ফরহিম I গ্রুম আফটার জিম
শরীর গড়তে জিমে যে ঘাম ঝরান, তা যদি ত্বক ও চুলের শত্রু হয়ে ওঠে? ফিটনেসের মতোই জরুরি ব্যায়ামের পর সঠিক গ্রুমিং। কয়েকটি সহজ অভ্যাসে ত্বক থাকবে সতেজ, চুল হবে সুস্থ, আর আত্মবিশ্বাসকে দেবে পূর্ণতার মাত্রা
সুস্থতায় ব্যায়াম অপরিহার্য। জিম এ ক্ষেত্রে সহজ সমাধান। সেখানে ভারী শরীরচর্চা প্রতিটি পেশিকে যেমন সচল করে, তেমনি ত্বকের জন্য বয়ে আনে ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ। জিমের কৃত্রিম আবহাওয়া, বহু মানুষের ব্যবহৃত ব্যায়ামের যন্ত্রপাতি আর অতিরিক্ত ঘামের লবণাক্ততায় ত্বক ও চুল হারায় স্বাভাবিকতা। ব্যস্ত দৈনন্দিন রুটিনে ব্যায়ামের পর ত্বকযত্নের বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়। অথচ আধুনিক পুরুষের কাছে শরীরচর্চা শুধু সুস্থ থাকার উপায় নয়, চর্চিত জীবনদর্শনও। এই দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো গ্রুম আফটার জিম অর্থাৎ জিমের পর স্বপরিচর্যা।
সিবাম, ঘাম ও ত্বকের রসায়ন
ব্যায়ামে শরীর ঘামে। এটি জরুরি এক জৈবিক প্রক্রিয়া, যা অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে শরীর শীতল রাখে। কিন্তু যখন ঘাম দীর্ঘক্ষণ ত্বকে জমে থাকে, তখনই শুরু হয় জটিলতা। পুরুষের ত্বকে সিবাম নিঃসরণকারী গ্রন্থিগুলো নারীর তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি সক্রিয়। জিমে ব্যায়ামের ফলে তৈরি হওয়া ঘাম, পরিবেশে থাকা সূক্ষ্ম ধূলিকণা এবং মরা চামড়া এই অতিরিক্ত সিবামের সঙ্গে মিশে তৈরি করে একধরনের আঠালো স্তর; যা ত্বকের রোমকূপের উপরিভাগ পুরোপুরি আটকে দেয়। ফলে ব্রণ, ব্ল্যাকহেডস, ফলিকুলাইটিস এবং বিভিন্ন ধরনের ফাঙ্গাল ইনফেকশন দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। এ ছাড়া জিমে ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলো অসংখ্য মানুষের স্পর্শ পায়। তাই সেখানে থাকে ব্যাকটেরিয়ার আনাগোনা, যা ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি ঝুঁঁকি। বিশেষজ্ঞের মতে, খেলাধুলা বা ব্যায়ামের পর ঘাম শুকিয়ে গেলে ত্বকের ওপর সোডিয়াম ক্লোরাইড, ইউরিয়া ও ল্যাকটিক অ্যাসিডের একটি সূক্ষ্ম আস্তরণ পড়ে, যা প্রাকৃতিক আর্দ্রতা শুষে নিয়ে ত্বক করে শুষ্ক, খসখসে ও অতি সংবেদনশীল। তাই ব্যায়ামের পাশাপাশি ব্যায়াম শেষে ত্বকের গভীর পরিচ্ছন্নতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ত্বক পরিচর্যার ধাপ
জিম থেকে ফেরার পর প্রথমে সাবান বা ক্ষারযুক্ত ক্লিনজার ব্যবহারের অভ্যাস ত্যাগ করা প্রয়োজন। কেননা এই উপাদানগুলো জিমের ধুলোবালি ও ঘাম পরিষ্কারের জন্য যথেষ্ট নয়। এগুলো ত্বকের আর্দ্রতা আরও কমিয়ে দেয়। এর বদলে বেছে নিতে পারেন অ্যাকটিভেটেড চারকোল বা স্যালিসাইলিক অ্যাসিডসমৃদ্ধ ফেসওয়াশ। চারকোল কাজ করে চুম্বকের মতো। ত্বকের গভীরে জমে থাকা ময়লা ও সিবামকে টেনে বের করে। স্যালিসাইলিক অ্যাসিড রোমকূপের ভেতরে গিয়ে রোধ করে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি। এরপর বরফ-শীতল পানির স্পর্শ পেশির ক্লান্তি দূর করার পাশাপাশি ত্বক প্রশমনে হতে পারে দারুণ কার্যকর। ত্বকের স্বাভাবিক পিএইচ মাত্রা ধরে রাখতে ব্যবহার করতে পারেন ভালো মানের টোনার। এটি ত্বক সতেজ ও টানটান করে। শেষে ত্বকের আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনতে চাই হালকা, ওয়াটার-বেসড ময়শ্চারাইজার। তাতে সারা দিন ত্বক থাকবে সজীব ও আর্দ্র।
চুলে যখন গ্রিনহাউস ইফেক্ট
জিম করার সময় অনেকে হেডব্যান্ড বা ক্যাপ পরেন, যা ঘাম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করলেও চুলের স্বাস্থ্যের জন্য ডেকে আনে বিপদ। দীর্ঘ সময় ক্যাপ পরে থাকলে মাথার ত্বকে বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ঘাম আর শরীরের স্বাভাবিক উত্তাপ মিলে একধরনের গ্রিনহাউস ইফেক্ট তৈরি হয়। ম্যালাসেজিয়া নামক ফাঙ্গাসের বংশবৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে এই অতিরিক্ত আর্দ্রতা। এটি তীব্র খুশকি, চুলকানি এবং স্ক্যাল্পে ইনফেকশনের কারণও হয়ে দাঁড়ায়। সমস্যা সমাধানে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন সালফেট-মুক্ত মাইল্ড শ্যাম্পু ব্যবহার করতে পারেন। খেলা কিংবা ব্যায়ামের পর ভেজা চুলে দীর্ঘক্ষণ থাকা ঠিক নয়। এমন চুল ফাঙ্গাস ও ব্যাকটেরিয়ার উপযুক্ত প্রজনন ক্ষেত্র। তাই জিম থেকে ফেরার পরই চুল দ্রুত শুকিয়ে নেওয়া চাই। হেয়ার ড্রায়ারের মৃদু তাপে চুল শুকালে ভালো। এতে স্ক্যাল্প শুষ্ক থাকে এবং সংক্রমণের ভয় কমে। জিমে ব্যবহৃত হেডব্যান্ড বা টাওয়েল সপ্তাহে অন্তত একবার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল লিকুইড দিয়ে পরিষ্কার করা জরুরি।
প্রফেশনাল লুকবুক
সাজপোশাকের পাশাপাশি ত্বকের সজীবতাও পুরুষের ব্যক্তিত্বের বড় অংশ। জিম থেকে ফেরার পর এই ছোট্ট রুটিন অনুসরণ করতে পারেন। তাতে ত্বকের অকালবার্ধক্যের প্রবণতা জানাবে বিদায়। নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে ভুলবেন না। রোদ ও ধুলোবালি থেকে ত্বকের সুরক্ষা সব সময় প্রয়োজন। রাতে ঘুমানোর আগে ভালো নাইট ক্রিম বা আন্ডার-আই জেল ব্যবহার করা যেতে পারে। ক্লান্ত চোখের ছায়া দূর করে দেবে সজীবতা। দীর্ঘ মেয়াদে ত্বকের তারুণ্য ও উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে এর জুড়ি মেলা ভার। এ ছাড়া চুলের ভারী সামগ্রী; জেল, স্প্রে ব্যবহার করলেও তা সঠিকভাবে পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি।
আত্মযত্ন
শরীরচর্চা রুটিন হলে, গ্রুমিং হোক রুটিনের কার্যকরী শেষ ধাপ। জিমের ক্লান্তি কাটিয়ে ত্বক ও চুলের যত্ন নেওয়া মানে নিজেকে ভালোবাসা এবং সম্মান করা। পরিচ্ছন্ন ও উজ্জ্বল ত্বক আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। জিমে যেমন প্রতিদিনই নতুন লক্ষ্য পূরণ করেন, তেমনিভাবে নিজের ত্বকস্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া চাই। সযত্নে সুন্দর ও পরিপাটি হয়ে ওঠাই আধুনিক পুরুষের প্রকৃত সিগনেচার স্টাইল।
আধুনিক বিশ্বে শরীরচর্চার কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে ব্যক্তিগত গ্রুমিং বা পরিচ্ছন্নতা অবিচ্ছেদ্য। মাঠের পারফরম্যান্স যেমন অনুশীলনের ফসল, তেমনি সুস্থ ত্বক ও চুল হলো সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রার প্রতিফলন। পরিশ্রম শেষে পরিচর্যা ও যত্নের মাধ্যমে আপনি যখন পুনরায় সতেজ হয়ে ওঠেন, তাজা হয় আপনার প্রাণশক্তিও। আর আপনার ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ। কেননা প্রকৃত শক্তি শুধু বাহুপেশিতে নয়; তা প্রকাশ পায় আত্মযত্ন, পরিচ্ছন্নতা ও আত্মবিশ্বাসের নীরব দ্যুতিতে।
আনিকা তায়্যিবা
মডেল: সুপ্রভ
মেকওভার: পারসোনা মেনজ
ছবি: জিয়া উদ্দীন
