skip to Main Content

পুরাবৃত্ত I পি কে সেন সাততলা

চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজার এবং সদরঘাট এলাকার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষী। প্রায় দুই শ বছরের পুরোনো এই স্থাপনা ব্যক্তিপর্যায়ে নির্মিত বন্দরনগরীর প্রথম বহুতল ও দৃষ্টিনন্দন ভবন হিসেবে পরিচিত

একসময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের কাছে বন্দরনগরীতে পৌঁছানোর বাতিঘর ছিল পি কে সেন সাততলা ভবন। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড় থেকে মাঝিরা যখন নৌকার হাল ধরতেন কিংবা সাধারণ মানুষ নদী পার হতেন, দূর দিগন্তে সদরঘাটের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনের চূড়া দেখেই তারা নিশ্চিত হতেন, সামনে চট্টগ্রাম! কালের করাল গ্রাসে আজ আকাশচুম্বী আধুনিক ইমারত আর বহুতল ভবনের ভিড়ে সেই ঐতিহ্যবাহী চূড়া যেন অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে।
নামকরণ ও ইতিবৃত্ত
উনিশ শতকের দিকে বর্তমান সদরঘাট ও ফিরিঙ্গি বাজার এলাকাটি ঝোপঝাড় আর জঙ্গলবেষ্টিত ছিল। তখনকার চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়ার প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন প্রফুল্ল কুমার সেন, যিনি সংক্ষেপে পি কে সেন নামে পরিচিত। বিখ্যাত পি কে সেন হাটেরও প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ১৮৯০ সালে এই এলাকায় ১৬ শতক জমি কিনে এই বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করেন। জঙ্গল কেটে রাস্তাঘাট তৈরি, দোকানপাট বসানোর পাশাপাশি তেলের ঘানি, চালকলসহ বিভিন্ন ব্যবসার সূত্রপাত ঘটান। একসময় তার অধীনে দুই শতাধিক কর্মচারী কাজ করত এবং পুরো এলাকা একটি বড় ব্যবসায়িক অঞ্চলে পরিণত হয়। শোনা যায়, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে (১৯৫৮ সাল) সদরঘাট ও ফিরিঙ্গি বাজার এলাকায় অসংখ্য অ্যাংলো-খ্রিস্টান বা ফিরিঙ্গি বসবাস করতেন। আর্থিকভাবে তারা ছিলেন সচ্ছল। তখন এই এলাকায় ধুমধাম করে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসব গুড ফ্রাইডে উদ্‌যাপিত হতো। কোতোয়ালি থেকে শুরু করে ফিরিঙ্গি বাজারের মোড় পর্যন্ত এই উৎসব উপলক্ষে বসত বিরাট মেলা।
দেশভাগের দৃশ্যপট
১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তি বা দেশভাগ এবং এর চার বছরের মধ্যে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পি কে সেন তার পরিবারকে ভারতে পাঠিয়ে দেন এবং নিজেও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তিনি সদানন্দ ঘোষ, সুশীল ঘোষ ও চিন্তাহরণ ঘোষ—এই তিন ভাইয়ের কাছে ভবনটি বিক্রি করে দেন। বর্তমানে সদানন্দ ঘোষের বংশধর দীপু ঘোষ এবং তার পরিবার এই ভবনে বসবাস করছে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভবনটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্বাধীনতার পর এর সংস্কার করা হয়।
নির্মাণশৈলী ও স্থাপত্য রূপ
পি কে সেন ভবনের নির্মাণশৈলী চমৎকার এবং সেই সময়ের বিবেচনায় অত্যাধুনিক ও নান্দনিক ছিল। ভবনটি নির্মাণের জন্য ১৮৯০ সালে কলকাতা থেকে ৫০-৬০ জন সুদক্ষ কারিগর আনা হয়েছিল। লোকমুখে এটিকে সাততলা বলা হলেও মূল আবাসিক ভবন চারতলাবিশিষ্ট। এর পঞ্চম তলায় একটি পারিবারিক মন্দির ছিল, যেখানে একসময় ধুমধাম করে পূজা-পার্বণ হতো। তবে দীর্ঘ সময় পার হওয়া এবং ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় বর্তমানে সেখানে আর পূজা হয় না। এই ভবনে ষষ্ঠ ও সপ্তম তলা উচ্চতায় মূলত নান্দনিক দুটি উঁচু গম্বুজ রয়েছে। এই গম্বুজবিশিষ্ট কাঠামোর কারণেই ভবনটিকে দূর থেকে সাততলা মনে হয় এবং এটিই ভবনের মূল আকর্ষণ। পঞ্চম তলার ওপরে একটি খোলামেলা বৈঠকখানা এবং উন্মুক্ত বারান্দা ছিল, যেখান থেকে একসময় কর্ণফুলী নদীর অপরূপ দৃশ্য দেখা যেত। ভবনের চারতলা পর্যন্ত মাঝখান বরাবর দুটি চমৎকার শৈল্পিক সিঁড়ি দুই দিক থেকে নেমে এসেছে। এর মধ্যে একটি সিঁড়ি একদম ওপরের তলা পর্যন্ত চলে গেছে। চারতলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোরে দুটি করে ফ্ল্যাট বা প্রবেশদ্বার থাকলেও একদম ওপরের তলায় তা রয়েছে একটি। প্রতিটি কক্ষেরই রয়েছে আলাদা ও স্বতন্ত্র নির্মাণ শৈলী।
কালের পরিক্রমায়
সময়ের বিবর্তনে পি কে সেন ভবনটি পুরোনো জৌলুশ ও চাকচিক্য হারিয়েছে। একসময় প্রবেশমুখে বিশাল একটি ফটক থাকলেও এখন তা নেই এবং সামনের গলিটিও বেশ সরু। ইতিহাসপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা এখনো প্রাচীন এই স্থাপত্য দেখতে আসেন। তবে এত বড় এবং প্রাচীন একটি ব্যক্তিগত স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার করা বর্তমান মালিকদের পক্ষে বেশ ব্যয়বহুল। চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রথম বহুতল ভবনের এই স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে পি কে সেন সাততলা ভবনটির যথাযথ সংরক্ষণ জরুরি।

 লাইফস্টাইল ডেস্ক
ছবি: সংগ্রহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top