জেন্টলম্যান’স I আঁটসাঁট ফিটফাট
অভ্যাস ঢিলেঢালা পোশাকে। সেই করোনার সময় থেকে। ঘরের পোশাক পথঘাট ছাপিয়ে জায়গা করে নিয়েছিল রানওয়েতেও। তবে দশকের অর্ধেক না যেতেই কাটতে শুরু করেছে রেশ। আলোচনায় এবার সেই পুরোনো ফিটিং ফ্যান্টাসি
ঠিক কবে থেকে যে আরাম নিশ্চিত করে পোশাক পরতে শুরু করেছিলেন পুরুষেরা, সেই তথ্যের স্পষ্ট সূত্র পাওয়া কঠিন। কারণ, ইতিহাস অনুযায়ী আরাম নয়; পুরুষের পোশাকের মূলমন্ত্র ছিল শক্তি প্রদর্শন। আর সূত্র হচ্ছে, সামাজিক আধিপত্য এবং ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় পোশাক; অস্বস্তির কারণ হলেও তা গ্রহণযোগ্য। এর প্রমাণ মেলে অতীতে। উনিশ শতকে পশ্চিমা অভিজাত পুরুষদের পোশাকের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিশেষ ধরনের কলার। আলাদা করে বেঁধে নেওয়া ভীষণ শক্ত ও ধারালো এই কলার ঘাড়ের নড়াচড়া সীমিত করে ঘাড় সোজা রাখতে বাধ্য করত। একে বলা হতো ফাদার কিলার। এমন অসংখ্য অস্বস্তিকর নজির মেলে পেছন ফিরে তাকালে, যেখানে পুরুষের পোশাক মানেই এমন কিছু, যা তাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করার পাশাপাশি তার সুঠাম দেহাবয়বের প্রকাশ এবং সামাজিক পদমর্যাদার প্রতিফলন ঘটায়। ফ্যাশনের পরিবর্তনশীল স্বভাবের সূত্র ধরে আবারও ফিরে আসছে সেই ভাবনা।
ফ্যাশনে স্লিম ফিট
এ বছরের জুনের শেষ সপ্তাহ ছিল মেন’স ফ্যাশনের দখলে। গ্লোবাল ফ্যাশন ক্যাপিটালখ্যাত ফ্রান্সের প্যারিসে আয়োজিত হয়েছে প্যারিস ফ্যাশন উইক মেন’স স্প্রিং-সামার ২০২৭। ৩৩টি শো আর ৩৭টি উপস্থাপনার জমকালো আসরে অসংখ্য নতুনত্বের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় ছিল স্লিমার সিলুয়েট। অর্থাৎ, বেশ ফর্ম-ফিটেড স্টাইল, যা চলতি ঢিলেঢালা প্যান্টের সঙ্গে একই রকম স্টাইলের শার্ট ও টি-শার্টের ফ্যাশনের সম্পূর্ণ বিপরীত। ইন হাউস ডিজাইনার অ্যান্থনি ভ্যাকারেলোর নকশায় সেইন্ট লরেনের সংগ্রহে দেখা গেছে ফর্ম-ফিটেড সামার ফিট, ভেস্ট, স্লিম ফিট স্যুট-প্যান্ট, স্প্রিং সোয়েটার; যাকে বলে ওল্ড মানি অ্যাসথেটিক। শোতে ডিওরের অর্ধেকের বেশি সংগ্রহই স্লিম ফিটে সাজিয়েছেন ডিজাইনার জনাথন অ্যান্ডারসন। লাক্সারি ওয়্যারের মধ্যে ছিল ফিটেড ব্লেজার, লং কোট ও ক্র্যাভেট কলার। প্রাডার ডিজাইনার রাফ সাইমনের ডিজাইনেও দেখা গেছে পুরুষদের স্লিমার সিলুয়েট।
পছন্দ-অপছন্দের নেপথ্যে
চলতি শতকের প্রথম দশকে স্কিনি জিনস ছিল ভীষণ ট্রেন্ডি। নারী-পুরুষ সবাই পরতেন। তারপর এলো ব্যাগি স্টাইল। তখন স্কিনি জিনসের নাম শুনলেই নাক সিটকাতেন অনেকে। শুধু তা-ই নয়, করোনার পরপর আঁটসাঁট সবকিছুতেই দেখা গিয়েছিল সামষ্টিক অনীহা। এমনকি ফরমাল ফ্যাশনেও জায়গা করে নিয়েছিল ব্যাগি স্টাইল। কিন্তু ফ্যাশনের দ্রুত পরিবর্তনশীলতা এবং চক্রাকার স্বভাবের কারণে আবারও ফিরেছে সেই আঁটসাঁট স্টাইল। সামষ্টিক পছন্দ-অপছন্দের নেপথ্যে, সব বাধা পেরিয়ে আবারও স্কিনি পোশাকের নকশা করছেন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনাররা। তবে তা শুধু স্কিনি জিনসে আটকে নেই; দেখা যাচ্ছে স্ট্রাকচার্ড টেইলরিংয়ে তৈরি স্লিম ট্রাউজার্স, হাই-ওয়েস্টেড বটমস এবং এমন স্লিক স্লিম সিলুয়েট, যা শুধু আঁটসাঁট নয়, সুঠাম দেখাতেও সহায়ক।
যা কিছু স্টাইলে
এখনকার স্লিমার সিলুয়েট ক্যাটাগরিতে ছেলেদের জন্য রয়েছে আঁটসাঁট টি-শার্ট, স্লিম ফিট পোলো শার্ট, ফিটেড ক্রু-নেক সোয়েটার, ক্রপড জ্যাকেট, সফট-টেইলরড ব্লেজার, শর্ট-লেন্থ বোম্বার জ্যাকেট, স্লিম ফিট ড্রেস শার্ট এবং হালকা ফিটেড ওভার শার্ট। বটম ওয়্যারে রয়েছে হাই-ওয়েস্টেড ট্রাউজার, স্ট্রেইট-লেগ ট্রাউজার, জেন্টলি টেপার্ড ট্রাউজার, স্লিম ফিট চিনো, স্লিম স্ট্রেইট জিনস, নি-লেন্থ টেইলরড শর্টস, স্লিম কাট প্লিটেড ট্রাউজার। ফাইন টেইলরিংয়ে সিঙ্গেল-ব্রেস্টেড স্লিম স্যুট, স্ট্রাকচার্ড ব্লেজার, খানিকটা কম দৈর্ঘ্যের জ্যাকেট, কোমরের আকারকে প্রাধান্য দেয় এমন ডিজাইনের স্যুট এবং স্লিম কাট ওয়েস্টকোট। নিটওয়্যার লাইনে দেহের মাপের সঙ্গে মানানসই কার্ডিগান, স্লিম পুলওভার, লাইটওয়েট নিট পোলো এবং রিবড নিট টপ। আউটার ওয়্যার ক্যাটাগরিতে ট্রিম ট্রেঞ্চ কোট, টেইলরড উল কোট, স্লিম লেদার জ্যাকেট এবং ফিটেড হ্যারিংটন জ্যাকেট।
স্লিমার ফ্যাশন চলেছে জুতার স্টাইলেও—স্লিক লোফার, মিনিমাল লেদার স্নিকার, চেলসি বুট, ডার্বি বা অক্সফোর্ড শু, পয়েন্টেড বা আমন্ড-টো বুট। অনুষঙ্গে আরও আছে স্লিম লেদার বেল্ট, সরু টাই, কমপ্যাক্ট লেদার ব্যাগ, মিনিমাল গয়না, চিকন ফ্রেমের সানগ্লাস।
আঁটসাঁট পোশাক সবার জন্য স্বস্তিকর নয়। তবে স্লিমার সিলুয়েটের ব্যাপারটি ভিন্ন। এ ধারায় আঁটসাঁটের সঙ্গে আরামও নিশ্চিত করা হয়। স্টাইল হয়ে ওঠে আরও অভিব্যক্তিপূর্ণ। গুরুত্ব পায় স্বাস্থ্যের সৌন্দর্য। শরীরের স্বাভাবিক গঠন অনুসরণের মাধ্যমে কাঁধ ও কোমরকে সংজ্ঞায়িত করে, পা দীর্ঘ ও লম্বা দেখায়। ফুটে ওঠে ফিটনেস। ফরমালেও, ক্যাজুয়ালেও। মার্জিত দেখায় ভীষণ। পরিষ্কার, পরিমিত ও পরিশীলিত সুন্দরতা প্রকাশিত হয়।
আবৃতি আহমেদ
মডেল: আজরাফ
মেকওভার: পারসোনা মেনজ
ওয়্যারড্রোব: ব্লুচিজ
ছবি: জিয়া উদ্দীন
