তনুরাগ I বায়োমিমেটিক বেসিক
নিজস্ব ভাষায় পরিস্থিতি জানান দেয় ত্বক। সেই ভাষাকে অনুকরণ করে যত্ন নিলেই মিলতে পারে সমাধান। কৌশলের নাম বায়োমিমিক্রি
যখন যেমন খুশি তেমন ত্বকযত্নের কলেবর আজকাল অনেকটাই কমে এসেছে। যদিও বাজারে আসা নতুন কোনো স্কিন কেয়ার পণ্য দেখে ব্যবহারের ইচ্ছা দমানো দায়, তবু আস্থা বেড়েছে সচেতন যত্নে। বলা হচ্ছে, লেস ইজ মোর। কারণ, একের পর এক পণ্যে নয়, স্কিন ভালো থাকে ত্বক উপযোগী পণ্য ব্যবহারে। আর ত্বকের প্রয়োজন-অপ্রয়োজন বুঝতে হলে এর ভাষা বোঝা জরুরি হয়ে ওঠে। স্কিন কেয়ারের মন্ত্রটাও সেখানে। অপ্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করে ত্বককে টেক্কা দিয়ে নয়, বরং ত্বকে মানানসই পণ্য যোগ করে।
অনুকরণ-অনুসরণ
ত্বকে কোনটি ব্যবহারের উপযোগী আর কোনটি পরিত্যাজ্য, তা আগেই ঠিক করে নেওয়া হয় বায়োমিমিক্রি কৌশলে। ইংরেজি শব্দ বায়ো অর্থ জীবন এবং মিমিক্রি মানে অনুকরণ। মানবদেহে প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন পদার্থ; যেমন লিপিড, প্রোটিন বা অন্যান্য সংকেতবাহী অণু তৈরি হয়, যা শরীর সুস্থ ও সচল রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে বিভিন্ন কারণে কোনো একটি বা একাধিক অণুর উৎপাদন কম-বেশি হতে পারে। সেই ঘাটতি পূরণে প্রাকৃতিক অণুটির যৌগিক গঠনকে অনুকরণ করে—এমন একটি উপকরণ বাইরে থেকে প্রয়োগ করাকে বলে বায়োমিমিক্রি। এই কৌশলে ব্যবহৃত যৌগটি বৈজ্ঞানিক ল্যাবে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়। প্রাকৃতিক অণুসদৃশ কৃত্রিম যৌগকে বলা হয় বায়োমিমেটিক ইনগ্রেডিয়েন্ট।
শরীরে ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় কোলাজেন, ইলাস্টিন, সিবাম, সেরামাইড ইত্যাদি বেশ কয়েক ধরনের অণু প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়। তবে নানা সময়ে এগুলোর পরিমাণ কম-বেশি হয়ে ভারসাম্য নষ্ট হলে সেই প্রভাব দেখা দিতে পারে ত্বকে। তখন এই অণুগুলোর গঠন অনুকরণ করে—এমন উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে ত্বকের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। এ কৌশলে স্কিনের নিজস্ব ভাষা বুঝে এমন সব উপকরণ বেছে নেওয়া হয়, যেগুলোর ফর্মুলেশন ত্বকের প্রাকৃতিক গঠনকে প্রতিফলিত করে। ফলে ত্বকে কোনো ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় না এবং ত্বকের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার ঝুঁকি কমে।
নেপথ্যে বিজ্ঞান
বায়োমিমেটিক স্কিন কেয়ার ট্রেন্ড হয়ে উঠলেও এর মূল আলোচনা শুরু অনেক আগে। গেল শতকের আশির দশকে ফরাসি লাক্সারি ব্র্যান্ড ল্যানকমের নিউসম লাইন এবং ডিওরের ক্যাপচার লাইনে উপস্থাপন করা হয় এমন সব পণ্য, যা জৈবিক সামঞ্জস্য বাড়াতে সক্ষম বলে দাবি তোলা হয়েছিল। বর্তমান সময়ের ত্বক বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রমাণ মিলেছে বেশ কিছু গবেষণায়। ২০২১ সালে কার্গার পাবলিশার্স প্রকাশিত স্কিন ফার্মাকোলজি এবং ফিজিওলজি-বিষয়ক ক্লিনিক্যাল স্টাডিতে দেখা গেছে, সক্রিয় উপাদানের একটি বায়োমিমেটিক যৌগ, জিনের আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে ত্বকের আর্দ্রতা ও সুরক্ষাপ্রাচীরের কার্যকারিতা বাড়াতে সক্ষম। বায়োমিমেটিক কৌশল ব্যবহারে একটি ক্রিম তৈরি করার এবং এর প্রয়োগের ওপর দ্য মেডিকেল-সার্জিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত ২০২২ সালের এক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, ক্রিমটি ত্বকের পিএইচ ভারসাম্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় সহজে প্রয়োগযোগ্য এবং শুষ্ক ত্বকে তাৎক্ষণিক হাইড্রেশন যোগ করতে সক্ষম।
পরিচয়ের সঙ্গে সংযোগ
ত্বকযত্নে বৈজ্ঞানিক ল্যাবে তৈরি পরিচিত কয়েকটি বায়োমিমেটিক উপকরণ এবং সেগুলোর কার্যকারিতার সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক।
সেরামাইড
মূলত ত্বকের বাইরের স্তরে থাকা প্রাকৃতিক লিপিড, যা স্কিন ব্যারিয়ারের প্রায় ৫০ শতাংশ গঠনে সহায়ক। এই লিপিডের অনুকরণে তৈরি করা হয় বায়োমিমেটিক সেরামাইড। ত্বকের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যারিয়ার পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে এটি। ত্বকে স্বাভাবিক আর্দ্রতা ফেরাতে সক্ষম। দূষণ, শুষ্কতা এবং অন্যান্য পরিবেশগত ক্ষতি থেকেও দিতে পারে সুরক্ষা। শুষ্ক, সংবেদনশীল ও ক্ষতিগ্রস্ত ত্বকের জন্য এর পক্ষে আশীর্বাদ হওয়া সম্ভব।
হায়ালুরনিক অ্যাসিড
ত্বকের এক্সট্রাসেলুলার ম্যাট্রিকসে উপস্থিত একটি অণু, যা কোষে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখতে পারে। বায়োমিমেটিক হায়ালুরনিক অ্যাসিড ত্বকের নিজস্ব হায়ালুরনিক অ্যাসিডের মতোই কাজ করে। গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্রতা বজায় রাখে, ত্বক মসৃণ ও সজীব করা ছাড়াও ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা ধরে রাখতে সক্ষম।
পেপটাইড
অ্যামিনো অ্যাসিডের ছোট শৃঙ্খল, যা ত্বকে প্রাকৃতিক বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করে। বায়োমিমেটিক পেপটাইড এই সংকেতকে অনুকরণ করে ত্বককে নতুন কোলাজেন ও ইলাস্টিন উৎপাদনের নির্দেশ দিতে পারে। ফলে ত্বকের বলিরেখা কমতে শুরু করে, দৃঢ়তা বাড়ে, প্রদাহ কমে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ত্বক দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
কোলাজেন
ত্বকের প্রধান কাঠামোগত প্রাকৃতিক প্রোটিন, যা দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখে। যদিও টপিক্যাল বায়োমিমেটিক কোলাজেন সরাসরি ত্বকের গভীরে যেতে পারে না, তবু কোলাজেন-অনুপ্রাণিত পেপটাইড আর্দ্রতা ধরে রেখে ত্বক আরও মসৃণ, কোমল ও দৃঢ় করতে সক্ষম।
ভিটামিন ডি
সূর্যালোকের প্রভাবে ত্বকে স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয় এই ভিটামিন। এটি স্কিন ব্যারিয়ার, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা এবং কোষের পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বায়োমিমেটিক ভিটামিন ডি সূর্যালোক ছাড়াই এই প্রাকৃতিক কার্যক্রমকে অনুকরণ করে। এটি ত্বকের কোষের স্বাভাবিক বিকাশ নিয়ন্ত্রণে পারদর্শী।
অ্যামিনো অ্যাসিড
ত্বকের ন্যাচারাল ময়শ্চারাইজিং ফ্যাক্টরের (এনএমএফ) গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বায়োমিমেটিক অ্যামিনো অ্যাসিড ত্বকের প্রাকৃতিক অ্যামিনো অ্যাসিডের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি, আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং নতুন প্রোটিন তৈরিতে সহায়ক হয়ে ত্বক মেরামত করে।
ত্বকযত্ন শুরুর আগে ত্বকের সমস্যাগুলো বোঝা প্রয়োজন। ত্বকে বিদ্যমান প্রাকৃতিক অণুগুলোর ভারসাম্য ঠিক করতে পারলে ত্বক অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এখানেই কারসাজি বায়োমিমিক্রির।
আবৃতি আহমেদ
মডেল: ফাইজা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
