skip to Main Content

ফরহিম I গ্লো ফ্লো

ঘাম, রোদ আর ধুলাবালিতেই যেন পুরুষের নিত্য চলাচল। খেলাধুলায় তা আরও দৃশ্যমান। ফুটবল মাঠের কাদামাটি-ঘাসের সঙ্গে বোঝাপড়া, ক্রিকেট নেটের তপ্ত রোদ, জিমের ভারী ব্যায়াম কিংবা ভোরের আলোয় দীর্ঘ দৌড়—শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিটি ধাপেই ত্বক ও চুলকে যেতে হয় চরম পরীক্ষার মধ্য দিয়ে

দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল, খেলাধুলা বা কঠোর পরিশ্রম মানেই স্বাস্থ্যকর জীবন। তাই গ্রুমিং বা রূপচর্চার প্রয়োজন নিয়ে আলাদা করে ভাবনার চল ছিল কম। আধুনিক বিজ্ঞান এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। বিজ্ঞান বলছে, যারা নিয়মিত খেলাধুলা বা ভারী ব্যায়াম করেন, তাদের ত্বক ও চুল সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষের তুলনায় দ্বিগুণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।
শরীরচর্চার সময় ঘাম হওয়া একটি জরুরি জৈবিক প্রক্রিয়া। এটি অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে শরীরকে শীতল রাখে। কিন্তু যখন এই ঘাম দীর্ঘক্ষণ ত্বকে জমে থাকে, তখনই সমস্যা তৈরি হয়। মানুষের ত্বকের স্বাভাবিক পিএইচ মাত্রা ৪ দশমিক ৭ থেকে ৫ দশমিক ৭৫-এর মধ্যে, যা সামান্য অম্লীয়। অতিরিক্ত ঘামের কারণে এই মাত্রা পরিবর্তিত হয়ে ত্বক অ্যাসিডিক হয়ে পড়ে, যা ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। পুরুষের ত্বকে টেস্টোস্টেরন হরমোনের আধিক্যের কারণে তেলগ্রন্থি বা সিবাম উৎপাদনকারী গ্রন্থিগুলো নারীর তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি সক্রিয় থাকে। যখন আউটডোর স্পোর্টসের সময় বাতাসে ভেসে থাকা ধূলিকণা এবং মরা চামড়া এই অতিরিক্ত সিবাম ও ঘামের সঙ্গে মেশে, তখন তৈরি হয় একধরনের আঠালো স্তর। এটি রোমকূপের মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। ফলে তৈলাক্ততা এবং ঘামের কারণে সৃষ্ট ব্রণ, ব্ল্যাকহেডস, ফলিকুলাইটিস এবং বিভিন্ন ধরনের ফাঙ্গাল ইনফেকশন দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাধুলার পর ঘাম শুকিয়ে গেলে ত্বকের ওপর সোডিয়াম ক্লোরাইড, ইউরিয়া ও ল্যাকটিক অ্যাসিডের একটি আস্তরণ পড়ে। এটি প্রাকৃতিক আর্দ্রতা শুষে নিয়ে ত্বককে শুষ্ক, খসখসে ও অতি সংবেদনশীল করে তোলে। তাই শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়; খেলা শেষে ত্বকের গভীর পরিচ্ছন্নতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাচীন অলিম্পিয়ানদের গ্রুমিং প্রথা
আজকের যুগে স্পোর্টস গ্রুমিং বা স্কিন কেয়ারকে আধুনিক ফ্যাশন মনে করা হলেও এর শিকড় ইতিহাসের গভীরে। প্রাচীন অলিম্পিক যুগে অ্যাথলেটরা মাঠে নামার আগে শরীরে খাঁটি জলপাই তেল ও বালির একটি মিশ্রণ মেখে নিতেন। ইংরেজিতে এর নাম ছিল গ্লো দ্য অ্যাথলেট। এটি তাদের ত্বককে তীব্র রোদ ও ধুলাবালু থেকে রক্ষা করত। খেলা শেষে তারা স্ট্রাইজিল নামক একটি বিশেষ বাঁকানো ধাতব স্ক্র্যাপার দিয়ে শরীর থেকে ঘাম, ধুলা ও তেলের সেই আস্তরণ চেঁছে পরিষ্কার করে কুসুম গরম পানিতে গোসল করতেন। রোমান সাম্রাজ্যের গ্ল্যাডিয়েটর ও অ্যাথলেটদের মধ্যেও গোসল ও ত্বক পরিচর্যার বিশেষ ঐতিহ্য ছিল। তারা অনুশীলনের পর খনিজসমৃদ্ধ থার্মাল বাথে উষ্ণ প্রস্রবণে সময় কাটাতেন এবং শরীর শীতল রাখতে ল্যাভেন্ডার ও পুদিনার নির্যাস ব্যবহার করতেন। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও তুরস্কের প্রাচীন হাম্মাম সংস্কৃতিতে শরীরচর্চা বা যুদ্ধের মহড়ার পর বাষ্পীয় গোসল এবং স্ক্রাবিংয়ের মাধ্যমে শরীর ও ত্বকের ক্লান্তি দূর করার চল ছিল। এভাবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বীরত্ব ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বরাবরই একে অপরের পরিপূরক।
বিশ্বসেরা দুই খেলোয়াড়ের উদাহরণ
আধুনিক যুগের বিশ্বসেরা অ্যাথলেটরা ভালো করেই জানেন, মাঠের পারফরম্যান্সের মতোই তাদের বাহ্যিক উপস্থিতি এবং ত্বকের সুস্থতাও ব্র্যান্ড ভ্যালু ও আত্মবিশ্বাসের অংশ।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
বিশ্ব ফুটবলের এই অন্যতম ফিট অ্যাথলেট তার কঠোর স্কিন কেয়ার রুটিনের জন্য পরিচিত। পর্তুগিজ এই ফরোয়ার্ড ক্যারিয়ারের সিংহভাগ সময় কাটিয়েছেন খোলা মাঠে, তীব্র রোদ আর ঘামের মধ্যে। রোনালদো এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি প্রতিদিন অনুশীলনের পরপরই চারকোল-সমৃদ্ধ ফেসওয়াশ দিয়ে ত্বক পরিষ্কার এবং বরফ-শীতল পানিতে গোসল করেন। এটি তার পেশির ক্লান্তি দূর করার পাশাপাশি ত্বকের রোমকূপ টানটান রাখে এবং অতিরিক্ত সিবাম নিয়ন্ত্রণ করে। এ ছাড়া তিনি নিয়মিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ সেরাম এবং এসপিএফ ৫০ প্লাস সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন, যা চল্লিশোর্ধ্ব বয়সেও তার ত্বকে অকালবার্ধক্যের ছাপ পড়তে দেয়নি।
বিরাট কোহলি
ভারতীয় ক্রিকেট সুপারস্টার বিরাট কোহলি তার ফিটনেস ও গ্রুমিং সেন্সের জন্য যুবসমাজের আইকন। ক্রিকেটের দীর্ঘ ফরম্যাটের কোনো কোনো ম্যাচে টানা ৭-৮ ঘণ্টা কড়া রোদে ফিল্ডিং করতে হয়। কোহলি তার স্কিন কেয়ার নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, মাঠে নামার আগে তিনি কখনোই ত্বকে নন-গ্রেসি, ওয়াটারপ্রুফ সানস্ক্রিনের প্রলেপ নিতে ভোলেন না। এ ধরনের প্রলেপ ঘামে ধুয়ে যায় না। এ ছাড়া দিল্লির শুষ্ক আবহাওয়া এবং মুম্বাইয়ের আর্দ্রতায় ত্বকের ভারসাম্য বজায় রাখতে তিনি প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে হাইড্রেটিং ময়শ্চারাইজার ও আন্ডার-আই ক্রিম ব্যবহার করেন। সুশৃঙ্খল জীবনযাপন ও স্কিন কেয়ারের ফলেই তীব্র রোদেও তার ত্বক থাকে উজ্জ্বল ও দাগহীন।
চুলের চ্যালেঞ্জ
ক্রিকেটারদের হেলমেট, সাইক্লিস্টদের ক্যাপ কিংবা জিমে ব্যবহৃত হেডব্যান্ড—এই স্পোর্টস গিয়ারগুলো পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে জরুরি হলেও চুলের জন্য বিপদ ডেকে আনে। দীর্ঘ সময় হেলমেট বা ক্যাপ পরে থাকলে মাথার ত্বকে বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সেখানে ঘাম ও শরীরের স্বাভাবিক উত্তাপ মিলে একধরনের গ্রিনহাউস ইফেক্ট তৈরি করে। এই অতিরিক্ত আর্দ্রতায় ম্যালাসেজিয়া নামক ফাঙ্গাস দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে, যা তীব্র খুশকি, চুলকানি ও স্ক্যাল্পে ইনফেকশনের মূল কারণ। এ ছাড়া হেলমেটের অনবরত ঘর্ষণে গোড়া দুর্বল হয়ে চুল পড়ে যেতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ট্র্যাকশন অ্যালোপেসিয়া বলা হয়।
চুল সুরক্ষায়
প্রতিদিন তীব্র ক্ষারযুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করলে স্ক্যাল্পের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে যায়, ফলে চুল রুক্ষ ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। এর পরিবর্তে সপ্তাহে তিন দিন মৃদু বা স্পোর্টস-ফ্রেন্ডলি সালফেট-মুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করা মঙ্গল। খেলার কিংবা গোসলের পর ভেজা চুলে দীর্ঘক্ষণ থাকা ঠিক নয়। কেননা ভেজা চুল ফাঙ্গাস ও ব্যাকটেরিয়ার উপযুক্ত প্রজনন ক্ষেত্র। তাই দ্রুত চুল শুকিয়ে নেওয়া জরুরি। হেলমেটের ভেতরের প্যাডিং, ক্যাপ বা হেডব্যান্ড সপ্তাহে অন্তত একবার অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল লিকুইড দিয়ে পরিষ্কার করা শ্রেয়। কেননা অপরিচ্ছন্ন স্পোর্টস গিয়ার থেকে স্ক্যাল্পের রোগ ছড়ানোর হার সবচেয়ে বেশি।
ফিনিশিং গ্লো
আজকের গতিময় বিশ্বে স্পোর্টস স্কিন কেয়ার কোনো বিলাসিতা কিংবা একচেটিয়াভাবে নারীদের বিষয় নয়; এটি অ্যাথলেটিক জীবনযাত্রার একটি অপরিহার্য ও বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন। মাঠের পারফরম্যান্স যেমন কঠোর পরিশ্রমের ফসল, তেমনই সুস্থ ত্বক ও চুল হলো নিয়মানুবর্তিতা ও আত্মযত্নের প্রতিফলন। তাই মাঠে নিখুঁত গোল করা, নেটে বাউন্ডারি হাঁকানো, জিমে নতুন পারসোনাল রেকর্ড গড়া কিংবা ভোরে কয়েক কিলোমিটার দৌড় শেষ করার পাশাপাশি প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিনিট বরাদ্দ রাখা যেতে পারে নিজের ত্বক ও চুলের জন্য।

 নাঈমা তাসনিম
মডেল: সানা
মেকওভার: পারসোনা মেনজ
ছবি: কৌশিক ইকবাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top