এডিটর’স কলাম I সৌন্দর্যের আয়নায় পরিবর্তন -কানিজ আলমাস খান
সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সৌন্দর্যশিল্পের সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে খুব কাছ থেকে দেখেছি, এই কর্মক্ষেত্র জীবিকা অর্জনের পাশাপাশি মানুষের আত্মবিশ্বাস, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার শক্তিশালী মাধ্যম
১৯৯০ সালে যখন পারসোনার যাত্রা শুরু হয়, সঙ্গে ছিলেন ১২ জন গারো সৌন্দর্যকর্মী নারী। এরও আগে, আমার প্রথম কর্মী দলের পাঁচজন সদস্য ছিলেন তারা। আজ পারসোনা একটি বিস্তৃত পরিবার। প্রায় আড়াই হাজার সহকর্মীর মধ্যে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা কাজ করছেন, তাদের মধ্যে গারো নারীরা অন্যতম বৃহৎ অংশ।
গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। এই সমাজে বেড়ে ওঠার সময় থেকে সেই নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তাদের স্বভাবসুলভ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কঠোর পরিশ্রম ও কর্মক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, যা সৌন্দর্যসেবার মতো মানুষকেন্দ্রিক পেশায় তাদের মূলধারায় যুক্ত করেছে।
শুরু থেকে আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে একজন তরুণী আত্মপরিচয় এবং ভবিষ্যৎ গড়ার আত্মবিশ্বাস অর্জন করবেন। এই লক্ষ্য থেকে প্রশিক্ষণকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। পারসোনার অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পাশাপাশি পারসোনা ইনস্টিটিউট অব বিউটি অ্যান্ড লাইফস্টাইলের মাধ্যমে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি, গ্রুমিং, বিউটি থেরাপি, গ্রাহকসেবা এবং স্যালন ব্যবস্থাপনার ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রতিবছর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়, যাতে আমাদের কর্মীরা বিশ্বের পরিবর্তিত ধারা ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের রাখতে পারেন সমসাময়িক ও আগুয়ান।
এই দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, আমাদের অসংখ্য কর্মী আজ সফল উদ্যোক্তা। কেউ নিজস্ব স্যালন পরিচালনা করছেন, কেউ বিউটিবিষয়ক ট্রেনিং দিচ্ছেন, আবার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অনেকের সন্তান আজ করপোরেট প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা কিংবা অন্যান্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত। একটি প্রজন্মের পরিশ্রম ও আত্মনিবেদন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কর্মী থেকে উদ্যোক্তা—এমন রূপান্তরের সাক্ষী হওয়ার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আমার জন্য আর কী হতে পারে!
একসময় দেশের বিউটি পারলারগুলো মূলত চীনা উদ্যোক্তাদের পরিচালনায় ছিল। পূর্ব এশীয় বৈশিষ্ট্যের মিল থাকায় সে সময় অনেক গারো নারী সেখানে কাজের সুযোগ পান। সেগুলো বন্ধ হওয়ার পরে যখন দেশীয় উদ্যোক্তারা আধুনিক সৌন্দর্যশিল্পকে সংগঠিত রূপ দেন, তখন গারো নারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। একজন যোগ দিয়েছেন, পরে নিয়ে এসেছেন তার বোন, আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশীকে। একসঙ্গে বসবাস, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ তাদের শহুরে জীবনে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। এই পারস্পরিক আস্থা এবং মূলধারার স্রোতে মিশে যাওয়ার সুযোগ তাদের পেশাজীবী সম্প্রদায় হিসেবে গড়ে তুলেছে।
৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে আমি গারো সম্প্রদায়সহ বাংলাদেশের সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনবোধ আমাদের জাতীয় পরিচয়কে আরও সমৃদ্ধ করেছে। আমার বিশ্বাস, প্রত্যেক মানুষ তার পরিচয় নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারলে, সমান সুযোগ এবং নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ পেলে একটি দেশের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। সেই বিশ্বাস আজও আমার পথচলার সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
