skip to Main Content

মাছকাহন I ম্যাঙ্গো ফিশ ম্যাডনেস

‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। বহু পুরোনো প্রবাদ। এই অঞ্চলের এক সুস্বাদু মাছের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পাঠ দিচ্ছেন আল মারুফ রাসেল

‘এমত অমৃত ফল ফলিয়াছে জলে
সাহেবরা সুখে তাই ম্যাঙ্গো ফিশ বলে’

শুরুতে শরণ নিলাম যুগসন্ধিক্ষণের কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের। কারণ, পুরো লেখাই যে এই ম্যাঙ্গো ফিশকে স্মরণ করে! ইংরেজ শাসনে ভাগ্য ফেরাতে ভারতে আসা লোকেদের কাছে রীতিমতো এক আতঙ্কের নাম ছিল বর্ষা। এখানে তাদের আয়ু বড়জোর দুই বর্ষা বলেই ভাবা হতো। তবে এই জীবন-জুয়ায় দুই বর্ষা উতরে যেতে পারলেই তারা বনে যেতেন রীতিমতো বড়লোক। কারণ, সেই আমলে বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররাই গ্রেট ব্রিটেনে বছরে এক হাজার পাউন্ড কামাতে পারতেন না, আর ভারতে প্রতিবছর ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার পাউন্ড কামানো ছিল বাঁ হাতের খেল! বৃষ্টির মৌসুমে নানা রকম পানিবাহিত রোগ, সাপের উপদ্রব তো ছিলই, সঙ্গে মানসিক অবসাদও। ঘোরতর বর্ষায় তাদের আরও দুদণ্ড শাস্তি দিত ‘আম মাছ’ বা ‘ম্যাঙ্গো ফিশে’র অভাব।

১৮৮০ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত নামহীন লেখকের ‘ইন্ডিয়ান কুকারি বুক’-এ এর নামকরণের বিষয়ে বলা হয়েছে, মাছের বাজারে এপ্রিলে নানা ধরনের কার্প ও মাগুরের সঙ্গে প্রচুর ম্যাঙ্গো ফিশ দেখা যেত। এ সময়ে এগুলো ডিম ছাড়তে বাংলার নদীতে ছড়িয়ে পড়ত। গাছে আম ধরার সময়ে এই মাছের দেখা মিলত নদীতে। আবার জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে আমের মৌসুম যখন ফুরোনোর সময়, তখন এই মাছও গায়েব হয়ে যেত।
ম্যাঙ্গো ফিশ ধরতে যাওয়া বেশ আয়োজনের ব্যাপার ছিল, অনেকটা শিকারের মতোই। বড় নৌকা সাজানো হতো, কয়েক দিনের রসদ থাকত তাতে—খাবার, পানীয়, কাপড়চোপড়, দশ-বারোজন পরিচারক, খানসামা, বাবুর্চি—সে এক এলাহি কারবার! কিছু জায়গায় ‘ফিশ হান্টিং’ বা ‘মৎস্য শিকার’ লেখা পেলেও আমি ‘ধরা’ই বলি। কারণ, এই মাছের যে আকার, তাতে শিকার বললে আমাদের যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের বাঘাড় মাছ শিকারিদের নির্ঘাৎ হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে! সঙ্গে সাহেবরা ছিপ ফেলতেন, তবে সেটা সম্ভবত লোকদেখানো ছিল। কারণ, যত মাছই ঘুরুক না কেন, ছিপ তথা বড়শি দিয়ে এই মাছ ধরা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ হওয়ার কথা। সম্ভবত পেছনে কয়েকজন জেলেও তাদের কাজে ব্যস্ত থাকতেন, যা দিয়ে মূলত উদরপূর্তি হতো।
বলা হয়, ম্যাঙ্গো ফিশের স্বাদ নাকি পৃথিবীর সব চেনা-জানা মাছের স্বাদকে পেছনে ফেলতে পারে। সে কারণেই স্থানীয় ও ইউরোপীয়—সবাই এই মাছের খোঁজ করত। ফল—বাজারে এর দুর্মূল্য। ইন্ডিয়ান কুকারি বুক জানাচ্ছে, সে আমলে মৌসুমের শুরুতে টাকায় চার বা আটটি পাওয়া যেত এই মাছ। মে মাসে যখন সবচেয়ে ভালো স্বাদেরটি বাজারে প্রচুর উঠত, তখন টাকায় এক কুড়ি মাছও মিলত। এর পরের মাসেই আবার টাকায় দুই কুড়ি বা তিন কুড়ি ম্যাঙ্গো ফিশও পাওয়া যেত। মৌসুমের শেষে এই মাছের দাম মৌসুমের শুরুর মতো চড়া হতো। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে কিছু মিলত, তবে সেগুলোয় স্বাদ হতো না—অপ্রজনন ঋতুর মাছ হওয়ার কারণে।
ম্যাঙ্গো ফিশের প্রতি ব্রিটিশদের এই ভালোবাসা বাঙালিরা খুব একটা ভালো চোখে দেখেনি। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তো লিখেছিলেন—
‘ব্যয় হেতু না হয় কাতর
খানায় আনায় কত করি সমাদর
ডিস ভরে কিস লয় মিসি বাবা যত
পিস করে মুখে দিয়ে কিস খায় কত।
তাদের পবিত্র পেটে তুমি কর বাস
এই কয় মাস আর নাহি খায় মাস।’
এতবার ম্যাঙ্গো ফিশের নাম পেলেন; আসুন, এবার জেনে নিই এর কুল পরিচয়। মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম পলিনেমাস প্যারাডিসিয়াস। আরেকটি ইংরেজি সাধারণ নাম হলো প্যারাডাইস থ্রেডফিন। দেশের অ্যাকুয়ারিস্টদের কাছে তেমন প্রিয় না হলেও বিদেশে বাহারি মাছ হিসেবে এর বেশ কদর রয়েছে। বাংলায় অবশ্য নামের অভাব নেই, তবে সবচেয়ে প্রচলিত নাম হলো তপসে, আর শুদ্ধ বাংলায় তপসী। ‘টেস্ট অব টাইম’ বইয়ে আরও বিস্তারিত বলেছেন মোহনা কাঞ্জিলাল, ‘নিষ্পাপ পবিত্র মানুষের মতো এই মাছেরও দাড়ি-মোচ আছে। এ ছাড়া মাছের মুখ, পাখা ও লেজে গেরুয়া রং আছে, যা তপস্বীদের পোশাক রং। এ কারণেই এ মাছের নাম তপস্বী।’
মূলত লোনা আর মিশ্রপানির মাছ, বর্ষার আগে আগে মিঠাপানিতে উঠে আসে প্রজননের জন্য—অনেকটা ইলিশের মতো। আর সে সময়েই সাহেবরা ঝাঁপিয়ে পড়তেন শিকারে। খুলনা, যশোর, নদীয়া, কলকাতা, চাঁদপুর, বাকেরগঞ্জ—মানে মূলত নিম্ন বঙ্গেই এই মাছ-ধরা চলত। মাছটি প্রাপ্তবয়স্ক হলে সর্বোচ্চ এক ফুট হয়, তবে এখনকার শহুরে বাজারে চার-পাঁচ ইঞ্চির ওপরে খুব কম দেখা যায়। ম্যাঙ্গো ফিশ সাহেবরা খেতেন মূলত ডিপ ফ্রাই করে। পাশাপাশি ইলিশের মতোই স্মোকড করেও খাওয়া হতো। ১৮৪৪ সালের এপ্রিলের প্রথম দিনে বিখ্যাত পর্যটক ফ্যানি পার্ক, কলকাতার কাছে এই মাছ খেয়ে প্রশংসা করেছিলেন। আর পরদিন সকালে নাশতায়ও আনওয়ারি ঘরানায় কয়লায় পুড়িয়ে খেয়েছিলেন। এ মাছের শুধু মেরুদণ্ডেই নরম কাঁটা, সে কারণে আস্ত ফ্রাই করে খাওয়ার চল ছিল সাহেবদের মধ্যে।
‘ক্যালকাটা ট্যাভার্নস অ্যান্ড হোটেল’স-এ মেজর হ্যারি হবস লিখেছেন, সার্ডিনের থেকে সামান্য বড় আর হেরিংয়ের থেকে ছোট এই মাছ দুর্দান্ত স্বাদের। সরাই, হোটেল আর রেস্টুরেন্টগুলো এর জনপ্রিয়তার সুযোগ নিত। একটা সময় ছিল যখন চার রুপিতে ১০০টির বেশি ম্যাঙ্গো ফিশ পাওয়া যেত। ‘স্মোকড ম্যাঙ্গো ফিশ’ ছিল সাহেব ও মেমদের প্রিয় খাবার। ১৮২২ সালে প্রকাশিত ‘ফিফটিন ইয়ারস ইন ইন্ডিয়া’ বইয়ে আর জি ওয়ালেস লিখেছেন, ‘হুগলির ম্যাঙ্গো ফিশের চেয়ে সুস্বাদু কিছু আর এই দুনিয়ায় নেই, এটা দেখতে যেমন সুন্দর খেতেও তেমন সুস্বাদু…আর এর চমৎকার ডিমের সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা করা যায় না। বছরে কেবল দুমাস এই মাছ প্রচুর পরিমাণে মেলে। এর ডিম সংরক্ষণ করা হয় যেন বছরের অন্য সময়ে খাওয়া যায়।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘এক থালা ম্যাঙ্গো ফিশ খেতে কয়েক মাসের সমুদ্রযাত্রার ধকলও সওয়া যায়।’
ভারতবর্ষের সাংবাদিকতার জনক জেমস অগাস্টাস হিকির ‘বেঙ্গল গ্যাজেট’-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে কলকাতার সব মিটিংয়ের মুখ্য অ্যাজেন্ডা হতো ম্যাঙ্গো ফিশ খাওয়া। অনেকে শপথ করেই বলতেন, হালকা মুচমুচে করে ভাজা এই মাছ খেতে শহরে যাত্রার ধকল বিফলে যায় না। অনেকে মফস্বল থেকে শহরে আসতেন ফাইন ডাইনে বসে মাছ ভাজা খেতে, সঙ্গে থাকত বেঙ্গল রাম। এই মাছের প্রতি তাদের টান এতটাই ছিল যে এক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘কলকাতা আমার লিভার নষ্ট করলেও, পেটে শান্তি দিয়েছিল ম্যাঙ্গো ফিশ।’
কবি হেমচন্দ্রের বাড়িতে প্রতি শনিবার বসত সাহিত্য সভা। সেখানে সভা শেষে থাকত আহারের ব্যবস্থা। পদ্য লিখে তিনি এই সভার আমন্ত্রণ জানাতেন:
‘তপ্ত তপ্ত তপসে মাছ, গরম গরম লুচি,
অজা মাংস ভাজা কপি আলু কুচি কুচি।
শীতের দিনে ভাবে যদি তুলে থাবা থাবা,
দশ নম্বর পদ্মপুকুর দৌড়ে এস বাবা।’
এ সত্যি অভিনব দাওয়াতপত্র। তপসে মাছের আকর্ষণে ভিটে বেচে দিতেও দ্বিধা করবেন না বলে জানিয়েছিলেন ঈশ্বর গুপ্ত:
‘গোঁৎ করে সে্যাঁত ঠেলে ভাটী গাঙ ছেড়ে।
উজানের পথে চল দাড়ী গোঁপ নেড়ে।।
শাঁখ ঘণ্টা বাজাইবে যত মেয়ে ছেলে
ভিটে বেচে পুজো দিব মিটে জলে এলে।।’
কথায় কথা বাড়ে, এর চেয়ে ঘরে বসে খাওয়া যাক সাহেবদের ফ্রাই! প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ বইয়ে রয়েছে সে সময়কার সাহেবদের মাছ ভাজার তরিকা, আগ্রহীরা চেষ্টা করে দেখতে পারেন—‘তপসিমাছের ফ্রাই’ (এই বানানেই লিখেছিলেন প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী, রেসিপিতেও তার বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)।
 ‘উপকরণ: তপসিমাছ এক কুড়ি, নুন সিকি তোলা, ময়দা দেড় ছটাক, ডিম দুটি, বিস্কুটের গুঁড়া (অথবা বাসী পাউরুটির ছিল্কা) আধপোয়া।’
 ‘প্রণালি: তপসিমাছ আনিয়া তাহার শুঁয়ো কাটিয়া ফেল। মাছের গলায় একটু চিরিয়া তেল পিত্তাদি বাহির করিয়া ফেল। তারপর মাছটা চাঁচিয়া আঁশ ছাড়াও। ডিম থাকিলে সাবধানে বানাইবে যেন ডিম বাহির হইয়া না যায়। ভাল করিয়া ধোও। একটি কাপড়ে মাছগুলি মুছিয়া ফেল। মাছে প্রথমে নুন মাখিয়া রাখ। এখন একটি চেপ্টা পাত্রে ময়দা (খুসকি) রাখ। মাছের গায়ে উল্টাইয়া পাল্টাইয়া যতটুকু ময়দা লাগাইতে পার লাগাও। তারপরে প্রত্যেক মাছ আবার ঝাড়িয়া রাখিবে। এই রকম ময়দা দেওয়ার মানে মাছটাকে শক্ত করিয়া লওয়া।
এখন ডিম ভাঙ্গিয়া ফেটাও। একটু নুন মিশাও। এক হাত দিয়া ডিমে মাছ এক একটি করিয়া ডুবাও আর বিস্কুটের গুঁড়ার উপরে ফেল। তারপরে অন্য হাত দিয়া মাছ বিস্কুটের গুঁড়ার উপরে ফেল। তারপরে অন্য হাত দিয়া মাছ বিস্কুটের গুঁড়ার উপর হইতে নাড়িয়া তোল।
এবারে ঘি চড়াও। ঘি পাকিয়া আসিলে এক এক খোলার দুই তিনটী করিয়া মাছ ছাড়। মাছ বাদামী রংএর ভাজা হইলেই ঘি হইতে ছাঁকিয়া আবার নূতন মাছ ছাড়িবে।’

ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top