skip to Main Content

গিক পাঠ I ভয় থেকে জয় -শাকিব চৌধুরী

ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দি ওডিসি’ সম্বন্ধে নিশ্চয় এরই মধ্যে শুনেছেন। হয়তো হলে গিয়ে দেখেও ফেলেছেন। দুর্দান্ত বানিয়েছেন নোলান সাহেব। ব্লকবাস্টার সিজিআইয়ের এই যুগে সত্যিকারের লোকেশনে শুট করা দৃশ্য দেখলেই আলাদা ভালো লাগে। নোলান হচ্ছেন আমাদের জেনারেশনের সেই চলচ্চিত্র নির্মাতা, যার ছবি হলে গিয়ে দেখার একটা আলাদা তাগিদ থাকে। একটা বিশেষ ইভেন্ট ভাব।
আর এই জায়গাটা তিনি ক্যারিয়ারজুড়ে সততা, নিষ্ঠা আর প্রতিভা দিয়ে তৈরি করেছেন। তিনি থিয়েট্রিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স বোঝেন। এই টেকনো-মডার্ন যুগে কীভাবে একঝাঁক অচেনা মানুষকে দু-তিন ঘণ্টার জন্য একই হলে বসিয়ে একটা দুর্দান্ত সম্মিলিত অভিজ্ঞতা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে তিনি যেন পিএইচডিই করে ফেলেছেন। তাই তো ২৫০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের ছবি মুক্তির মাত্র এক সপ্তাহেই ৩২২ মিলিয়ন ডলার আয় করে ফেলেছে।
তাহলে কি সিনেমা হলে ব্যবসা করতে হলে বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করা ছাড়া গতি নেই? আর অনেক টাকা খরচ করলেই তো ছবি হিট হবে, এমনও না। এ বছরই মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ম্যান্ডালোরিয়ান অ্যান্ড গ্রোগু’, ‘সুপারগার্ল’ আর ‘মাস্টার্স অব দ্য ইউনিভার্স’—সবই বড় বাজেটের ছবি, আর তিনটিই বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
সুখবর হচ্ছে, গতি আছে। পথও আছে। আর সেই পথটা অনেক দিন ধরে দেখিয়ে আসছে হলিউডের হরর ইন্ডাস্ট্রি।
কয়েক দশক ধরে আমেরিকায় বিশাল একটা হরর ফ্যানবেজ তৈরি হয়েছে, যারা নিয়মিত হরর ছবি দেখে। হলে গিয়ে হোক কিংবা বাসায় বসে। আর যেহেতু হলিউডের ইন্ডাস্ট্রি অত্যন্ত সক্রিয় ও শক্তিশালী, তাই সেখানে তুলনামূলক কম খরচে হরর ছবি বানানো যায়। এরপর কোথাও না কোথাও নির্মাতা লাভে সেটা বিক্রি করেই ফেলেন।
কারণ, হরর ছবি অনেকটা গানের মতো। একটা গান ভালো লাগার জন্য ভাষা বোঝা লাগে না। তাই তো আমরা বাংলা গানের পাশাপাশি ইংরেজি, হিন্দি, কোরিয়ান—সব ভাষার গানই শুনি। ভয়ও ঠিক তেমন। ভয়ের কোনো ভাষা নেই। পৃথিবীর যেকোনো দেশের ভালো হরর ছবি অন্য যেকোনো দেশের দর্শকের সঙ্গে কানেক্ট করতে পারে।
তাই নেটফ্লিক্স, আমাজন প্রাইম বা অন্যান্য স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে দেখবেন, দুদিন পরপরই নতুন হরর ছবি আসছে। বিষয়টা ভারত ইতিমধ্যেই ধরে ফেলেছে। জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড তো অনেক আগেই ধরেছে। এখন সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের।
এখন প্রশ্ন আসবে, আমাদের তো সেই রকম শক্তিশালী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নেই। খুব সাধারণ একটা হরর সিকোয়েন্স ধারণ করতেও এখানে তুলনামূলক অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়।
কথাটা একদম সত্যি। এবং এটাই সবচেয়ে বড় বাধা।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের একটা হরর ছবি বানাতে কম করে হলেও ৬-৭ কোটি টাকা লাগবে। কিন্তু এই টাকা বাংলাদেশের বাজার থেকে উঠে আসবে, সেই নিশ্চয়তা কোথায়?
এখানেই আমি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিতে চাই—শুধু বাংলাদেশ নিয়েই ভাবছেন কেন?
হরর ছবির দর্শক তো পুরো পৃথিবীতেই আছে। আপনি আজ ৬ কোটি টাকা দিয়ে একটা ভালো হরর ছবি বানালেন। তারপর সেটার আন্তর্জাতিক স্বত্ব বিক্রি করলেন ১০ লাখ ডলারে। অর্থাৎ প্রায় ১২ কোটি টাকা। হিসাবটা আমি খুব সরল করে বলছি, ব্যাপারটা বোঝানোর জন্য। কিন্তু আমি একেবারে হাওয়ায় কথা বলছি না।
এই তো কয়েক দিন আগেই দুটো হরর ছবি বিশ্বজুড়ে ঝড় তুলেছে—‘অবসেশন’ আর ‘ব্যাকরুমস’।
খুবই সাধারণ গল্প। কিন্তু নির্মাণ? অসাধারণ। আর সিনেমা হলের সেই সম্মিলিত অভিজ্ঞতার জন্য একেবারে পারফেক্ট।
‘ব্যাকরুমস’-এর বাজেট ছিল ১০ মিলিয়ন ডলার। কারণ, এখানে পরিচিত দুজন অভিনয়শিল্পী আছেন, আর বেশ কিছু সেটও নির্মাণ করতে হয়েছে। কিন্তু ছবিটি বক্স অফিসে আয় করেছে ৩৮৭ মিলিয়ন ডলার।
আর ‘অবসেশন’?
পুরোটাই অন-লোকেশন শুট। বাজেট? মাত্র ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার। অর্থাৎ প্রায় ৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা। আর বক্স অফিস? ৪৪৩ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা।
ভাবা যায়? আরেকটু ভাবুন। এই দুই ছবির কোনো নির্মাতাই এর আগে ফিচার ফিল্ম বানাননি। দুজনই ইউটিউব থেকে উঠে আসা নির্মাতা। আমাদেরও ভাবতে হবে।
বাংলাদেশে এখন ৯-১০ কোটি টাকায় চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু সেই ফিল্ম আমাদের ভৌগোলিক গণ্ডির মধ্যে আটকে আছে। আমরা শুধু বাংলাদেশের বাজার নিয়েই ভাবি। যত দিন এই মানসিকতা থাকবে, তত দিন আমরা হয়তো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দু-একটা পুরস্কার পাব, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারব না। আর বাণিজ্যিক সফলতা ছাড়া কোনো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি দীর্ঘ মেয়াদে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
আন্তর্জাতিক প্রযোজকেরা প্রতিনিয়ত নতুন গল্প খুঁজছেন। যেকোনো ব্যবসায়ীর মতোই তারা দেশ দেখেন না, মানুষ দেখেন না—তারা দেখে ব্যবসার সম্ভাবনা। আমাদের সময় এসেছে নিজেদের গল্প আন্তর্জাতিক মানে নির্মাণ করে বিশ্ববাজারে নিয়ে যাওয়ার।
ভয় পেয়ে বসে থাকলে হবে না।
কারণ, ‘অবসেশন’ আর ‘ব্যাকরুমস’ বানিয়ে দুই ইউটিউবার নির্মাতা ইতিমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছেন—
ভয় থেকেই জয়।
লেখক: ফিল্ম এনথুজিয়াস্ট ও প্রডিউসার
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top