পাতে পরিমিতি I প্লেট ডায়েট
দুনিয়াজুড়ে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, স্থূলতা, ফ্যাটি লিভার ও কিডনি জটিলতার মতো ক্রনিক রোগ দ্রুত বাড়ছে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার ভারসাম্যের মাধ্যমে এসব রোগের ঝুঁঁকি কমানো এবং অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এর সহজ, বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর পদ্ধতি সম্পর্কে পরামর্শ দিচ্ছেন পুষ্টিবিদ নিশাত শারমিন নিশি
জন্মের পর থেকে ছয় মাস এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং শেষে একটি শিশু যখন সাধারণ খাদ্য গ্রহণ শুরু করে, তখন থেকে খাবারের প্লেট নিয়ে ভাবতে হয়। আসলে ‘প্লেট ডায়েট’ কোনো নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা নয়; বরং খাবারের সুষম বণ্টনের সহজ কৌশল। এই ডায়েটে ক্যালরি গণনা বা জটিল হিসাব ছাড়াই প্রতিদিনের খাবারকে স্বাস্থ্যকরভাবে সাজানো যায়। প্লেট ডায়েট মেইনটেইন করতে নেওয়া চাই একটি ৯ থেকে ১০ ইঞ্চি থালা, যার অর্ধেকজুড়ে থাকবে শাকসবজি ও স্যালাদ, এক-চতুর্থাংশে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার; যেমন মাছ, মুরগি বা ডিম—যেকোনোটি। বাকি অংশে ভাত, রুটি, ওটসের মতো স্বাস্থ্যকর শর্করাজাতীয় খাবার। এর সঙ্গে ঘটানো চাই ফ্লুইড ব্যালেন্স; অর্থাৎ পর্যাপ্ত পানি, পরিমিত ফল এবং হেলদি ফ্যাট। আসলে প্লেট ডায়েটে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাটসহ ভিটামিন, মিনারেলসের সমারোহ থাকে; তাই এই পদ্ধতিতে খাদ্য গ্রহণের কারণে আমাদের রক্তে সুগার কন্ট্রোল এবং ওয়েট মেইনটেইনের পাশাপাশি সামগ্রিক পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকিও কমে।
খাবার বাছাই
প্লেট ডায়েটের মূল কাঠামো সবার জন্য একই হলেও বয়স, লিঙ্গ ও শারীরিক কার্যক্রম অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়।
শিশু ও কিশোর-কিশোরীর ক্ষেত্রে শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বেশি পরিমাণে প্রোটিন প্রয়োজন। তাই প্লেট ডায়েটে রাখা যেতে পারে দুধ, ডিম, মাছ, মুরগি ও ডাল। অন্যদিকে অতিরিক্ত চিপস, চকলেট ও কোমল পানীয় পরিহার করা শ্রেয়।
প্রাপ্তবয়স্ক নারীর জন্য আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ফলিক অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ডাল, মাছ, দুধ ও টক দই নিয়মিত থাকা চাই।
প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের খাদ্যতালিকা থেকে অতিরিক্ত লাল মাংস, ভাজাপোড়া ও লবণযুক্ত খাবার বাদ দেওয়া জরুরি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে; তাই পর্যাপ্ত সবজি ও ফল খাওয়া মঙ্গল।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের হজমক্ষমতাও কমতে শুরু করে। তাই প্রবীণদের বেছে নেওয়া শ্রেয় সহজপাচ্য ও নরম খাবার। জীবনের এ পর্যায়ে পেশিশক্তিও কমতে থাকে বলে পরিমাণমতো প্রোটিন গ্রহণ জরুরি। এ ছাড়া পর্যাপ্ত পানি বা তরল খাবার গ্রহণের দিকেও নজর দেওয়া চাই।
অসুখ সারাই
সুস্থ থাকতে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সকল বয়সীরই খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। দৈনন্দিন মানসিক চাপ এবং অগোছালো জীবনযাপনের জন্য সহজে কিছু রোগ বাসা বাঁধে শরীরে। দীর্ঘস্থায়ী রোগের ক্ষেত্রে প্লেট ডায়েট মেইনটেইন করতে কিছু বিষয় জানা দরকার।
ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিস মানেই রক্তে গ্লুকোজের আধিক্য। তবে এর মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে চোখ, কিডনি, স্নায়ু, এমনকি হৃদ্যন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্লেটের অর্ধেক অংশ শাকসবজি; এক-চতুর্থাংশ মাছ, মুরগি, ডিম বা ডাল এবং বাকি অংশ লাল চালের ভাত বা আটার রুটি রাখা যেতে পারে পাতে। চিনি, যেকোনো মিষ্টি, কোমল পানীয় একেবারে বাদ দেওয়া আবশ্যক। তবে ফলের রসের লোভ সামলানো কারও পক্ষে মুশকিল হলেও অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করা বারণ। এ ছাড়া মনে রাখা চাই, খাবারের পরিমাণ মেইনটেইনের পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা একজন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বেশ উপকারী।
উচ্চ রক্তচাপ
একে বলে নীরব ঘাতক। অতিরিক্ত লবণ খাওয়া বন্ধের ব্যাপারে সচেতন থাকলেও অনেকের ধারণা নেই—ক্যানড ফুড, আচার, চিপস ও প্রসেসড ফুড এড়িয়ে চলা জরুরি। শাকসবজি, ফল, ব্রাউন রাইস এবং চর্বিহীন প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
হৃদ্রোগ
হার্টের অন্যতম সমস্যার কারণ হলো রক্তনালিতে চর্বি জমা। তাই খাবার হিসেবে ভাজাপোড়া খাবার, ট্রান্স ফ্যাট, অতিরিক্ত ঘি ও মাখন গ্রহণ সীমিত করা চাই। সপ্তাহে অন্তত দুদিন মাছ, পরিমিত বাদাম ও বীজ এবং কালারফুল শাকসবজি হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
ফ্যাটি লিভার
ফ্যাটি লিভার যেন প্রতিটি ঘরেই অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা। এই রোগের প্রভাব কমাতে কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি ও ফাস্ট ফুড কমিয়ে শাকসবজি, লিন প্রোটিন, লাল চাল ও লাল আটা দিয়ে তৈরি খাবার গ্রহণ করা চাই। ওবিসিটি বা শরীরের বাড়তি ওজন কমাতে পারলেও উল্লেখযোগ্য উপকার পাওয়া সম্ভব।
কিডনি রোগ
এ রোগের বিভিন্ন স্টেজ থাকে। সে ক্ষেত্রে খাদ্য পরিকল্পনা রোগের পর্যায় অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। অতিরিক্ত লবণ এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ কিডনি রোগীর জন্য ক্ষতিকর। এ ছাড়া রক্তের ইলেকট্রোলাইটসের ওপর ভিত্তি করে অনেক রোগীর পটাশিয়াম ও ফসফরাস নিয়ন্ত্রণেরও প্রয়োজন পড়ে। তাই খাদ্য পরিকল্পনা কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া আবশ্যক।
স্থূলতা
ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও ফ্যাটি লিভারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ রোগ সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা রাখে ওবিসিটি বা স্থূলতা। এ থেকে রেহাই পেতে অনেকে হুট করে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেন; কিন্তু তাতে শরীরে ভীষণ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বরং ছোট প্লেটে খাবার পরিবেশন, ধীরে ধীরে খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
থাকুক খেয়াল
প্লেট ডায়েট মেইনটেইন করতে সাধারণ কিছু নিয়ম অনুসরণ করা ভালো।
প্লেটের অর্ধেক অংশ পূরণ করুন সবজি দিয়ে;
প্রতিদিন অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি রাখা চাই বিভিন্ন রঙের ফল;
মেইন কোর্সে হোলগ্রেইন শস্য নিন;
সারা দিনের প্রোটিন গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিমাণ সঠিক রাখা মঙ্গল;
অতিরিক্ত চিনি ও লবণ গ্রহণ কমানো চাই;
পর্যাপ্ত পানি পান না করলে ডিহাইড্রেশনের পাশাপাশি নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দেবে;
ফিটনেস ধরে রাখতে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মর্নিংওয়াক করা প্রয়োজন;
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের দিকে গুরুত্ব দিন; কেননা, ঘুম কম হলে স্ট্রেস হরমোন সক্রিয় হয়ে যায়।
লেখক: প্রধান পুষ্টিবিদ ও বিভাগীয় প্রধান, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা
ছবি: ইন্টারনেট
