কভারস্টোরি I ফ্যাশনে ফুটবল ফুয়েল
৬০০ কোটি মানুষ চোখ রাখছে ফুটবলে, ধারণা বিশেষজ্ঞদের। ১০৫ মিটারের মাঠ পেরিয়ে ফিফা ভাইব ছুঁয়েছে ফ্যাশন বিশ্বকেও। তৈরি হয়েছে নিউ লাক্সারি প্লে গ্রাউন্ড। সারাহ্ দীনার বয়ানে বাজারের সেই বিশাল কলেবরের কিয়দংশ এখানে
সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় পৃথিবী। জানা কথা, তাই তো? আর ঠিক চার বছর পরপর ফুটবলকে কেন্দ্র করে যেন আবর্তিত হয় পৃথিবীর সবকিছু। ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের টাইমে এতটাই মশগুল হয় মানুষ। সব ছাপিয়ে মেইন ক্যারেক্টার গোলের খেলা। একই মন্ত্রে ফ্যাশন ও ফুটবল মিলেমিশে একাকার—এই এক লাইনে শেষ হয় না ব্যাখ্যা; বরং বলতে হয় বৈশ্বিক এই ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ঘিরে বসে ফ্যাশনের বিশাল আয়োজন। ব্যতিক্রম হয়নি এবারও। অ্যাডিডাস ট্রিয়োন্ডা নামের বল নিয়ে খেলা ইতিমধ্যে জমে ক্ষীর। ফ্যাশনবোদ্ধাদের চোখও সেখানে।
বিলিয়ন ডলার স্টাইল গেম
৪৮টি দল এবং ১০৪টি ম্যাচের এবারের টুর্নামেন্টে নাইকি, অ্যাডিডাস ও পুমা—এই তিন বড় ব্র্যান্ডই বাজারের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। বহু আগে থেকে জার্সি শুধু মাঠের পোশাকের পরিচয়ে আটকে নেই; দৈনন্দিন স্ট্রিট ফ্যাশনের অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ডিজাইনার কোলাব, রেট্রো রিলিজ এবং লিমিটেড এডিশন ড্রপের মাধ্যমে ফুটবল জার্সি একটি কালচারাল স্টেটমেন্টে রূপ নিয়েছে। এই পুরো পরিবর্তন দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপ হলো ফুটবল, ফ্যাশন, মিডিয়া ও ডিজিটাল কালচারের মিলনে গড়ে ওঠা একটি বিলিয়ন ডলারের হাইব্রিড লাইফস্টাইল ইকোনমি।
ওয়্যারড্রোব বুম
চলতি বিশ্বকাপ এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন স্ট্রিটওয়্যার ও ফুটবল সংস্কৃতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ঢের বেশি একত্রিত। আমেরিকান নাইকি ও জার্মান অ্যাডিডাস থেকে শুরু করে বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউসগুলো—সবাই এখন নতুন প্রজন্মের ফুটবল-সমর্থকের স্টাইলকে সংজ্ঞায়িত করার প্রতিযোগিতায় মত্ত। ফুটবল জার্সি, ট্র্যাক জ্যাকেট এবং দলীয় প্রতীকগুলো তরুণদের সংস্কৃতি, সংগীত, পরিচয় ও আত্মপ্রকাশের ভাষায় পরিণত হয়েছে। ফ্যাশন ও ফুটবলের এই মেলবন্ধনে স্পষ্ট হয়েছে, আধুনিক ক্রীড়া সংস্কৃতি এখন মাঠের বাইরেও সমান শক্তিশালী। ফুটবল স্পোর্টসওয়্যারের বাজার খেলার পোশাকের সীমানা ছাপিয়ে একটি ডেটা-ড্রিভেন, ডিজিটাল এবং বৈশ্বিক ইকোসিস্টেমে রূপ নিয়েছে। ডিরেক্ট-টু-কনজিউমার প্ল্যাটফর্ম, অ্যাপভিত্তিক ড্রপ এবং সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর রিলিজ স্ট্র্যাটেজি এ বেলা ঐতিহ্যবাহী হোলসেল কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ভোক্তার সঙ্গে ব্র্যান্ডের সম্পর্ক তৈরি করছে। ফুটবল স্পোর্টসওয়্যার তৈরি হচ্ছে হালকা পলিয়েস্টার মেশ, ইলাস্টিন-ইন্টিগ্রেটেড ফোর-ওয়ে স্ট্রেচ এবং থার্মাল রেগুলেশন সক্ষম ফ্যাব্রিক দিয়ে, যা উচ্চ-তীব্রতার খেলায় পারফরম্যান্স নিশ্চিত করে। এই পুরো ইন্ডাস্ট্রি আবার কঠোর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যেও সক্রিয়। কিটের ব্র্যান্ডিং ও ফ্যাব্রিক স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করে, রাসায়নিক ব্যবহার সীমিতকরণের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব বিকল্পগুলোকে বাধ্যতামূলক করছে ফিফার ইকুইপমেন্ট রেগুলেশন। একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের পোশাকের নিরাপত্তা মান নিয়ন্ত্রণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থা। ফলে টেকসই উপকরণ, রিসাইকেলড ফাইবার এবং বায়ো-বেসড ইলাস্টিন এখন শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে রত।
ফিফা কোর ফিলিংস
বাজারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটছে ভোক্তার আচরণে। অ্যাপ-ড্রপ কালচার এবং মেম্বারশিপ-বেসড এক্সক্লুসিভ রিলিজ এখন স্কারসিটি ইকোনমি তৈরি করছে, যেখানে বিশেষ কিট ও লিমিটেড এডিশন পণ্য দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল এবং ইউরোপের বাজারে এই প্রবণতা সবচেয়ে শক্তিশালী; কারণ, সেখানে ফুটবল সংস্কৃতি দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সব মিলিয়ে ফুটবল স্পোর্টসওয়্যার শুধু পারফরম্যান্স গিয়ার হিসেবে বিবেচ্য নয়; প্রযুক্তি, ফ্যাশন, রেগুলেশন ও ডিজিটাল কমার্সের দ্রুত বিকশিত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। যেখানে জার্সি, বুট ও প্রযুক্তি একসঙ্গে তৈরি করছে নতুন ধরনের ভোক্তা সংস্কৃতি। এর ফলে এটি স্ট্রিটওয়্যার, কনসার্ট লুক, ফেস্টিভ্যাল আউটফিট তো বটেই; এমনকি দৈনন্দিন জীবনের স্টাইল স্টেটমেন্টও হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনকে ফ্যাশনবোদ্ধারা নাম দিয়েছেন ফিফা কোর। ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী জার্সি, ক্রেস্ট আর স্পোর্টস সিলুয়েটগুলো যখন শহুরে ফ্যাশনের সঙ্গে মিশে যায়, তখন তা শুধু খেলাধুলার পরিচয় নয়; বরং একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক ভাষা হয়ে ওঠে। মাঠের আবেগ মিশে যায় রাস্তায়, মানুষের ব্যক্তিগত স্টাইলে এবং গ্লোবাল ইয়ুথ কালচারে।
ফিল্ড টু মুডবোর্ড
ফ্যাশন জগতে স্পোর্টি বা অ্যাথলেইজার অ্যাসথেটিকস একসময় হয়তো আলাদা করে চিহ্নিত ছিল; কিন্তু ধীরে ধীরে সেটি পারসোনাল স্টাইল ল্যাঙ্গুয়েজে রূপ নিয়েছে। বিখ্যাত আইরিশ ফ্যাশন ডিজাইনার সাইমন রোসার ফল-উইন্টার ২০২৬ শোতে এই পরিবর্তনই স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। যেখানে অ্যাডিডাসের সঙ্গে কোলাবোরেশনে ট্র্যাক জ্যাকেট থেকে শুরু করে মোটিফনির্ভর স্পোর্টস অ্যাকসেসরিজকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়। উদাহরণে বলা যায় পার্ল জিপার বা ক্রিস্টাল এমব্রয়ডারির মতো নান্দনিক সংযোজনের কথা।
স্পোর্টসওয়্যার মিক্সড স্টাইলের দিকে এগিয়েছে এবার। সোশ্যাল মিডিয়া ও পপ কালচারের প্রভাবে জার্সি জুটিবদ্ধ হচ্ছে স্কার্ট, ফ্লেয়ার্ড সিলুয়েট বা ফরমাল অ্যাকসেসরিজের সঙ্গে। তৈরি করছে নতুন ধরনের ফ্যাশন ল্যাঙ্গুয়েজ, যেখানে নিয়মের চেয়ে ব্যক্তিত্বই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বকাপ-অনুপ্রাণিত ফুটবল সংস্কৃতি। এদিকে পিন্টারেস্টের সাম্প্রতিক ট্রেন্ড রিপোর্টে দেখা গেছে, ওয়ার্ল্ড কাপ জার্সি-সম্পর্কিত সার্চ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফুটবল ফ্যানডম ওয়ার্ল্ড কাপ শার্ট, ব্রাজিল শার্ট আউটফিট ফর উওম্যান, মেক্সিকো জার্সি আউটফিট ইত্যাদি আছে সেই তালিকায় শীর্ষে। আবার, মার্কিন ফ্যাশন ডিজাইনার উইলি চাভেরিয়া এবং অন্য ডিজাইনাররাও স্পোর্টসওয়্যারকে রানওয়েতে তুলে এনে ফুটবলকে হাই ফ্যাশনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করছেন। স্প্যানিশ লাক্সারি ব্র্যান্ড লোয়েভে নিজ দেশের জাতীয় দলের জন্য ইউনিফর্ম তৈরি করেছে। উরুগুয়ের ইউনিফর্ম ডিজাইন করেছে গ্যাব্রিয়েলা হারস্ট। ব্রাজিলকেন্দ্রিক টুগেদার উই প্লে ক্যাপসুলের মাধ্যমে বিশ্বকাপকে ফ্যাশন কালেকশনের অংশে পরিণত করছে ফার্ম রিও।
লেজেন্ড মিটস লেবেল
ফুটবল ও ফ্যাশন কোলাবের চূড়ান্ত প্রকাশ দেখা যাচ্ছে এ সময়ে। বিশ্ববিখ্যাত লেবেলগুলো একসময় মডেল, সংগীতশিল্পী ও অভিনয়শিল্পীতেই বুঁদ ছিল। সেখানে এসেছে পরিবর্তন। আবার এক ব্র্যান্ডও অন্য ব্র্যান্ডের সঙ্গে একত্রে নিচ্ছে সিদ্ধান্ত।
নাইকি X জ্যাকুমাস
পারসিয়ান লাক্সারি লেবেল জ্যাকুমাসের সঙ্গে মিলে বিশ্বখ্যাত লেবেল নাইকি তৈরি করেছে একটি বিশেষ লাইফস্টাইল কালেকশন। শুধু ফ্রান্সের জাতীয় দলের জন্য। মিনিমালিস্ট প্রি-ম্যাচ জার্সি রেখেছে প্রোডাক্ট লাইনে; যার রং গাঢ় রয়্যাল ব্লু। সেখানে লাল ও সাদা পিন স্ট্রাইপ উপস্থিত। এর সঙ্গে ফুটবল কিটে দেখা গেছে জ্যাকুমাসের রানওয়ে ডিএনএ ক্রেস্ট।
অ্যাডিডাস X থ্রাশার
এই যৌথ উদ্যোগ ফুটবল ঐতিহ্য ও স্কেট সংস্কৃতির এক চমৎকার মেলবন্ধন। আর্জেন্টিনার ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জার্সি থেকে অনুপ্রাণিত ডায়মন্ড-প্যাটার্ন ডিজাইনকে কেন্দ্র করে তৈরি নয়টি পণ্যের এই ক্যাপসুল কালেকশন শুধু নস্টালজিয়ার পুনরাবৃত্তি নয়; বরং থ্রাশারের প্রয়াত সহপ্রতিষ্ঠাতা ফাউস্তো ভিতেল্লোর আর্জেন্টাইন শিকড়ের প্রতিও শ্রদ্ধাঞ্জলি।
অ্যাডিডাস X কিথ X লিওনেল মেসি
আডিডাস, কিথ ও মেসির কোলাবে পাওয়া গেছে বিশ্বকাপ প্রভাবিত বিলাসবহুল ফ্যাশনের খোঁজ। প্রোডাক্ট লাইনে আছে বিশেষভাবে তৈরি ট্র্যাক জ্যাকেট, সুয়েড সাম্বা স্নিকার এবং মিনিমালিস্ট কো-ব্র্যান্ডেড জার্সি, যা ক্রীড়া ও উচ্চমানের স্ট্রিটওয়্যারের মধ্যে একটি পরিশীলিত সংযোগ গড়ে দেয়। ফুটবল-প্রাণিত পোশাক যে শুধু সমর্থক নয়, বরং আধুনিক ফ্যাশনপ্রেমীদের কাছেও আকর্ষণীয় হতে পারে, এই সহযোগিতা তারই প্রমাণ।
নাইকি X ভার্জিল আবলো
নাইকি ও ভার্জিল আবলো আর্কাইভের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই কোলাবোরেশন ফুটবল ও ফ্যাশনের ইতিহাসকে নতুনভাবে দেখার এক সৃজনশীল প্রয়াস। এবারের আগে সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপের যে আসরের আয়োজন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, তা ঘিরে আমেরিকাধর্মী স্মৃতিকাতর নান্দনিকতাকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে এই সংগ্রহে। ভিনটেজ স্পোর্টসওয়্যার, সাহসী গ্রাফিকস এবং আমেরিকান পপ-কালচারের উপাদানগুলোকে নিয়ে ভার্জিল আবলোর নিরীক্ষাধর্মী নকশা দেখা গেছে সেখানে।
নাইকি X প্যালেস স্কেটবোর্ডস
নাইকি ও প্যালেস স্কেটবোর্ডসের সহযোগিতায় ইংল্যান্ড ফুটবলের ঐতিহ্যকে লন্ডনের স্কেট সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করেছে এক আধুনিক স্টাইল ভাষা। সংগ্রহটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক প্রতীক সেন্ট জর্জ’স ক্রস, যেটিকে নতুনভাবে হাজির করা হয়েছে স্লিম-ফিট এবং সোয়েট-উইকিং পারফরম্যান্স পোশাকে। ফুটবলের জাতীয় পরিচয় এবং স্কেটবোর্ডিংয়ের স্বাধীনচেতা মনোভাবকে একত্র করে এই একাত্মবোধ জানান দেয়, কীভাবে স্পোর্টসওয়্যার আজ মাঠের পাশাপাশি দৈনন্দিন স্ট্রিট স্টাইলেও পাচ্ছে গুরুত্ব।
অ্যাডিডাস X উইলি চাভারিয়া
উইলি চাভারিয়া ও অ্যাডিডাস মিলে তৈরি করেছে এক বিশেষ সংগ্রহ, সরল বাংলায় যেটির শিরোনাম দাঁড়ায় ‘স্বপ্ন দিয়েই শুরু’। এই সংগ্রহে মেক্সিকান ফুটবল সংস্কৃতি, কমিউনিটির গর্ব এবং লাতিন পরিচয়ের উপাদানগুলোকে চাভারিয়ার সাহসী সিলুয়েট ও সমসাময়িক নকশার ভাষার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। জার্সি, ট্র্যাকসুট ও ফুটওয়্যার আছে এই প্রোডাক্ট লাইনে।
রানওয়ে টু গ্যালারি
এবারের বিশ্বকাপ ঘিরে কলেবরে বেড়েছে বাজার। এই পারদ ফাইনালে ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার স্পর্শ করবে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি ইউরোমনিটরের তথ্য মতে, এ বছর ফুটবল স্পোর্টসওয়্যার মার্কেটের মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে। একই সঙ্গে পারফরম্যান্স ফ্যাব্রিকের উদ্ভাবন বিশেষ করে ময়শ্চার-উইকিং পলিয়েস্টার ব্লেন্ড এবং রিসাইকেলড নাইলন পণ্যের প্রযুক্তিগত মান নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এই চাহিদার কেন্দ্রে রয়েছে ব্রাজিল, যেখানে ফুটবল সংস্কৃতি খেলার গণ্ডিতে আটকে না থেকে দৈনন্দিন জীবন ও ফ্যাশন চয়েসের মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। ফলে বিভিন্ন স্তরের ভোক্তার কাছে প্রিমিয়াম কিট ও ফুটবল-প্রাণিত পোশাকের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে, যা বাজার সম্প্রসারণকে করেছে আরও বেগবান।
গোলস অ্যান্ড গ্ল্যামার
স্টোন আইল্যান্ডের ব্যাজ, অ্যাডিডাস সাম্বা, ফ্রেড পেরির পোলো শার্ট, বাকেট হ্যাট—ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত এই স্টাইল উপাদানগুলো দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় হলেও, এগুলোকে কখনোই উচ্চ ফ্যাশনের প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখা হয়নি। কিন্তু ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ঘিরে সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোজুড়ে আয়োজিত এই আসর পরিণত হয়েছে বিলাসবহুল ফ্যাশনের অন্যতম আলোচিত ক্ষেত্রে। বড় বড় ফ্যাশন হাউস ও স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড শুধু জার্সি নয়; খেলোয়াড়দের মাঠের বাইরের উপস্থিতি ও ব্যক্তিগত স্টাইল নিয়েও প্রতিযোগিতায় মেতেছে। ফলে খেলার পাশাপাশি ফ্যাশন, পরিচয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে ফুটবল।
তিনটি ভিন্ন দেশে চলমান বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আসর। একাধিক টাইম জোন, ভাষা ও সংস্কৃতিকে যুক্ত করা এই আয়োজন ঘিরে ফিফার আশাবাদ, বিশ্বের প্রায় ৬০০ কোটি মানুষ অন্তত একটি করে ম্যাচ দেখবে। ফলে এটি ব্র্যান্ডগুলোর জন্য এক বিশাল বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক মঞ্চে রূপ নিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে ফ্যাশন জগতের বড় নামগুলোও ফুটবলের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক আরও গভীর করেছে। স্পেনের জাতীয় দলের জন্য পুরুষ ও নারী—উভয় স্কোয়াডের ভ্রমণ পোশাক ডিজাইন করতে চার বছরের অংশীদারত্ব ঘোষণা করেছে লোয়েভে। অন্যদিকে ফ্রান্সের জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইমন পোর্ত জ্যাকুমাসের ব্র্যান্ড জ্যাকুমাস। যেখানে ম্যাচ ডে পোশাক ও নস্টালজিয়া অনুপ্রাণিত ফুটওয়্যার ডিজাইন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত ডিজাইনার ভার্জিল আবলোর সৃজনশীল উত্তরাধিকার সামনে রেখে ইউএসএ টিমের জন্য বিশেষ জার্সি ও স্নিকার্স তৈরি করেছে ভার্জিল আবলো আর্কাইভ টিম। একই সঙ্গে সমর্থকদের জন্যও আনা হয়েছে বিশেষ পোশাক সংগ্রহ। এদিকে ইতালিয়ান মেনজওয়্যার ব্র্যান্ড বোগি মিলানো ফিফার অফিশিয়াল ফরমালওয়্যার পার্টনার হিসেবে খেলাধুলা ও টেইলারিংয়ের সংযোগকে আরও দৃশ্যমান করেছে। সাধারণ ক্রেতাদের জন্যও একটি বিশেষ ক্যাপসুল কালেকশন উন্মোচন করেছে এই লেবেল। এসব উদ্যোগ স্পষ্ট করে, ২০২৬ বিশ্বকাপ মাঠের পাশাপাশি ফ্যাশন রানওয়েতেও সমান গুরুত্ব নিয়ে উপস্থিত।
তবে ফুটবল ও ফ্যাশনের সম্পর্কের শুরু কোনো বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউসের বোর্ডরুমে নয়। লোয়েভে, জ্যাকুমাস কিংবা অন্যান্য লাক্সারি ব্র্যান্ড মাঠে নামার বহু আগেই ফুটবল সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল স্টাইল। গেল সত্তরের দশকের শেষ ভাগ এবং আশির দশকে ব্রিটেনের স্টেডিয়াম গ্যালারিতে জন্ম নেয় ক্যাজুয়াল প্রটেস্ট, যেখানে তরুণ ফুটবল-সমর্থকেরা দলীয় স্কার্ফ ও রেপ্লিকা জার্সির পরিবর্তে বেছে নিতে শুরু করেন ডিজাইনার পোশাক ও আমদানি করা স্পোর্টসওয়্যার। লিভারপুল ও ম্যানচেস্টারের শ্রমজীবী তরুণদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতিতে লাকোস্ট, সার্জিও ট্যাকিনি, ফিলা, এলেসে এবং অ্যাডিডাসের মতো ব্র্যান্ডগুলো একধরনের মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়। সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিদ বিল ওসগারবি মনে করেন, এই আন্দোলনের মূল আকর্ষণ ছিল পরিশীলিত ও ব্যয়বহুল স্টাইলের প্রতি দুর্নিবার মোহ।
ফুটবল সমর্থকেরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে শুরু করেন হাইএন্ড স্পোর্টসওয়্যার ও ডিজাইনার ব্র্যান্ডের মাধ্যমে। অন্যদিকে লেখক ফিল থর্নটনের মতে, ফুটবল ফ্যাশনকে শুধু গ্যালারির সংস্কৃতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তার ভাষ্যে, এটি একটি চক্রাকার খেলা; প্রতি নতুন মৌসুম, নতুন ব্র্যান্ড এবং নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে ফুটবল-অনুপ্রাণিত স্টাইল নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। সেই ধারাবাহিক বিবর্তনের ফলই আজকের ফুটবল অ্যাসথেটিক কোরগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে। যেখানে এই খেলা আদতে জার্সি, ট্র্যাক জ্যাকেট বা স্নিকার সমর্থনের প্রতীক তো বটেই; বৈশ্বিক ফ্যাশন পরিচয়েরও অংশ। দুই বিশেষজ্ঞের মত থেকে জানা যায়, ফুটবল-সমর্থকদের কাছে স্টাইলের গুরুত্ব খেলাটির প্রায় সমান ছিল। গ্যালারিতেও পোশাক ছিল পরিচয়, মর্যাদা এবং নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরার একটি মাধ্যম। এবারে সেই প্রবণতা কমেনি, বরং আরও শক্তিশালী হয়েছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে চলতি শতকের দ্বিতীয় দশকে স্পোর্টসওয়্যারের বৈশ্বিক উত্থান। ব্যালেন্সিয়াগা ও অফ হোয়াইটের মতো ব্র্যান্ডগুলো একে হাই ফ্যাশনের অংশ করে তুলেছে। বিলাসবহুল স্নিকার ও ব্র্যান্ড কোলাবরেশনের সংস্কৃতি ফুটবল-অনুপ্রাণিত ফ্যাশনের জন্য নতুন পথ তৈরি করে। ভোক্তাদের আগ্রহও সেই পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলে। গত বছরের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্রেতা লাক্সারি ও স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ডের যৌথ সংগ্রহে আগ্রহী।
অ্যাসথেটিক অ্যালগরিদম
চলতি বিশ্বকাপ ঘিরে ফুটবল সংস্কৃতির ফ্যাশন-শক্তি আরও স্পষ্ট হওয়ার আরেকটি কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এখনকার ফুটবলাররা শুধু ক্রীড়াবিদ নন; বৈশ্বিক লাইফস্টাইল আইকনও। টানেল ওয়াক, ম্যাচ-পরবর্তী পোশাক, ব্যক্তিগত স্টাইল কিংবা কোচদের উপস্থিতি—সবকিছুই এ সময়ে অনলাইনে বিশ্লেষণ ও আলোচনার বিষয়। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি স্টাইল পাচ্ছে সমান মনোযোগ। স্পেনের বিপক্ষে খেলায় প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দেশ কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোজিনিয়া একের পর এক গোল ঠেকিয়ে ম্যাচসেরা হওয়ার পাশাপাশি ইনস্টাগ্রামেও হয়ে ওঠেন টক অব দ্য মোমেন্ট। ওই সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ফলোয়ার একলাফে ৫০ হাজার থেকে পৌঁছে যায় কয়েক মিলিয়নে। তার পরনের জার্সিটির সঙ্গে মিশে আছে বাংলাদেশের নাম। ইয়াংওয়ান করপোরেশনের সাপ্লাই করা ফ্যাব্রিকে এটি ঢাকায় তৈরি করেছে কাপেল্লি স্পোর্ট নামের অ্যাথলেটিক অ্যাপারেল ব্র্যান্ড। ফিফাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই জোয়ারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে তারা টিকটককে প্রথমবারের মতো প্রেফারড প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যুক্ত করেছে, যাতে ভক্তরা ম্যাচের বাইরের গল্প, পর্দার আড়ালের মুহূর্ত এবং লাইভ কনটেন্ট আরও সহজে দেখতে পারেন।
লোগো টু লাইফস্টাইল
বিশ্বকাপ ঘিরে ফ্যাশন হাউসগুলো শুধু অভিজাত খেলোয়াড়দের নিয়ে পরিকল্পনা না সাজিয়ে, সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও রেখেছে কেন্দ্রবিন্দুতে। যেমন ডেভিড ও ভিক্টোরিয়া বেকহামের ছেলে রোমিও বেকহাম সম্প্রতি ফুটবল-অনুপ্রাণিত ক্যাম্পেইন ‘আ গুড স্পোর্ট’-এর ফেস হিসেবে কাজ করেছেন, যেখানে ইংল্যান্ডের তারকা খেলোয়াড় এবেরেশি এজে, ডেকলান রাইস এবং লিয়া উইলিয়ামসনের সঙ্গে দেখা গেছে তাকে। এরই ধারাবাহিকতায় গুচিকে ২০২৭ সাল থেকে আলপাইন ফর্মুলা ১ টিমের টাইটেল স্পনসর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে লাক্সারি ব্র্যান্ড এলভিএমএইচ ফর্মুলা ১-এর সঙ্গে ১০ বছরের একটি ঐতিহাসিক অংশীদারত্বে প্রবেশ করেছে, যার মাধ্যমে লুই ভিতোঁ এবং ট্যাগ হয়ার সরাসরি মোটরস্পোর্টস ইকোসিস্টেমের অংশ হয়ে উঠেছে।
ফুটবল এমন খেলা, যেখানে একটি বল কোটি মানুষের আবেগকে এক সুতোয় বাঁধে। সেই খেলাই যখন ফ্যাশনের সঙ্গে মিশে যায়, তখন তৈরি হয় নতুন বিজয় আখ্যান। ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু চ্যাম্পিয়ন খোঁজার আসর নয়; এটি খুঁজে নিচ্ছে নতুন স্টাইল, পরিচয় এবং ভোক্তা সংস্কৃতিও। একটি জার্সি যেমন একজন সমর্থকের আবেগ বহন করে, তেমনি একটি ডিজাইন বহন করে সময়ের পরিবর্তনের ছাপ। ফুটবল তাই স্কোরলাইনে লেখা সংখ্যার হিসাব পেরিয়ে এমন একটি বৈশ্বিক স্টাইল ইকোসিস্টেমে পরিণত, যেখানে প্রতিটি ডিজাইন, রং এবং সিলুয়েট শোনায় নিজস্ব গল্প।
মডেল: অমৃতা কবির
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: ক্যানভাস
ছবি: জিয়া উদ্দীন
