নখদর্পণ I বাইট ফাইট
খেলার উত্তেজনায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় যত্নে করা মেনিকিউর কিংবা প্রিয় দলের অনুপ্রেরণায় আঁকা নেইল আর্ট। ফুটবল-জ্বরের এই অদ্ভুত অভ্যাস, এর মনস্তত্ত্ব এবং নখ বাঁচানোর কার্যকর কিছু উপায়ের বয়ানে দিলজান নাহার চাঁদনী
ফিফা বিশ্বকাপ। টানটান উত্তেজনা। পর্দার সামনে থাকা মানুষের হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। প্রিয় দলের গোল হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা। কেউ করছেন প্রার্থনা, কেউ টেনশন। একদম পারফেক্ট ফুটবল ভাইব। ঠিক এমন সময়ে কারও কারও হাতের নখ অজান্তেই চলে যায় মুখে। দাঁতে কাটতে শুরু করেন তারা। তীব্র উত্তেজনার আপাতপ্রকাশ। ভুলেই যান, নখে আঁকা আছে প্রিয় দলের সৃজনশীল পতাকা কিংবা লোগো।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে দাঁতে নখ কাটা খুব চেনা। হাই ভলিউম ম্যাচ হলে তো কথাই নেই। ম্যাচের ফল যা-ই হোক, এরই মধ্যে দাঁতে নখ কেটে সাবাড়! ফুটবল যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি মানসিক চাপও। একটি গোল, অফ সাইড কিংবা পেনাল্টি—সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে উচ্ছ্বাসকে উদ্বেগে, আবার উদ্বেগকে স্বস্তিতে বদলে দিতে পারে। নেইল বাইটিং বা নখ কামড়ানো সেই উদ্বেগেরই ফল। মনোবিজ্ঞানে পাওয়া তথ্য মতে, দীর্ঘদিন ধরে নখ কামড়ানোর অভ্যাসকে বলে ওনিকোফ্যাগিয়া। এটি বডি ফোকাসড রিপিটিটিভ বিহেভিয়ার; যা সাধারণত উৎকণ্ঠা, চাপ, অস্থিরতা কিংবা একঘেয়েমির সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণা বলছে, বিশ্বের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই অভ্যাসে আক্রান্ত হয়। অনেকে বুঝতেই পারেন না, তারা নখ কামড়াচ্ছেন। এটি অবচেতনভাবে চাপ সামলানোর একটি উপায়।
বিশ্বকাপের সময় মানেই উত্তেজনার পাহাড়। একজন আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স কিংবা ইংল্যান্ড-সমর্থকের কাছে ম্যাচের ফল অনেক সময় ব্যক্তিগত। যখন প্রিয় দল চাপে পড়ে, দর্শকের শরীরেও স্ট্রেস রেসপন্স সক্রিয় হয়। হাত ঘামা, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, পা নাড়ানো কিংবা নখ কামড়ানো সেই প্রতিক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ। শেষ মুহূর্তের গোল, নাটকীয় কামব্যাক, রেড কার্ড কিংবা বিতর্কিত অফসাইড—বিশ্বকাপের ইতিহাসে রয়েছে এমন অসংখ্য উত্তেজনাকর মুহূর্ত। এগুলো দর্শকদের মানসিকভাবে এমনটাই জড়িয়ে ফেলে যে তারা নিজেদের অজান্তেই রিপিটিটিভ বিহেভিয়ারের আশ্রয় নেন।
তবে এই অভ্যাস শুধুই হাস্যকর বা বদভ্যাস নয়, দীর্ঘদিন নখ কামড়ানোর ফলে আঙুলের ত্বক ও কিউটিক্যাল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা ফাঙ্গাল ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ায়। দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির সমস্যা এমনকি নখের স্থায়ী বিকৃতিও ঘটায়। অনেক ক্ষেত্রে নখের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এবং হাতের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। এসব থেকে রেহাই পেতে প্রথমত, নিজের ট্রিগার চিহ্নিত করা চাই। খেয়াল করে দেখুন, কোন পরিস্থিতিতে আপনার নখ কামড়ানোর প্রবণতা বাড়ে। তারপর সেসব পরিস্থিতি বিশেষভাবে সামলানোর চেষ্টা চালানো যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, হাতকে ব্যস্ত রাখুন। স্ট্রেস বল, পেন বা যেকোনো কিছু রাখতে পারেন হাতে। যখন স্ট্রেস ফিল হবে কিংবা নখ কামড়ানোর প্রবণতা বাড়বে, তখন এগুলো ব্যবহার করুন। মাইন্ডফুল ব্রিদিংও এ ক্ষেত্রে ভালো কাজে লাগে। নিয়ম করে প্রাণায়াম করলে মস্তিষ্ক থাকে শান্ত।
খুব ভালো একটি হ্যাক হতে পারে এক্সপেনসিভ মেনিকিউর, যা নষ্ট হওয়ার চিন্তা থাকবে মাথায়। এর ফলে নখ কামড়ানো এড়িয়ে যাবেন অবচেতনেই! এ ছাড়া বিটার টেস্টিং নেইলপলিশ প্রয়োগ করতে পারেন, যা দাঁতের স্পর্শে মুখে দেবে তিক্ত স্বাদ। রোধ করবে দাঁতে নখ কাটা। আরও যোগ করা যেতে পারে রিস্ট ব্যান্ড। সেখানে সৌন্দর্য বাড়াতে পারে রিমাইন্ডিং কিছু চার্ম। লেখা থাকতে পারে, ‘নো বাইটিং’।
নখের বিশেষ যত্ন এ ক্ষেত্রে দিতে পারে সমাধান। নখ ছোট রাখা, সুন্দর শেপ বা ডিজাইন করা। নখের এক্সারসাইজ মেনিকিউর, যা আপনার দাঁতে কাটা রোধ করবে অনায়াসে। সে ক্ষেত্রে যেতে পারেন ভালো কোনো স্যালনে কিংবা নিজেই করে নিতে পারেন ঘরে বসে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন কালার নেইল পেইন্ট, হোয়াইট কোটিং আর পছন্দমতো অনুষঙ্গ। যাতে নেইল বিউটি পেতে পারে আরও এক ধাপ বেশি সৌন্দর্য। হতে পারেন এক্সপার্টের শরণাপন্নও। নিরাময় ও প্রতিরোধের জন্য যিনি আপনাকে মেডিটেশন ও মেডিকেশন—দুটোরই পরামর্শ দিতে সক্ষম।
হয়তো পরেরবার কোনো ফুটবল ম্যাচ অতিরিক্ত রোমাঞ্চকর হয়ে উঠবে। স্কোরলাইন হবে অনিশ্চিত, অফসাইড কল নিয়ে জন্ম নেবে বিতর্ক, আর শেষ মিনিট পর্যন্ত থাকবে শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষা। তখন নিজের হাতকে রাখুন প্রিয় দলের ফ্ল্যাগ ধরে রাখার আর চিয়ার করার কাজে মগ্ন! কারণ, সত্যিকারের বিশ্বকাপ জ্বর শুধু মাঠে নয়, অনেক সময় নেইল টিপেও ধরা পড়ে।
ছবি: সংগ্রহ
