বিশেষ ফিচার I শু সমাচার
একটি লাফ, স্প্রিন্ট বা নিখুঁত বাঁক—বদলে দিতে পারে ম্যাচের ফল। অ্যাথলেটের দক্ষতার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার জুতাও। আর তা ফ্যাশন স্টেটমেন্টও
একটি ভালো স্পোর্টস শুর পেছনে থাকে জটিল প্রকৌশল ও উপকরণবিজ্ঞান। প্রতিটি জুতার নকশা, কুশনিং, সোল ও উপাদান নির্ধারণ করে ব্যবহারকারীর আরাম ও পারফরম্যান্স। ইতিহাস বলে, স্পোর্টস শুর সূচনা উনিশ শতকের শেষ দিকে। ইংল্যান্ডের ব্র্যান্ড প্লিমসলস প্রথম এমন একটি জুতা তৈরি করে, যা খেলাধুলার জন্য বেশ আরামদায়ক ছিল। এরপর ১৮৯৫ সালে জোসেফ উইলিয়াম ফস্টার তৈরি করেন মেটাল স্পাইক শু। সেটির সোল ছিল ধাতব স্পাইক যুক্ত। এর ফলে ট্র্যাকে গ্রিপ বাড়ে; গতিও। তিনি পরে বিখ্যাত রিবক ব্র্যান্ড চালু করেন। ১৯১৭ সালে আমেরিকান এক রাবার কোম্পানি প্রথম স্নিকার উদ্ভাবন করে কেডস নামে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অ্যাডিডাস ও নাইকির মতো ব্র্যান্ডের আবির্ভাব স্পোর্টস শু শিল্পে বিপ্লব ঘটায়।
রকমফের
ব্যক্তিভেদে যেমন চাহিদা ভিন্ন, তেমনি জুতাও। প্রতিটি খেলাধুলার নিজস্ব চাহিদা রয়েছে। তাই সব স্পোর্টস শু একভাবে তৈরি হয় না।
রানিং শু সাধারণত হালকা ও নরম কুশনিংযুক্ত হয়। দীর্ঘক্ষণ দৌড়ানোর সময় হাঁটু, গোড়ালি এবং পায়ের ওপর চাপ কমানো এর মূল লক্ষ্য। অ্যাথলেটদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এই জুতা।
বাস্কেটবল খেলায় দ্রুত দিক পরিবর্তন এবং লাফ-ঝাঁপ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। তাই বাস্কেটবল শুতে শক্ত গ্রিপ, এক্সট্রা সাপোর্ট এবং অনেক ক্ষেত্রে উঁচু অ্যাঙ্কেল কভারেজ দেখা যায়।
ফুটবলের জন্য তৈরি বুটে থাকে বিশেষ স্টাড বা ক্লিট, যা ঘাস বা আর্টিফিশিয়াল টার্ফে ভালো ট্র্যাকশন দেয়। একই সঙ্গে বল নিয়ন্ত্রণের সুবিধা এবং চমৎকার গ্রিপ নিশ্চিত করে। ফলে ভেজা মাঠেও দৌড়ানো সহজ হয়।
টেনিসে শরীর দুই পাশেই দ্রুত নড়াচড়া করে বলে টেনিস শুতে স্থিতিশীলতা ও টেকসই গঠন বিশেষ গুরুত্ব পায়।
জিম, ক্রস ট্রেনিং কিংবা বিভিন্ন ধরনের ফিটনেস কার্যক্রমের জন্য তৈরি ট্রেনিং শু বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী।
আধুনিক স্পোর্টস শুর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রযুক্তি। একজন দৌড়বিদের পা মাটিতে পড়ার সময় তার শরীরের ওজনের কয়েক গুণ চাপ তৈরি হয়। এই আঘাত কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয় কুশনিং প্রযুক্তি। সে ক্ষেত্রে ইথিলিন ভিনাইল অ্যাসিটেট এবং পলিউরেথেন আজও বহুল ব্যবহৃত উপাদান। বর্তমানে নাইকির এয়ার টেকনোলজি কিংবা অ্যাডিডাসের বুস্ট টেকনোলজি কুশনিংকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
সোল টেকনোলজি
জুতার আউটসোলই নির্ধারণ করে গ্রিপ, স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতা। পাহাড়ি পথ, ট্র্যাক, কোর্ট কিংবা জিম—প্রতিটি পরিবেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের সোল ডিজাইন প্রয়োজন। উন্নত মানের রাবার প্রযুক্তি জুতার পারফরম্যান্সে বড় ভূমিকা রাখে।
ব্রিদেবল শু
অতিরিক্ত ঘাম, তাপ ও আর্দ্রতা পায়ের জন্য ক্ষতিকর। হাইজিন ইস্যু তৈরি করে, পায়ে দুর্গন্ধ হয়। এমনকি র্যাশও হতে পারে। তাই শু ব্রিদেবল হওয়া জরুরি। ফলে মেশ ফ্যাব্রিক ও ফ্লাইনিটের মতো উপাদান ব্যবহার করা হয়। এগুলো বাতাস চলাচল নিশ্চিতের পাশাপাশি পা দীর্ঘ সময় শুষ্ক রাখতে সাহায্য করে। ধারণা করা হয়, এই পদ্ধতির উদ্ভাবক নাইকি। তারাই প্রথম বিশেষ টেকনোলজিতে তৈরি ব্রিদেবল শু বাজারে এনেছে।
স্পোর্টস শু তৈরি করা মানে শুধু সুন্দর দেখতে পণ্য নয়; নকশাকারদের প্রথম কাজ হলো ব্যবহারকারীর প্রয়োজন বোঝা। ম্যারাথন রানার, ফুটবলার ও জিমপ্রেমীর চাহিদা অভিন্ন নয়। প্রথমে গবেষণা, তারপর স্কেচ, উপাদান, প্রোটোটাইপ তৈরি করা এবং অসংখ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে একটি চূড়ান্ত নকশা দাঁড়ায়। স্পোর্টস শুর মূল লক্ষ্য কমফোর্ট। একটি শু কতটুকু আরামদায়ক এবং সেই সঙ্গে দেখতে সুন্দর ও আকর্ষণীয় হতে পারে, তা-ও বিবেচ্য। কারণ, প্রয়োজনের গণ্ডি পেরিয়ে শু এখন ফ্যাশন স্টেটমেন্টও।
ভবিষ্যৎ বিস্তার
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে স্পোর্টস শু আরও স্মার্ট হয়ে উঠছে। কমফোর্ট, কোয়ালিটি, স্টেটমেন্ট—সবকিছু ছাপিয়ে স্পোর্টস শুর দুনিয়া প্রতিনিয়ত বিকশিত হচ্ছে। নতুন নতুন নকশা, উপাদান ও প্রযুক্তি আসছে বাজারে। উনিশ থেকে শুরু করে একুশ শতক—কালের বিবর্তনে স্পোর্টস শুর বাজার বদলেছে বহুবার। কাস্টমাইজড ডিজাইন ফুটওয়্যারে থ্রি-ডি প্রিন্ট যোগ করেছে নতুন মাত্রা। ভবিষ্যতে আরও নতুন প্রযুক্তি বদলে দিতে পারে শু সমাচার।
দিলজান নাহার চাঁদনী
ছবি: সংগ্রহ
