শ্রীবৃদ্ধি I ডাইনিং ডেকর
উদরপূর্তির আয়োজন হয় খাবার টেবিলে। এই আয়োজনে নান্দনিক টেবিল সজ্জার ভূমিকা অনস্বীকার্য
খাওয়ার টেবিল সজ্জা কতখানি গুরুত্ব বহন করে, তা টেবিলওয়্যারের ইতিহাসে তাকালে পরিষ্কার হয়। দস্তরখান, ট্রেঞ্চার থেকে অধুনা টেবিল—সুদূর অতীত থেকে একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত যা অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, তা হচ্ছে খাওয়ার টেবিলের গুরুত্ব। সবচেয়ে নিরাপদ, পরিষ্কার এবং সুশোভিত রাখা হয় বোধ করি খাবার ঘর আর খাবারের স্থানকেই। আঠারো শতকের ইউরোপে টেবিল সাজানো একটি শিল্পকলার রূপ নেয়, যা পরবর্তী সময়ে শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে প্রবেশ করে সাধারণ মানুষের ডাইনিং টেবিলে।
ঘরের সবচেয়ে খোলামেলা স্পেসটি ডাইনিংয়ের জন্য বরাদ্দ থাকায় ঘরে ঢুকেই টেবিলের সজ্জা নজর কাড়ে। মানুষের মনস্তত্ত্ব ও ঘরের আবহ নিয়ন্ত্রণে রঙের ভূমিকা বেশ স্পষ্ট। তাই রং ও কাপড়ের টেক্সচার নির্বাচন ডাইনিংয়ে মেজাজ ও নান্দনিকতা নির্ধারণ করে। যেমন ক্যাজুয়াল পরিবেশে হালকা প্যাস্টেল বা নিউট্রাল টোন এবং জমকালো আয়োজনে গাঢ় রংগুলো চমৎকার মানায়। ফরমাল পরিবেশে নেভি ব্লু বা রয়্যাল মেরুনের মতো গাঢ় রঙের ওপর সিল্ক বা স্যাটিনের টেবিল ক্লথ এক রাজকীয় রূপ দেয়। পাশাপাশি গ্রীষ্মের উজ্জ্বলতা, বর্ষার আর্দ্রতা অথবা শীতের ধূসরতার সঙ্গে সমন্বয় রেখেও ডাইনিং টেবিলের মেজাজ সেট করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে গ্রীষ্মে তাজা ফুল ও স্বচ্ছ গ্লাসওয়্যার, শীত বা বর্ষায় উডেন টেক্সচার এবং ক্যান্ডেলস্ট্যান্ডের সঙ্গে মানানসই লিনেন একখণ্ড নান্দনিক আর্টপিসে রূপান্তর করে টেবিলকে।
ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং আধুনিক জীবনযাত্রা অনুযায়ী দেশ ও দেশের বাইরে টেবিল টেক্সটাইল ব্যবহারে বৈচিত্র্য দেখা যায়। আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে অন্দরমহল সাজানোর অনুষঙ্গ নিয়ে কাজ করছে কারুজ। প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ড ম্যানেজার এস কে ইশতিয়াক জামিল বলেন, ‘ঘর সাজাতে আসবাব বা আলো নিয়ে ভাবলেও ডাইনিং টেবিলকে অনেকেই এড়িয়ে যান। অথচ এটিই প্রতিদিন পরিবারকে একসঙ্গে যুক্ত করার কেন্দ্রস্থল। টেবিল টেক্সটাইল বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি কাঠ বা মার্বেলের টেবিলকে দাগ ও ক্ষয় থেকে বাঁচায় এবং ডাইনিংয়ের পরিবেশ উষ্ণ ও অর্থবহ করে তোলে।’
দেশীয় আবহ আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে কারুজ তাদের কালেকশনে এনেছে নানা পদের টেবিল টেক্সটাইল ও লিনেন সামগ্রী। এসব টেবিল টেক্সটাইল উপাদানে ফ্যাব্রিকের ব্যবহার এবং সেগুলোর ধরনভেদে বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে।
প্রথমত, ডাইনিংয়ের নান্দনিক ভিত্তি হিসেবে টেবিল ক্লথ বা কভার মূল্যবান কাঠ বা মার্বেলের টেবিলকে সরাসরি ধুলোবালি, তরল খাবারের দাগ ও ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। এটি ব্যবহারের নিয়ম হলো টেবিলের চারপাশ থেকে ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি নিচে ঝুলিয়ে রাখা। কভারের ফ্যাব্রিক নির্বাচনে দেখা যায় প্রাকৃতিক সুতি বা কটন, আরামদায়ক লিনেন, ওয়াটারপ্রুফ পলিয়েস্টার এবং আভিজাত্য আনতে সিল্ক, স্যাটিন বা ভেলভেটের ব্যবহার। গ্রীষ্মকালে হালকা রঙের সুতি বা লিনেনের কভার মানানসই হলেও বর্ষায় ওয়াটার-রেজিস্ট্যান্ট টেক্সচার এবং শীতকালে ডার্ক মেরুন বা ভেলভেটের ভারী ফ্যাব্রিক চমৎকার আবহ তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, টেবিলের ঠিক মাঝখানে বিছিয়ে দেওয়া সরু ও দীর্ঘ টেবিল রানার ডাইনিংয়ে বাড়তি বৈচিত্র্য আনে। ক্যানভাস কটনের ডিজিটাল প্রিন্ট, নকশিকাঁথা বা বাটিক মোটিফ এবং দেশীয় পাটের সঙ্গে কটনের ফিউশনে তৈরি হয় এসব রানার। এর ব্যবহারে সরাসরি টেবিল বা টেবিল ক্লথের ওপর কন্ট্রাস্ট তৈরি করে দেওয়া যায়, যা মাঝখানে রাখা গরম পাত্রের নিরাপদ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। রানারের দুই প্রান্ত টেবিলের দুই পাশে ৬ থেকে ১০ ইঞ্চি হ্যাংগিং রাখলে দারুণ দেখায়।
তৃতীয়ত, প্লেট থেকে টেবিলের সরাসরি ঘর্ষণ ও দাগ এড়াতে ব্যবহৃত হয় প্লেসম্যাট বা টেবিল ম্যাট। এটি থালার আকারের চেয়ে একটু বড় হতে হয়, যেন পাশে গ্লাস বা অন্য সামগ্রী রাখার জায়গা থাকে। প্লেসম্যাটের ক্ষেত্রে অর্গানিক হ্যান্ডক্রাফটেড পাট, বাঁশ বা বেতের টেক্সচার, মোটা ক্যানভাস কটন ও সিলিকন ম্যাটেরিয়াল ব্যবহৃত হয়। গ্রীষ্মে হালকা কটন এবং বর্ষা বা শীতে পাটের বোনা প্লেসম্যাট টেবিলে আভিজাত্য আনে।
চতুর্থত, ওয়ান-টাইম টিস্যুর একটি নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয় সফট কটন বা পিওর লিনেন ফ্যাব্রিকের ক্লথ ন্যাপকিন, যা ন্যাপকিন রিং কিংবা ফ্রেঞ্চ ফোল্ড, পিরামিড বা রোজ ফোল্ডিংয়ের মতো নানা শৈল্পিক ন্যাপকিন ফোল্ডিংয়ের মাধ্যমে থালার ওপর আকর্ষণীয়ভাবে সাজিয়ে রাখা যায়। আর পানীয়ের পাত্রের কারণে টেবিলে চটচটে দাগ এড়াতে পাশে রাখা হয় কর্ক, পাট, কাঠ বা ফ্যাব্রিকড কোস্টার।
পঞ্চমত, ভিক্টোরিয়ান আবহে ভিনটেজ ও স্নিগ্ধ আমেজ নিয়ে আসতে কটন বা অরগ্যাঞ্জা ফ্যাব্রিকে সূক্ষ্ম ক্রশে ও কাস্টমাইজড এমব্রয়ডারির লেইস টেবিলওয়্যার বেশ জনপ্রিয়। টেবিল কভারের বর্ডার কিংবা ন্যাপকিনের সীমানায় লেইসের নান্দনিক ছোঁয়া যেমন ঐতিহ্য বজায় রাখে, তেমনি আধুনিক ডাইনিংয়ে কাটআউট মোটিফ কিংবা অনন্য আকৃতির কাস্টমাইজড বা কাটআউট ডিজাইন ডাইনিং স্পেসকে নতুন মাত্রা দেয়।
চূড়ান্তভাবে, পুরো টেবিলের মাঝে রঙের সামঞ্জস্য রাখতে বাজারে পাওয়া যায় ম্যাচিং বা কম্বো সেট; যেখানে একটি রানারের সঙ্গে ৪ বা ৬টি প্লেসম্যাট, ন্যাপকিন এবং কোস্টার একই ফ্যাব্রিক ও থিমে তৈরি থাকে। এটি ক্যাজুয়াল কিংবা বিশেষ উৎসবের আয়োজনে পুরো ডাইনিংকে নিমেষে একটি সুসংগঠিত ও পেশাদার রূপ দেয়। ঐতিহ্যবাহী পাটের বুনন ও টেক্সচার থেকে শুরু করে সুতি, লিনেন ও লেইসের সুবিন্যস্ত ডেকর—একটি আদর্শ ডাইনিং টেবিল হয়ে ওঠে পরিবারের উষ্ণতা, স্মৃতি ও অন্দরসজ্জার অনন্য এক ক্যানভাস।
শ্রেয় চৌধুরী
ছবি: কারুজ
