বিশেষ ফিচার I পিচসাইড প্রেস্টিজ
খেলা শুরুর দশ মিনিটেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর হাই কিক। সঙ্গে সঙ্গে গোল! গ্যালারি থেকে টিভির পর্দায় দেখা যাচ্ছে তার বাগদত্তা জর্জিনা রদ্রিগেজকে। সঙ্গীর অর্জনে ভীষণ উচ্ছ্বসিত। সেই মুহূর্ত ছড়িয়েছে ছবিতে আর আলোচনায় তার স্টাইল
খেলোয়াড়দের দিকে তাক করে থাকা ক্যামেরা কবে, কখন আর কীভাবে তাদের ব্যক্তিগত জীবনেও উঁকি দিতে শুরু করেছিল, সেই তথ্য অজানা। বিশেষ করে খেলোয়াড়দের স্ত্রী ও প্রেমিকাদের দিকে। সেখান থেকেই উৎপত্তি ওয়্যাগ ফ্যাশনের। ডব্লিউ, এ, জি—এই তিন ইংরেজি বর্ণ মিলিয়ে নামকরণ ট্রেন্ডটির। যার পূর্ণরূপ, ‘ওয়াইফস অ্যান্ড গার্লফ্রেন্ডস অব অ্যাথলেটস’। ফ্যাশনের এই ধারায় আলোচনার বিষয় খেলোয়াড়দের স্ত্রী ও প্রেমিকাদের সাজপোশাকের স্টাইল।
গ্যালারি গার্লস
বহু বছর আগে ফ্যাশন মঞ্চে রূপান্তরিত হয়েছে খেলার মাঠ। জার্সি, অ্যাথলেইজার থেকে টানেল ফিট, খেলা ছাড়াও কথা হয় ফ্যাশন নিয়ে। পোশাক থেকে চুলের স্টাইল—বাদ পড়ে না কিছুই। অথচ এই সংস্কৃতির শুরুটা হয়েছিল কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই। পৃথিবীর সহজাত নিয়মে। যার কেন্দ্রে ছিল মানুষের প্রবল আগ্রহ আর ব্যবসায়িক মনস্তত্ত্ব। বিশ শতকের শেষ দিকে স্যাটেলাইট টেলিভিশন ঘরে ঘরে পৌঁছানোর পর টিভি প্রোগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল খেলা, যা ধীরে ধীরে হেঁটেছে বাণিজ্যিকীকরণের পথে। তার আগে অবশ্য খেলার খবর আর ছবি মিলত খবরের কাগজে। আলাদা পাতায় ছাপা হতো খেলোয়াড়দের স্টাইলিশ সব ছবি। তাদের যাপিত জীবনের গল্পেও বুঁদ হতেন পাঠকেরা। এরপর এলো মুঠোফোনের যুগ। ইন্টারনেটের কল্যাণে খবরের স্টক ফুরানো যখন দায়, তখন গল্পের শাখা-প্রশাখা গজানো স্বাভাবিক। জনপ্রিয় খেলোয়াড়ের স্ত্রী কিংবা প্রেমিকার তথ্যও রূপ নিতে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ খবরে। গ্যালারিতে আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিলেন এই গ্যালারি গার্লসরা। টিভির পর্দা থেকে খবরের কাগজ, ফ্যাশন পাতা আর ম্যাগাজিনগুলোও একসময় লিখতে শুরু করে ওয়্যাগদের নিয়ে। কোন খেলোয়াড়ের স্ত্রী ও প্রেমিকা কী পরেছেন, কেমন তাদের স্টাইল—এগুলো হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়। তবে তখনো সেটিকে স্পষ্ট করে ওয়্যাগ ফ্যাশন বলা হয়নি।
দ্য ওয়্যার
দুই দশক আগে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় গ্যালারিতে নজর কাড়ে একদল ভীষণ স্টাইলিশ নারী। সবাই ব্রিটিশ। দলের লিডার ইংল্যান্ডের রাইট মিডফিল্ডার ডেভিড বেকহামের স্ত্রী ও সাবেক স্পাইস গার্ল ভিক্টোরিয়া বেকহাম। সঙ্গীর সমর্থনে গ্যালারিতে দেখা যেত তাকে। নিজ দেশের পতাকার অভিজাত লাল রঙের স্কিন-টাইট ট্যাংক টপ, যাতে লেখা ‘ইংল্যান্ড রকস’। সঙ্গে সাদা রঙের শর্টস, লং ব্রাউন বুটস, ওভার-সাইজড শেডেড সানগ্লাস, চকচকে ঘড়ি আর বার্কিন ব্যাগ। ইন্টারনেটে ‘ওয়্যাগ’ লিখে সার্চ করলে ভিক্টোরিয়ার এই ছবি চলে আসে সামনে। গ্যালারিতে তার সঙ্গে এক কাতারে দেখা গেছে আরও কয়েকজন খেলোয়াড়ের স্ত্রী ও প্রেমিকাদের—শেরিল কোল, কলিন রুনি, অ্যালেক্স কুরান, কার্লি জাকার এবং ন্যান্সি ডেল’ওলিও। তখন থেকে খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলগুলো তাদের ‘ওয়্যাগ’ বলে ট্যাগ দিতে শুরু করে। আর তাদের সাজপোশাককে উল্লেখ করা হয় ওয়্যাগ ফ্যাশন হিসেবে।
এর আগেও, ১৯৬৬ ও ১৯৭০-এর ফুটবল বিশ্বকাপের সময় পত্রিকার পাতায় সাদাকালো ছবিতে দেখা যেত ব্রিটিশ ফুটবলারদের স্টাইলিশ স্ত্রী ও প্রেমিকাদের। ১৯৮৬ থেকে ২০০২—ওই আসরগুলোতে ফ্রান্স, ইতালি, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলোর জনপ্রিয় ফুটবলারদের ওয়্যাগদেরও দেখা যেত ট্যাবলয়েডে। তবে ওয়্যাগ হিসেবে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছেন ভিক্টোরিয়া বেকহামই। পরবর্তীকালে নিজের ফ্যাশন লাইনও প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। তার ওয়্যাগ স্টাইল নিয়ে একের পর এক লেখা ছাপা হয়েছে ব্রিটিশ ভোগ ম্যাগাজিনে। উল্লেখ করা হয়েছে ভীষণ ওয়াইটুকে হিসেবে, যেখানে চলতি শতকের সূচনাকালের আবহ ছিল পরিপূর্ণ। এখনো তা-ই। লো-রাইজ জিনস, বড় সানগ্লাস, দলের নাম লেখা টপস, লিমিটেড এডিশন বেল্ট, স্টেটমেন্ট জুয়েলারি আর ডিজাইনার ব্যাগ—ওয়্যাগ প্রসঙ্গ এলে ভিক্টোরিয়ার স্টাইল নিয়ে কথা বলতেই হয়।
ফুটবল ছাড়াও কথা হয় অন্য অ্যাথলেটদের ওয়্যাগদের নিয়েও। বাদ যায় না জনপ্রিয় বাস্কেট বল, টেনিস, ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় কিংবা সাঁতারু, দাবারু বা অলিম্পিক বিজয়ীরা। গ্যালারিতে লাক্সারি ফ্যাশনের প্রদর্শনী করেন তাদের ওয়্যাগরা। কার চেয়ে কে এগিয়ে- সবই হয়ে ওঠে আলোচ্য।
গ্যালারি ছাপিয়ে
ওয়্যাগ ফ্যাশন এখন আর শুধু ওয়্যাগদের মধ্যে আটকে নেই; পরিণত হয়েছে নির্দিষ্ট ফ্যাশন ফর্মুলায়। ওয়্যাগরা সেখানে অনুপ্রেরণা। দলের সঙ্গে মিলিয়ে ক্যাজুয়াল টু ফরমাল, আবার গ্ল্যামারাস—সবই থাকতে পারে তাতে। পারিপাট্য ও পরিশীলিত। কিছুটা সংযত, তবে আত্মবিশ্বাসী। ডেনিম ও ফর্ম ফিটেট, ড্রেস বা গাউন, ডিজাইনার সানগ্লাস, হ্যাট এবং নামীদামি সব বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের পোশাকে দেখা যায় তাদের। সঙ্গীর মতোই পান গিফট ও স্পন্সরশিপ। নিজের মতো স্টাইল করেন সেগুলো। একেকজন একেকভাবে। কারও থাকে ব্যক্তিগত স্টাইলিস্ট। খেলোয়াড়দের ওয়্যাগদের অনেকের আছে নিজস্ব ফ্যাশন লেবেল। সঙ্গীর পরিচয়ের বাইরে নিজ ফ্যাশন সত্তার জন্যও পরিচিতি পান তারা। তাদের স্টাইল নজর কাড়ে সমর্থকদের। সৌন্দর্য বাড়ায় গ্যালারির। ব্রিটিশ ভোগ ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে আলোচিত স্টাইলগুলোর মধ্যে রয়েছে ইংল্যান্ড ক্যামির সঙ্গে ট্রাকার ক্যাপ, ফুটি টপের সঙ্গে মটোক্রস জ্যাকেট, শর্টসের সঙ্গে বুটস, শেডসের সঙ্গে মাইক্রো শর্টস, স্লাওচি বুট কাট প্যান্টের সঙ্গে ওয়েজেস, বেবি টি-শার্টের সঙ্গে জিনস। স্টেডিয়াম স্টাইল বা গেম ডে ড্রেসিং ফ্যাশন ধারায় এগুলো প্রত্যাশিতই; তবে ব্যক্তিগত স্টাইল চয়েসও প্রাধান্য পায় ওয়্যাগ ফ্যাশনে।
ওয়্যাগ মানেই আজকাল সমর্থকেরা খোঁজেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বাগদত্তা জর্জিনা রদ্রিগেজ, লিওনেল মেসির স্ত্রী অ্যান্তোনেলা রোকুজ্জো, নেইমারের প্রেমিকা ব্রুনা বিয়ানকারডিকে। গোলের পর গোলদাতার ওয়্যাগের দিকে চলে যায় ক্যামেরার ফোকাস। তৈরি হয় স্টাইল স্টেটমেন্ট।
আবৃতি আহমেদ
ছবি: সংগ্রহ
