ফিচার I বিশ্বকাপের শহরে স্বাদের সফর
মাঠের তুমুল উত্তেজনার বাইরেও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখো সমর্থকের মাঝে চলছে স্বাদের এক অন্য রকম বিশ্বকাপ! স্থানীয় রন্ধনশৈলী, জীবনধারা ও কালিনারি ঐতিহ্যের বৈচিত্র্য মিলিয়ে প্রতিটি আয়োজক শহর স্বতন্ত্র পরিচয় তুলে ধরছে বিশ্বমঞ্চে
উত্তর আমেরিকান তিন প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি ভেন্যুতে বসেছে ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মহা আসর। এই আয়োজন শুধু ফুটবলের মহোৎসবই নয়; বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতি ও নগরজীবনের এক আকর্ষণীয় মানচিত্রও।
মেক্সিকো
প্রাচীন ঐতিহ্য ও মসলার জাদু
ফুটবলের প্রতি আবেগের কথা উঠলে মেক্সিকোর নাম আসে প্রথম সারিতে। এ দেশের খাবারের মূল ভিত্তি প্রাচীন আজটেক ও মায়া সংস্কৃতির সঙ্গে স্প্যানিশ উপনিবেশের মেলবন্ধন। রাজধানী মেক্সিকো সিটি ইতিহাস ও আধুনিকতার এক অপূর্ব মিলনস্থল। এখানকার স্ট্রিট ফুডের রাজা ট্যাকোস আল পাস্টর। গেল শতকের ত্রিশের দশকে লেবানিজ অভিবাসীদের হাত ধরে মেক্সিকোতে শাওয়ারমার আদলে স্পিট-রোস্টেড বা ঝুলন্ত আগুনে মাংস পোড়ানোর রীতির আগমন ঘটে। মেক্সিকানরা এতে যুক্ত করেন শুকনা মরিচ, মসলা ও আনারস। কর্ন টরটিলার ওপর পাতলা করে কাটা মেরিনেট করা পর্ক অথবা গরুর মাংস এবং ওপরে মিষ্টি আনারসের টুকরা, ধনেপাতা ও পেঁয়াজকুচি দিয়ে তৈরি এই ট্যাকো শহরটির প্রাণবন্ত জীবনযাত্রার প্রতীক। মারিয়াচি সংগীত ও টাকিলার জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত এই প্রাচীন শহর। এখানকার গর্ব হলো বিরিয়া। এটি মূলত হালিস্কো অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী মসলাদার স্টু বা স্যুপজাতীয় পদ। খাসি বা গরুর মাংস ভিনেগার, শুকনো গুয়াজিলো মরিচ, রসুন, তেজপাতা, জিরা ও থাইম দিয়ে দীর্ঘ সময় মেরিনেট করে রাখা হয়। এরপর মাটির পাত্রে কয়লার ধিমে আঁচে মাংস একদম নরম ও রসাল হওয়া পর্যন্ত রান্না করা হয়। বিরিয়ার সঙ্গে যে সুস্বাদু ঝোল তৈরি হয়, তাতে টরটিলা ডুবিয়ে খাওয়ার রাজকীয় স্বাদ ফুটবলভক্তদের ক্লান্তি নিমেষে দূর করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্র
অভিবাসীদের ফিউশন ও স্মোকি বারবিকিউ
একেকটি মার্কিন শহর স্বাদ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে একেবারে আলাদা। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ছোঁয়ায় এখানকার খাদ্যসংস্কৃতি প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হচ্ছে।
নিউইয়র্ক
বিশ্বের অন্যতম গতিময় এ শহর যেন পুরো পৃথিবীর স্বাদকে একচিলতে মানচিত্রে ধারণ করেছে! ইতালিয়ান অভিবাসীদের হাত ধরে আসা ক্রিস্পি ও পাতলা ক্রাস্টের নিউইয়র্ক স্টাইল পিৎজা এবং ইহুদিদের ঐতিহ্যবাহী বেগাল বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। তবে শহরটির আসল সৌন্দর্য এর বহুসাংস্কৃতিক স্ট্রিট ফুডে। ম্যানহাটানের এক রাস্তাতেই ইতালিয়ান পাস্তা, কোরিয়ান বারবিকিউ, ভারতীয় চাট কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের হালাল ফুড কার্ট পাওয়া যায়। আর চঞ্চল নাগরিক জীবনে সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে কফির কাপ যেন এখানকার নাগরিকদের ফুসফুস!
লস অ্যাঞ্জেলেস
হলিউডের এই শহর স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং আধুনিক খাদ্যসংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। মেক্সিকোর কোলঘেঁষা হওয়ায় এখানে মেক্সিকান-আমেরিকান ফিউশন কুজিন বেশ জনপ্রিয়, যার সেরা উদাহরণ ফিশ ট্যাকোস। পাশাপাশি, ক্যালিফোর্নিয়ার রোদ-ঝলমলে সকালে স্বাস্থ্যকর নাশতার অপর নাম অ্যাভোকাডো টোস্ট। হোল-হুইট বা টক স্বাদের সাওয়ারডু ব্রেড টোস্ট করে তার ওপর ফ্রেশ ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাভোকাডো ম্যাশ, সামান্য লেবুর রস, সামুদ্রিক লবণ ও চিলি ফ্লেক্স ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ওপরে চেরি টমেটো ও পোচড এগ দিয়ে পরিবেশিত এই টোস্ট এখন গ্লোবাল ট্রেন্ড।
কানসাস সিটি
আমেরিকার বারবিকিউ ক্যাপিটালখ্যাত এই শহরের বারবিকিউ কালচারের মূল বৈশিষ্ট্য লো অ্যান্ড স্লো পদ্ধতি; অর্থাৎ ওক বা হিকরি কাঠের ধোঁয়ায় অত্যন্ত ধিমে আঁচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে মাংস পুড়িয়ে নরম করা। বিশেষ করে মাংসের চর্বিযুক্ত অংশ পুড়িয়ে বার্ন্ট এন্ডস এবং টমেটো ও গুড়ের তৈরি ঘন, মিষ্টি আর ঝাল সস—এ ধরনের খাদ্য কানসাস সিটিকে ভোজনরসিকদের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় স্থানে পরিণত করেছে।
কানাডা
বহুজাতিক সমাজ ও শীতের ওম
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যময় অভিবাসী সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এ দেশের রন্ধনশৈলী গড়ে উঠেছে।
টরন্টো
এটি বিশ্বের অন্যতম বহুজাতিক শহর, যেখানে দুই শতাধিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। এখানকার আইকনিক খাবার পিমিল বেকন স্যান্ডউইচ, যা ভুট্টার গুঁড়ায় মোড়ানো চর্বিহীন পর্ক দিয়ে তৈরি এবং সেন্ট লরেন্স মার্কেটে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে টরন্টোর বিশেষত্ব, একই দিনে এখানকার লিটল ইতালিতে পাস্তা, চায়নাটাউনে ডিমসাম এবং লিটল জ্যামাইকায় ক্যারিবিয়ান জার্ক চিকেনের আসল স্বাদ নেওয়া সম্ভব।
ভ্যানকুভার
সমুদ্র ও পাহাড়ঘেরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের এই শহর টাটকা সি-ফুডের জন্য বিখ্যাত। বিশেষত প্যাসিফিক স্যালমন ফিশ গ্রিল কিংবা স্মোকড করে খাওয়ার ঐতিহ্য এখানকার আদিবাসীদের সময় থেকে চলে আসছে। এশীয় অভিবাসীদের বিপুল উপস্থিতির কারণে এ শহরে জাপানি সুশি ও চীনা রন্ধনশৈলীর প্রভাব স্পষ্ট। ভ্যানকুভারের নিজস্ব উদ্ভাবন বিসি রোল, যা গ্রিলড সালমন স্কিন ও সুইট সস দিয়ে তৈরি এক অনন্য সুশি।
মন্ট্রিয়ল
ফরাসি ঐতিহ্যের ছাপ বহনকারী এ শহরকে বলা হয় উত্তর আমেরিকার প্যারিস। এখানকার আইকনিক খাবার পাউটিন। ক্রিস্পি ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের ওপর টাটকা পনিরের টুকরো ছড়িয়ে, তার ওপর গরম ও ঘন ব্রাউন গ্রেভি সস ঢেলে এটি পরিবেশন করা হয়। গ্রেভির উত্তাপে পনিরের টুকরোগুলো যখন আংশিক গলে যায়, সেই স্বাদ অতুলনীয়। এ ছাড়া কাঠের আগুনে সেঁকা হালকা মিষ্টি স্বাদের মন্ট্রিয়ল বেগাল এ শহরের আরেকটি পরিচয়।
ফুটবল বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর দিক এটি নানা দেশ ও সংস্কৃতির মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। ২০২৬ সালের এই মেগা আসরে স্টেডিয়ামে যেমন বিভিন্ন দেশের পতাকা উড়ছে, তেমনি রেস্তোরাঁ, ক্যাফে আর স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলোতেও দেখা যাচ্ছে সংস্কৃতির এক অনন্য কোলাজ। মেক্সিকোর ঝাল ট্যাকো, নিউইয়র্কের চিজ পিৎজা কিংবা মন্ট্রিয়লের গরম পাউটিন—প্রতিটি খাবারই একেকটি শহরের ইতিহাস, ভূগোল ও মানুষের জীবনযাত্রার গল্প শোনায়। কারণ, কখনো কখনো কোনো একটি দেশকে জানার সবচেয়ে চমৎকার ও সুস্বাদু উপায় হলো স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া!
দিলজান নাহার চাঁদনী
ছবি: ইন্টারনেট
