skip to Main Content

কভারস্টোরি I আমরা ক’জন

বন্ধুর বাড়িয়ে দেওয়া হাত তলিয়ে যাওয়া বন্ধুকে টেনে তুলতে পারে তীরে। বন্ধুত্বের প্রেরণায় থেমে গেছে যুদ্ধ, স্তিমিত হয়েছে পারমাণবিক উত্তেজনা, তৈরি হয়েছে সভ্যতার নিদর্শন। এমন উদাহরণ প্রচুর। আবার এর উল্টোটাও ঘটেছে। তবু ‘তুমি আমার পাশে বন্ধু হে বসিয়া থাকো, একটু বসিয়া থাকো’ ধরনের অনুভূতি অতুলনীয়। নাঈমা তাসনিম, আবৃতি আহমেদ ও শ্রেয় চৌধুরীর লেখায় বন্ধুতার বিস্তরণ

বন্ধু। পেঁজা তুলার মতো এক শব্দ। কিন্তু সেই হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো সম্পর্কই হয়ে উঠতে পারে জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের পাতায় এমন ঘটনা অগুনতি। ব্যান্ড থেকে ব্যবসা, প্রেম থেকে বিচ্ছেদ—সবই সম্ভব বন্ধুত্বে।
গৌতম বুদ্ধের উপদেশ সংকলন ‘পালি সূত্র’তে সৎ বন্ধুর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, ‘উত্তম বন্ধু মানুষের প্রজ্ঞা ও মুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।’ একজন সত্যিকারের বন্ধু ভুল থেকে ফিরিয়ে আনে, বিপদে সাহস জোগায়, সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয় না এবং সত্যের পথে অবিচল থাকতে সাহায্য করে।
বন্ধুত্ব যে সব সময় খেলার মাঠ অথবা ক্লাসরুমেই হবে, এমন কোনো শর্ত নেই। বিশ্বরাজনীতির ময়দানেও জমতে পারে বন্ধুত্ব। আর তাতে ভূরাজনীতি পরিবর্তিত হতে পারে। কিছুদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বয়ানে জানা গেল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার বন্ধু। এমন দোস্তির সম্পর্ক ছিল আমেরিকার ৪০তম প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ও অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের মধ্যেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে স্নায়ুযুদ্ধের শেষ দিকে তাদের দুজনের পারস্পরিক ব্যক্তিগত আস্থা ও ধারাবাহিক বৈঠক পারমাণবিক উত্তেজনা কমাতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৮৭ সালের আইএনএফ ট্রিটিসহ একাধিক চুক্তি দুই পরাশক্তির সম্পর্কের নতুন দিগন্ত খুলে দেয় এবং বিশ্বকে সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁঁকি থেকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে আনে।
বন্ধুর ঝগড়ায় নিজে যুক্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনা হরহামেশা দেখা যায়। ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয় এমন অনেক কিছুর। ১৯৫৫ সালে মেক্সিকো সিটিতে প্রথম দেখা হয় কিউবা বিপ্লবের প্রধান নেতা ও পরবর্তীকালে দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান ফিদেল কাস্ত্রো এবং আর্জেন্টাইন বিপ্লবী এরনেস্তো চে গেভারার। কিউবার তৎকালীন একনায়ক ফুলহেনসিও বাতিস্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ফিদেল। অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকা ভ্রমণ করতে গিয়ে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও শোষণ কাছ থেকে দেখে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন চে। এক রাতের দীর্ঘ আলোচনাই তাদের মধ্যে এমন বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে, যা পরবর্তী সময়ে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৫৬ সালে কিউবায় পৌঁছে শুরু হয় তাদের যৌথ সংগ্রাম। সিয়েরা মায়েস্ত্রোর পাহাড়ে গেরিলা যুদ্ধের প্রতিটি ধাপে তারা একে অপরের ওপর নির্ভর করেছেন। ফিদেল ছিলেন রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রতীক; আর চে তো সাহস, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের প্রতিমূর্তি। পরস্পরকে পরিপূরক করে তোলার ক্ষমতাই তাদের বন্ধুত্বকে করেছিল শক্তিশালী।
ফ্রম দ্য স্ক্রিন
বন্ধুত্ব মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হওয়ার কারণে বারবার ফিরে এসেছে সবখানে। বাদ যায়নি সিনেমার পর্দাও। অস্কার ও গোল্ডেন গ্লোব জয়ী চলচ্চিত্র ‘গুড উইল হান্টিং’য়ের শেষ দৃশ্যে কনস্ট্রাকশন সাইটে কাজ করতে থাকা চাকি সুলিভানের কথায় তার বন্ধু উইলের জীবন বদলে যায়। যে উইল অনিশ্চয়তার ভয়ে এমআইটিতে গবেষণার প্রস্তাব ছেড়ে দিয়েছিল, বন্ধুর প্রেরণায় জীবনের প্রতি সব অভিযোগ পেছনে ফেলে নতুন শুরুর জন্য ক্যালিফোর্নিয়ায় পাড়ি জমায় সে। এই চলচ্চিত্র মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের বন্ধুরা কখনো একে অপরের প্রতিভা ও সম্ভাবনা নষ্ট হতে দেয় না।
টেলিভিশনের পর্দায় বন্ধুত্ব নিয়ে যত গল্প বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ‘সেক্স অ্যান্ড দ্য সিটি’ ও ‘ফ্রেন্ডস’-এর নাম সব সময় আলোচনায় আসে। ফ্রেন্ডস টিভি সিরিজে চরিত্রগুলোর কাছে বন্ধুত্ব মানে একে অপরের জন্য সব সময় পাশে থাকা। ছয় বন্ধুর হাসি, ভালোবাসা, ভুল-বোঝাবুঝি আর ক্ষমার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় গল্প। জীবনের বড় সিদ্ধান্ত থেকে ছোট সংকট—সবকিছুতেই তারা একে অপরের নিরাপদ আশ্রয়। এই বন্ধনে পরিবার আর বন্ধুত্ব যেন একাকার হয়ে যায়। অন্যদিকে সেক্স অ্যান্ড দ্য সিটি টিভি সিরিজে সম্পর্ক অনেক বেশি পরিণত, বাস্তব ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকেন্দ্রিক। প্রেম, ক্যারিয়ার, বিবাহ, মাতৃত্ব কিংবা ব্যক্তিগত সংকট—সবকিছু নিয়ে চরিত্রগুলো খোলামেলা আলোচনা করে। এখানে বন্ধুত্ব মানে ভিন্নমত, ভিন্ন জীবনধারা এবং ভিন্ন সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে একে অপরের পাশে থাকা।
বলিউডের ‘থ্রি ইডিয়টস’ চলচ্চিত্রটি শেষ পর্যন্ত মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য এমন কিছু মানুষ পাওয়া, যারা বন্ধুর স্বপ্নকে নিজের স্বপ্নের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করে। ফারহান চরিত্রটি যখন পরিবারের চাপে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে বসে, র‌্যাঞ্চো তাকে নিজ হৃদয়ের কথা শুনতে শেখায়। রাজু যখন ব্যর্থতার ভয় আর অনিশ্চয়তায় ভেঙে পড়ে, তখন বন্ধুরাই তাকে নতুন করে বাঁচার সাহস দেয়। আর র‌্যাঞ্চো নিরুদ্দেশ হওয়ার বহু বছর পরও তাকে খোঁজার উদ্দেশ্যে ফারহান ও রাজু হাজার মাইল পথ পাড়ি দেয়।
হলিউডের ‘দ্য হ্যাংওভার’ মুভি ট্রিলজিতে দেখা যায়, প্রিয় বন্ধুর ব্যাচেলর পার্টির আনন্দে মশগুল চার তরুণ বিপদের জালে জড়িয়েও কীভাবে বন্ধুকে খুঁজে বের করে বিয়ের আসরে পৌঁছে দেয়। শত সংকটেও টিকে থাকে তাদের সম্পর্ক।
গানে টানে প্রাণে
১৯৭০ সালে লন্ডনে ফ্রেডি মার্কারি, ব্রায়ান মে, রজার টেলর ও জন ডিকন মিলে গড়ে তোলেন কিংবদন্তি ব্যান্ড ‘কুইন’। ‘বোহিমিয়ান র‌্যাপসোডি’ থেকে শুরু করে ‘উই উইল রক ইউ’—এই রক গ্রুপের প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে ছিল পরস্পরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও মেলবন্ধন। ১৯৯১ সালে ফ্রেডি মার্কারির অকালমৃত্যুর আগপর্যন্ত তাদের এই আত্মিক সম্পর্ক কখনো শিথিল হয়নি। ফ্রেডি যখন জানতে পারেন, তিনি এইচআইভিতে আক্রান্ত, তখন গণমাধ্যম ও পাপারাজ্জিদের তীক্ষ্ণ নজর থেকে তাকে বাঁচাতে অন্য সদস্যরা এক অদৃশ্য আর অভেদ্য সুরক্ষার দেয়াল তুলে দাঁড়িয়েছিলেন। ফ্রেডির প্রয়াণের পর বেজ গিটারিস্ট জন ডিকনের হৃদয় এতটাই ভেঙে পড়ে, প্রিয় বন্ধুকে ছাড়া কুইনের অস্তিত্ব তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। প্রথমে তিনি অনিয়মিত হয়ে পড়েন এবং এরপর চিরতরে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন।
রক মিউজিকের অগ্রদূত ব্যান্ড ‘দ্য বিটলস’-এর শুরুয়াতেও এমন সম্পর্কেরই আভাস। যুক্তরাজ্যের লিভারপুলের চার তরুণ স্বপ্নবাজ জন লেনন, পল ম্যাককার্টনি, জর্জ হ্যারিসন ও রিঙ্গো স্টারের তুমুল বন্ধুত্বই কিংবদন্তি এই গ্রুপ গড়ে তোলার রসদ জুগিয়েছিল। বাকিটা তো ইতিহাস!
বাংলাদেশের বিখ্যাত কয়েকটি ব্যান্ডও শুরু হয়েছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক থেকে। এই তালিকায় আছে সোলস, মাইলস, ওয়ারফেজ, শিরোহামহীন, ব্ল্যাক, বাংলা, শূন্য, জলের গান। ‘ওয়ারফেজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শেখ মনিরুল ইসলাম টিপু ক্যানভাসকে জানান, নটর ডেম কলেজ থেকে তাদের একসঙ্গে পথচলা শুরু। বন্ধুদের গড়ে তোলা এই ব্যান্ডগুলো সব যে একসঙ্গেই আছে, তা নয়। ভেঙেছে, নতুন কিছু গড়েছে। কিন্তু এখনো গানে গানে ভাসে বন্ধুত্বের সুর। ‘এলআরবি’ ভোকাল এবং বাংলাদেশের রক মিউজিক সিনারিওর অন্যতম প্রবাদপ্রতিম সত্তা আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর রাতে ‘নগর বাউল’ জেমসের কনসার্টে ছিল লাখো মানুষের উপস্থিতি। সেদিন মঞ্চে গিটার বাজাতে বাজাতে কেঁদেছিলেন কিংবদন্তি জেমস। না, তারা দুজন বন্ধু ছিলেন, এমন দাবি করেননি তিনি। কিন্তু গাইতে গাইতে যে বন্ধুত্ব হয়ে যায়নি, তা-ও বলেননি।
অক্ষরের স্বাক্ষরে
বাংলা সাহিত্যের প্রসিদ্ধ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন বিলেতে অর্থকষ্টে ভুগছিলেন, তখন বন্ধু সমাজসংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাকে নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। অন্যদিকে ইংরেজি সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারার বিখ্যাত ‘হ্যারি পটার’ বুক সিরিজের মূল শক্তি হলো হ্যারি, রন ও হারমায়োনির সম্পর্ক। একসঙ্গে বিপদের মুখোমুখি হওয়ার পর তাদের মধ্যে গভীর আস্থা ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। গল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনজনই নিজেদের আলাদা দক্ষতা দিয়ে একে অপরকে সাহায্য করে। হ্যারির সাহস, রণকৌশল ও আনুগত্য; রনের উদারতা আর হারমায়োনির বুদ্ধিমত্তা—এসব গুণ একত্র হয় বলেই তারা প্রতিটি বড় চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে পারে। বন্ধুত্ব তাদের ব্যক্তিগত দুর্বলতাকেও শক্তিতে পরিণত করে। তাদের বন্ধুত্ব দেখিয়েছে—সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক পার্থক্য বা খ্যাতি দিয়ে বিচার করে না বন্ধুরা। যখন অন্যরা হ্যারিকে এড়িয়ে যায়, তখনো রন ও হারমায়োনি পাশে থাকে। রনের দরিদ্র হওয়া কিংবা হারমায়োনি নন-ম্যাজিক্যাল পরিবার থেকে বেড়ে ওঠা তাদের বন্ধুত্বের মাঝে কোনো প্রভাব ফেলেনি। নিঃস্বার্থ সমর্থন, বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতার কারণেই হ্যারি পটারের বন্ধুত্ব পাঠকদের কাছে এতটা স্মরণীয় ও অনুপ্রেরণার হয়ে উঠেছে।
আফগান-আমেরিকান লেখক খালেদ হোসাইনির বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য কাইট রানার’-এর গল্পের কেন্দ্র আমির ও হাসানের বন্ধুত্ব ঘিরে। সামাজিক মর্যাদা, জাতিগত বিভাজন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে তাদের অবস্থান আলাদা হলেও শৈশবের সম্পর্ক ছিল গভীর। হাসান নিঃস্বার্থ, বিশ্বস্ত ও আত্মত্যাগী। সে আমিরের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। হাসানের ভাষায়, ‘ফর ইউ, আ থাউজ্যান্ড টাইমস ওভার’ এই বন্ধুত্বেরই প্রতীক, যেখানে নিজের স্বার্থের আগে বন্ধুর সুখকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে, যখন আমির ভয় ও স্বার্থের কারণে হাসানের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়। এই নীরবতা তার সারা জীবনের অপরাধবোধেরও কারণ হয়ে ওঠে। উপন্যাসটি দেখায়, বন্ধুত্বে বিশ্বাস হারানো যতটা সহজ, তা পুনর্গঠন করা ততটাই কঠিন।
প্রযুক্তি প্রাণ
শৈশবের বন্ধু বিল গেটস ও পল অ্যালেন বাল্যকাল থেকে কম্পিউটারের প্রতি অভিন্ন কৌতূহল ও ভালোবাসা ভাগাভাগি করতেন। সফটওয়্যার যে ভবিষ্যতের পৃথিবী বদলে দেবে, সেই বিশ্বাস থেকে এই দুই আমেরিকান ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মাইক্রোসফট’। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মার্ক জাকারবার্গ, ডাস্টিন মস্কোভিটজ, ক্রিস হিউজেস, এডুয়ার্ডো স্যাভেরিন এবং পরে অ্যান্ড্রু ম্যাককলামের যৌথ উদ্যোগে ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করে ‘ফেসবুক’। বন্ধুদের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করার একটি ছোট ক্যাম্পাস নেটওয়ার্ক হিসেবে শুরু হয়েছিল এর পথচলা। ওই আমেরিকান তরুণদের সেই উদ্যোগই আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সময় ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিনের পরিচয় হয়। সার্চ প্রযুক্তিকে আরও কার্যকর করার অভিন্ন লক্ষ্য থেকে এই দুই আমেরিকান ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘গুগল’।
অন্য এক বন্ধুর মাধ্যমে ২১ বছর বয়সী স্টিভ ওজনিয়াকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ১৬ বছর বয়সী স্টিভ জবসের। বয়সের পার্থক্য থাকলেও এই দুই আমেরিকানের আগ্রহের জায়গা ছিল এক—ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইলেকট্রনিকস। প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চাইতেন দুজনেই। সেই থেকে বন্ধুত্ব। বিশ শতকের সত্তরের দশকে দুজনে মিলে তৈরি করেন টাইপরাইটারের মতো দেখতে একটি কম্পিউটার। নাম দেন ‘অ্যাপল আই’। এরপর আর থামেননি তারা। একসঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন স্মার্টফোন ও প্রযুক্তির অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ব্র্যান্ড ‘অ্যাপল’।
একটি সর্বজনীন সমস্যা সমাধানে সৃজনশীল বন্ধুত্বের আরেক উদাহরণ হলো ‘এয়ারবিএনবি’। ২০০৮ সালে তিন আমেরিকান বন্ধু ব্রায়ান চ্যাস্কি, নাথান ব্লেচারজিক এবং জো গেবিয়া চেয়েছিলেন এমন কিছু বানাতে; যেখানে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে ঘুরতে গিয়ে থাকার জায়গা খোঁজা ব্যক্তি এবং হোটেল ও গেস্টহাউস ব্যবসায়ীরা সহজে যোগাযোগ করতে পারবেন। যার ফসল এই শীর্ষ গ্লোবাল অনলাইন মার্কেটপ্লেস।

প্রেমে সমাপনে
প্রেমের মাঝেও একধরনের অলিখিত চুক্তি থাকে বন্ধুত্ব ও বন্ধুদের নিয়ে। দুজন মানুষ যদি একে অন্যকে ভালোবেসে বন্ধু না হয়ে উঠতে পারে, সেই সম্পর্ক উষ্ণতা ছড়ায় না। পরস্পরকে না বুঝতে পারলে একত্রে বেড়ে ওঠা যায় না, অজান্তেই ভারী লাগে সম্পর্ক। আরেকটি ঊহ্য কিন্তু মুখ্য বিষয়, বিদ্যমান বন্ধুদের উপস্থিতি। অধুনালুপ্ত ইংলিশ গার্ল গ্রুপ ‘স্পাইস গার্লস’-এর বিখ্যাত গান ‘ওয়ানাবি’র বিষয়বস্তু অনেকটা এ রকম—‘যদি তুমি আমার প্রেমিক হতে চাও, তবে আমার বন্ধুদের সঙ্গে তোমার বনিবনা হতে হবে।’ ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ টপচার্টে টানা ৭ সপ্তাহ শীর্ষে ছিল গানটি।
পোলিশ-ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানী মারি কুরি এবং ফরাসি বিজ্ঞানী পিয়েরে কুরি বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম সেরা বন্ধুত্বের উদাহরণ। ১৮৯৫ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। গবেষণাগারেই তাদের বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়। দুজনেই জ্ঞান, কৌতূহল ও বিজ্ঞানচর্চার প্রতি একই রকম নিবেদিত ছিলেন। একসঙ্গে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা এবং ১৮৯৮ সালে পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম মৌল আবিষ্কার করেন। ১৯০৩ সালে মারি কুরি, পিয়েরে কুরি এবং ফরাসি পদার্থবিদ অঁরি বেক্যরেল যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। শুরুতে নোবেল কমিটি শুধু পিয়েরে ও বেক্যরেলের নাম বিবেচনা করেছিল। পিয়েরে কুরির জোরালো অবস্থানের কারণে মারি কুরির অবদানও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়।
ফ্যাশনে বন্ধুবল
যাকে বলে বেস্ট ফ্রেন্ডস—সাবরিনা আজাদ দিসা ও সৈয়দা শারমিন মজুমদার তিথির সম্পর্কটা তা-ই। ২০১১ সালে পরিচয়। একসঙ্গে কলেজ, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিজেদের আঁকা নকশায় শাড়ি বানিয়ে পরতেন দুজনে। এখনো তেমনই অভ্যাস। শাড়ির প্রতি তাদের এই ভালোবাসা এক হয়েছে একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ডে—‘তায়সা’। ২০১৭ সালে খেলার ছলে অনলাইনে যাত্রা শুরু করা দুই বন্ধুর এই ছোট্ট উদ্যোগ এখন অনেকটাই বড়। বর্তমানে ধানমন্ডির সীমান্ত সম্ভারে আউটলেট আছে তাদের। শাড়ি, কামিজ, স্কার্ট, টপসসহ সংগ্রহের সবই দেশীয় পোশাক। দুজনে মিলেই নকশা করেন। প্রতিটি কাজে একে অপরের পাশে থাকেন। বন্ধুত্ব থেকে ব্র্যান্ড তৈরির এই গল্প জানা গেল সাবরিনা আজাদের কাছে। তার ভাষ্যে, ‘যেভাবে শুরু করেছিলাম, সেভাবেই চলছে। কোনো কাজ একা করতে গেলে দুজনের কেউই আগ্রহ পাই না। তাই পোশাকের নকশা থেকে শুরু করে ব্র্যান্ডের সব কাজ একসঙ্গে করি।’
মার্কেট ঘুরে গজ কাপড় আর লেইস কিনে ইচ্ছেমতো নকশার পোশাক বানাতে একসঙ্গে দর্জিবাড়ি; কার পোশাক কত সুন্দর, কার কানের দুল আর হাতের চুড়িগুলো কোথা থেকে নেওয়া—সেই আলাপ করতে করতে গল্প পৌঁছে যায় ফ্যাশন ব্র্যান্ড খোলার পরিকল্পনায়। বন্ধুকে বন্ধু বলেন, ‘চলো, একটা ফ্যাশন ব্র্যান্ড খুলি।’ খুঁজলে পাওয়া যাবে বন্ধুত্বের এমন অনেক উদাহরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে আজকাল সহজে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে বন্ধুরা মিলে তৈরি করা ফ্যাশন ব্র্যান্ড। ফ্যাশনের প্রতি তরুণদের আগ্রহ আর বন্ধুত্বের প্রতি প্রবল বিশ্বাস হয়ে উঠছে তাদের পেশাগত জীবনের অংশ। উদাহরণ হিসেবে আরও বলা যেতে পারে ‘দেশাল’-এর কথা। ২০০৫ সালে দেশীয় পোশাক নিয়ে কাজ করার উদ্যোগে ব্র্যান্ডটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিন বন্ধু ইশরাত জাহান, সবুজ সিদ্দিকী ও কনক আদিত্য। পরে অবশ্য উদ্যোগটি থেকে প্রস্থান করেছিলেন কনক। তবে দেশাল রয়েছে এখনো। বন্ধুত্ব থেকে ব্যবসা, তারপর ভাঙনের এমন গল্প রয়েছে অধুনালুপ্ত দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘রঙ’-এরও। ব্র্যান্ডটি ভেঙে গিয়ে তৈরি হয়েছে ‘বিশ্বরঙ’ ও ‘রঙ বাংলাদেশ’।
দেশ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নজর দিলে দেখতে পাব, একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বন্ধুত্ব, তারপর সেখান থেকে জন্মেছিল এমন এক ফ্যাশন ব্র্যান্ড, যা আজ পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম লাক্সারি লেবেলে। দুই ইতালীয় ফ্যাশন ডিজাইনার ডোমেনিকো ডলশে এবং স্টেফানো গ্যাবানার ‘ডলশে অ্যান্ড গ্যাবানা’। অন্তর্জালে পাওয়া যায় ‘প্রোয়েঞ্জা শুলার’, ‘ওপেনিং সেরিমনি’, ‘র‌্যাগ অ্যান্ড বোন’, ‘পাবলিক স্কুল’, ‘সুপ্রিম’, ‘দ্য হান্ড্রেডস’-এর মতো এমন বেশ কয়েকটি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের নাম, যেগুলোর মূল ভিত্তি হচ্ছে বন্ধুত্ব। ফ্যাশনের এই অধ্যায়ে বাদ রাখা যায় না বন্ধুবল নিয়ে নেমে পড়া জেন-জিদের। উল্লেখ করা যেতে পারে ‘রঙস অ্যান্ড রেবেলস’, ‘ঢং’, ‘গরুর ঘাস’-এর মতো ফ্যাশন লেবেলগুলোর কথা। তাদের নকশাগুলোও শোনায় বন্ধুত্বের গল্প। যেখানে ফুটে ওঠে তাদের হৃদ্যতার উচ্ছ্বাস। তবে ভাঙনের গল্পও সেখানে শোনা যায়। ‘অন্য আলো’, ‘ওজি’, ‘বিবিআনা’ বন্ধুত্ব থেকে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে বাঁক বদলেছে। কেউ থেমে গেছে, কারও আবার শুরু নতুন করে।
সৌন্দর্য সংগ্রামে
জেরাড ব্লানডিনো ছিলেন মেকআপ আর্টিস্ট আর ব্যবসায়িক বুদ্ধিদীপ্তি ছিল জেরেমি জনসনের। বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকে আন্তর্জাতিক বিউটি ব্র্যান্ড ‘এস্টি লডার’-এ দুজনে কাজ করতেন। সেখান থেকে বন্ধুত্ব। তারপর ১৯৯৮ সালে এই দুই আমেরিকান প্রতিষ্ঠা করেন ‘টু ফেসড কসমেটিকস’। প্রসাধনী যে ক্ল্যাসিকের খোলস ছাড়িয়ে আনন্দময়ও হতে পারে, সেই ভাবনা থেকে নেওয়া দুই বন্ধুর এই উদ্যোগ আজ বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বিউটি ব্র্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক বিউটি ব্র্যান্ড ‘সামার ফ্রাইডস’-এর গল্পটাও দুই বন্ধুর। দুই আমেরিকান—মারিয়ানা হিউইট ও লরেন আয়ারল্যান্ডের। ২০১৮ সালে স্কিন কেয়ার নিয়ে তাদের এই উদ্যোগ এখন পরিণত হয়েছে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়। সাশ্রয়ী মূল্যের স্কিন কেয়ার ও প্রসাধন পণ্যের জন্য জনপ্রিয় বিউটি ব্র্যান্ড ‘ইএলএফ কসমেটিকস’ও দুই বন্ধুর উদ্যোগ। জোসেফ শামাহ এবং স্কট ভিনসেন্ট বোরবা। তারাও আমেরিকান।
বিউটি ইন্ডাস্ট্রিতে সফল বন্ধুত্বের আরেকটি উদাহরণ ‘গ্লো রেসিপি’। দৃষ্টিনন্দন প্যাকেজিংয়ের কারণে সব বয়সী মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ব্র্যান্ডটি তৈরি হয়েছে দুই বন্ধুর উদ্যোগে। সারা লি এবং ক্রিস্টিন চ্যাং। দুজনেই দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক। তাদের দেখা হয়েছিল নিউইয়র্কে, ‘ল’রিয়েল’-এ কাজ করার সময়। সৌন্দর্যচর্চায় দক্ষিণ কোরিয়া এবং পশ্চিমা বিশ্বকে এক করার চেষ্টায় ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আন্তর্জাতিক এই ব্র্যান্ড। ভারতীয় বিউটি ব্র্যান্ড ‘পিলগ্রিম’, ‘এমক্যাফেইন’ এবং ‘দ্য ম্যান কোম্পানি’ও বন্ধুদের উদ্যোগ। এমন অসংখ্য উদাহরণ বিশ্বজুড়ে। আর বাংলাদেশে রয়েছে সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার প্ল্যাটফর্ম ‘সাজগোজ’। নাজমুল শেখ, মিলকী মাহমুদ ও সিনথিয়া শারমিন ইসলাম—তিন বন্ধু মিলে ২০১৩ সালে শুরু করেন প্রতিষ্ঠানটি। বিউটি পণ্যের ভেজালের বাজারে গ্রাহকদের ভরসা হয়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে বড় শক্তি বন্ধুত্ব। এ বিষয়ে তিনজনই একমত। নাজমুল শেখ বলেন, ‘বন্ধুর সঙ্গে কোনো কিছু তৈরি করতে চাইলে মূল্যবোধ অভিন্ন কি না, তা আগে মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। কারণ, বিশ্বাস সময় নিয়ে তৈরি হয়।’
বন্ধু নং ফুর্তি নং
একজন প্রকৃত বন্ধু আমাদের মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিধ্বনি হিসেবে কাজ করে। তার সামনে মনের কথা কোনো দ্বিধা কিংবা ভয় ছাড়াই বলতে পারা যায়। নির্দ্বিধায় শোনাও যায় তার মনের বার্তা। প্রকৃত বন্ধুত্বে সব ভাবনা, ইচ্ছা ও প্রত্যাশা নিঃশব্দে জন্ম নেয় এবং ভাগাভাগি হয়ে যায়। ‘দ্য প্রফেট’ কাব্যে বিখ্যাত লেবানিজ কবি কাহলিল জিবরান বলেছিলেন, ‘বন্ধুত্ব হচ্ছে সেই জমিন, যেখানে তুমি ভালোবাসার বীজ বোনো এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ফসল ঘরে তোলো। সে-ই তোমার প্রশ্নের উত্তর এবং তোমার শীতের আগুনের ওম। যেখানে আমরা ভালোবাসা বুনি, কৃতজ্ঞতা কুড়াই এবং জীবনের কঠিনতম দিনগুলোয় উষ্ণতা খুঁজে পাই।’

তথ্যঋণ: শেখ সাইফুর রহমান
মডেল: জেসিয়া, সারাহ্ ও শিলা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব ও জুয়েলারি: ব্লুচিজ
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top