skip to Main Content

দেশ বিদেশ I অন্নপূর্ণার আহ্বান

উল্লেরি থেকে অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্প অবধি প্রতিটি বিরতি স্থান যেন প্রকৃতি, সংস্কৃতি আর আত্ম-অন্বেষণের এক অনন্য যাত্রা, যা ট্রেকারদের বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় এই ট্রেকিং স্যাংচুয়ারিতে

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩ হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতায় পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ স্থায়ী বসবাস করে। এখানকার গাছপালা মাটির কাছাকাছি থেকে নিজেদের বাঁচায়, আর প্রাণীরা ঘন পশম ও শক্তিশালী শরীরের কারণে তীব্র ঠান্ডা এবং কম অক্সিজেনের মধ্যেও টিকে থাকে। ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি পর্বতের অবস্থান এই হিমালয়ান রেঞ্জে, বাকি ৪টি কারাকোরামে। এর মধ্যে হিমালয়ের অন্নপূর্ণা ট্রেকিং রুটের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, অপেক্ষাকৃত সহজ রুট, মনোমুগ্ধকর বিরতি স্থান এবং নির্ভয় অরণ্য থাকে পছন্দের শীর্ষে। তবে ট্রেকারদের মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কাটে অন্নপূর্ণার পাহাড়ি গ্রামগুলো।
উল্লেরি যেন পাহাড়ের বুকে খোদাই করা একটি গ্রাম। এখানে পৌঁছাতে হয় তিন হাজারের বেশি পাথরের সিঁড়ি বেয়ে। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই গ্রামে দেখা মেলে পাথর বসানো সরু গলি, স্লেটের ছাদের বাড়ি আর পাহাড়ি ফুলে সাজানো ছোট ছোট উঠোন। মাগার সম্প্রদায়ের মানুষের আতিথেয়তা গ্রামটিকে করে তুলেছে উষ্ণ। এরপরে রয়েছে রডোডেনড্রন এবং ওকের জঙ্গলের মাঝখানে ছোট্ট দুটি গ্রাম বিরেথাতি আর বান্থাতি। এরপরে আসে ঘোরেপানি, যা একসময় তিব্বত-ভারত বাণিজ্যপথের বিশ্রামকেন্দ্র ছিল। মূলত পুনহিলের চূড়ায় পৌঁছার আগে শেষ গ্রাম এটি। কাঠের লজ, রঙিন প্রার্থনা পতাকা, পাহাড়ি ক্যাফে আর ভোরের সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় থাকা ট্রেকারদের কোলাহল এ গ্রামের বিশেষত্ব। ফেরার পথে ট্রেকাররা তাদের ছবি সেঁটে আসে ঘোরেপানির লজগুলোতে।
ধাপে ধাপে সাজানো পাথরের বাড়ি, ফুলে ভরা বারান্দা, নিচে মেঘের গালিচা—ঘান্দ্রুক যেন একটি জীবন্ত পোস্টকার্ড। এখানে গুরুং জাতি নেপালিজ নয়, তিবেতো— বর্মন ভাষাভাষী। ঘান্দ্রুকের প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন বিখ্যাত গুরখা আর্মিতে কর্মরত। ছমরং অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্প ট্রেকের প্রবেশদ্বার। পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে সাজানো বাড়ি, নিচে মোদি খোলা নদীর গভীর গিরিখাত আর সামনে অন্নপূর্ণা সাউথ ও মচ্ছপুচ্ছ্রে শৃঙ্গের অসাধারণ দৃশ্য। ছমরংকে অনেকে পুরো ট্রেকের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম বলেন। এর একটু নিচেই ঝিনুডাডাতে রয়েছে উষ্ণ পানির স্রোতোধারা। বাঁশ, ওক ও রডোডেনড্রনের ঘন জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শান্ত গ্রাম সিনুয়া। এই গ্রামের দুটি ধাপ রয়েছে, আপার সিনুয়া ও লোয়ার সিনুয়া। এর পরে বাঁশে ঘেরা গ্রাম বাম্বু এবং শান্ত দোভান।
মচ্ছপুচ্ছ্রে বেসক্যাম্পের পূর্বে শেষ গ্রাম দেউরালি। উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখানকার বাতাসও পাতলা হয়ে আসে। চারপাশে বিশাল পাথরের দেয়াল, ঝরনা আর তুষারগলা পানির ধার। দেউরালি থেকে একটু দূরে বাগার উপত্যকা যেন অপার্থিব সৌন্দর্যের লীলাভূমি। হাজার রকমের ফুলে সুশোভিত এই উপত্যকা প্রতিটি ঋতুতে সাজে নানা রঙে। মচ্ছপুচ্ছ্রেতে পৌঁছে আপনার প্রথমে মনে হবে, যেন সত্যিই হিমালয়ের ভেতরে প্রবেশ করা হয়েছে। এখানে জন্মে কোব্রা প্ল্যান্ট নামের সাপসদৃশ এক উদ্ভিদ। জুন কিংবা ডিসেম্বর—মোহময় কুয়াশায় ঢাকা থাকে মচ্ছপুচ্ছ্রের চারদিক।
এখান থেকে মেঘের ভেতর দিয়ে ক্রমেই উন্মোচিত হয় অতিকায় অন্নপূর্ণা পর্বত। বেসক্যাম্প থেকে অন্নপূর্ণা, অন্নপূর্ণা ৩, হিমচুলি, অন্নপূর্ণা সাউথসহ ৮ হাজার মিটারের বিশাল পর্বতশ্রেণি একত্রে দৃশ্যমান চারদিকে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় পুরো এলাকা সোনালি ও গোলাপি আলোয় রূপ বদলায়। ছোট-বড় প্রায় ১৮০টি মনোমুগ্ধকর ঝরনা ও অসংখ্য সাসপেনশন ব্রিজের দেখা মিলবে এই রুটে। তবে জেনে রাখা ভালো, খাড়া শৃঙ্গের কারণে খুব অল্পসংখ্যক পর্বতারোহী এর চূড়ায় উঠতে পেরেছেন এবং মৃত্যুহার এখানে ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ এবং সফলতার হার মাত্র ৪০ শতাংশ।
 লাইফস্টাইল ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top