skip to Main Content

টেকসহি I ইকো গেম

গ্যালারির সীমানা পেরিয়ে আজকাল হাই ও স্ট্রিট ফ্যাশন র‌্যাম্পেও চলছে ফুটবল ফ্যাশনের দাপট। বিশ্বজুড়ে আগ্রহ বেড়েছে দলের রং ও চিহ্নখচিত পোশাকে। বাণিজ্যিক মার্চেন্ডাইজিংয়ের এই বিশাল জাঁকজমকের পরিবেশগত মূল্য জানাচ্ছেন আনিকা তায়্যিবা

স্পোর্টস ফ্যাশন এখন নিছক স্টাইল স্টেটমেন্ট নয়; বরং পরিবেশগত উদ্ভাবনের এক জোরালো প্ল্যাটফর্ম। ফিফা এবং বৈশ্বিক স্পোর্টস ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলো ইকো-ফ্রেন্ডলি জার্সি, এথিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারিং আর পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামাল ব্যবহারের মতো যুগান্তকারী ধারণাগুলো সাদরে গ্রহণ করছে। এভাবেই স্টাইল ও সাসটেইনেবিলিটি হাত ধরাধরি করে হাঁটছে ফুটবল ফ্যাশনের নতুন যুগে।
পরিবেশ পর্ব
ফুটবল ফ্যাশন ও মার্চেন্ডাইজের ক্ষেত্রে সাসটেইনেবিলিটির সহজ অর্থ হলো, একটি জার্সি বা বুট তৈরির জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে সেটি ব্যবহার শেষে বাতিল হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবেশ ও সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সর্বনিম্ন রাখা। স্পোর্টসওয়্যার বা খেলার পোশাক প্রধানত তৈরি হয় ভার্জিন পলিয়েস্টারে, যা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদিত একধরনের সিনথেটিক ফাইবার। কৃত্রিম এই ফাইবার মাটিতে মিশতে সময় নেয় শত শত বছর। তত দিনে এর প্রভাব পড়ে পরিবেশ প্রকৃতিতে। বিশ্বকাপ বা ক্লাব ফুটবলের নতুন মৌসুম এলেই প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফ্যান জার্সি উৎপাদিত হয়। এতে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ, রাসায়নিক বর্জ্যের বিস্তার এবং অপরিমিত পানির অপচয় ঘটে। কাপড়ে রং করার প্রক্রিয়ায় নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক সরাসরি মেশে নদী ও সাগরে। সিনথেটিক কাপড় থেকে নির্গত মাইক্রোপ্লাস্টিক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়ায় সামুদ্রিক প্রাণ-প্রকৃতিতেও। আড়ম্বরপনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ফ্যাশনের জন্য চড়া মূল্য চোকায় প্রকৃতি, যা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে স্পোর্টস ব্র্যান্ডগুলো।
হাওয়া বদল
পরিবর্তনের হাওয়া এরই মধ্যে বইতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ময়দানে। স্পোর্টসওয়্যারের ক্ষেত্রে টেকসই বা লো ইমপ্যাক্ট ম্যাটেরিয়ালের ব্যবহার ফ্যাশন দুনিয়ার অন্যতম আলোচিত বিষয়। গ্লোবাল স্পোর্টস ব্র্যান্ডগুলো ভার্জিন পলিয়েস্টারের বদলে রিসাইকেলড ম্যাটেরিয়াল ব্যবহারের দিকে জোর দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে অ্যাডিডাস এবং পার্লে ফর দ্য ওশানসের যুগান্তকারী কোলাবোরেশনের কথা বলা যায়। সমুদ্রের তলদেশ থেকে উদ্ধার করা প্লাস্টিকের বোতল এবং পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল দিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখের মতো শীর্ষ ক্লাবগুলোর জন্য তৈরি করেছে চোখধাঁধানো সব ইকো-ফ্রেন্ডলি জার্সি। পিছিয়ে নেই নাইকিও। তাদের ‘মুভ টু জিরো’ ক্যাম্পেইনের আওতায় ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ব্রাজিল, ফ্রান্স ও পর্তুগালের মতো দলগুলোর জন্য যে জার্সি তৈরি করেছিল, তা ছিল শতভাগ পুনর্ব্যবহৃত পলিয়েস্টারে তৈরি। পুমা তাদের ‘রি:জার্সি’ প্রজেক্টের মাধ্যমে পুরোনো বাতিল পোশাককে নতুন জার্সির সুতোয় পরিণত করছে, যা ‘গার্মেন্ট টু গার্মেন্ট’ রিসাইক্লিংয়ের এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। কে জানে আপনার গায়ে জড়ানো প্রিমিয়াম জার্সিটিও হয়তো কয়েক বছর আগে ভারত মহাসাগরে ভাসমান কোনো প্লাস্টিকের বোতল ছিল! এ ছাড়া শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো এখন ডোপ বা ওয়াটারলেস ডায়িংয়ের মতো উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে, প্রথাগত পদ্ধতির তুলনায় যা পানির ব্যবহার প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমায়।
টেকসই তত্ত্ব
বৈশ্বিক ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা তাদের সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা সম্পর্কে এখন অনেক বেশি সোচ্চার। ফিফার অফিশিয়াল সাসটেইনেবিলিটি গাইডলাইন এবং তাদের ফুটবল ইউনাইটস দ্য ওয়ার্ল্ড ভিশন অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে তারা শূন্য কার্বন নিঃসরণের জন্য একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ফিফার টুর্নামেন্টগুলোতে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এখন শুধু সিএসআর বা করপোরেট দায়বদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি বাধ্যতামূলক। তাদের সাসটেইনেবল সোর্সিং কোড অনুযায়ী, ফিফার অফিশিয়াল টুর্নামেন্ট কালেকশন এবং ফ্যান মার্চেন্ডাইজ তৈরির ক্ষেত্রে সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি রাখা হয়। কারখানার শ্রমিকদের জন্য বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কাজের পরিবেশ কতটা নিশ্চিত এবং উৎপাদনের কারণে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে কি না, এই বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়েও ফিফা তাদের মেগা-ইভেন্টগুলোতে আপস্ট্রিম বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সরাসরি কাজ করে। ফিফার এই কঠোর নীতির কারণে সহযোগী ব্র্যান্ডগুলোও তাদের উৎপাদন ব্যবস্থায় এথিক্যাল ফ্যাশনের মানদণ্ড বজায় রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
গ্রিনওয়াশিংয়ের ফাঁদ
ফুটবল ফ্যাশনের পরিবেশবান্ধব যাত্রায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্নটির নাম গ্রিনওয়াশিং। অনেক ব্র্যান্ডই নিজেদের ইকো-ফ্রেন্ডলি বা সাসটেইনেবল দাবি করে আকর্ষণীয় প্রচারণা চালায়। কিন্তু অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে দেখা যায়, তাদের মূল উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপাদানের ব্যবহার খুব একটা কমেনি। ধরা যাক, কোনো ব্র্যান্ড সামান্য কিছু রিসাইকেলড ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে একটি গ্রিন ক্যাপসুল কালেকশন বাজারে এনে ব্যাপক জনসংযোগ চালাল। অথচ একই সময়ে তারা লাখ লাখ সাধারণ ক্ষতিকর জার্সি ও বুট উৎপাদন অব্যাহত রাখল। এই দ্বিমুখী নীতি মূলত ক্রেতাদের সঙ্গে একধরনের প্রতারণা এবং এতে টেকসই উদ্যোগের আসল প্রভাব নামে শূন্যের কোঠায়। তাই স্পোর্টস ফ্যাশনে সাসটেইনেবিলিটির দাবিগুলো কতটা কার্যকর, নাকি নিছকই বিপণন কৌশল—তা নিয়ে সমালোচক ও পরিবেশবাদীরা নতুন করে ভাবছেন এবং সরব হচ্ছেন।
রিপেয়ার, রিইউজ, রিসাইকেল
ফুটবল ফ্যাশনের ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ নির্ভর করছে কোটি কোটি ফুটবল ফ্যানের লাইফস্টাইল ও ফ্যাশন চয়েসের ওপর। তাই তারাই হয়ে উঠতে পারেন পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতার প্রত্যাশী। কথা তুলতে পারেন সার্কুলার ফ্যাশন নীতি নিয়ে। রিইউজ, রিপেয়ার ও বায়িং লেসের মতো অভ্যাসগুলো নিজেদের লাইফস্টাইলে যুক্ত করতে পারেন। তা ছাড়া ভিনটেজ বা রেট্রো ফুটবল জার্সি সংগ্রহ করা এখন বিশ্বজুড়ে অভিজাত ফ্যাশন ট্রেন্ড। প্রতিটি টুর্নামেন্টে স্রেফ ট্রেন্ডের জোয়ারে গা ভাসিয়ে নতুন জার্সি না কিনে খুঁজতে পারেন থ্রিফট স্টোর বা সেকেন্ড-হ্যান্ড মার্কেটপ্লেস। এতে ফ্যাশনেবল থেকেও কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো যায়।
ছবি: সংগ্রহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top