ডিজাইনার ডায়েরি I লিপি খন্দকার
দেশের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ডিজাইনার এবং ফ্যাশন হাউস বিবিআনার প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার। শুনিয়েছেন তার পথচলার গল্প
হতে চেয়েছিলাম শিল্পী। ছোটবেলার স্বপ্ন। সেখান থেকে পড়া শুরু চারুকলায়। দ্বিতীয় বর্ষে ছোট্ট সর্ষে দানা মনে উঁকি দিল; অর্থাৎ, ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে আগ্রহ। কাপড়, নকশা, রং টানছিল প্রবলভাবে। কিন্তু দেশে তখন ছিল না কোনো ফ্যাশন ইনস্টিটিউট, যেখানে মিলবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। শেষমেশ নিজেই নিজেকে প্রস্তুত করার চেষ্টায় মনোযোগী হলাম। ছোট ছোট প্রদর্শনীতে অংশ নিতে শুরু করলাম। ধীরে ধীরে সঞ্চিত সাহসে ধানমন্ডির একটি পুরোনো বাড়িতে সূচনা ঘটালাম বিবিআনার। সেটি ২০০১ সালের কথা।
ছোটবেলায় ওপেন টি বায়োস্কোপ খেলতে পছন্দ করতাম। সেখান থেকে ‘সুলতানা বিবিয়ানা, সাহেব বাবুর বৈঠকখানা’ ছড়াটি মনে গেঁথে গিয়েছিল। নিজের উদ্যোগ যখন শুরু করলাম, বাংলা অভিধান নিয়ে বসে ছিলাম দীর্ঘ সময়। ‘অ’-তে শুরু করে একের পর এক পাতা উল্টিয়ে আটকে গেলাম ‘ব’-তে এসে। ‘বিবিয়ানা’ শব্দটি থেকে চোখ সরাতে পারলাম না। মনে হলো, যেন ফিরে পেয়েছি ছোটবেলার সেই আনন্দ স্মৃতি। আরও মনে হলো, এই শব্দের মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে পরিপাটি এক কন্যা। যেন আমি এমন মেয়েদের জন্যই পোশাক নকশা করতে চেয়েছি।
ফাস্ট ফ্যাশনের বিপরীতে অবস্থান আমার। স্লো ফ্যাশনেই ভরসা। প্যাটার্ন-বেসড আর আর্দি টোনেই তাই সব সময়ের ভালো লাগা। মোটিফেও শুনেছি মনের কথা। তাই তো আমার কাজে কলকা ছিল, আছে, থাকবে। একসময় মানুষ পোশাকে কলকা দেখলেই বুঝে যেতেন, বিবিআনার কারুকাজেই এমন অলংকরণ। এখনো শুনি খাদি কাপড়, মাখন রং আর প্যাটার্ন দেখেও ক্রেতা বুঝে যান—এটি তার প্রিয় ব্র্যান্ডের কাজ।
বাংলাদেশি মেয়েদের জন্য ফ্যাশন আইটেম তৈরি করার সময়ে চেয়েছি নিজের দক্ষতা আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যেতে। সেখানে আমার আজন্ম ভালোবাসা—হাতে বোনা সুই-সুতার কারুকাজেই বিবিআনার স্বতন্ত্রতা। আর তাতে আমাদের দেশের নারীদের দক্ষতা অতুলনীয়। দেশের ৬৩ জেলার নারীরা কাজ করেছেন বিবিআনার নকশা তৈরিতে। এখনো তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই এই ব্র্যান্ডের জয়গান।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও বিদেশি ব্র্যান্ড পসরা সাজিয়েছে। বাজারের কলেবরের পাশাপাশি প্রতিযোগিতাও বেড়েছে কয়েক গুণ। তাই বলে বাংলাদেশিদের মন ও মনন থেকে বিবিআনা হারিয়ে যায়নি। এখনো উৎসবে ভিড় জমে। নিয়ম করেও কেউ কেউ আসেন আমার আঙিনায়। যুগের পর যুগ পেরিয়ে সন্ধি যেন। ক্রেতা চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েই কাজ করেছি সব সময়। তাদের সন্তুষ্টিকে দিয়েছি প্রাধান্য। ক্রেতারাও বিশ্বাস রেখেছেন আমার কাজে। বিবিআনাকে নিঃস্বার্থ ভালোবেসেছেন।
অনুলিখন: সারাহ্ দীনা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
