skip to Main Content

অন্দরমহল I সাজে শরতের সমীরণ

ঋতুবদল মানেই শপিং কার্ট ভারী করা—এই সমীকরণ থেকে বের হওয়া যাক। পশ্চিমা বিশ্বের অটাম অ্যাসথেটিক, পুঁজিবাদের বহিঃপ্রকাশ হলেও আমাদের উপমহাদেশে এই রূপান্তর অনুভূতির এবং মনস্তাত্ত্বিক

আগেকার দিনে ঝুম বর্ষার ঘনঘটার পরে যখন শরতের নীল আকাশ উঁকি দিত দুয়ারে, তখন ঘরের ভেতরের মেজাজটাও বদলে ফেলতেন মা-চাচিরা। মেঝেতে মাটির নতুন প্রলেপ, মাচানের নিচে আনকোরা চাঁদোয়া, দেয়ালে রঙের ছোঁয়া, বিছানায় নকশা করা চাদর কিংবা কাঁথা আর হাতে বানানো গৃহসজ্জার নানা উপকরণ। কালের পরিক্রমায় আবহমান সংস্কৃতির পালাবদল ঘটলেও মানুষের অন্দরমহল সাজানোর আগ্রহে ভাটা পড়েনি। ঋতুর সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে ঘরের রূপবদল মানব মনে এনে দেয় একধরনের পুনর্বিন্যাসের বোধ। আকিজ কলেজ অব হোম ইকোনমিকসের গৃহ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক মৌসুমি হোসেন বললেন, ‘আমাদের জলবায়ু ভিন্ন। তাই ঋতু পরিবর্তনের সময় প্রাকৃতিক আলো, বাতাস চলাচল, আর্দি টোন এবং স্থানীয় উপকরণকে গুরুত্ব দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর।’

রঙের রহস্য
একসঙ্গে অনেক গাঢ় রং ব্যবহার না করে ভারসাম্য রেখে সাজালে ঘর লাগবে পরিপাটি আর স্নিগ্ধ। গ্রীষ্মের হালকা সাদা, মিন্ট বা আকাশির বদলে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে পারে টেরাকোটা, অলিভ গ্রিন, মাস্টার্ড, রাস্ট, বেইজ কিংবা কফি ব্রাউনের মতো উষ্ণ টোন।
কাপড়ের কারুকাজ
শরতের সজ্জায় ঘরে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে টেক্সটাইলে। পাতলা সামার প্রিন্টের বদলে খাদি, জামদানি, নকশিকাঁথা কিংবা হ্যান্ডলুম কটনের কুশন কভার ব্যবহার করা যেতে পারে। সোফার এক কোণে একটি হ্যান্ডলুম থ্রো বা হালকা নকশিকাঁথা রেখে দিলে প্রয়োজনে ঘর হয়ে উঠবে আরামদায়ক। নান্দনিকতার পাশাপাশি এসব কাপড় বাংলাদেশের আবহাওয়ায় উপযোগী।
প্রকৃতির পরশ
শরতের সাজে প্রাকৃতিক উপকরণের আবেদন আলাদা। পাটের টেবিল রানার, বেতের ঝুড়ি, বাঁশের ট্রে কিংবা শীতলপাটি ঘরে এনে দেয় সহজ-সরল ও পরিশীলিত সৌন্দর্য। এসব উপকরণ টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং স্থানীয় কারুশিল্পের প্রতিনিধি। মাটির তৈরি ফুলদানি, প্ল্যান্টার, ক্যান্ডেল হোল্ডার কিংবা ছোট শোপিস ঘরে প্রাকৃতিক উষ্ণতা আনে। বিশেষ করে কাঠ, পাট বা বেতের আসবাবের সঙ্গে টেরাকোটার সংমিশ্রণ শরতের আবহ আরও জীবন্ত করে তোলে।
গাছের যত্ন
বর্ষার শেষে ইনডোর প্ল্যান্টগুলো নতুনভাবে সাজানো সম্ভব। মানিপ্ল্যান্ট, স্নেক প্ল্যান্ট, আরেকা পাম বা জেড প্ল্যান্টকে সিরামিক কিংবা টেরাকোটার টবে বসিয়ে জানালার ধারে বা লিভিং রুমের কোণে রাখলে ঘরে আসবে পরিশোধিত বায়ু ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য। শুকনো ঘাস বা কাশফুলের ডালও হতে পারে একটি সুন্দর সেন্টারপিস।
আলোর আবহ
তীব্র সাদার পরিবর্তে উষ্ণ সাদা আলোর টেবিল ল্যাম্প বা ফ্লোর ল্যাম্প ব্যবহার করলে সন্ধ্যার পর ঘর আরও আরামদায়ক ও রুচিশীল দেখাবে। দিনের বেলায় যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক আলো ব্যবহারের চেষ্টা করা ভালো। লাইটিং বা ল্যাম্পশেড কিনতে চাইলে দোয়েল চত্বর থেকে মিরপুর, এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, বেইলি রোড, বনানী কিংবা গুলশানের বিভিন্ন লাইটিং শোরুমে মিলবে নানান ধরনের আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী ডিজাইনের সংগ্রহ।
শরতের সাজ
শুকনো ফুল, কাশফুল, শিউলির অনুপ্রেরণায় সাজানো ফুলদানির আয়োজন, টেরাকোটার শোপিস কিংবা হাতে তৈরি মোমবাতি ঘরে শরতের অনুভূতি এনে দিতে পারে। তবে অতিরিক্ত সাজসজ্জা এড়িয়ে চলাই উত্তম। ঋতু পরিবর্তন ঘর গোছানোরও ভালো সময়। অপ্রয়োজনীয় শোপিস, পুরোনো ম্যাগাজিন বা অব্যবহৃত জিনিস সরিয়ে রাখলে ঘর আরও খোলামেলা ও পরিচ্ছন্ন দেখাবে।
টেবিল টাচ
খাওয়ার টেবিলও ঋতুর গল্প বলে। জামদানি কিংবা পাটের টেবিল রানার, লিনেন ন্যাপকিন, কাঠের সার্ভিং বোর্ড, টেরাকোটার বাটি অথবা পিতলের ছোট অ্যাকসেন্ট ব্যবহার করে সহজে তৈরি করা যায় শরৎ অনুপ্রাণিত টেবিল স্কেপ। অতিথি না থাকলেও প্রতিদিনের খাবারের সময়টুকু হয়ে উঠবে আরও বিশেষ।
দীপ্তির দোলা
শুধু একটি উষ্ণ টোনের লাইটও ঘরের আবহ বদলে দিতে পারে। উজ্জ্বল সাদা আলোর বিকল্প হিসেবে ওয়ার্ম এলইডি, টেবিল ল্যাম্প, বেতের ল্যাম্পশেড কিংবা মোমবাতির আলো ব্যবহার করতে পারেন। সন্ধ্যার পর এই নরম আলো ঘরে এনে দেবে স্বস্তি আর প্রশান্তির অনুভূতি।
দেয়ালের দৃশ্য
ঘরের দেয়াল শুধু ছবি টাঙানোর জায়গা নয়; নকশিকাঁথার ফ্রেম, জামদানি মোটিফ, রিকশা আর্ট, টেরাকোটার ওয়াল প্লেট কিংবা আলপনা-প্রেরণায় তৈরি ওয়াল হ্যাংগিং একটি সাধারণ দেয়ালকেও করে তোলে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
সুবাসের ছোঁয়া
দৃশ্যের পাশাপাশি ঘরের অনুভূতিও বদলায় সুগন্ধে। লেমনগ্রাস, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচি কিংবা ভ্যানিলার ঘ্রাণযুক্ত এসেনশিয়াল অয়েল বা ডিফিউজার ব্যবহার করতে পারেন। সন্ধ্যার নরম আলো আর মৃদু সুগন্ধ মিলিয়ে ঘরে তৈরি হবে এক শান্ত, স্বস্তিদায়ক পরিবেশ।
দেশীয় ধরন
পশ্চিমা দেশগুলোয় ঘর সাজাতে যেমন প্লেইড বা চেকার্ড প্যাটার্ন, পাম্পকিন কিংবা ম্যাপল মোটিফের চল আছে, তেমনি আমাদের লোকজ নকশা ও বুনন বেশ বৈচিত্র্যময় এবং এ দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই। বসার ঘরের প্রধান আকর্ষণ হতে পারে একটি হালকা নকশিকাঁথা থ্রো, যেখানে লতাপাতা, পদ্ম, ময়ূর ও শাপলার নকশা ঘরে এনে দেবে উৎসবের আবহ। ডাইনিং বা সাইড টেবিলে থাকতে পারে জামদানি মোটিফের রানার। দুবলা জাল, পান্না হাজারি, তেরছা, বুটি, ফুলঝুরি, জলবার, করোলা কিংবা চাঁদতারা নকশার জামদানি কাপড় কুশন কভার, টেবিল রানার বা ওয়াল ফ্রেম হিসেবে দারুণ মানানসই। দেয়ালসজ্জায় যোগ হতে পারে টেরাকোটার ওয়াল প্লেট, রিকশা আর্ট, বেতের বোনা ওয়াল হ্যাংগিং বা ফ্রেম করা নকশিকাঁথা। মেঝেতে ভারী কার্পেটের বদলে মোটা বুননের পাটের ডুরি রাগস বা শীতলপাটি ব্যবহার করা যেতে পারে। ভাদ্রের তালপাকা গরমেও প্রশান্তি এনে দেবে ঘুমশীতল পাটি।

 নাঈমা তাসনিম
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top