স্পাইস আপ I স্বর্গীয় সুবাস
মরিচের মতো তীব্র ঝাঁজালো স্বাদ, আবার এলাচির মতো মিষ্টি সুবাস—মসলার দুনিয়ায় এক প্রাচীন ও রহস্যময় রত্ন হলো গ্রেইন্স অব প্যারাডাইস। আদার দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় এই উদ্ভিদের বীজগুলো অনেকটা গোলমরিচের মতো হলেও এর স্বাদ ও সুঘ্রাণ অনন্য।
পশ্চিম আফ্রিকার আদিম এই মসলার বৈজ্ঞানিক নাম আফরামাম মেলাগুয়েতা। অঞ্চলভেদে অ্যালিগেটর পেপার বা গিনি পেপার নামেও ডাকা হয়। তবে স্বর্গের দানা বা গ্রেইন্স অব প্যারাডাইস নামটি জুড়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে চতুর্দশ শতাব্দীর ইউরোপীয় বণিকদের চতুর বিপণনকৌশল। মধ্যযুগে যখন গিনি উপসাগর দিয়ে এই মসলা ইউরোপে পৌঁছায়, তখন সেই মহাদেশের ধনী এবং অভিজাত পরিবারগুলো খাবারে ও পানাহারে আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলতে এর ব্যবহার শুরু করে। ইউরোপীয় বাজারে এর চাহিদা ও দাম আকাশচুম্বী রাখতে সাব-সাহারানের বিচক্ষণ বণিকেরা একটি গল্প ছড়িয়ে দেন। বলতে শুরু করেন, এই অলৌকিক মসলা সরাসরি স্বর্গোদ্যান থেকে প্রবাহিত নদীতে ভেসে পৃথিবীতে এসেছে। এই রোমাঞ্চকর মিথ থেকে এর এমন নামকরণ। পশ্চিম আফ্রিকার যে উপকূল থেকে জাহাজে তোলা হতো, মানচিত্রে দীর্ঘদিন সেই জায়গার নাম ছিল গ্রেইন কোস্ট।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও জীবনধারাবিষয়ক অনলাইন পোর্টাল ওয়েবএমডির গবেষণা অনুযায়ী, গ্রেইন্স অব প্যারাডাইসের বীজে এমন কিছু প্রাকৃতিক রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, যা তিন উপায়ে মানব শরীরে কাজ করে। প্রথমত, শরীরের ভেতরের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে; দ্বিতীয়ত, ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই চালায়; তৃতীয়ত, এর কিছু উপাদান শরীরের ব্রাউন অ্যাডিপোজ টিস্যু বা ভালো চর্বিকে সক্রিয় করে; যা মেটাবলিজম বাড়িয়ে ক্যালরি ও মেদ পোড়াতে সহায়ক। বহু বছর ধরে নানা শারীরিক সমস্যায় গ্রেইন্স অব প্যারাডাইস ব্যবহার করছেন আফ্রিকার লোকজ চিকিৎসকেরা। ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়রিয়া ও পেটের নানাবিধ অসুখ নিরাময়, হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানো, বদহজম, গ্যাস্ট্রিক আলসার প্রতিরোধসহ মূত্রনালির সংক্রমণ এবং কিডনির সমস্যা দূরীকরণে এর ব্যবহার বেশ পুরোনো।
স্বাদের দিক থেকে গ্রেইন্স অব প্যারাডাইস বেশ জটিল ও চমকপ্রদ। এর রয়েছে গোলমরিচের মতো কড়া ঝাঁজালো ভাব। তবে সেই ঝাঁজ ছাপিয়ে এর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে এলাচি, আদা আর লেবুর সতেজ মিষ্টি সৌরভ। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে মিষ্টি ও ঝাল—উভয় ধরনের খাবারে এটি দারুণ মানিয়ে যায়। বিশেষ করে খাসি, ভেড়া কিংবা মুরগির মাংসের স্টু ও রোস্টে গোলমরিচের চমৎকার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী রান্নার প্রধান উপাদান এটি। অন্যদিকে মৃদু মিষ্টি সুঘ্রাণের জন্য ইউরোপ-আমেরিকায় ক্রিসমাস কেক, পাই, জিঞ্জার ব্রেড এবং বিভিন্ন ফলের চাটনি তৈরিতেও এর কদর রয়েছে। এ ছাড়া আধুনিক ক্রাফট বিয়ার, প্রিমিয়াম জিন এবং স্পাইসড টি বা চায়ের মসলা হিসেবে এটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
স্বাভাবিকভাবে পশ্চিম ও উত্তর আফ্রিকার মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এটি ঐতিহ্যবাহী মসলা। যেমন নাইজেরিয়ান সংস্কৃতিতে অতিথিদের আপ্যায়নে বা বিশেষ অনুষ্ঠানে গ্রেইন্স অব প্যারাডাইস পরিবেশন বাধ্যতামূলক। এর বাইরে উন্নত দেশগুলোর প্রসিদ্ধ শেফ ও ভোজনরসিকদের কাছে এটি লাক্সারি বা প্রিমিয়াম মসলা। পশ্চিম আফ্রিকার নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে চাষ হওয়ায় এই বিরল মসলার দাম সাধারণ গোলমরিচের তুলনায় বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ১০০ গ্রাম গ্রেইন্স অব প্যারাডাইসের মূল্য মানভেদে ৮ থেকে ১৫ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের সাধারণ বাজারে এটি সচরাচর মেলা ভার। তবে বড় বড় সুপারশপ বা আমদানি করা অনলাইন অথেনটিক শপগুলোতে ১০০ গ্রামের প্যাক ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার টাকায় পাওয়া যায়।
নাঈমা তাসনিম
ছবি: ইন্টারনেট
