কুন্তলকাহন I রেশমি রহস্য
সিল্কি চুল বহুদিন ধরে চর্চায়। হিট ট্রেন্ড যাকে বলে। টানটান ঝলমলে চুলে মুগ্ধ নয়ন। রাপুনজেলের মতোন এমন চুল কী করে হয়, সেই খোঁজে রাফেজা বিনতে ঋতু
অনেক দিন ধরে ফ্যাশন রানওয়ে থেকে শুরু করে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের দুনিয়ায় রাজত্ব করছে উজ্জ্বল ও ঝলমলে চুলের ট্রেন্ড। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড শ্যানেল বা টম ফোর্ডের শোতে মডেলদের করা শাইনি স্লিক বান ও চকচকে স্ট্রেইট চুলের স্টাইল কিংবা টিকটকের জনপ্রিয় লিকুইড বা গ্লাস হেয়ার বুঝিয়ে দেয়, এখন অনেকেরই হেলদি ও শাইনি চুল পছন্দ। তবে সাধারণ জীবনে তো সঙ্গে সব সময় ব্যক্তিগত হেয়ারস্টাইলিস্ট কিংবা কোনো রিং লাইট বা সুন্দর ফিল্টারের ছোঁয়া থাকে না! তাই ইনস্টাগ্রামের অসংখ্য ঝলমলে চুলের পোস্টের মতো নিখুঁত উজ্জ্বলতা পাওয়া অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
এর পেছনে কিছু কারণও আছে। যেমন খনিজযুক্ত পানি, চারপাশের দূষণ, অতিরিক্ত কেমিক্যালযুক্ত স্টাইলিং প্রোডাক্ট ব্যবহার এবং অতিরিক্ত হিট দেওয়ার কারণে চুলের স্বাভাবিক মসৃণতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে চুল তার আলো প্রতিফলিত করার ক্ষমতা বা আসল উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলে। আবার চুলে রং করালে সাময়িকভাবে একটু চকচকে ভাব এলেও রাসায়নিক উপাদানের কারণে চুল ভেতর থেকে ফাঁপা ও শুষ্ক হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘ মেয়াদে কেশের প্রাণশক্তি কেড়ে নেয়। গ্লসি হেয়ার মূলত চুলের এমন এক সুস্থ ও দীপ্তিময় রূপ, যেখানে প্রতিটি গোছা আলো প্রতিফলিত করে আয়নার মতো চকচকে দেখায়। নিখুঁত কালার, পুষ্টিকর থেরাপি এবং কিউটিকল সিলিং ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে এই ঝলমলে দ্যুতি আনা হয়। হানি গোল্ড, চেরি কোলা কিংবা ক্যারামেল ব্রাউন—চুলের শেড যেমনই হোক, সঠিক গ্লসিং ও টোনিং এনে দেয় প্রিমিয়াম লুক। চুলের কোনো ক্ষতি না করে বরং এর স্বাস্থ্য ঠিক রেখেই এই ঝলমলে ভাব ফিরিয়ে আনার কিছু সহজ উপায় রয়েছে, যা ঘরে বসে কিংবা স্যালনে গিয়ে সারা সম্ভব।
ইন-স্যালন ট্রিটমেন্ট
চুলের দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্রতা ও রেশমিভাব ধরে রাখতে এবং ড্যামেজ রিপেয়ার করতে স্যালন-গ্রেড প্রফেশনাল ট্রিটমেন্টের বিকল্প নেই। চুলের ধরন বুঝে স্টাইলিস্টরা সাধারণত কয়েকটি কাস্টমাইজড সার্ভিস দিয়ে থাকেন।
কেরাস্টাস ফিউজিও-ডোজ
বোতলে বন্দি এমন এক জাদুকরি ফর্মুলা, যা নিমেষে চুলের রূপ বদলে দেয়। ধরন ও সমস্যা বুঝে সঙ্গে সঙ্গেই তৈরি করা হয় এই বিশেষ ট্রিটমেন্ট। এতে থাকা বুস্টার ও কনসেন্ট্রেটের মিশ্রণ চুলের রুক্ষতা, প্রাণহীন ভাব, কোঁকড়ানো জট, চুল পড়া কিংবা রঙের বিবর্ণতা দূর করতে সরাসরি কাজ করে। ফলে মাত্র একবার ব্যবহারেই চুল হয়ে ওঠে দারুণ কোমল, হালকা এবং নজরকাড়ার মতো ঝলমলে।
কে১৮ প্রফেশনাল রিপেয়ার ট্রিটমেন্ট
কালার বা অতিরিক্ত তাপের কারণে চুল ভঙ্গুর ও খসখসে হলে মলিকুলার স্তরে কাজ করে কে১৮। এটি ভেতরের ভেঙে যাওয়া কেরাটিন চেইনগুলোকে আবার জোড়া লাগিয়ে চুলকে শক্তিশালী ও নমনীয় করে তোলে। সাধারণ হেয়ার মাস্কের মতো এটি শুধু চুলের ওপরের অংশে নয়; বরং একদম গভীর থেকে ভেতরের ক্ষতি মেরামত করে। ফলে চুল ফিরে পায় কাচের মতো মসৃণ ও নিখুঁত রূপ, যা চমৎকারভাবে আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে চুলকে আরও উজ্জ্বল রূপ এনে দেয়।
গ্লস অথবা টোনার রিফ্রেশ
যারা কালার বা হাইলাইটস করিয়েছেন, তাদের চুলের রং দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং উজ্জ্বলতা বাড়াতে এটি চমৎকার কাজ করে। রংকে আরও প্রাণবন্ত করে চুলে স্বচ্ছ ও ঝলমলে মিরর ফিনিশ এনে দেয়। বিশেষ করে সোনালি বা বাদামি শেডের চুলের জন্য এই ট্রিটমেন্ট ভীষণ জনপ্রিয়। এর সঙ্গে হালকা ব্লো-ড্রাই করে নিলে চুল নিমেষে কোমল, সতেজ ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
গ্লসি হেয়ারের যত্ন
নিয়মিত গ্লসি হেয়ারের যত্ন নেওয়ার পরও প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস ও পারিপার্শ্বিক কারণে চুলের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। ব্লো ড্রায়ার, ফ্ল্যাট আয়রন বা কার্লিং আয়রনের অতিরিক্ত ব্যবহার চুলের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা কেড়ে নেয়। এ ছাড়া সূর্যের ক্ষতিকর ইউভি রশ্মি রং ড্যামেজ করে চুলকে শুষ্ক ও প্রাণহীন করে ফেলে। পাশাপাশি, প্রাকৃতিকভাবে সবার চুলের গঠন এক রকম হয় না। কোঁকড়ানো বা উষ্কখুষ্ক চুলে স্বাভাবিকভাবে তেলের অভাব থাকে; তাই বাড়তি পুষ্টি ও ময়শ্চারাইজার সমৃদ্ধ প্রোডাক্ট ব্যবহার জরুরি।
ব্লো-ড্রাই ও ফ্ল্যাট আয়রন
গ্লসি হেয়ারস্টাইলিংয়ের জন্য ব্লো-ড্রাই বা ফ্ল্যাট আয়রন এড়ানো কঠিন হলে কিছু সতর্কতা মেনে চলা ভালো। ড্রায়ার চালুর আগে অবশ্যই চুলে হিট প্রটেক্টিভ স্টাইলিং প্রোডাক্ট ব্যবহার করা চাই। ড্রায়ারের নজল ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন; কারণ, এটি বাতাসের গতি বাড়িয়ে চুলের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলে। চুল থেকে ড্রায়ারের দূরত্ব অন্তত ছয় ইঞ্চি হওয়া জরুরি এবং কার্ল ধরে রাখতে ডিফিউজার ব্যবহার মঙ্গল। নিয়মিত ব্লো-ড্রাই করতে হলে ড্রায়ারের তাপমাত্রা সব সময় কমিয়ে রাখা শ্রেয়। এ ছাড়া ফ্ল্যাট আয়রন ব্যবহারের ক্ষেত্রে চুল শুকানোর আগে এবং আয়রনের সময়ে—উভয় ধাপেই প্রটেক্টিভ প্রোডাক্ট ব্যবহার করা এবং আয়রনটি চুলের ওপর দ্রুত ও মসৃণভাবে চালানো ভালো।
শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার বাছাই
বাজারের হাজারো পণ্যের ভিড় থেকে নিজের জন্য সঠিক শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার বেছে নিতে অনেকে দ্বিধায় পড়েন। এ ক্ষেত্রে পণ্যের উপাদানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। এমন প্রোডাক্ট বেছে নেওয়া চাই, যাতে চুল মজবুত করতে প্রোটিন, প্রাকৃতিক তেলের পুষ্টির জন্য ভিটামিন এ ও ই, অ্যামিনো অ্যাসিড, কেরাটিন এবং কেশ কোমল রাখতে সিল্ক অ্যামিনো অ্যাসিড ও জোজোবা অয়েল রয়েছে। অন্যদিকে, শ্যাম্পু কেনার ক্ষেত্রে সোডিয়াম লরিল সালফেটযুক্ত পণ্য সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা ভালো; কারণ, এই ক্ষতিকর উপাদান চুলকে ভেতর থেকে রুক্ষ ও শুষ্ক করে।
মডেল: দীবা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
