skip to Main Content

ফিচার I এয়ার ফ্রায়ারে রান্না রূপান্তর

বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ, জানালার পাশে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা, সঙ্গে মুচমুচে হালকা খাবার—বর্ষাযাপনের চমৎকার সমীকরণ। এই আনন্দের সমান্তরালে রান্নাঘরে চলে তেল ছিটানো, ভ্যাপসা গরম আর ভাজাভাজির পর চিটচিটে চুলা পরিষ্কারের এক মহাযজ্ঞ। নাগরিক জীবনে এই ঝামেলার এক দারুণ সমাধান হয়ে এসেছে এয়ার ফ্রায়ার

২০১০ সালে ডাচ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ফিলিপস যখন বিশ্ববাজারে প্রথম এয়ার ফ্রায়ার নিয়ে আসে, অনেকে একে ভেবেছিলেন টেম্পরারি ট্রেন্ড। কিন্তু দেড় দশকের ব্যবধানে এটি এখন ওয়াশিং মেশিন বা মাইক্রোওয়েভ ওভেনের মতোই গৃহস্থালির অপরিহার্য অংশ। এয়ার ফ্রায়ার আসলে কোনো ফ্রায়ার বা ভাজার যন্ত্র নয়; বরং একটি ভীষণ পাওয়ারফুল ও কমপ্যাক্ট কনভেকশন ওভেন। সাধারণ ওভেনের চেয়ে এর কাজের গতি ও কার্যকারিতা অনেক বেশি। এর মূল বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে দুটি প্রধান উপাদানের ওপর। প্রথমটি হলো যন্ত্রের ভেতরের ওপরের অংশে থাকা একটি শক্তিশালী কয়েল, যা তীব্র তাপ উৎপন্ন করে। দ্বিতীয়টি এই কয়েলের ঠিক ওপরে বা নিচে থাকা একটি উচ্চগতির ফ্যান, যা উৎপন্ন গরম বাতাসকে ক্ষিপ্রগতিতে নিচের দিকে ঠেলে দেয়। এয়ার ফ্রায়ারের এই পেটেন্টেড প্রযুক্তির নাম ‘র‌্যাপিড এয়ার টেকনোলজি’। যখন বাস্কেটে খাবার রাখা হয়, তখন ফ্যানটি প্রায় ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার বাতাসকে প্রতি মিনিটে হাজারবার বাস্কেটের ভেতরে বৃত্তাকারে ঘোরায়। বাস্কেটের নিচে থাকা বিশেষ তারকা বা জালের মতো নকশা বাতাসকে ধাক্কা দিয়ে আবারও ওপরের দিকে পাঠায়। এই তীব্র ও দ্রুতগতির বায়ুপ্রবাহ খাবারের চারপাশে একটি অদৃশ্য তেলের কড়াইয়ের মতো কাজ করে। গরম বাতাসের এই নিরবচ্ছিন্ন ঘূর্ণন খাবারের উপরিভাগের আর্দ্রতা বা জলীয় অংশকে দ্রুত বাষ্পীভবন করে ফেলে, ফলে খাবারটি বাইরে থেকে মুচমুচে হয়ে ওঠে।
ডিপ ফ্রাই বা ডুবো তেলে ভাজলে খাবারের ওপর যে বাদামি ও মুচমুচে স্তর তৈরি হয়, তার পেছনে রয়েছে রসায়নের এক বিখ্যাত বিক্রিয়া—মেলিয়ার্ড রিঅ্যাকশন। এটি মূলত খাবারের প্রোটিন ও অ্যামিনো অ্যাসিডের সঙ্গে রিডিউসিং সুগারের তাপীয় বিক্রিয়া। এয়ার ফ্রায়ারের তীব্র গরম বাতাস এবং অতি অল্প তেল খাবারের উপরিভাগে দ্রুত ১৪০ থেকে ১৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তৈরি করে এই মেলিয়ার্ড রিঅ্যাকশনকে সক্রিয় করে তোলে। ফলে ডুবো তেলে না ভেজেও খাবারে ভাজা পোড়া স্বাদের সেই চেনা ঘ্রাণ আর বাদামি রং চলে আসে।
তেল বনাম বাতাস
স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে এয়ার ফ্রায়ার জনপ্রিয় হওয়ার প্রধান কারণ এর পুষ্টিগত সুবিধা। প্রথাগত ডুবো তেলে ভাজা খাবারের তুলনায় এই যন্ত্রে তৈরি খাবারে তেলের ব্যবহার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে যায়। সাধারণ উপায়ে তৈরি খাবারের সঙ্গে এর পুষ্টিগত তুলনা করলে পার্থক্যটি বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন সাধারণ উপায়ে ডুবো তেলে ভাজা ১০০ গ্রাম ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ে যেখানে ফ্যাট থাকে ১৪ থেকে ১৭ গ্রাম, সেখানে এয়ার ফ্রায়ারে মাত্র এক চা-চামচ তেলে তৈরি একই পরিমাণ ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ে ফ্যাট নেমে আসে মাত্র ২ থেকে ৩ গ্রামে। একইভাবে, ডুবো তেলে ভাজা চিকেন উইংসের ১৯ গ্রাম ফ্যাট ও ৩২০ ক্যালরির বিপরীতে এয়ার ফ্রায়ারে এটি তৈরি করলে ফ্যাট কমে দাঁড়ায় ১০ গ্রামে এবং ক্যালরি ২১০ তে। আমাদের চিরচেনা পেঁয়াজু বা বেগুনির ক্ষেত্রেও অয়েল স্প্রে ব্যবহার করে ফ্যাটের পরিমাণ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। ফ্যাটের পাশাপাশি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমিয়ে দেয় এয়ার ফ্রায়ার। আলু বা শ্বেতসারজাতীয় খাবার উচ্চ তাপমাত্রায় ডুবো তেলে ভাজা হলে তাতে অ্যাক্রিলামাইড নামক রাসায়নিক যৌগ তৈরি হয়। এটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন ফর রিচার্জ অন ক্যানসার চিহ্নিত করেছে সম্ভাব্য মানব ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এয়ার ফ্রায়ার ব্যবহারে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা পটেটো চিপসে অ্যাক্রিলামাইডের উৎপাদন প্রায় ৯০ শতাংশ কমানো সম্ভব। তা ছাড়া ডুবো তেলে ভাজার সময় উচ্চ তাপে খাবারের অনেক দ্রবণীয় ভিটামিন, যেমন বি, সি নষ্ট হয়ে যায়। এয়ার ফ্রায়ারে রান্নার সময় সরাসরি তেলের সংস্পর্শ না থাকায় এবং রান্না দ্রুত শেষ হওয়ায় খাবারের ভেতরের পুষ্টি উপাদান ও প্রাকৃতিক আর্দ্রতা যথেষ্ট সংরক্ষিত থাকে।
বহুমুখী ব্যবহার
শুরুতে একে শুধু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা চিকেন ফ্রাইয়ের যন্ত্র মনে করা হলেও, বর্তমানের এয়ার ফ্রায়ারগুলো মাল্টি-কুকিং গ্যাজেট হিসেবে কাজ করছে। ছোট আকারের কেক, মাফিন, কুকিজ বা পাউরুটি এতে ওভেনের মতোই চমৎকারভাবে বেক করা যায়। প্রি-হিট হতে সময় কম লাগে বলে সাধারণ ওভেনের চেয়ে দ্রুত কাজ শেষ করে। আস্ত মুরগি, ফিশ ফিলে, কাটলেট কিংবা পনির গ্রিল ও রোস্ট তৈরির জন্য এটি বেশ উপযোগী। অনেক উন্নত মডেলে কম তাপমাত্রায় বাতাস প্রবাহিত করে ফলমূল শুকানো বা মাংসের জার্কি তৈরির মতো ডিহাইড্রেশন ফিচারও থাকে। চিনাবাদাম, কাজুবাদাম রোস্ট করা কিংবা রান্নার মসলা হালকা টেলে নেওয়ার কাজটি মাত্র ২-৩ মিনিটে কোনো ঝামেলা ছাড়াই করা যায়। এর আরেকটি দারুণ ব্যবহার হলো খাবার পুনরায় উত্তপ্ত করা। ফ্রিজে রাখা পিৎজা, শিঙাড়া বা সমুচা মাইক্রোওয়েভে গরম করলে সাধারণত নরম হয়ে যায়। কিন্তু এয়ার ফ্রায়ারে মাত্র ২ মিনিট গরম করলেই তা একদম সদ্য ভাজা খাবারের মতো মুচমুচে হয়ে ওঠে।
বাজার বিশ্লেষণ
ভোক্তাদের চাহিদা ও পরিবারের আকারের ওপর ভিত্তি করে বাজারে মূলত তিন ধরনের এয়ার ফ্রায়ার পাওয়া যায়। প্রথমটি বাস্কেট স্টাইল, যা সবচেয়ে সাধারণ মডেল। এর নিচে একটি হ্যান্ডেলসহ বাস্কেট থাকে। ছোট পরিবার বা ব্যস্ত দম্পতির জন্য ২ থেকে ৪ লিটার ধারণক্ষমতার এই বাস্কেট মডেলগুলো আদর্শ। দ্বিতীয় ধরনটি ওভেন স্টাইল, যা দেখতে ছোট টোস্টার ওভেনের মতো এবং এর ধারণক্ষমতা ১০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত। সাম্প্রতিক উদ্ভাবনটি ডুয়াল বাস্কেট মডেল। এতে দুটি আলাদা বাস্কেট থাকে, ফলে এক পাশের বাস্কেটে যখন চিকেন ফ্রাই হচ্ছে, অন্য পাশেরটিতে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই তৈরি এবং দুটির তাপমাত্রা ও সময় ভিন্নভাবে সেট করা যায়।
প্রযুক্তির দিক থেকেও এগুলো অনেক উন্নত। বাজারে অ্যাপ-নিয়ন্ত্রিত স্মার্ট এয়ার ফ্রায়ার পাওয়া যাচ্ছে, যা ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে মোবাইলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এ ছাড়া ডিজিটাল টাচস্ক্রিন প্যানেল এবং প্রিসেট কুকিং মোড; যেমন ফিশ, চিকেন, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, কেক ইত্যাদির জন্য আগে থেকে নির্ধারিত তাপমাত্রা ও সময় থাকার কারণে অ্যানালগ নব ঘোরানোর তুলনায় রান্নার কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে। বিশ্ববিখ্যাত ফিলিপস, নিঞ্জা কিচেন, শাওমি ও প্যানাসনিকের পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজারে ওয়ালটন ও সিঙ্গার সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত বিভিন্ন মডেলের এয়ার ফ্রায়ার সরবরাহ করছে।
সীমাবদ্ধতা ও শেষ কথা
সব প্রযুক্তিরই যেমন কিছু নেতিবাচক দিক থাকে, এয়ার ফ্রায়ারও ব্যতিক্রম নয়। সত্য হলো, এতে তৈরি খাবারের স্বাদ ও টেক্সচার কখনোই শতভাগ ডুবো তেলে ভাজা খাবারের মতো হবে না। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার; যেমন পুরি বা পেঁয়াজুর ক্ষেত্রে একদম নিখুঁত মুচমুচে টেক্সচার পাওয়া মুশকিল। তেল ছাড়া দীর্ঘক্ষণ রান্না করলে খাবার অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই মুরগি বা মাছ রান্নার সময় সামান্য তেল ব্রাশ বা স্প্রে করতে হয়। বাস্কেটে গাদাগাদি করে খাবার রাখলে বাতাস চলাচল করতে পারে না বলে রান্না অমসৃণ হয়; তাই বড় পরিবারের জন্য বাস্কেট মডেলে কয়েকবারে রান্না করা প্রয়োজন পড়ে, যা সময়সাপেক্ষ। এ ছাড়া এয়ার ফ্রায়ারগুলো সাধারণত ১২০০ থেকে ২২০০ ওয়াটের হয়ে থাকে, যার নিয়মিত ব্যবহারে বিদ্যুৎ বিলে প্রভাব পড়ে।
আজ থেকে দুই দশক আগে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের আগমন যেভাবে আমাদের খাবার গরম করার অভ্যাস বদলে দিয়েছিল, কিংবা ওয়াশিং মেশিন যেভাবে কাপড় ধোয়ার কষ্ট দূর করেছে; সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এয়ার ফ্রায়ারও সেভাবেই আধুনিক নগরজীবনে রান্নার একটি নতুন সংস্কৃতি তৈরি করছে।
দায় স্বীকার: হাভার্ড টিএইচ চ্যাপ স্কুল অব পাবলিক হেলথ; ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন; মায়ো ক্লিনিক

 নাঈমা তাসনিম
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top