ফিচার I বিশে বাজিমাত
বয়স যখন বিশের কোঠায়, জীবন তখন দারুণ ব্যস্ত আর পরিবর্তনশীল। এই সময়ে ত্বকযত্ন নিয়ে তৈরি হয় অনেক বিভ্রান্তি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ থেকে ত্রিশ—তুমুল যৌবনের এই সময়কালে ত্বকে ভরপুর তারুণ্য থাকলেও ভেতরে ভেতরে বয়সের ছাপ পড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। তাই অতিরিক্ত পণ্য না চাপিয়ে, ত্বকযত্নের বিজ্ঞানসম্মত, সহজ ও ধারাবাহিক রুটিন গড়ে তোলা শ্রেয়। কারণ, সাধারণত ২৫ বছর বয়সের পর থেকে ত্বকের কোলাজেন ও ইলাস্টিন উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে থাকে। উভয় উপাদানই ত্বক টানটান, স্থিতিস্থাপক ও প্রাণবন্ত রাখে। ফলে বয়সের দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই ত্বক সুরক্ষিত রাখার অভ্যাস গড়া বুদ্ধিমানের কাজ। এর অর্থ এই নয়, বিশ বছর বয়সেই শক্তিশালী অ্যান্টি-এজিং পণ্যে ভরসা করতে হবে; বরং সূর্য রশ্মি থেকে সুরক্ষা, পর্যাপ্ত আর্দ্রতা এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবহারের মতো অভ্যাসই দীর্ঘ মেয়াদে বেশি উপকার দেয়।
সানস্ক্রিন সানশাইন
ত্বকযত্নে যদি একটিমাত্র পণ্য বেছে নিতে হয়, তাহলে সেটি হোক সানস্ক্রিন। অতিবেগুনি রশ্মি শুধু সরাসরি সূর্যের নিচে থাকাকালে নয়; চলতি পথে গাড়ির জানালা কিংবা কর্মস্থলের কাচের দেয়াল ভেদ করে ঢুকে পড়া রোদের মাধ্যমেও ত্বকে পৌঁছতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এই অদৃশ্য ক্ষতি ত্বকে বলিরেখা, পিগমেন্টেশন এবং অকালবার্ধক্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রতিদিন সকালে এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সুরক্ষাসম্পন্ন ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করা মঙ্গল। বাইরে দীর্ঘ সময় থাকলে দু-তিন ঘণ্টা পরপর পুনরায় প্রয়োগ জরুরি।
কার্যকর ত্বকযত্ন
বিশের কোঠায় বয়স পৌঁছালে দশ ধাপের জটিল রুটিনের প্রয়োজন নেই; বরং ত্বকের ধরন বুঝে কয়েকটি প্রয়োজনীয় ধাপ অনুসরণই যথেষ্ট।
ক্লিনজিং
সকালে ও রাতে ত্বক পরিষ্কার করুন। রাতে মেকআপ বা সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে ডাবল ক্লিনজিং উপকারী হতে পারে। তবে অতিরিক্ত শক্তিশালী ক্লিনজার ব্যবহার না করে এমন পণ্য বেছে নেওয়া ভালো, যা ত্বকের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা নষ্ট করবে না।
এক্সফোলিয়েশন
সপ্তাহে এক থেকে তিনবার মৃদু রাসায়নিক এক্সফোলিয়েন্ট ব্যবহার করলে মৃত কোষ দূর হওয়াসহ ত্বকের টেক্সচার উন্নত হয়; ব্রণের ঝুঁকি কমে। তবে প্রতিদিন শক্তভাবে স্ক্রাব কিংবা অতিরিক্ত অ্যাসিড ব্যবহার করলে ত্বকের সুরক্ষাবলয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
টার্গেটেড ট্রিটমেন্ট
ত্বকের প্রয়োজন অনুযায়ী সেরাম বাছাই করা চাই। শুষ্ক ত্বকের জন্য হায়ালুরনিক অ্যাসিড এবং নিস্তেজ বা অসম রঙের ত্বকের জন্য ভিটামিন সি, কোজিক অ্যাসিড উপকারী হতে পারে। বয়স যখন ত্রিশের কাছাকাছি, এমন সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী রেটিনল বা সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে রুটিনে বাকুচিওল ধীরে ধীরে যোগ করা ভালো।
ময়শ্চারাইজার
তৈলাক্ত ত্বকের জন্য হালকা জেলভিত্তিক এবং শুষ্ক ত্বকের জন্য ক্রিম বা লোশনভিত্তিক ময়শ্চারাইজার বেছে নিতে পারেন। কেননা সুস্থ স্কিন ব্যারিয়ার বজায় রাখতে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে বিশের কোঠায় পৌঁছেও কৈশোরে ব্যবহৃত শক্তিশালী ব্রণনাশক ক্লিনজার বা অ্যালকোহলযুক্ত টোনার ব্যবহার করেন। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের তেল উৎপাদন কিছুটা কমে আসে। ফলে একই পণ্য তখন লালচে ভাব, খসখসে ত্বক ও জ্বালাপোড়ার কারণ হতে পারে। একইভাবে ব্রণ থাকলেও মুখ বারবার ধোয়া বা জোরে ঘষে পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। এতে ত্বকের প্রদাহের পাশাপাশি আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
রেটিনল
বয়স যদি বিশের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে হয় এবং সূক্ষ্ম রেখা, অসম টেক্সচার বা বারবার ব্রণের সমস্যা দেখা দেয়, তবে খুব কম ঘনত্বের রেটিনল সপ্তাহে এক বা দুই রাত ব্যবহারে শুরু হতে পারে যত্ন। শুরুতেই প্রতিদিন ব্যবহার না করে ধীরে ধীরে ত্বককে অভ্যস্ত করা এবং অবশ্যই দিনের বেলায় সানস্ক্রিন ব্যবহার জরুরি।
হাইড্রেশন
ত্বক আর্দ্র থাকলে দেখতেই উজ্জ্বল লাগে না; সুরক্ষাবলয়ও শক্তিশালী থাকে। বিশেষ করে যাদের ব্রণপ্রবণ ত্বক, তাদের ভারী তেলযুক্ত ক্রিমের বদলে হায়ালুরনিক অ্যাসিডসমৃদ্ধ, নন-কমেডোজেনিক ময়শ্চারাইজার বেছে নেওয়া ভালো। এই উপাদান রোমকূপ আটকে না দিয়েই ত্বকে আর্দ্রতা রাখতে সাহায্য করে।
ছোট অভ্যাস, বড় পরিবর্তন
দিন শেষে কখনোই মেকআপ না তুলে ঘুমাতে যাওয়া চলবে না! এতে রোমকূপ বন্ধ হয়ে ব্রণ, নিস্তেজতা এবং ত্বকের প্রদাহ বাড়তে পারে। ত্বকযত্নে নতুন কোনো পণ্য ব্যবহার করতে চাইলে একসঙ্গে একাধিক পণ্যের বদলে একটি করে যোগ করা উত্তম। প্রতিটি পণ্যকে অন্তত চার সপ্তাহ সময় দেওয়া দরকার, যাতে বুঝতে পারেন, সেটি ত্বকে মানাচ্ছে কি না।
এই বয়সে ত্বকযত্নের মূলমন্ত্র হলো প্রতিরোধ, ধারাবাহিকতা ও ভারসাম্য। মৃদু ক্লিনজার, উপযুক্ত ময়শ্চারাইজার, প্রয়োজন অনুযায়ী সক্রিয় উপাদান এবং প্রতিদিনের সানস্ক্রিন—এই কয়েকটি অভ্যাসই আগামীর সময়গুলোতে আপনার ত্বকের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হয়ে উঠতে পারে। মনে রাখা ভালো, সুন্দর ত্বক রাতারাতি তৈরি হয় না; এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তের ফল।
বিউটি ডেস্ক
মডেল: দীবা, ফাইজা ও ক্রিস্টাল
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
