skip to Main Content

সঙ্গানুষঙ্গ I পয়মন্ত পুঁতি

ফ্যাশনের চাকা ঘোরে প্রতিনিয়ত। ট্রেন্ড আসে আর যায়। কিন্তু কিছু বিষয় ঝোঁকের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি আর ইতিহাসের অংশ হয়ে বাঁচে। পুঁতি তেমনই এক চিরন্তন শিল্পকলা

একসময় যা ছিল সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা আর সুরক্ষার প্রতীক; আজ তা বিশ্বজুড়ে ফ্যাশন-সচেতন মানুষের কাছে আত্মপ্রকাশের এক অনবদ্য মাধ্যম। বিশেষ করে ২০২৬ সালের গ্লোবাল ফ্যাশন রানওয়ে থেকে শহরের ব্যস্ত করপোরেট অফিস পর্যন্ত—সবখানেই পুঁতির গয়নার জয়জয়কার। এথনিক অনুষঙ্গের পরিচয় পেরিয়ে, এটি এখন আধুনিক হাই ফ্যাশনের ক্ল্যাসিক তকমাধারী স্টেটমেন্ট।
আদি থেকে ঐতিহ্যে
পুঁতির কাজের ইতিহাস মানবসভ্যতার মতো প্রাচীন। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় ৭৫ হাজার বছরের পুরোনো ঝিনুকের পুঁতি আবিষ্কার করেছেন, যা মানুষের তৈরি প্রাচীনতম অলংকারগুলোর একটি। প্রাচীন মিসরে সোনা, ল্যাপিস লাজুলি আর চিনামাটির মতো উপাদান দিয়ে তৈরি হতো বিশালাকার পুঁতির নেকলেস ও তাবিজ, যা ছিল রাজকীয় ক্ষমতা এবং দেব-দেবী আরাধনার প্রতীক। বিশ্বজুড়ে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর কাছে পুঁতি ছিল জাতিগত পরিচয় প্রকাশের মাধ্যম।
কেনিয়া ও তানজানিয়ার মাসাই নারীদের গলার ভারী, চওড়া পুঁতির নেকলেস শুধু অলংকার নয়; এর রং ও নকশা দেখে বলে দেওয়া যায় পরিধানকারীর বয়স, বৈবাহিক অবস্থা কিংবা সামাজিক অবস্থান। নাইজেরিয়ার ইয়োরুবা রাজারা পরতেন আদে নামের এক বিশেষ পুঁতিখচিত মুকুট, যা ছিল বংশগৌরবের প্রতীক। আমেরিকার আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলো প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং জাতিগত পরিচয়ের জটিল জ্যামিতিক নকশা ফুটিয়ে তুলত তাদের পোশাক ও গয়নায়। পরবর্তীকালে এশিয়া ও ইউরোপের বাণিজ্য পথ এই পুঁতিকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয় ট্রেড বিডস বা বাণিজ্য পুঁতি হিসেবে।
নস্টালজিয়ার মালা
অনেকের শৈশবের সঙ্গে রঙিন পুঁতির স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বড় বড় কাঠের তৈরি বোহিমিয়ানধর্মী থেকে শুরু করে রংধনুর রঙে রাঙানো ছোট ছোট পাথরের তৈরি পুঁতির মালা—মেলা থেকে কেনা সেই সস্তা অথচ অমূল্য গয়না ছিল কারও কারও জীবনের প্রথম ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। সেই দিনগুলোতে ফ্যাশনের ব্যাকরণ ছিল সহজ—‘মোর ইজ মোর’। সমবয়সীদের সঙ্গে চলত এক নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা—কার গলায় কত বেশি পুঁতির মালা ঝুলছে, কার হাত কত রঙিন ব্রেসলেটে ভরপুর! মায়ের সুতোর বাক্স থেকে সুতো চুরি করে, সুইয়ের ডগায় একের পর এক রঙিন পুঁতি গেঁথে নিজের কল্পনার মালা বানানোর মধ্যে ছিল নিখাদ আনন্দ। এই নস্টালজিয়াই আজকের ফ্যাশনের অন্যতম জনপ্রিয় ট্রেন্ড। ওয়াইটুকে ফ্যাশন প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে পুঁতির গয়নাও নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছে গেছে। মিলেনিয়াল ও জেন-জিরা একই সঙ্গে শৈশবের স্মৃতি আর সমসাময়িক ফ্যাশনের মিশেলে বিডেড জুয়েলারিকে করে নিচ্ছেন আপন।
কারুশিল্পের আধুনিক রূপান্তর
আজকের দিনে পুঁতির গয়নার বিপুল জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে এর শৈল্পিক আবেদন এবং পরিবেশ-সচেতনতা। একঘেয়ে প্লাস্টিক কিংবা মেটালের গয়নার বিপরীতে মানুষ খুঁজছে নিজস্বতা। আর এখানেই অনন্য ভূমিকা রাখছে হ্যান্ডমেইড পুঁতির কাজ। স্বাধীন ডিজাইনার ও কারিগরেরা গয়না তৈরিতে ব্যবহার করছেন বৈচিত্র্যময় সব প্রাকৃতিক উপাদান। যেমন বিভিন্ন মূল্যবান রত্নপাথর, মুক্তা, ঝিনুক ও শামুকের খোলস, সিড বিডস ইত্যাদি। আরও আছে টেকসই উপাদান—মাটির পুঁতি, কাঠের পুঁতি, পুনর্ব্যবহারের উপযোগী কাচ প্রভৃতি। এই গয়নাগুলো মূলত স্লো ফ্যাশন আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিটি পুঁতি যেখানে একজন কারিগরের হাত ধরে সুতোয় গাঁথা হয়, সেখানে প্রতিটি গয়না হয়ে ওঠে একেকটি স্বতন্ত্র গল্প। পরিবেশবান্ধব উপাদান এবং নৈতিক উৎপাদন পদ্ধতির কারণে পরিবেশসচেতন তরুণ প্রজন্মের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা আকাশচুম্বী। এতে যেমন প্রকৃতির ক্ষতি হচ্ছে না, তেমনই বেঁচে থাকছে লোকজ শিল্প ও কারিগরদের জীবিকা।
গ্লোবাল রানওয়ে থেকে সোশ্যাল মিডিয়া
ফ্যাশন দুনিয়ায় বোহো স্টাইল এখন আর সাময়িক ট্রেন্ড নয়, বরং মানুষের রুচির এক স্থায়ী অংশও। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন হাউস ক্লোয়ির ডিজাইনার চিমেনা কামালি এই শৈলীকে যেভাবে রানওয়েতে আধুনিক ও অভিজাত রূপে ফিরিয়ে এনেছেন, তা ফ্যাশন দুনিয়ায় নতুন জোয়ারের জন্ম দিয়েছে। আজকাল পিন্টারেস্ট, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করলেই চোখে পড়ে কারুকাজ করা সুতি কাপড়, ঝালর, ট্যাসেল এবং তার সঙ্গে মিলিয়ে স্তরে স্তরে পরা চমৎকার সব পুঁতির নেকলেস।
বিশ্বের নামীদামি ব্র্যান্ডগুলো ডিআইওয়াই গয়নার ধারণাকে রানওয়েতে অত্যন্ত পরিশীলিতভাবে নিয়ে এসেছে। যেমন শ্যানেল পুঁতির কাজকে দিয়েছে এক মহাজাগতিক রূপ, যেখানে চকচকে পুঁতিগুলোকে দেখায় গ্রহ-নক্ষত্রের মতো। অন্যদিকে, ডিজাইনার হেনরি জ্যাঙ্কভ বড় বড় কাঠের পুঁতি আর ঝিনুক ব্যবহার করে গয়নায় এনেছেন সমুদ্রের নোনা হাওয়া আর ছুটির দিনের দারুণ আমেজ। আবার সেলিনের রানওয়েতে একের ওপর আরেক স্তর করে পরা রঙিন পুঁতির নেকলেসগুলো দেখে মনে হয়, যেন বাংলাদেশি কোনো নারীর শৈশবের সেই স্টাইলিং নিয়ে আনাড়ি হাতের পরীক্ষা-নিরীক্ষারই একটি পরিণত ও আধুনিক রূপ।
স্টাইলিংয়ে বৈচিত্র্য
পুঁতির গয়নার সবচেয়ে বড় সুবিধা এর বহুমুখী ব্যবহার। রঙিন বা পাথরের পুঁতি মানেই আপনাকে সারাক্ষণ বোহিমিয়ান কিংবা এথনিক পোশাকে থাকতে হবে—এমন ধারণা পুরোপুরি অতীত। পিন্টারেস্টের ট্রেন্ডসেটার থেকে শুরু করে গ্লোবাল ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সাররা দেখিয়েছেন, কীভাবে এক ছড়া সামান্য পুঁতির মালা দিয়ে পুরো লুকের আমেজ বদলানো সম্ভব। সমুদ্রসৈকত বা রিসোর্টের সুইমিংপুলের ধারে লিনেন ও সুতির হালকা পোশাক কিংবা শার্টের সঙ্গে রঙিন পুঁতি চমৎকার মানিয়ে যায়; বিশেষ করে রোদে পোড়া এবং সমুদ্রের জলে ভেজা ত্বকে এক বা একাধিক স্তরের পুঁতি ও ঝিনুকের মালা দেখতে দারুণ লাগে। চলতি হাওয়ায় বেছে নিতে পারেন কোরাল, টারকোয়েজ বা সি-শেল যুক্ত নেকলেস।
ঋতুবদলের সঙ্গে পুঁতির স্টাইলিংয়েও আসে ভিন্নতা; বিশেষ করে ভ্যাপসা গরমে সুতির হালকা কুর্তি, ওভারসাইজড লিনেন শার্ট কিংবা স্লিভলেস টপসের সঙ্গে ছোট-বড় বিভিন্ন শেডের রঙিন সিড বিডস ভীষণ ট্রেন্ডি ও স্বস্তিকর দেখায়। গলায় প্রথমে রঙিন চোকার স্টাইলের পুঁতির মালা, তার নিচে সামান্য বড় কোনো পাথরের মালা এবং সবশেষে ঝুলন্ত একটি মেটাল ও পুঁতির ফিউশন নেকলেস পরার মাধ্যমে সহজে লেয়ারিং করতে পারেন।
বাঙালি নারীর ঐতিহ্যবাহী সাজে পুঁতির গয়না সব সময় আলাদা আভিজাত্য এনে দেয়। জামদানি, খাদি বা সুতি শাড়ির সঙ্গে মেটাল এবং মাটির পুঁতির ফিউশন গয়না পরলে তাতে একটি সুফি ও শৈল্পিক ছোঁয়া পাওয়া সম্ভব। অন্যদিকে, সিল্ক বা কাতানের মতো জমকালো শাড়ির সঙ্গে জটিল ফিলিগ্রি যুক্ত কার্নেলিয়ান বা জেডের পুঁতির ভারী মালা রাজকীয় রূপ তৈরি করে। এমনকি চুলের খোঁপার চারপাশে বা ব্রেসলেট হিসেবেও পুঁতি ব্যবহার করা সম্ভব।
পুঁতির প্রতিটি দানায় লুকিয়ে আছে সময়ের গল্প, মানুষের স্মৃতি আর সংস্কৃতির স্পন্দন। ফ্যাশনের পরিবর্তনশীল স্রোতে তাই এটি কখনো হারিয়ে যায় না; শুধু বদলে নেয় ভাষা ও রূপ। শৈশবের নস্টালজিয়া থেকে আধুনিক র‌্যাম্প—এক সুতোয় গাঁথা এই শিল্প আমাদের রাখে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত। হয়তো এ কারণে যুগের পর যুগ পেরিয়েও পুঁতির সৌন্দর্য মানুষের অনুভূতির মতো সতেজ।

 রাফেজা বিনতে ঋতু
মডেল: ফারিয়া
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top