ফিচার I মসৃণে মগ্ন
ত্বকের একেক জায়গায় একেক টোন, অপ্রত্যাশিত দাগ, ডার্ক সার্কেল, রোদে পোড়া ভাব, আর ক্ষতিগ্রস্ত স্কিন ব্যারিয়ার; এত অমসৃণতা প্রায়শই হয়ে ওঠে বিরক্তির কারণ
আনইভেন। অর্থাৎ অসম। ত্বকের ক্ষেত্রে টোন ও টেক্সচারের ওপর নির্ভর করে এটি। স্বাভাবিক রং, গঠন, পুরুত্ব ও মসৃণতা—সব ঠিকঠাক থাকলে ত্বক ইভেন, আর না থাকলেই আনইভেন। নানা কারণে এমন হতে পারে ত্বক। নিউইয়র্কভিত্তিক স্কিন এক্সপার্ট নিল শুলৎজের মতে, প্রধানত গঠন ও রঙের কারণে ত্বক অমসৃণ দেখায়। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মার্কিন ফ্যাশন ম্যাগাজিন বার্ডিকে তিনি বলেন, শরীরের কোষে উৎপন্ন রঞ্জক পদার্থের কারণে ত্বক আনইভেন দেখাতে পারে। এই রঞ্জক পদার্থের নাম মেলানিন, যা ত্বকের রং নির্ধারণ করে। যত বেশি মেলানিন, তত বেশি গাঢ় দেখায় ত্বক। ত্বকের কিছু অংশ যদি অন্য অংশের চেয়ে বেশি মেলানিন তৈরি করে, তখন সেখানে ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। এতে ত্বকের টোন আনইভেন দেখাতে পারে। সূর্যরশ্মি ত্বকের মেলানিন উৎপাদনের ক্ষমতা ত্বরান্বিত করে। এতে ত্বকে সানস্পট ও বিবর্ণতা দেখা দিতে পারে। ব্রণ, বাহ্যিক আঘাত, কেটে যাওয়া, চুলকানি ইত্যাদি ছাড়াও প্রদাহের কারণে দাগ তৈরি হতে পারে ত্বকে। এ ছাড়া হরমোনও একটি কারণ; যেমন মেলাজমা থেকেও ত্বকে ডার্ক প্যাচ সৃষ্টি হতে পারে। ত্বকের ব্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হলে, স্বাভাবিক এক্সফোলিয়েশন বা মৃতকোষ ঝরে যেতে না পারলেও ত্বকের গঠন আনইভেন দেখায়। এই সমস্যা প্রায় সর্বজনীন। ধরা দিতে পারে নারী, পুরুষ—সবার ত্বকে। থাকতে পারে অনেক দিন।
এক্সফোলিয়েশন
ত্বকের মৃতকোষ দূর করার প্রক্রিয়া এটি। এতে ত্বকের উপরিভাগ ও রোমকূপ পরিষ্কার হয় এবং ত্বক মসৃণ আর উজ্জ্বল দেখায়। প্রাকৃতিকভাবে ত্বক মৃতকোষ ঝেড়ে ফেলতে পারে। তবে সব সময় তা সমানভাবে হয় না। ফলে ত্বকের গঠন আনইভেন দেখায়। যে অংশে মৃতকোষ জমে, সেই অংশকে খানিকটা কালচে দেখাতে পারে। এ সমস্যা দূর করতে কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েন্ট ব্যবহার করা সম্ভব। এএইচএ, বিএইচএ, গ্লাইকোলিক অ্যাসিড, স্যালিসাইলিক অ্যাসিড—এগুলোর যেকোনো একটি এক্সফোলিয়েন্টের কাজ করতে সক্ষম। সপ্তাহে দু-তিনবার ব্যবহারে মৃতকোষ দূর হয়ে ত্বক হতে পারে মসৃণ।
প্রফেশনাল পিলিং
অতিরিক্ত অমসৃণ ত্বকের জন্য প্রফেশনাল পিলিংয়ের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা, জানা যায় নিল শুলৎজের বয়ানে। তার মতে, এতে উপরিভাগ পুরোপুরি বদলে নতুন ত্বক পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে বেছে নেওয়া সম্ভব গ্লাইকোলিক অ্যাসিড পিল। তবে শুলৎজ সতর্ক করেন, যাদের ত্বক অতিমাত্রায় সক্রিয়, তাদের জন্য পিলিং খুব একটা নিরাপদ নয়। কারণ, অনেক গ্লাইকোলিক পিলের সমস্যা হলো, যদি সেগুলো যথেষ্ট মৃদু না হয়, তবে সারিয়ে তুলতে বেশি সময় নেওয়ার পাশাপাশি জ্বালাপোড়া ও লালচে ভাবের উদ্রেক ঘটায়। তাই ফেশিয়াল পিল খুব মৃদু হওয়া এবং পিলিং করতে চাইলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া চাই।
ভিট সি
ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে পারে ভিটামিন সি। এটি মেলানিনের প্রভাব কমাতে সক্ষম। ফলে ত্বকের টোন মসৃণ দেখায়। আনইভেন ত্বক ঠিক করতে ব্যবহার করা সম্ভব ভিটামিন সি যুক্ত সেরাম, ক্রিম বা টোনার। তবে এই ভিটামিনের অসুবিধা হলো, এর গুণমান দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং অক্সিডাইজ হয়ে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। তাই দিনের বেলায় নয়; বরং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় ভিটামিন সি ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
সান ডিফেন্স
আনইভেন ত্বক প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে সানস্ক্রিন বা সানব্লক। আজকাল সান-প্রোটেকটিভ এসপিএফ-যুক্ত ক্রিম ছাড়াও পাওয়া যাচ্ছে সানব্লক, স্প্রে, বডি লোশন ও সানস্টিক। বাইরে যাওয়ার অন্তত ১৫ মিনিট আগে সানস্ক্রিনের প্রলেপ দিলে সূর্যরশ্মি থেকে ত্বকের সুরক্ষা অনেকটা নিশ্চিত হয়। ত্বক অনুযায়ী বেছে নেওয়া যেতে পারে কেমিক্যাল বা মিনারেল সানস্ক্রিন। নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের টোন ও টেক্সচার মসৃণ থাকতে পারে।
হাইড্রোকুইনোন
ত্বকযত্নের অন্যতম বিতর্কিত উপাদান এটি। সাধারণত ফ্রেকলস, ডার্ক স্পট এবং মেলাজমার মতো তীব্র অমসৃণভাব হালকা করতে এটি ব্যবহারের পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। শুলৎজের মতে, ত্বকে অতিরিক্ত মেলানিন পিগমেন্ট তৈরি হয়ে আটকে থাকায় ডার্ক স্পট হয়। নিয়মিত এক্সফোলিয়েট না করলে মৃতকোষের স্তর জমতে থাকে এবং হাইপারপিগমেন্টেশন তৈরি করে। এ সমস্যা দূর করতে চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করা যেতে পারে হাইড্রোকুইনোন।
নো পিকিং
কথায় আছে, যত কম ছোঁয়া যায়, ত্বক ততই ভালো থাকে। তাই খোঁটানোর স্বভাব বাদ দিতে হবে! ত্বকে ছোট ব্রণ দেখলেই অনেকে সেটি খুঁটিয়ে দাগ বানিয়ে ফেলেন। এতে ত্বক আনইভেন হয়ে পড়ে। এই দাগ যেতে সময় লাগে বেশ। তাই তাদের জন্য নো পিকিং রুল মাস্ট!
মেকআপ টিপস
আনইভেন ত্বক সারাইয়ে নিখুঁত স্কিন কেয়ার রুটিন থাকলেও একরোখা দাগগুলো যেতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন মেকআপ। ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়শ্চারাইজার, সেরাম ও প্রাইমার দিয়ে বেস তৈরি করে নিয়ে তারপর কালার কারেকশন করা ভালো। চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল ও কালচে ভাবের স্থানে অরেঞ্জ বা পিচ রঙের কালার কারেকশন ব্যবহার করা যেতে পারে; বিশেষ করে ব্রাউন টোনের স্কিনে। আর সবুজ কালার কারেক্টর দিয়ে ব্রণ ও লালচে ভাব ঢাকা সম্ভব। কালার কারেকশনের পর কনসিলার ব্যবহার করলে অনেকটাই উধাও হয়ে যেতে পারে দাগগুলো। এরপর বেইজ মেকআপ করলেই হলো।
আনইভেন ত্বক বেশ স্বাভাবিক ব্যাপার। ডার্মাটোলজি-বিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৫০ শতাংশ এ সমস্যায় ভোগেন। এটি কোনো রোগ নয়; তাই দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সমস্যা অনুযায়ী নিয়মিত ত্বকযত্ন করলে এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ সম্ভব।
বিউটি ডেস্ক
মডেল: রহমান সিনথিয়া
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
