মোটিফ I পৌরাণিক প্রেরণার প্রত্যাবর্তন
দেব-দেবী, কিংবদন্তি, স্বর্গীয় প্রতীক কিংবা প্রাচীন সভ্যতার নান্দনিকতা আজ শুধু অনুপ্রেরণা নয়; বরং সমকালীন ফ্যাশনের শক্তিশালী ভাষা। যার নাম মিথ মোটিফ
ফ্যাশন কি শুধু পোশাকের গল্প? কাপড়, রং, নকশা আর অলংকরণ? উত্তরে বলতে হচ্ছে—‘না’। ফ্যাশন সময়, সংস্কৃতি ও মানুষের আত্মপরিচয়েরও ভাষা। তাই বিস্ময়ের কিছু নেই যে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে ফ্যাশনে ফিরে এসেছে পৌরাণিক কাহিনির অনুপ্রেরণা। গ্রিক দেব-দেবী, প্রাচীন প্রতীক, রেনেসাঁ শিল্প কিংবা লোককথার চিত্রভাষা—সবকিছুই নতুনভাবে জায়গা করে নিচ্ছে সমকালীন পোশাক ও অলংকারে। রানওয়ে থেকে রেড কার্পেট তো বটেই, দৈনন্দিন পোশাকেও দেখা যাচ্ছে এই মিথ মোটিফের শক্তিশালী উপস্থিতি।
দ্রুতগতির প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে মানুষ যেন আবারও ফিরে তাকাচ্ছে সেই সব গল্পের দিকে, যেগুলো হাজার বছর ধরে সাহস, প্রেম, ক্ষমতা, ভাগ্য কিংবা রূপান্তরের কথা বলে এসেছে। পৌরাণিক কাহিনি শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; এগুলো মানুষের চিরন্তন অনুভূতির প্রতীক। সে কারণে ফ্যাশনও এই গল্পগুলোকে নতুন ভাষায় পুনরুজ্জীবিত করছে।
এই প্রবণতার অন্যতম পরিচিত উদাহরণ ইতালীয় বিলাসবহুল ব্র্যান্ড ভারসাচি। লেবেলটির লোগোতেই রয়েছে মেডুসার মুখ। গ্রিক পুরাণের এই চরিত্র একসময় ভয়ের প্রতীক হলেও আধুনিক ব্যাখ্যায় হয়ে উঠেছে নারীর শক্তি, প্রতিবাদ এবং আত্মমর্যাদার প্রতিচ্ছবি। শুধু ভারসাচি নয়, বিশ্বের নানা ফ্যাশন হাউস তাদের সংগ্রহে ব্যবহার করছে গ্রিক ভাস্কর্যের মতো ড্রেপিং, বর্মের অনুপ্রেরণায় তৈরি করসেট, রেনেসাঁধর্মী সূচিকর্ম এবং নক্ষত্র বা দেবলোকের প্রতীকী মোটিফ।
কতুর থেকে স্ট্রিট ফ্যাশন
ফ্যাশনের এই পৌরাণিক ভাষা শুধু বিলাসবহুল কতুরে আটকে নেই; সাধারণ ফ্যাশনেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। জায়গা করে নিয়েছে স্ট্রিট ফ্যাশনেও। এর বিশেষ কারণ ধারণা করা যায়। মিথ মোটিফে রয়েছে গল্প বা পুরাণকথা; যা ব্যবহারকারীকে শুধু সুন্দর করে তোলে না, ব্যক্তিত্বেও প্রভাব ফেলে। এই নান্দনিকতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ করসেটের প্রত্যাবর্তন। একসময় নারীর স্বাধীনতাপরিপন্থী পোশাক হিসেবে বিবেচিত হলেও আজ একে দেখা হচ্ছে ভিন্ন দৃষ্টিতে। করসেট এখন আত্মবিশ্বাস, শারীরিক উপস্থিতি এবং নিজস্ব পরিচয় প্রকাশের একটি মাধ্যম। টেইলর সুইফট থেকে শুরু করে কার্দাশিয়ান পরিবার—অনেক তারকাই একে আধুনিক স্টাইলিংয়ের অংশ করেছেন। ফলে অতীতের একটি ঐতিহাসিক পোশাক আজ নতুন অর্থে ফিরে এসেছে।
পৌরাণিক কাহিনি এবং ওত কতুরের অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায় ভ্যালেন্তিনোর ২০১৭ সালের স্প্রিং কতুর সংগ্রহে। ব্র্যান্ডটির সৃজনশীল পরিচালক পিয়েরপাওলো পিচিওলি প্রতিটি পোশাককে একটি পৌরাণিক চরিত্রের নামে উৎসর্গ করেন। ‘পাসিথিয়া’ নামের পোশাকে মুক্তা ও ফুলের সূক্ষ্ম কারুকাজের মাধ্যমে ধ্যান এবং প্রশান্তির প্রতীক ফুটিয়ে তোলা হয়। ‘প্যান্ডোরা’ অনুপ্রাণিত গাউনে সূক্ষ্ম সূচিকর্মের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় কৌতূহল, আশা এবং মানবজীবনের জটিলতার গল্প। শত শত ঘণ্টায় হাতে তৈরি এই নকশাগুলো প্রমাণ করে, পোশাকও ইতিহাস আর কাহিনির বাহক হতে সক্ষম।
একইভাবে ডিওরের ২০২০ সালের ওত কতুরের সংগ্রহে গ্রিক পুরাণের সঙ্গে নারীবাদের সংলাপ তৈরি করেন মারিয়া গ্রাজিয়া কিউরি। রানওয়েজুড়ে ভেসে ওঠে প্রশ্ন, ‘পৃথিবীকে যদি নারীরা শাসন করত’, কেমন হতো? সোনালি ঝালর, স্বর্গীয় আবহের গাউন এবং শক্তিশালী টেইলরিংয়ের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, দেবীসুলভ সৌন্দর্য মানে শুধু কোমলতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নেতৃত্ব, দৃঢ়তা আর স্বাধীনতার গল্প।
দর্শন দিগন্ত
মিথ মোটিফের জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে আরও গভীর এক সামাজিক বাস্তবতা। প্রযুক্তি আমাদের অসংখ্য তথ্যের নাগাল দিয়েছে; কিন্তু মানুষের আবেগ, পরিচয় আর অর্থ খোঁজার আকাঙ্ক্ষা আজও রয়ে গেছে। পৌরাণিক কাহিনি সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। মেডুসা আজ নারীর প্রতিবাদের প্রতীক, নার্সিসাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মমুগ্ধতার রূপক, আর প্যান্ডোরার বাক্স আমাদের কৌতূহল এবং তার পরিণতির চিরন্তন স্মারক। সময় বদলেছে, কিন্তু গল্পগুলোর তাৎপর্য বদলায়নি; বরং নতুন প্রজন্ম সেগুলোকে নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন অর্থ দিচ্ছে।
ফ্যাশনের ময়দানে তাই মিথ মোটিফ ক্ষণস্থায়ী ট্রেন্ড নয়। এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক সৃজনশীল পুনর্বিবরণ। যখন পোশাক শুধু শরীর নয়; ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাস আর গল্পও বহন করতে শুরু করে, তখন ফ্যাশন হয়ে ওঠে শিল্প। আর সেই শিল্পে পৌরাণিক কাহিনি আজও সমানভাবে জীবন্ত অতীতের সৌন্দর্যকে বর্তমানের নকশায় বুনে, ভবিষ্যতের কল্পনাকে অনুপ্রাণিত করে।
সারাহ্ দীনা
ছবি: সংগ্রহ
