির জন্য পাথরের সমতল পৃষ্ঠ ব্যবহারের চল ছিল। তারা শস্য সেদ্ধ করে ঘন ধরনের পেস্ট বা পায়েসজাতীয় খাবারও তৈরি করতেন। মাছ ও মাংস ধোঁয়ায় শুকিয়ে সংরক্ষণের পদ্ধতি তাদের জানা ছিল। বড় বড় মাটির বয়ামে জলপাইয়ের তেল, কড়া পানীয় ও শস্য সংরক্ষণ করতেন। অনেক পাত্রে ঢাকনার ব্যবহার দেখা যায়, যা খাদ্যকে আর্দ্রতা ও পোকামাকড় থেকে সুরক্ষা দিত। এত্রুস্কিদের সমাজে ভোজ ছিল সামাজিক মর্যাদা ও ঐক্যের প্রতীক। অভিজাত শ্রেণির মানুষেরা বিশাল ভোজসভার আয়োজন করতেন; যেখানে গান, নৃত্য ও পানীয়ের ব্যবস্থা থাকত। সমাধিচিত্রে নারী ও পুরুষকে একসঙ্গে ভোজে অংশ নিতে দেখা যায়, যা সমসাময়িক অনেক সভ্যতার তুলনায় এত্রুস্কিতে নারীদের অপেক্ষাকৃত স্বাধীন অবস্থানের ইঙ্গিতবাহী। সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকা ছিল তুলনামূলকভাবে সরল—গম, যব, সবজি ও ফলমূলনির্ভর। তবে উৎসবের সময় সবাই মিলে বড় পরিসরে রান্না ও খাবার ভাগাভাগি করতেন।
এত্রুস্কি সভ্যতার ধাতুশিল্প ছিল অত্যন্ত উন্নত। ব্রোঞ্জ ও সোনার অলংকার তৈরিতে তারা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাদের তৈরি সূক্ষ্ম নকশার গয়না, আয়না ও ধর্মীয় সামগ্রী আজও প্রত্নতাত্ত্বিকদের বিস্মিত করে। বিশেষ করে ব্রোঞ্জের আয়নার গায়ে খোদাই করা পৌরাণিক দৃশ্য তাদের শিল্পরুচির পরিচয়বাহী। এত্রুস্কিদের ধাতব কাজের নিদর্শন বর্তমানে ইতালির বিভিন্ন জাদুঘর এবং রোমের জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ধর্ম ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল তাদের। আকাশ, বজ্রপাত, সূর্য, উর্বরতা এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত দেব-দেবীতে বিশ্বাস রাখতেন। পুরোহিতেরা পাখির ওড়াউড়ি, বজ্রপাত কিংবা পশুর যকৃৎ পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যৎ গণনা করতেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে খাদ্য ও পানীয় নিবেদনের প্রচলন ছিল ব্যাপক। দেবতাদের উদ্দেশে কড়া পানীয়, ফল, শস্য এবং পশু উৎসর্গ করা হতো।
প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য রেখে চলার ক্ষেত্রে এত্রুস্কিরা ছিলেন বেশ সচেতন। নদীপথ ব্যবহার করে বাণিজ্য পরিচালনা করলেও পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ ফেলতেন না। ভূমধ্যসাগরীয় বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। তৎকালীন গ্রিস, ফিনিশিয়া ও কার্থেজের সঙ্গে পণ্য আদান-প্রদানের ফলে তাদের সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য আসে। ষষ্ঠ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এত্রুস্কিরা ইতালির অন্যতম শক্তিশালী জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। শেষ পর্যন্ত রোমানরা এত্রুস্কি নগরীগুলো দখল করে নেন এবং তাদের সংস্কৃতির অনেকটুকুই রোমান সভ্যতার মধ্যে মিশে যায়। তবু স্থাপত্য, ধর্মীয় আচার, নগর-পরিকল্পনা ও শিল্পকলায় এত্রুস্কিদের প্রভাব রোমান সভ্যতা থেকে মুছে ফেলা যায়নি।
নাঈমা তাসনিম
ছবি ও চিত্রকর্ম: ইন্টারনেট
