skip to Main Content

ফিচার I নাইওরি নেমন্তন্ন

পারস্য, পর্তুগিজ, বিলাতি, চীনা—কত ঘাটের রান্নার স্রোত এসে মিলেছে বাঙালির পাতে। খাওয়া-দাওয়ার বৈচিত্র্য তাই বঙ্গ-সংস্কৃতিতে অবিচ্ছেদ্য

সে এক পুরোনো বঙ্গদেশের গল্প। যেখানে মেয়েরা নিজেদের বাড়ি আসতেন অতিথি হয়ে। বর্ষামুখর সময়ে মিলত সেই সুযোগ। বাকি সময় তাদের কেটে যেত দায়িত্ব সামলাতে। তার ওপরে প্রয়োজন পড়ত অনুমতির। যা আবার চাইতে হতো স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে। মিলত না সহজে। যদি মিলত, মন ডানা মেলত তখনই। কাছের মানুষদের দেখার হাহাকার, আনন্দের একফালি সুযোগ—সবই তখন ঈদের চাঁদ। দিন গোনা হতো হাতের কড় গুনে। কখন আসে সেই মুহূর্ত, যখন আসবে পালকি কিংবা নৌকা। একটু একটু করে বাক্স-পেটরা গুছিয়ে নেওয়া। আর মনের মাঝে স্বপ্ন। একটু বাঁধভাঙা খুশির খোঁজ করা।
খোঁজ পাওয়া যায় লোকসাহিত্যে। মৈমনসিংহ গীতিকায় মহুয়ার পালায় আর ভাটিয়ালি গানে। সেখানে নাইওরের বিরহ ও আনন্দের চিত্র চমৎকারভাবে ফুটে আছে। উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী শচীন দেববর্মনের কণ্ঠে বিশেষ হয়ে আছে একটি গান:
‘কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া
আমার ভাইধনরে কইয়ো
নাইওর নিতো বইলা
তোরা কে যাস…’
গানটির কথাগুলো মূলত শ্বশুরবাড়িতে বন্দী এক নারীর আকুলতা প্রকাশ করে, যিনি ভাটির স্রোতে ভেসে যাওয়া কোনো মাঝিকে অনুরোধ করছেন তার ভাইয়ের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য, যাতে তাকে নাইওর নিয়ে যাওয়া হয়।
নাইওরের সময়ে মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই চাইতেন কন্যাকে শতভাগ আদর-আপ্যায়ন দিতে। তখনকার সময়ে যৌথ পরিবারের চল ছিল। আনন্দ আয়োজনে সবাই এগিয়ে আসতেন। আমের মধুর রসের শেষ প্রহর প্রায়। তবু যতটা পারা যায়, ততটাই চেষ্টা করা হতো মেয়েকে আমের স্বাদ দেওয়ার জন্য। তা ছাড়া কাঁচা আম থেকে তৈরি করে রাখা আচারও থাকত সেখানে। আমসত্ত্ব-আমসিও জমিয়ে রাখতেন মা-চাচিরা। স্নেহধন্য কন্যা যেন যা ইচ্ছা তা-ই খেতে পারেন, সেই চেষ্টা থাকত সারাটা ক্ষণ। শীত হোক কিংবা বর্ষা—পার্বণপ্রিয় বাঙালি পিঠা বানাতে বসে যায় সব সময়। আর আহ্লাদি কন্যা যদি তখন আসেন ঘরে, তাহলে সেই পিঠায় মিশে থাকে আরও মায়া। বর্ষাকালের নাইওরের সময়ে পিঠাপুলিও বাদ যেত না। নতুন ধান সে সময়ে না থাকলেও মায়ের কোঠরে জমানো চালেই তৈরি হতো। ভাদ্র মাসে নাইওর এলে পাতে উঠত তালের নানা পদ—বড়া, বাটি ভাপা পিঠা, তাল কদমসহ কত কিছু! কলাপাতা বা মাটির পাত্রে পোড়ানো ঐতিহ্যবাহী তালের পিঠাও থাকত কারও কারও ঘরে।
চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে আছে—আমৃত গুটিকা, আমের খণ্ড, পাতপিঠা, দুঘলকলকি, মনোহরা, ক্ষীরখণ্ড, ক্ষীরপুলি, চন্দ্রপুলি, ছানাবড়া, পায়েস, নালবড়া—এসবেও আপ্যায়িত হতেন কন্যা। বর্ষার শুরুতে গ্রামে যখন প্রচুর কাঁঠাল পাকে, তখন অতিরিক্ত নরম কাঁঠাল দিয়ে তৈরি করা হয় বড়া পিঠা; পাকা কাঁঠালের রস, চালের গুঁড়া ও সামান্য ময়দা মেখে। পাতা ভাঁজ করে তার ভেতর চালের গুঁড়া ও কাঁঠালের রস দিয়ে তৈরি বিশেষ ভাপা পিঠা তৈরির চল ছিল। মেঘলা বা বৃষ্টির দিনে চায়ের সঙ্গে খাওয়ার জন্য গ্রামীণ নারীরা ঝাল পিঠা তৈরি করতেন। বিক্রমপুর ও মুন্সিগঞ্জ অঞ্চলের একটি বিখ্যাত বর্ষাকালীন পিঠা ইলিশ-চিতই। বর্ষায় প্রচুর তাজা ইলিশ পাওয়া যায় বলে চিতই পিঠার ভেতরে বা সঙ্গে ইলিশ মাছের পুর দিয়ে এটি তৈরি। নাইওরি মেনুতে তা বাদ যেত না এই অঞ্চলে। চালের গুঁড়া সেদ্ধ করে তৈরি মেরা পিঠাকে পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ ও মসলা দিয়ে কড়াইতে ভাজা হতো। পরিচিত ছিল ঝাল মুঠো নামে। গুড় ও চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি মুচমুচে মিষ্টি পাকন পিঠাও কম গুরুত্ব পেত না। ডিম, সুজি, পেঁয়াজ ও মরিচ দিয়ে ঝটপট নরম ঝাল পিঠাও তৈরি করতেন মায়েরা।
মাছে-ভাতে বাঙালি, সে তো জানা কথাই। তাই হরেক পদের মাছ রান্না হতো সে সময়ে। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রজ্ঞাসুন্দরী তার এক রান্নার বইতে ৫৮ পদের মাছ রান্নার পদ্ধতি জানিয়েছেন। মধ্যযুগের বাঙালির বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে মৎস্য ভোজনের বর্ণনা রয়েছে। রুই, কাতলা, চিতল, মাগুর, চিংড়ি, পাবদা, শোল ইত্যাদি মাছের নাম আছে সেগুলোতে।

ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যেও আছে খাড়কি, চিংড়ি, কচ্ছপের ডিম, ভেটকিসহ অসংখ্য মাছ ও মাছজাতীয় খাবারের কথা। ষোলো শতকে বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল কাব্যে মাছ রান্নার বিভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়; যেমন কৈ মাছ আদার রসে রান্না করা হতো, রুই মাছ দিয়ে হতো কলতার আগা, ঝাঁজালো সর্ষের তেলে খরসুনা মাছ। এসবের কোনোটা যদি কন্যার পছন্দের তালিকায় থাকত, তাহলে তা হাজির করতে জান বাজি রাখতেন বাবা-মা।

 সারাহ্ দীনা
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top