বিশেষ ফিচার I সুউচ্চ ভবনে উত্তপ্ত ফাঁদ
উন্নয়নের প্রতীক হয়ে ওঠা হাইরাইজ স্থাপত্য আমাদের নগরজীবনকে বাসযোগ্য রাখছে, নাকি অদৃশ্য তাপের ফাঁদে বন্দি করছে, সেই প্রশ্ন জরুরি। লিখেছেন শিক্ষক ও স্থপতি কনক সাহা
ইংরেজিতে যাকে বলে স্কাইস্ক্র্যাপার, মানে আকাশছোঁয়া ভবন—সে রকম কিছু বাংলাদেশে এখনো হয়নি। তবে হাইরাইজ কিংবা বহুতল ভবন, সংজ্ঞা অনুযায়ী ৭৫ ফুটের ওপরে যেকোনো দালান—সে রকম ভবনে ছেয়ে গেছে ঢাকার মানচিত্র। এই স্থাপত্যিক পরিবর্তন এক অর্থে অবশ্যম্ভাবী ছিল। কারণ, ঢাকার জনসংখ্যা গত ৩০ বছরে চার গুণের বেশি বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আবাসন আর কর্মসংস্থানের তাগিদে পুরোনো ভবন ভেঙে উঠেছে গায়ে গা লাগানো উঁচু থেকে আরও উঁচু দালান। রাজনৈতিক নেতারাও ক্রমশ স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন, কখনো সিঙ্গাপুর, কখনো নিউইয়র্ক, কখনো লন্ডনের! এসবের মাঝে আমাদের নিজেদের মতো আলাদা একটা শহরের স্বপ্নটাই দেখা হয়নি।
উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে হাইরাইজ ভবন ইউরোপ আর আমেরিকায় সভ্যতামূলক উন্নতি, প্রযুক্তিগত উন্মেষ আর মানুষের অসীম সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আধুনিক ঢাকায় তার প্রভাব পড়া এক অর্থে সময়োপযোগীই ছিল। কিন্তু নির্বিকার নকলের চেয়ে হয়তো দরকার ছিল আরও কিছু বেশি। ভেবে দেখা উচিত ছিল, কীভাবে এই প্রযুক্তিকে আমাদের শহরের আবহাওয়া-পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া দরকার, তার জন্য কী ধরনের পরিবর্তন আর সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
২০০৮ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালার নিয়মজনিত সুবিধায় এরপরে দ্রুতগতিতে ঢাকায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক, সঙ্গে মিশ্র ব্যবহারে হাইরাইজের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। যে ধরনের হাইরাইজ বিল্ডিং এখানে গড়ে উঠেছে, সেগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কাচঘেরা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, যেখানে উঁচু তলায় অতিরিক্ত বাতাসের চাপ থাকে, তা থেকে বাঁচতে, প্রাকৃতিক বাতাসের রাস্তা বন্ধ করে কৃত্রিম আলো-বাতাসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এর স্বাভাবিক ফল হচ্ছে অতিরিক্ত বিদ্যুৎশক্তির ব্যবহার আর অত্যধিক তাপ নিঃসরণ।
বাংলাদেশের মতো সীমিত সামর্থ্যের দেশে হাইরাইজ বিল্ডিং যদিও ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেছে, কিন্তু এই অতি ফসিল ফুয়েল ব্যবহারের চাপ আমাদের খরচ আর বায়ুদূষণ—দুটিই ত্বরান্বিত করে যাচ্ছে। প্রথমত, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ভবনগুলো বাইরে ছাড়ছে গরম বাতাস, দ্বিতীয়ত কাচ বা স্টিলের মতো অত্যন্ত তাপ প্রতিফলনকারী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে বাইরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিবছর গ্রীষ্ম অসহনীয় হয়ে উঠছে শহরগুলোতে। নগর-পরিকল্পনা এবং স্থাপত্য বিষয়ের একাধিক গবেষণায় এর মাত্রা উঠে এসেছে। গবেষক তানিয়া শারমিন ও সাইমুম কবির যেমন তুলে ধরেছেন, অধিক বাণিজ্যিক মুনাফার লক্ষ্যে ঢাকায় যেসব দালান গড়ে উঠেছে, সে কারণে অসংখ্য ক্ষুদ্র তাপদ্বীপ তৈরি হয়েছে। সুউচ্চ ভবন বাড়ার সঙ্গে বাইরের খোলা জায়গায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক উঠে এসেছে এ রকম বহু গবেষণায়।
যদিও মহানগরীগুলোতে তাপমাত্রা বা বায়ুদূষণ বৃদ্ধির অবশ্যই এটা একমাত্র কারণ নয়; আমরা অকাতরে ধ্বংস করেছি খোলা সবুজ মাঠগুলো। একসময়ের পুকুর-খাল-বিলে ভরা ঢাকা শহরে এখন পানি খুঁজে পাওয়াই দায়, সেই সঙ্গে যাবতীয় অর্থনৈতিক সুযোগের কেন্দ্র হিসেবে অস্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি তো আছেই। কিন্তু সেসবের পরেও স্থাপত্যের দায় থেকে যায়। এই ক্রান্তীয় নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার দেশে শহরগুলো কেন দিন দিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে, তার পেছনে আমাদের স্থাপত্যের নিজস্বতার অভাব একটা বড় কারণ। পশ্চিমা নকলের বাইরে গিয়ে দরকার ছিল নিজেদের তাপ-হাওয়া-পানির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থাপত্যের চিন্তা আর গবেষণা। সঙ্গে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী এবং ভবনের নকশা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি নগর-পরিকল্পনা। হাইরাইজের ক্ষেত্রেও যে আঞ্চলিক নিজস্বতা আর পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানো যেতে পারে, তার উদাহরণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা চীনেই রয়েছে। সিঙ্গাপুরের বিশ্বখ্যাত স্থাপত্য ফার্ম ডব্লিউওএইচএ আর্কিটেক্টসের কাজ কিংবা তাইওয়ানের তাইপেই টাওয়ারের নকশা দেখলেই তা বোধগম্য হয়। জ্বালানি বা বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে হাইরাইজে মিতব্যয়ী ডিজাইনের সম্ভাবনা, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণসামগ্রীর পুনর্ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা হচ্ছে। এই ধারায় বাংলাদেশেও দরকার এসব আবিষ্কারের দেশীয় পরিবেশে ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা নিয়ে যুগোপযোগী কাজ এবং তার বাস্তব প্রয়োগ। সংস্কৃতির মতো স্থাপত্যেও নিজস্বতার চর্চা অব্যাহত না রাখলে আমাদের শহরগুলো দীর্ঘ মেয়াদে বসবাসের অনুপযোগী কংক্রিটের বস্তিতে পরিণত হবে।
নিঃসন্দেহে সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ কম জমিতে বেশি মানুষের আবাসিক বাণিজ্যিক বিবিধ ব্যবহার নিশ্চিতের সুযোগ করে দেয়। একই সঙ্গে উচিত ছিল বাকি খোলা জমিতে সবুজায়ন ও জলাধারের উৎস নিশ্চিত করা। অপরিকল্পিত নগরায়ণের বোঝায় জর্জরিত এই শহরে আমরা না পেরেছি সত্যিকার অর্থে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে ধারণ করার মতো হাইরাইজ নির্মাণ করতে, না পেরেছি মাঠ-পানিকে বাঁচাতে। ফলে অবিশ্বাস্য গতিতে উত্তপ্ত দূষিত হয়ে উঠেছে শহরগুলো, আর আমাদের শিশুরা দূষিত বাতাস-পানির অভিশাপে নিরানন্দ অন্ধকারে শৈশবের ঘুড়ি ওড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে স্বীকার করে সেসব পরিবেশ-প্রতিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য ঘটানোর চেষ্টাই এই অন্ধকার নিরাশার শহরকে হয়তো অপেক্ষাকৃত বাসযোগ্য হিসেবে টিকিয়ে রাখতে পারে। বিশেষত হাইরাইজ ভবনের নকশা ও পরিকল্পনায় উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটানো দরকার। যাতে আলো-বাতাস নিশ্চিত হয়, শহরের দিকে ভবনগুলো যেন গরম নিশ্বাস না ছাড়ে আর জ্বালানি শক্তি খরচের পরিমাণটা কমানো যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করা জরুরি এখনই।
বহুদিন হয়ে গেল, ঢাকা শহরের আকাশটা কিনে নিয়েছে পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ দালানগুলো। বছরখানেক আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল একটি ভিডিও ক্লিপ, যেখানে ছোট এক বাচ্চা তার বাসার জানালা দিয়ে দুই বিল্ডিংয়ের ভয়েডের কয়েক হাত অন্ধকার জায়গায় ঘুড়ি ওড়ানোর চেষ্টা করছিল। আমাদের পুরো নগর-পরিকল্পনা আর স্থাপত্যের ফাঁকা বুলি সেই ছবিতেই ধসে পড়ার কথা। তবে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা লোভ আর জনঘনত্বের শহরে সোশ্যাল মিডিয়া রোজ যত নতুন চমক নিয়ে আসে, তাতে এত কিছু মনে রাখার দায় কই! হঠাৎ ২০-৩০ বছর পরে ঢাকায় ফেরত আসা যেকোনো প্রবাসী এই শহরের আকস্মিক বদল দেখে নিশ্চয় চমকে যাবেন। ঢাকায় যারা এই সময়ের অধিবাসী, তারা কি গর্ব অনুভব করেন এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোয়ার দেখে? নাকি কেউ কেউ গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে খোঁজেন খাল-নদী-সবুজ আর পাড়া-মহল্লায় সাজানো অন্তরঙ্গ নগরকে!
ছবি: ইন্টারনেট
