ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন I ফ্যাশন ফর অল
ফ্যাশন আর লাক্সারি নয়; সবার, সব স্তরের। আভিজাত্যের শিকল ছিঁড়ে অবিচলিত ভঙ্গিতে, অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাওয়া
মানব মনের ভিন্নতার বাহ্যিক সংস্করণ বলা চলে পোশাককে। একদম শুরু থেকেই, যখন পরিবেশ-প্রতিকূলতা থেকে বাঁচার চেষ্টায় শরীরে আবরণ জড়াতে শুরু করেছিল আদিম মানুষ। সময়ের সঙ্গে যা রূপ নিয়েছে ফ্যাশনে, যার পুরোটাতেই ব্যক্তিসত্তা আর অনুভূতি জাহিরের প্রয়াস। পোশাক তো অনেক আছে, কিন্তু সেটি কেমন হবে, তা-ই ফ্যাশন। এ এক সীমাহীন আর্ট ফর্ম। সেই থেকে এই সময়—বহু ক্রোশ পথ পাড়ি দেওয়া ফ্যাশন যেন ক্লান্তিহীন। প্রতিনিয়ত বলে নতুনের গল্প। সেখানে স্থান পায় কালার, প্যাটার্ন, টেক্সচার আর টেকনিক। নিত্য জানায় আবিষ্কারের আহ্বান। আলিঙ্গন করে অনুভূতিকে। কারও একার নয়, সবার। বহু বছর পেরিয়ে এভাবেই মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে ফ্যাশন। কেমন করে, সে এক ইতিহাস।
ফ্যাশন শুধু ট্রেন্ড অনুসরণ করার বিষয় নয়, এটি ব্যক্তিত্ব প্রকাশেরও শক্তিশালী মাধ্যম। এর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে স্বকীয়তায়। যার শুরু হয়েছিল হাড়কাঁপানো শীত, তপ্ত গরম, ঝড়-বৃষ্টি, ধুলা-ময়লা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার জন্য। পাথর বা কাঠের ধারালো সুই ও গাছের শিকড় দিয়ে পশুর চামড়া কিংবা গাছের ছাল-বাকল জোড়া দেওয়ার মাধ্যমে তৈরি হতো আবরণ। তবে সময়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত জিনিসগুলোকে আলাদা করার চেষ্টা করেছিল দলবদ্ধ মানুষ। চামড়া আর ছাল-বাকলের গায়ে চলত প্রাকৃতিক রঙের আঁকিবুঁকি। প্রয়োজন তো ছিলই; সঙ্গে রুচিবোধ ও সৃজনশীলতা দ্রুতই জায়গা করে নিয়েছিল পোশাকে। কার গায়ে পরা পশুর পশমের আবরণ কত সুন্দর ও ভালো, আদিম যুগে সেই আলাপও হয়তো ছিল। সভ্যতার পথে এগোতে গিয়ে মিলেছিল সুতার সন্ধান। সেখান থেকে কাপড়। তারপর চোখের পলকে বদলে গিয়েছিল পোশাকের ইতিহাস।
প্রাচীন রোম থেকে মিসরে, মধ্যযুগ থেকে রেনেসাঁয়—ফ্যাশন হয়ে উঠেছিল উচ্চবিত্ত সমাজের পরিচয় ও মর্যাদার অংশ। হাই ফ্যাশনের চিন্তার জন্ম তখনই। সেই ধারার ফ্যাশন পরিণত হয়েছিল সাধারণ মানুষ ও সমাজের অধিপতির মধ্যকার পার্থক্য নির্ধারণের মাপকাঠি। তখনকার অবিভক্ত ইউরোপের রাজদরবারগুলো আলোচিত হতো আড়ম্বরতার জন্য। বিলাসবহুল কাপড়, জমকালো লেইস, ঝলমলে কারুকাজে খচিত থাকত আগতদের পোশাক। মূল্যবান রত্নখচিত পোশাকে প্রদর্শিত হতো সামাজিক আধিপত্য। দক্ষ কারিগরদের হাতে তৈরি হতো সেগুলো, যা ছিল সাধারণের নাগালের বাইরে আর এতই ব্যয়বহুল, যা পরার সামর্থ্য ছিল না স্বয়ং পোশাকের কারিগরদেরও।
সুতা দিয়ে তাঁতে কাপড় তৈরি হলেও মূল পোশাক তৈরির কাজটা ছিল বেশ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। অথচ পৃথিবীর জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছিল পোশাকের চাহিদা। সেখানেই প্রবেশ করেছিল বিজ্ঞানের জ্ঞান এবং উদ্ভাবকের মন। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে সেলাই শিল্পে সহায়ক একটি যান্ত্রিক ডিভাইস আবিষ্কার করেন ইংল্যান্ডে কর্মরত জার্মান বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী চার্লস ফ্রেডরিক উইজেনথাল। তার যন্ত্রে দ্বিমুখী সুইয়ের সাহায্যে সেলাই করা যেত। ব্রিটিশ পেটেন্ট লাভ করলেও সেটি কোনো পূর্ণাঙ্গ সেলাই মেশিন ছিল না। ১৭৯০ সালে বিশ্বের প্রথম সেলাই মেশিন আবিষ্কার করেন ব্রিটিশ উদ্ভাবক থমাস সেন্ট। তিনি মূলত হাতে সেলাই কমাতে চেয়েছিলেন, যেন দ্রুততম সময়ে পোশাক তৈরি করা যায়। থমাসের এই ধারণা থেকে জন্মেছিল ফ্যাশনের নতুন দিগন্ত। সাধ আর সাধ্যমতো পোশাক কিনতে পেরেছিলেন সাধারণেরাও। সঙ্গে সরব হয়ে উঠছিল ফ্যাশনের চাহিদা।
১৮৫৮ সালে প্যারিসে ‘হাউস অব ওয়ার্থ’ নামে নিজস্ব ফ্যাশন হাউস প্রতিষ্ঠা করেন ইংরেজ ডিজাইনার চার্লস ফ্রেডেরিক ওয়ার্থ। ধারণা করা হয়, এটিই আধুনিক ফ্যাশন ডিজাইনের আঁতুড়ঘর। মিস্টার ওয়ার্থকে গণ্য করা হয় ওত কতুরের জনক হিসেবে।
ফ্যাশনের ইতিহাসে প্যারিস সব সময় শীর্ষ সারিতে। উনিশ শতকে পোশাকরুচির বাঁকবদলে আরও ভূমিকা রাখেন কিংবদন্তি ফরাসি ডিজাইনার লুই ভিতোঁ। সে সময় পছন্দমতো পোশাক তৈরি করানোর জন্য ওই শহরে পাড়ি জমাতেন বিশ্বের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা। গ্রাহকের ফরমাশ অনুযায়ী টেইলরিংয়ের ধারার পরিবর্তে, ডিজাইনার কালেকশন উপস্থাপনের প্রচলন ঘটে। স্পটলাইট পেতে শুরু করেন ডিজাইনাররা। বাজারে প্রবেশ করে ক্রিশ্চিয়ান ডিওর, কোকো শ্যানেল, সেন্ট লরেন্ট, জিভাঁশির মতো লাক্সারি ডিজাইনার ও হাই ফ্যাশন ব্র্যান্ড। আর প্যারিস হয়ে ওঠে ফ্যাশনের রাজধানী।
একের পর এক লাক্সারি ও লোকাল ব্র্যান্ডের উত্থানে ফ্যাশনের স্বর্ণশতাব্দীতে পরিণত হয়েছিল পরবর্তী সময়কাল। বিশ শতকের মাঝামাঝিতে শুধু সামাজিক মর্যাদার প্রতীক নয়, ব্যক্তিগত রুচি ও পরিচয়ও প্রকাশিত হতো পোশাকে। ফলে বিপ্লব ঘটে ডিজাইন ও স্টাইলে। পোশাক পরিণত হয় এক নীরব ভাষা বা যোগাযোগের শব্দহীন মাধ্যমে। গেল নব্বইয়ের দশক থেকে পরবর্তী সময়ে ফ্যাশন পরিবর্তিত হয়েছে সাধারণ ক্রেতার হাত ধরে। মিলেনিয়াল থেকে জেনারেশন জেডে প্রকাশ পেয়েছে পূর্ণ রূপের। স্ট্রিট ওয়্যার হয়ে উঠেছে ট্রেন্ডি। ফাস্ট ফ্যাশনের জায়গা নাড়িয়ে দিয়েছে প্রি-লাভড ফিলোসফি। ফ্যাব্রিক, রং, মোটিফ ও প্যাটার্ন থেকে অলংকরণ—সবখানেই ভালোবেসে ধরণীকে রাখা হয়েছে সর্বাধিক গুরুত্বে।
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সমানতালে প্রসার ঘটেছে ফ্যাশনের। সৃজনশীলতা তো ছিলই, সঙ্গে বেড়েছে সচেতনতাও। ফ্যাশনে যুক্ত হয়েছে পরিবেশবান্ধব টেকসই ধারণা। এ নিয়ে এখন হাই ফ্যাশন থেকে লোকাল—সর্বত্রই সরব সবাই। ফ্যাশন নিয়ে চলছে আলোচনা; সমালোচনাও। নিজস্ব সত্তায় ও স্বেচ্ছায় একে ধারণের প্রয়াস সুস্পষ্ট।
ফ্যাশন ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট
