skip to Main Content

হেরিটেজ I এন্ডি সিল্ক

খাঁটি সিল্ক তৈরিতে প্রাণ যায় গুটিপোকার। অন্যদিকে এন্ডি সিল্কের গল্প সম্পূর্ণ ভিন্ন। একে বলে অহিংস সিল্ক। তবে চিনতে গেলেই বাধে বিপত্তি। বাজারে এই পরিচয়ে যা বিক্রি হয়, তা আসলেই এন্ডি সিল্ক কি না, সেই উত্তর মেলানোর চেষ্টায় আবৃতি আহমেদ

অনেক দিন আগের কথা। রাজপ্রাসাদের বাগানে গাছতলায় বসে ছিলেন চীনের এক রাজকন্যা। পান করছিলেন গরম চা। গাছ থেকে হঠাৎ একটি কোকুন পড়ল তার কাপে। রাজকুমারী দেখলেন, কোকুনটি নরম হয়ে উঠেছে এবং তা থেকে চকচকে আঁশ বেরোতে শুরু করেছে। রেশম বা সিল্ক আবিষ্কারের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেছে এই ঘটনার উল্লেখ। মূলকথা হলো, সিল্ক আবিষ্কৃত হয়েছিল চীনে। ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। সেই হিসাবে চীনের সে সময়ের রানি শি-লিং-শিকে বলা হয় সিল্কের আবিষ্কারক। কারণ, ইতিহাসে লব্ধ সবচেয়ে পুরোনো এবং প্রথম সিল্কের পোশাক তৈরি করেছিলেন তিনি। উপহার দিয়েছিলেন স্বামীকে। শুরুতে শুধু চীনারাই তৈরি করত সিল্ক। এ দেশের মসলিন আর জামদানির মতোই মহামূল্যবান শিল্প হিসেবে শুধু নির্দিষ্ট কারিগরদের কাছে গচ্ছিত ছিল সেই পদ্ধতি। বিক্রি হতো চড়া দামে। আবিষ্কারের তিন হাজার বছর পর বিভিন্ন রাজ্য-রাজত্বের সূত্র ধরে চীন ছাড়িয়ে সিল্ক পৌঁছে যায় ইউরোপে। পরবর্তীকালে ছড়িয়ে পড়ে এশিয়াতেও। নিজস্ব মসলিন ও জামদানি আর অন্যান্য তাঁত বুননের সঙ্গে সিল্ক বুননেও পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের তাঁতিরাও। উনিশ শতকে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি করা হতো রপ্তানি।
পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক, এখনো সেই আদি কৌশল পথ দেখায় সিল্ক শিল্পকে। তাই গুটিপোকা ছাড়া সিল্ক যেন অসম্ভব ব্যাপার। গুটিপোকাকে ইংরেজিতে বলে সিল্কওয়ার্ম, আর বাংলায় রেশমপোকা। সেখান থেকে সিল্কের বাংলা নামকরণ—রেশম। সাধারণত দুই ধরনের হয়। মালবেরি এবং নন-মালবেরি সিল্ক। নন-মালবেরির মধ্যে আছে তসর, মুগা এবং এন্ডি বা এরি। সিল্ক বলতে সাধারণত আমরা মালবেরি সিল্ককেই বুঝি। একে অনেকে বলেন পিওর বা খাঁটি সিল্ক। সেই তুলনায় এন্ডি সিল্ক অনেকটাই ভিন্ন রকম। ভারী ও রুক্ষ। খুব একটা চকচকে নয়। দামও তুলনামূলক কম। সব মিলিয়ে বাজারে বিক্রি হওয়া এন্ডি সিল্কের সত্যতা নিয়ে প্রায়ই সন্দেহ জাগে ক্রেতাদের মনে। কারণ, অনেকের ধারণা, এন্ডি সিল্ক বাংলাদেশে উৎপন্ন হয় না; বরং এই নামে যা বিক্রি হয়, সেটি আসলে মালবেরি স্পান সিল্ক। মানে খাঁটি সিল্ক তৈরির সময় বেঁচে যাওয়া সুতা থেকে তৈরি। অথচ এই ধারণা সঠিক নয়।
মসৃণ ও নরম সুতার বুননে তৈরি যে সিল্ককে সাধারণত খাঁটি হিসেবে চেনা যায়, সেটি তৈরি হয় শুধু মালবেরি, মানে তুঁতগাছের পাতা খায়—এমন রেশম পোকা থেকে। যেমন এ দেশের রাজশাহী বা বলাকা সিল্ক। এটি তৈরিতে রেশম বা গুটিপোকা জমানো হয় ছাঁচে। সেগুলোকে খেতে দেওয়া হয় তুঁতগাছের পাতা। কিছুদিন পর পোকাগুলো বড় হয়ে গেলে একধরনের সর্পিল ছাঁচে রাখা হয়। পোকাগুলো লালা দিয়ে নিজেদের চারপাশে জালের মতো আবরণ বা কোকুন তৈরি করে। এরপর পোকাসহ কোকুনগুলোকে ছাঁচ থেকে সংগ্রহের পর গরম পানিতে সেদ্ধ করলেই সেখান থেকে সুতা বেরোতে শুরু করে। চরকায় টেনে রিলিং পদ্ধতিতে সেই সুতা সংগ্রহ করা হয়। এই সুতা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে; যেমন একক, বহুস্তরী, সূক্ষ্ম, শুষ্ক ইত্যাদি। প্রতিটি কোকুন থেকে ৮০০-১০০০ মিটার পর্যন্ত সুতা বের করা সম্ভব। গুটি থেকে রেশম সুতা তৈরির এই পদ্ধতির নাম সেরিকালচার। সুতা প্রস্তুত হয়ে গেলে তা দিয়ে হাত তাঁতে বা মেশিনের সাহায্যে তৈরি করা হয় কাপড়। তারপর শুরু হয় রং আর মোমযোগে কাপড়ের ওপর নকশা আঁকার কাজ।
রেশম চাষের সময় কিছু পোকা গুটি থেকে সময়ের আগেই বেরিয়ে যায়। খাঁটি সিল্ক তৈরির সময় এই গুটিগুলোকে বাদ দেন চাষিরা। পরে সেগুলোর সঙ্গে অন্যান্য তন্তু জুড়ে যে কাপড় তৈরি করা হয়, তাকে অনেকে বলেন এন্ডি সিল্ক। এই সূত্রেই অনেকের ধারণা, এন্ডি সিল্ক আদতে পিওর সিল্কের উচ্ছিষ্ট থেকে তৈরি।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রেশম পোকার জাত। পিওর সিল্ক সুতা তৈরি করা হয় বোম্বিকস মোরি নামের রেশম পোকা থেকে। চাষের সময় সেই পোকাকে শুধু তুঁতগাছের পাতা খাওয়ানো হয়। এ প্রক্রিয়ায় আসলে মেরে ফেলা হয় পোকাগুলোকে। আর এন্ডি বা এরি সিল্ক তৈরি হয় সামিয়া রিকিনি নামের রেশম পোকার গুটি থেকে। আসামি শব্দ ‘এরা’ থেকে ‘এরি’, যার ইংরেজি অর্থ ক্যাস্টর। কারণ, এই রেশম পোকাগুলো ক্যাস্টর গাছের পাতা খেয়ে জীবনধারণ করে। গাছটি খরা-সহনশীল এবং এর জীবনধারণে তুঁতগাছের চেয়ে অনেক কম পানির দরকার পড়ে।
অনেক চাষি শুধু এন্ডি সিল্ক তৈরির জন্যই বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করেন। গুটি থেকে পোকা মথ হয়ে বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় থাকেন তারা। মথ উড়ে গেলে শুধু গুটিগুলোকে গরম ও পিএইচ-ভারসাম্যযুক্ত সাবান পানিতে এক ঘণ্টা সেদ্ধ করা হয়। গুটি পাকানোর সময় সেরিসিন নামের প্রোটিনজাতীয় আঠালো আবরণ তৈরি করে গুটিপোকা, সেদ্ধ করলে তা পরিষ্কার হয়ে যায়। এরপর গুটিগুলোতে গরম পানিতে ভিজিয়ে ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত রেখে দেওয়া হয়। সবশেষে, সেগুলো ধুয়ে, পিটিয়ে চ্যাপ্টা গোলাকৃতি দিয়ে, শুকিয়ে তা থেকে তুলা বা পশমের মতো করে আঁশ পাকিয়ে বের করা হয় সুতা।
পরিবেশবান্ধব, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতামুক্ত এবং টেকসই ফ্যাশনের আলোচনায় বারবার উঠে আসে এন্ডি সিল্ক। কারণ, কোকুন ছেড়ে উড়ে যাওয়া মথ আবারও ডিম পাড়ে। পুনরায় শুরু হয় রেশম চক্র। এন্ডি সিল্ক তৈরিতে কোনো প্রাণী হত্যা করা হয় না বলে একে অহিংস ও শান্তির সিল্ক নামেও ডাকার চল রয়েছে। এই কাপড়ের রয়েছে অসাধারণ তাপীয় বৈশিষ্ট্য, যা পরিধানকারীর শরীরকে শীতে উষ্ণ এবং গ্রীষ্মে শীতল রাখতে পারে। সুতায় বোনা ছোট আঁশগুলোর ভেতর দিয়ে বায়ু চলাচলে সক্ষম। পানি ও ঘাম শোষণ করতে পারে। যত্নে বোনা সুতা কাপড়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। খুব চকচকে কিংবা অনুজ্জ্বল—কোনোটিই নয়। ম্যাট ফিনিশ যাকে বলে, ঠিক তেমন দেখায় এন্ডি সিল্ক। কাপড়টি স্পর্শ করলে হাতে কিছুটা খসখসে ভাব অনুভূত হলেও পরিধানে বেশ আরামদায়ক। দীর্ঘ সময়ের ব্যবহারে সেই আরামবোধ আরও বাড়তে থাকে।

মডেল: দীবা ও ক্রিস্টাল
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: রঙ বাংলাদেশ
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top